বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৯

কয়েক হাজার অসহায় পোল্যান্ডবাসীকে বাঁচিয়েছিলেন ভারতের এই মহারাজা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়

রূপাঞ্জন গোস্বামী

১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর, পোল্যান্ডকে আক্রমণ করেছিল হিটলারের জার্মানি। ফলশ্রুতিতে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল ব্রিটেন ও ফ্রান্স। শুরু হয়ে গিয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

জার্মানির সঙ্গে গোপন সমঝোতা অনুযায়ী, ১৭ সেপ্টেম্বর পোল্যান্ড আক্রমণ করেছিল সোভিয়েত রাশিয়াও। ২৭ সেপ্টেম্বর স্বাধীনতা হারিয়েছিল পোল্যান্ড। দেশ ছেড়ে ব্রিটেনে আশ্রয় নিয়েছিলেন পোলিশ নেতা মন্ত্রীরা। লক্ষ লক্ষ পোল্যান্ডবাসীকে বন্দি করে কুখ্যাত কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পাঠিয়েছিলেন হিটলার। রাশিয়া পাঠিয়েছিল সাইবেরিয়াতে।

পোল্যান্ড দখলের পর তৃপ্ত হিটলার অভিবাদন জানাচ্ছেন নাৎসি বাহিনীকে, পোল্যান্ডের মাটিতে

অপারেশন বারবারোসা

কিন্তু রাশিয়া ও জার্মানির মধ্যে প্রবল সন্দেহ ও অবিশ্বাস যুদ্ধের আকার নিয়েছিল। ১৯৪১ সালের ২২ জুন হিটলার রাশিয়া আক্রমণ করেছিলেন। যা  অপারেশন বারবারোসা নামে পরিচিত। গ্রামের পর গ্রাম ছারখার করতে করতে এগিয়ে চলেছিল হিটলারের অপরাজেয় বাহিনী। রাশিয়া তৈরি হচ্ছিল প্রত্যাঘাতের জন্য।

রাশিয়ার সেনার হাতে বন্দি পোলিশদের দিয়ে সাইবেরিয়ায় শ্রমিকের কাজ করাতো রাশিয়া। জার্মানির আগ্রাসনের সময় হাজার হাজার পোলিশ শ্রমিক ও তাদের পরিবারকে মুক্তি দিয়েছিল রাশিয়া। উদ্দেশ্য ছিল বন্দি পোলিশদের মধ্যে থেকে সবল পুরুষ বেছে নিয়ে হিটলারের বিরুদ্ধে লড়বার জন্য একটি গেরিলা বাহিনী তৈরি করা।

পোলিশ পুরুষরা তাঁদের পরিবারকে বাঁচাতে রাশিয়ার প্রস্তাবে রাজি হন। হাতে তুলে নেন রাইফেল। পরিবারের বাকিদের পালিয়ে যেতে বলেন।

অপারেশন বারবারোসা

প্রাণ বাঁচাতে, রাতের অন্ধকারে পালিয়েছিলেন তাঁরা

চোখের জলে ভাসতে ভাসতে প্রিয়জনদের ছেড়ে বিভিন্ন দিকে পালাতে শুরু করেছিল অভিভাবকহীন, অসহায় নারী ও শিশুরা। কেউ পালাবার চেষ্টা করেছিলেন জলপথে, কেউ স্থলপথে। কোথায় যাবেন তার ঠিকানা জানা নেই। কয়েকমাস পরেই আসবে শীতকাল, তাই হাড়কাঁপানো শীতের সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে অপেক্ষাকৃত গরম মধ্য-এশিয়ায় যাওয়ার পথ ধরেন শরণার্থীরা।

শুরু হয় কয়েক হাজার কিলোমিটারের এক মর্মান্তিক যাত্রা। কখনও ট্রেনে, কখনও বাসে, কখনও জাহাজে, তবে বেশিরভাগ পথই পায়ে হেঁটে এগিয়ে চলেছিল শরণার্থীরা। বুকে এক চিলতে আশা, যদি কোনও দেশ দেয় আশ্রয়।

হাজার হাজার কিলোমিটার হেঁটে চলা একটু আশ্রয়ের জন্য

সাইবেরিয়া থেকে তুর্কমেনিস্তানের আশখাবাদ। সেখান থেকে ইরানের মাশহাদ, ইস্পাহান, তেহরান হয়ে শরণার্থীরা এসেছিলেন আফগানিস্তানে। তার পর বর্তমান পাকিস্তানের কোয়েটা, জেহাদাউ, করাচি হয়ে জাহাজে তৎকালীন ভারতের বোম্বে বন্দরে পৌঁছেছিলেন। সংখ্যায় মাত্র ৬৪০ জন। বাকিরা দীর্ঘ যাত্রাপথের ধকলে, ঠান্ডায়, অনাহারে, অপুষ্টিতে, জীবনের রাস্তা থেকে মাঝপথেই বিদায় নিয়েছিলেন।

 আশ্রয় দেয়নি কোনও দেশ

শেষ ভরসা ভারত। কিন্তু ব্রিটিশ গভর্নর তাঁদের ভারতে প্রবেশ করতে দিলেন না। তখন শরণার্থীদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন নাওয়ানগর স্টেটের তৎকালীন মহারাজা। তাঁর অধীনস্থ রোজি বন্দরে শরণার্থীদের জাহাজ ভেড়াবার আদেশ দেন ক্ষুব্ধ মহারাজা ।

মহারাজা জামসাহেব দিগ্বিজয় সিংজী রঞ্জিৎ সিংজী জাদেজা

নাওয়ানগর স্টেটে পৌঁছে অবাক হয়েছিলেন সব খোয়ানো মানুষগুলি। তাঁদের অভ্যর্থনা করার জন্য দাঁড়িয়েছিলেন স্বয়ং মহারাজা, জামসাহেব দিগ্বিজয় সিংজী রঞ্জিৎ সিংজী জাদেজা। প্রত্যেককে বুকে জড়িয়ে বলেছিলেন, “নিজেদের অনাথ ভাববেন না। আপনারা এখন নাওয়ানগর স্টেটের জনগণ। আমি হলাম বাপু, আপামর নাওয়ানগরবাসীর পিতা। আজ থেকে আমি আপনাদের অভিভাবক।”

সাইবেরিয়ার বন্দি শিবির থেকে স্বর্গে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন রুগ্ন শীর্ণ মানুষগুলি। যাঁদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন নারী ও অনাথ শিশু।

মহারাজার সঙ্গে শরণার্থীরা

 অভ্যর্থনা জানিয়েই দায় সারেননি জামসাহেব

চিকিৎসা, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছিলেন শরণার্থীদের জন্য। অনাথ শিশুদের পোলিশ ভাষায় শিক্ষা দেওয়ার স্কুল তৈরি করেছিলেন। ক্যাথলিক পাদ্রীদের দিয়ে ধর্মচর্চার ব্যবস্থা করেছিলেন। সবই করেছিলেন যুদ্ধকালীন তৎপরতায়। নিজের অর্থে ও পরিশ্রমে।

প্রথম ব্যাচের পোলিশ শরণার্থীরা

কিন্তু, এর পরেও পোলিশ শরণার্থীদের স্রোত এসেছিল ভারতের পশ্চিম উপকূলে। জামসাহেবের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন পাতিয়ালা ও বরোদার মহারাজা। এগিয়ে এসেছিল টাটা ও অনান্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। সবার সহায়তায় পোলিশ শরণার্থীদের জন্য বালাচাদি, ভালিভাদে (কোলাপুর), বান্দ্রা (মুম্বাই) ও পঞ্চগনিতে আরও শরণার্থী শিবির তৈরি করেছিলেন জামসাহেব।

১৯৪২ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন প্রায় ২০০০০ পোলিশ  শরণার্থী। তার মধ্যে ছিল হাজারেরও বেশি অনাথ শিশু। ১৯৪৫ সালের মে মাসে জার্মানির পতন হয়েছিল। স্বাধীনতা পেয়েছিল পোল্যান্ড। শরণার্থীদের দেশে ফিরতে অনুরোধ করেছিল পোল্যান্ড সরকার।

অনাথ পোলিশ  বালক বালিকাদের জন্য স্কুল করে দিয়েছিলেন মহারাজা

অনেকে ফিরেছিলেন, অনেকে ইংল্যান্ড, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও অনান্য কমনওয়েলথ রাষ্ট্রগুলিতে চলে গিয়েছিলেন। সে ব্যবস্থাও করেছিলেন জামসাহেব। শরণার্থীরা ভারত ছেড়ে যাওয়ার সময় স্টেশনে তাঁদের বিদায় জানাতে এসেছিলেন। সেদিন অঝোরে কেঁদেছিলেন শরণার্থীরা। জামসাহেবের চোখেও সেদিন ছিল জল।

আজও ভোলেনি পোল্যান্ড

পোল্যান্ডের নাগরিকদের প্রতি তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য পোলান্ড সরকার জামসাহেবকে মরণোত্তর Commanders Cross of the Order of the Merit of the Polish Republic পদক দিয়ে সম্মান জানিয়েছে। তাঁর নামে একটি রাস্তা ও একটি স্কোয়ারের নামকরণের করা হয়েছে।

পোল্যান্ডে মহারাজা স্কোয়ার

পোল্যান্ডের রাজধানী  ওয়ারশ’তে আছে একটি স্কুল। বাইরে থেকে আর পাঁচটি পোলিশ স্কুলের মত মনে হলেও, ভেতরে ঢুকে অবাক হয়ে যান অতিথিরা। একটুকরো ভারত যেন উঠে এসেছে পোল্যান্ডে। দেওয়ালে দেওয়ালে ঝুলছে অসাধারণ সব পেন্টিং। তাজ মহল, হোলি খেলার দৃশ্য, বেনারসের গঙ্গার ঘাট থেকে শুরু করে ভারতীয় গ্রাম্য জীবনের ছবি। স্কুলের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে ভারত থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন দেব দেবীর মূর্তি, ভাস্কর্য ও হস্তশিল্প।

জামসাহেব এই স্কুলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক

সর্বপরি স্কুলটির সঙ্গে  জড়িয়ে আছেন জামসাহেব দিগ্বিজয় সিংজী রঞ্জিৎ সিংজী জাদেজা। স্কুলের গেটের পাশে টাঙানো স্কুলের নামের ওপরে তাঁর নামের বোর্ড টাঙানো আছে। কারণ তিনিই স্কুলটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক।

১৯৯৯ সালের জুন মাসে স্কুলের ছাত্র, শিক্ষক ও অভিভাবকরা সর্বসম্মতিক্রমে  চিরকালের জন্য জামসাহেবকে স্কুলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ঘোষণা করেছিলেন। যে জামসাহেব প্রয়াত হয়েছিলেন ১৯৬৬ সালে।

১৯৯৩ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত ভারতে পোল্যান্ডের অ্যাম্বাসাডর ছিলেন Maria Krzyszt। তিনি দেশে ফিরে পোলিশ শরণার্থীদের প্রতি জামসাহেবের ভালোবাসাকে অমর করে রাখতে মহারাজার স্মৃতিতে এই স্কুলটি তৈরি করেন। তিনি চান যুগযুগ ধরে স্কুলের ছাত্র ছাত্রীরা এই ঐতিহাসিক ঘটনাটিকে বাঁচিয়ে রাখুক।

পোল্যান্ড  থেকে  জামনগরে তাঁর বাপুর কাছে এসেছিলেন তখনকার অনাথ শিশু, ৭৬ বছর পরে

স্কুলটি আজ বিনা অর্থে চেচনিয়া, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা , তিব্বত ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের শরণার্থী বালক বালিকাদের শিক্ষাদান করে থাকে। যে মানবিকতার বীজ বপন করেছিলেন জামসাহেব, তা আজ মহীরুহ হয়ে ডালপালা মেলছে বিশ্বজুড়ে। 

ভারতই বিশ্বকে বসুধৈব কুটুম্বকমএর কথা শিখিয়েছে। হাজার হাজার বছর ধরে ভারতই সমগ্র মানবজাতিকে এক অখণ্ড পরিবার হিসেবে ভেবে এসেছে। তা বুঝি আরও একবার প্রমাণ করে দিয়ে গেছিলেন জামসাহেব দিগ্বিজয় সিংজী রঞ্জিৎ সিংজী জাদেজা।

Comments are closed.