সাবমেরিনের নাবিকদের রুদ্ধশ্বাস জীবন, বাথরুমের কমোডেও ঘটতে পারে বিস্ফোরণ

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রূপাঞ্জন গোস্বামী

পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় যানের নাম সম্ভবত ডুবোজাহাজ বা সাবমেরিন। কারণ তাকে দেখতে পাওয়া যায় না। এবং যাকে দেখে পাওয়া যায় না, তার প্রতি আমাদের থাকে অসীম আগ্রহ। মহাকাশচারীদের জীবনযাত্রা সম্বন্ধে জানা গেলেও সাবমেরিনের ক্রু’দের জীবনযাত্রা নিয়ে খুব একটা কিছু জানা যায় না। ফলে সেটা নিয়ে কৌতুহল থাকে সবার।

আসলে মহাকাশচারীরা অসামরিক মানুষ, তাঁদের মিশনটাও অসামরিক। তাই তাঁদের সম্পর্কে অনেক কিছু জানা সম্ভব। কিন্তু সাবমেরিনের ক্রু’দের জীবনযাপন সম্পর্কে ততটা জানা সম্ভব নয়। কারণ সাবমেরিন প্রকৃত অর্থে একটি ডুবন্ত যুদ্ধজাহাজ। যার মূল কাজ তার শত্রুকে চূড়ান্ত ছোবল মারা ও পর্যুদস্ত করা।

তবুও সাবমেরিনের ক্রু’দের রহস্যময় জীবনযাত্রার কথা জানতে ইচ্ছে হয় আমাদের সবার। তাই, নির্দিষ্ট কোনও দেশের নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাবমেরিন ক্রুদের গড়পড়তা জীবনযাত্রা উঠে আসবে এই লেখায়। কারণ, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের হাতে বিভিন্ন মাপের ও বিভিন্ন ক্ষমতার সাবমেরিন থাকলেও সাবমেরিনের ভেতরের জীবনযাত্রা অনেকটাই এক।

 তার আগে জেনে নিন, সাবমেরিন সংক্রান্ত কিছু তথ্য

● সাবমেরিনে থাকে অনেকগুলি ব্যালাস্ট ট্যাঙ্ক। তাতে জল প্রবেশ করিয়ে সাবমেরিন জলে ডোবে। আবার  প্রয়োজনে ওই ট্যাঙ্ক থেকে জল বার করে দিয়ে, বাতাস ঢুকিয়ে হালকা হয়ে যায় সাবমেরিন। ভেসে ওঠে জলের ওপরে।

সাবমেরিন যেভাবে জলে ডোবে ভাসে

● সমুদ্রের জল বিশেষ চেম্বারে নিয়ে তড়িৎ-বিশ্লেষণ ঘটিয়ে জল থেকে অক্সিজেন উৎপন্ন করে দুটি অক্সিজেন জেনারেটর। অক্সিজেন জমা থাকে ট্যাঙ্কে। সাবমেরিনের ভেতর অক্সিজেনের অভাব হলেই কম্পিউটার জানিয়ে দেয়। প্রয়োজন অনুসারে বিশুদ্ধ অক্সিজেন ছাড়া হয় সাবমেরিনের ভেতর।

● সাবমেরিনের ভেতরের উৎপন্ন হওয়া কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে সোডা লাইম ডিভাইস। সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড, ক্যালসিয়াম হাইড্রক্সাইড থাকে যন্ত্রটিতে।

● সাবমেরিনে আদ্রতা শোষণকারী যন্ত্র থাকে, যা শরীর থেকে নির্গত হওয়া জলীয়বাস্প শুষে নেয়।

● প্রয়োজন অনুযায়ী  সমুদ্রের জল ডিস্টিলেশন পদ্ধতিতে পরিস্রুত করে, দৈনিক ১০০০০ থেকে ৪০০০০ গ্যালন বিশুদ্ধ জল তৈরি করা হয়।

অক্সিজেন জেনারেটর

● সাবমেরিন চলে পারমাণবিক শক্তি ও ডিজেল-ইলেকট্রিকের সাহায্যে। ডিজেল দিয়ে জেনারেটর চালিয়ে বিশাল বিশাল ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হয়। ব্যাটারির সংগ্রহ করা বিদ্যুতে চলে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি।

● একটি সাবমেরিন কয়েকটি কক্ষে বিভক্ত থাকে, যেমন control room, Auxiliary Machinery Space, Battery Compartment, Crews Mess এবং Wardroom। আবার  কন্ট্রোল রুমের মধ্যে থাকে,  Sonar Room, Radio Room,Torpedo Room

● জাহাজ, উড়োজাহাজ, মহাকাশ যানের কন্ট্রোল রুম থেকে বাইরেটা দেখা যায়। কিন্তু সাবমেরিনের কন্ট্রোল রুম থাকে যানটির মাঝখানে।

সাবমেরিনের কন্ট্রোল রুম

সমুদ্রের তলদেশের জমাট অন্ধকারে কিছু দেখা যায় না। তাই  Sonar Room থেকে শব্দ তরঙ্গ ছুঁড়ে সাবমেরিনের সামনের পরিবেশের ত্রিমাত্রিক ছবি আঁকা হয়। এ ছাড়াও সুবিধা ও হানাদারের ভয় না থাকলে জলের কয়েক ফুট নীচে থেকে পেরিস্কোপের সাহায্যে চারপাশ দেখা যায়।

● আকার অনুসারে একটি সাবমেরিনে ৫০ থেকে ১৩৫ জন ক্রু ও অফিসার থাকতে পারেন। সাধারণত ৬০ থেকে ৮০ দিনের হয় এক একটি মিশন।

সাবমেরিনে থাকে জলের নীচে ছোঁড়ার উপযোগী ক্ষেপণাস্ত্র টর্পেডো। এটি এক ধরণের স্ব-চালিত ক্ষেপণাস্ত্র, যা বিস্ফোরক বহন করে এবং লক্ষ্য বস্তুকে আঘাত করে বিস্ফোরিত হয়। এছাড়াও অনেক সাবমেরিন পারমানবিক ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম।

জলের নীচে টর্পেডো ছুঁড়ছে সাবমেরিন

কারা হন সাবমেরিনের নাবিক!

সাবমেরিনের নাবিকের পেশা সম্ভবত বিশ্বের কঠিনতম পেশাগুলির একটি। কারণ এমন একটি পরিবেশে কাজ করতে হয়, যে পরিবেশে মাসের পর মাস, টিকে থাকাই দুস্কর।

জলের নীচের জমাট ঘন অন্ধকার, বুঝতে দেয় না দিন রাতের তফাত। এছাড়াও বাইরের জগতের সঙ্গে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে কাটাতে হয়। ফলে শরীরে ও মনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যার থেকে জন্ম নিতে পারে মানসিক অস্থিরতা থেকে মানসিক বৈকল্য। ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে সাবমেরিনের মিশন।

তাই, সারা বিশ্বেই সাবমেরিন ক্রুদের বাছাই করা হয় অসংখ্য স্তরে নেওয়া কঠিন পরীক্ষার মাধ্যমে। লিখিত, শারীরিক, মানসিক পরীক্ষার পরেও থাকে দলবদ্ধ ভাবে কাজ করার, অনুশাসন মানার, বিপদের মুহূর্তে মাথা ঠান্ডা রাখার হাজারো পরীক্ষা।

তারপর, স্থলে ও জলে চলে কঠিন ট্রেনিং। সাবমেরিনের খুঁটিনাটি থেকে আপদকালীন অবস্থা সামাল দেওয়ার ট্রেনিং। একই সঙ্গে হবু নাবিককে তাঁর অলক্ষ্যে সামাজিক পরিবেশে বিভিন্ন ভাবে কড়া নজরে রাখা হয়। কারণ সামরিক কৌশল ও সাবমেরিনের নকশা তাঁর মাধ্যমে শত্রুদেশ  হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই পারে।

ট্রেনিং শেষে অভিজ্ঞতা অনুসারে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন গুরুত্বের সাবমেরিনে পোস্টিং দেয় হবু নাবিককে। সাবমেরিনের ভেতরে প্রত্যেকের কাজ নির্দিষ্ট করা থাকে। সেই তালিকা অনুযায়ী কাজ করেন। তবে সাবমেরিনের ভেতরে কোনও শ্রেণি বিভাজন নেই। অফিসার থেকে ক্রু, সবাইকেই সব কাজ করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়।

 কী খান!

বিভিন্ন দেশের সাবমেরিনের নাবিকরা তাঁদের দেশের রেসিপির খাবার খান। খাবার তৈরি হয় ছোট্ট সুরক্ষিত কিচেনে। ধোঁয়া ও বাষ্প যাতে অতি সামান্য হয়, তাই রান্না হয় মূলত ইলেকট্রিক ওভেন, গ্রিল ও ফ্রায়ারে। ব্যবহার করা হয় ইলেকট্রিক কেটলি। সব ক্রু’কেই রান্না জানতে হয়।

সাবমেরিনের রান্নাঘর

কতদিনের মিশন, সেই অনুযায়ী সাবমেরিনে খাদ্যদ্রব্য বোঝাই করা হয়। তাজা শাকসবজি নেওয়া হলেও, তা কয়েকদিন পরেই বাসি হয়ে যায়। তাই ক্যানবন্দি বিভিন্ন খাবার নেওয়া হয়। ভিনিগার বা তেলে ডোবানো সবজি, স্যালাড, মাছ ,মাংস,  ডিম, মাখন, কফি, বাদাম, শুকনো ফল, বিস্কুট ,পাউরুটি, পাস্তা নেওয়া হয় যাত্রী সংখ্যা বুঝে।

সাবমেরিনে ক্যানবন্দি খাবার তোলা হচ্ছে

খাবার রান্না করা হয় প্রায় তেল-ঝাল-মশলা ছাড়া। খাবারে স্বাদ আনার জন্য সস, সর্ষের কাসুন্দি, কেচাপ, মেয়োনিজ মাখিয়ে নিতে হয়। সাবমেরিনের নাবিকদের সবচেয়ে পছন্দের খাবার আইসক্রিম। সেটাও নেওয়া হয় প্রচুর পরিমাণে। তবে সব কিছুই খেতে হয় মাপা পরিমাণে। কারণ সাবমেরিনে নির্দিষ্ট পরিমাণে খাবার মজুত থাকে।

সাবমেরিনে খাবার তোলার আগে বিশেষজ্ঞদের দিয়ে কঠোরভাবে পরীক্ষা করে নেওয়া হয়। যাতে কোনও ভাবেই খাদ্যের জন্য শরীর খারাপ না হয় বা কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে খাদ্যে কিছু মিশিয়ে অন্তর্ঘাত করতে না পারে।

কী ভাবে নিজেদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখেন!

সাবমেরিনে রোজ স্নান করা সম্ভব নয়। কারণ, জলের ভেতর থেকেও জলের অভাব। বিশুদ্ধ জল উৎপাদনে প্রচুর শক্তি লাগে। তাই জলের অপচয় রুখতে সাধারণত সপ্তাহে একদিন স্নান করেন সাবমেরিনের নাবিকরা।

সাবমেরিনের বাথরুম

বিশেষ একধরণের জামা প্যান্ট পরে থাকেন তাঁরা, যার ভেতরে ব্যাকটিরিয়া ও ছত্রাক নিরোধক রাসায়নিক লাগানো থাকে। তিনদিন পরার পর আবার নতুন জামা প্যান্টের সেট বের করে পরে নেন। কাচার বালাই নেই।

দাঁত মাজা বা দাড়ি কাটতে কোনও সমস্যা নেই। ভয় সাবমেরিনের কমোডকে নিয়ে। কমোড মলমূত্র পাঠায় বিশেষ ট্যাঙ্কে। একটি ভালবের সাহায্যে নিয়মিত ট্যাঙ্ক সমুদ্রে খালি করা হয়। কিন্তু ভালবের সামান্য ত্রুটি থাকলে, ভালব ফাটিয়ে ভয়াবহ গতিতে সমুদ্রের জল কমোড দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে।

কী ভাবে অবসর কাটান!

প্রতি তিন ঘন্টা ডিউটির পর ছ’ঘন্টা বিশ্রাম বাধ্যতামূলক। ক্রু’দের শোয়ার জন্য আছে ওপর-নীচে ঘেঁষাঘেসি করে থাকা অনেকগুলি বাঙ্ক। অনেক সাবমেরিনে আবার হট বাঙ্ক থাকে সেখানে নাবিকের সংখ্যার তুলনায় বেড কম থাকে। একজন ডিউটিতে গেলে অন্যজন বাঙ্কে শোয়ার সুযোগ পান।

শোয়ার জায়গা

প্রতিটি সাবমেরিনের ভিতরে থাকে জিম। সেখানে ট্রেডমিল, স্ট্যাটিক সাইকেল ও অনান্য সরঞ্জাম থাকে। যেগুলি রাখতে সাধারণত জায়গা কম লাগে। ডিউটির আগে ও ডিউটি থেকে ফিরে ব্যায়াম করেন সাবমেরিনের ক্রু ও অফিসারেরা।

এছাড়াও অবসরে সবাই তাস, দাবা, ভিডিও গেম খেলেন। নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করেন। ভিডিয়ো প্লেয়ার দিয়ে সিনেমা দেখেন।

অবসরে ভিডিয়ো গেম খেলছেন

কিছু অদ্ভুত রীতি, যা বিস্ময় জাগায়

line-crossing ceremony 

বিষুবরেখা (Equator) পার হওয়ার দিন সাবমেরিনে এই বিশেষ অনুষ্ঠানটি হয়। ক্রুদের মধ্যে সবচেয়ে মোটাসোটা একজনকে সাজানো হয় নেপচুনের রাজা। তাঁর পারিষদ সাজেন কয়েকজন ক্রু। তাঁদের নিয়ে চলে নানান ঠাট্টা তামাসা, গান বাজনা।

লাইন ক্রসিং সেরিমনি

steel beach picnic

মিশনের ঠিক মধ্যভাগে এই উৎসবটি উদযাপন করা হয়। সে দিন সমুদ্রের জলের ওপরে ভেসে ওঠে সাবমেরিন। সাবমেরিনের ডেকে চলে আনন্দ উৎসব, খানা পিনা। ডেকে রোদ চশমা পড়ে গায়ে রোদ লাগান সবাই অনেকদিন পর।

খালি গায়ে শর্টপ্যান্ট পরে সাগরের জলে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মনের আনন্দে সাঁতার কাটেন। সেই সময় ডেক থেকে সমুদ্রের জলে কড়া নজরদারি চালান কয়েকজন ক্রু। হাতে থাকে রাইফেল, সমুদ্রের হাঙরদের হাত থেকে সহকর্মীদের রক্ষা করার জন্য।

স্টিল বিচ পিকনিক

পদে পদে মৃত্যুর হাতছানি

অনেক সময় শত্রুর জাহাজ ও ডুবোজাহাজের ওপর নজরদারি চালাতে গিয়ে শত্রুর জলসীমায় ঢুকে পড়ে সাবমেরিন। শত্রুর অ্যান্টি-সাবমেরিন ডিফেন্স সিস্টেমের কাছে যখন তখন ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে। শত্রু তার সুরক্ষা ব্যাবস্থার সাহায্যে অনেক সময় জেনেও ফেলে সাবমেরিনটির অবস্থান।

শত্রু পক্ষের নৌ-বাহিনী, তাদের বিমান, হেলিকপ্টার, জাহাজ থেকে সাবমেরিনের কাছে নামিয়ে দেয় ডেপথ চার্জার নামে সাবমেরিন বিধ্বংসী বোমা। একই সঙ্গে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ ঘটায় ও ভয়ঙ্কর মাত্রার বিদ্যুৎ ছড়িয়ে দেয় ডেপথ চার্জার বোমাটি।

সাবমেরিনের ওপরে নামছে ডেপথ চার্জার বোমা

সাবমেরিনটি বিদ্যুৎপৃষ্ট হওয়ার জন্য ভেতরের সব বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি একই সঙ্গে বিকল হয়। বিস্ফোরণের অভিঘাতে স্টিলের চাদর ভেদ করে সাবমেরিনের ভেতরে ঢুকতে শুরু করে সমুদ্রের জল।

অন্যের জলসীমায় নিজেদের সাবমেরিনের অস্তিত্ব স্বীকার করে না বেশিরভাগ দেশ। অভিযোগ জানানো হলে, আক্রমণকারী দেশ বলে, তাদের নৌ বাহিনী নিজেদের জলসীমায় নৌযুদ্ধের মহড়া করছিল। তারই অঙ্গ হিসেবে জলে নেমেছিল ডিপ চার্জার বোমা। জলের নীচে শত্রুদের সাবমেরিন আছে সেটা বুঝতেই পারেনি তারা। 

সকলের অলক্ষ্যেই সলিলসমাধি হয়ে যায় সাবমেরিন ও তাতে থাকা অসহায় মানুষগুলির। ওপরের পৃথিবীর জানতেও পারে না।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More