বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৭

খাবার খাচ্ছেন স্বাদ পাচ্ছেন না! ঢেকুরও তোলা যাবে না! কীভাবে মহাকাশে বেঁচে থাকেন মহাকাশচারীরা?

রূপাঞ্জন গোস্বামী

পৃথিবীর বেশিরভাগ কিশোর-কিশোরীর স্বপ্ন থাকে মহাকাশচারী হওয়ার। রকেটে করে মহাকাশে উড়ে যাওয়ার। মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে দেখার। অভিকর্ষশূন্য পরিবেশে উড়ে বেড়ানোর। গ্রহ, নক্ষত্র, নীহারিকার রহস্যময় জগতকে চাক্ষুস করার। কিন্তু মহাকাশচারী হওয়া আদৌ সহজ কাজ নয়, বরং পৃথিবীর অন্যতম কঠিন কাজগুলির মধ্যে একটি।

খুবই কম লোক জানেন, ভয়ঙ্কর কঠিন নির্বাচন পদ্ধতির সাহায্যে প্রতি ৬০০০ বিজ্ঞানীর মধ্যে থেকে প্রতি মিশনে মাত্র জনকে বেছে নেয় নাসা। মহাকাশে মহাকাশচারীদের জীবন সুখের মনে হলেও বাস্তবিক ক্ষেত্রে তা চরম দুঃসহ। এমনকী, পৃথিবীতে আর ফেরা নাও হতে পারে। তাই মহাকাশচারীদের জন্য বিশাল অঙ্কের জীবন বিমা করানো হয়। মহাকাশচারীরা মহাকাশে যাওয়ার আগে উইল করে যান, বা পরিবারের লোকজনদের সম্পত্তি বুঝিয়ে দিয়ে যান।

মহাকাশে মহাকাশচারীরা কী করেন !

সংক্ষেপে বলা অসম্ভব, তবুও জেনে রাখুন, প্রত্যেক মহাকাশচারীকে আলাদা আলাদা দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়। যাওয়ার আগে থেকেই মহাকাশে তাঁদের প্রতি মিনিটের কাজ নির্দিষ্ট করা থাকে। কেউ করেন গবেষণা, কেউ করেন মহাকাশযান বা স্পেস স্টেশন রক্ষণাবেক্ষণের কাজ। গবেষণা বা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মহাকাশচারীদের কখনও কখনও মহাকাশযানের বাইরে Space Walk করতে হয়। আধ ঘন্টা অন্তর অন্তর প্রত্যেককেই নাসার পৃথিবীস্থিত নিয়ন্ত্রণ কক্ষে কাজের রিপোর্ট পাঠাতে হয়। কিংবা ভিডিও ইন্টারভিউ দিতে হয়।

স্পেস স্টেশনের বাইরে কাজে ব্যস্ত মহাকাশচারীরা

মহাকাশযানে বাস করা আদৌ সহজ নয় কেন!

কারণ, মহাকাশে মহাকাশচারীদের লড়তে হয় নিজের দেহের সঙ্গে।

● মহাকাশে খাবার স্বাদহীন লাগে। ঢেকুর তোলা যায় না। কারণ জিরো গ্রাভিটিতে গ্যাস ওপরে ওঠে না। গা বমি লাগে।

● মহাকাশযানের ভেতর ভাসতে ভাসতে প্রতি মুহূর্তেই ধাক্কা খেতে হয় দেওয়ালে। অসতর্ক হলে গুরুতর চোট লাগে মাথায়।

● অভিকর্ষ না থাকার জন্য মহাকাশে মহাকাশচারীদের উচ্চতা দুই ইঞ্চি বেড়ে যায়। পৃথিবীতে ফেরার পর উচ্চতা আবার কমে যায়।

● মহাকাশে বায়ুত্যাগের পরিণতি মারাত্মক হতে পরে। মহাকাশচারীদের  ক্ষুদ্রান্ত্রে থাকা ব্যাকটেরিয়া দাহ্য গ্যাস তৈরি করতে পারে। তাই স্পেস স্যুটে স্পেশাল ফিল্টার লাগানো আছে, যেটি দাহ্য গ্যাস ও কার্বনডাই অক্সাইড বের করে দেয়।

● পৃথিবীতে, আমাদের পা আমাদের শরীরের ভার বহন করে। এই ভার সামাল দেওয়ার জন্য আমাদের পায়ের হাড় আর পেশী শক্ত হয়। কিন্তু মহাকাশে মহাকাশচারীরা খুব একটা বেশি পায়ের ব্যবহার করেন না। কারণ তাঁরা শূন্যে ভাসেন। এর ফলে তাঁদের কোমর ও পায়ের পেশী ক্রমশ ক্ষমতা হারাতে থাকে। হাড় ক্রমশ পাতলা ও দুর্বল হতে থাকে। তাই মহাকাশচারীদের রোজ ঘন্টা দুয়েক ব্যায়াম করা বাধ্যতামূলক করেছে নাসা

মহাকাশযানের জিমে চলছে এক্সারসাইজ

● মহাকাশে মানুষের হৃদপিন্ড ও রক্তেরও পরিবর্তন ঘটে। আমরা যখন পৃথিবীর বুকে দাঁড়াই, মাধ্যাকর্ষণের টানে রক্ত নেমে যায় পায়ে।  কিন্তু মহাকাশে মাধ্যাকর্ষণ নেই, ফলে রক্ত উঠে আসে মাথায় ও শরীরের ওপরের দিকে। এর জন্যই মহাকাশচারীদের মুখ ফোলাফোলা লাগে। ব্রেনে ভীষণ চাপ পড়ে।

● মহাকাশে শরীর খারাপ হলে মুশকিল। কারণ মহাকাশযানে ডাক্তার বা হাসপাতাল নেই। রোগ হলেও দ্রুত পৃথিবীতে ফেরার উপায় নেই। তাই আতঙ্কে থাকেন মহাকাশচারীরা, যদিও প্রত্যেক মহাকাশচারীকে রীতিমতো প্রশিক্ষণ দিয়ে হাফ-ডাক্তার বানিয়ে দেওয়া হয়।

মহাকাশচারীরা কী ভাবে নিজেদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখেন!

● মহাকাশচারীরা  ঘুম থেকে উঠে আমাদেরই মতো দাঁত ব্রাশ করেন এবং প্রাকৃতিক কাজ সেরে ফেলেন। প্রত্যেক মহাকাশচারীর নিজস্ব টুথব্রাশ, পেস্ট, চিরুনি, শেভ করার মেশিন আছে। সেগুলি রাখা থাকে একটি হাইজিন কিটে। মহাকাশযানে  কোনও বেসিন থাকে না। থাকে না ট্যাপ কল। দাঁত ব্রাশের পর আমাদের মতো কুলকুচি করেন না তারা। ভেজা টিস্যু পেপার দিয়ে মুছে ফেলেন।

● মহাকাশে স্নান করেন তাঁরা, কিন্তু ভিন্ন ভাবে।  বিশেষ সাবান আর শ্যাম্পু ব্যবহার করেন স্নানের ক্ষেত্রে। এই সাবান ধুতে জল লাগে না। কিন্তু খুব সাবধানে করতে হয় স্নান। যাতে ফেনা গা থেকে বেরিয়ে ছড়িয়ে না যায়। সাবান মাখার পর ভিজে তোয়ালে দিয়ে মুছে নেন।

মহাকাশে স্নান করছেন মহাকাশচারী

● স্পেস স্টেশন বা মহাকাশযানগুলিতে পান করার ও অন্য কাজে ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ জল নিয়ে যাওয়া হয়। তাই জলের অপচয় রুখতে বিশেষ ভাবে নির্মিত ওয়াটার পাউচ ব্যবহার করেন মহাকাশচারীরা। যে পাউচে চাপ দিলে ফোঁটা ফোঁটা জল বেরিয়ে আসে।

●  মহাকাশচারীদের প্রাকৃতিক কাজ সারার  জন্য ‘স্পেস টয়লেট’ বা জিরো গ্র্যাভিটি টয়লেট থাকে। আমাদের টয়লেটের চেয়ে এগুলি একদমই আলাদা। পৃথিবীতে অভিকর্ষ বল কাজ করে। তাই আমরা মল মূত্র ত্যাগ করলে তা নীচে চলে যায়। কিন্তু মহাকাশে তা হয় না। তাই মলমূত্র ত্যাগের জন্য ভ্যাকুয়াম ক্লিনার লাগানো কমোড ব্যবহার করা হয়। শোষণক্ষমতা যুক্ত কমোড দূষিত বায়ু, কঠিন ও তরল বর্জ্য টেনে নেয়। আমরা একই কমোডে কঠিন-তরল উভয় ধরনের বর্জ্য ত্যাগ করলেও মহাকাশচারীরা মূত্রত্যাগ করেন আলাদা ভ্যাকুয়াম টিউবে। মূত্রকে ফিল্টার মেশিনের সাহায্যে আবার শুদ্ধ জলে পরিণত করা হয়।

স্পেস টয়লেট’ বা জিরো গ্র্যাভিটি টয়লেট

● মহাকাশচারীদের খুবই ছোট্ট জায়গায় বাস করতে হয়। সেই জন্য জায়গাটি ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ব্যবহার করে পরিষ্কার রাখতে হয় নিয়মিত। জীবাণুনাশক সাবান ব্যবহার করে মহাকাশযানের জানালা, দেওয়াল ও মেঝে প্রতিদিন পরিষ্কার করতে হয়। একই ভাবে তাঁদের খাবার ট্রে, কাঁটা দেওয়া চামচ সাফ রাখেন। আবর্জনাও ঘাঁটতে হয় মহাকাশচারীদের। মহাকাশযানে চারটে ডাস্টবিন থাকে। তিনটে শুকনো আবর্জনা ও একটা ভিজে আবর্জনার জন্য। দুর্গন্ধযুক্ত যেকোনও বর্জ্য ভিজে আবর্জনার ডাস্টবিনে জমা হয়।

 কী খান মহাকাশচারীরা! 

মহাকাশচারীরা আমাদের মতো তিন বেলা খাবার খান। সেই খাবার নিয়ে যাওয়া হয় অনেক হিসেব করে। কারণ মহাকাশে  খাবার নিয়ে যাবার জন্য এবং সেই খাবারকে ভাল রাখতে নাসার খরচ হয় লক্ষ লক্ষ ডলার। তাই প্রত্যেক মহাকাশচারীর জন্য নিদিষ্ট পরিমাণ খাবার নিয়ে যাওয়া হয়। খাবার মহাকাশযানে ওঠে নাসার ল্যাবরেটরি গ্রিন সিগনাল দেওয়ার পর। কারণ, নাসা চায় না মহাকাশচারী মহাকাশে খাবারের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ুন। মহাকাশযান কিংবা স্টেশনে ফ্রিজার থাকে না। তাই খাবার সেখানে শুকনো করেই সংরক্ষণ করা হয়। 

মহাকাশের লাঞ্চ কিট

১৯৬২ সালে আমেরিকার Mercury space mission এর মহাকাশচারী জন গ্লেন দিয়ে শুরু হয়েছিল নাসার টিউব ফুড। তরল খাবার ভরা থাকে টুথপেস্টের মতো টিউবের মধ্যে। খাওয়ার সময় মহাকাশচারীরা গরম জল ঢুকিয়ে দেন টিউবে। তারপর টিউবে চাপ দিয়ে মুখে খাবার ঢালেন।

এখন অবশ্য মহাকাশচারীরা মহাকাশেও তাদের পছন্দমতো খাবার খেতে পারেন, যেমন, পাস্তা, নুডলস, ম্যাকারোনি, পিৎজা,বার্গার, ফলমূল, মুরগি, বিফ, সি-ফুড, চকোলেট, বাদাম, মাখন-সহ হরেক খাবার। এখনকার মহাকাশযানগুলিতে রান্নাঘরও আছে, যেখানে গরম জল ও বৈদ্যুতিক ওভেন আছে। তাই মহাকাশচারীরা খাবার গরম করে খেতে পারেন।

মহাকাশে উড়ছে পিৎজা

খাবারে স্বাদ আনার জন্য মহাকাশচারীরা খাবারে সস, সর্ষের কাসুন্দি, কেচাপ, মেয়োনিজ মাখিয়ে নেন। লবণ আর গোলমরিচ মহাকাশে নেওয়া হয় তরলাকারে। যাতে এসবের গুঁড়ো ছড়িয়ে পড়ে মহাকাশযানে বিপত্তি না ঘটাতে পারে। 

দৈনিক খাদ্য তালিকা

ব্রেকফাস্ট:  রান্নাকরা দানাশষ্য, বিফ স্টেক, দুধ ও মাখন মিশ্রিত ফেটানো ডিম, কোকো, ফল ও ফলের রস।

লাঞ্চ: সবজি, পাস্তা, নুডলস, ম্যাকারনি, হট ডগ, পাউরুটি, কলা, আখরোট, আমন্ড, ফলের রস।

ডিনার:  স্যুপ অথবা বিভিন্ন ধরণের ফলের মিশ্রণ, চালের পোলাও, পুডিং, ফলের রস ও মহাকাশচারীদের মনপসন্দ চিংড়ির ককটেল।

মনে প্রশ্ন জাগে, মহাকাশচারীরা কী ভাবে বোঝেন কখন কোন বেলার খাবার খেতে হবে! আসলে প্রত্যেক মহাকাশচারীর প্রতি মিনিটের কাজ, যাত্রা শুরুর আগেই নির্দিষ্ট করা হয়ে থাকে। তাই মহাকাশে তাঁরা তালিকায় নির্দিষ্ট করা সময়ে নির্দিষ্ট খাবারের প্যাকেট খুলে নেন। নাসার মহাকাশযানে মদ্যপান নিষিদ্ধ, তবে রাশিয়ানরা তাঁদের মহাকাশযানে পরিমিত মদ্যপান করে থাকেন।

অবসরে চলছে গান বাজনা

কী ভাবে অবসর কাটান মহাকাশচারীরা! 

মহাকাশচারীরা শুধু কাজই করেন না, আমাদের মতো তাঁদেরও সপ্তাহে দু’দিন ছুটি থাকে। ছুটির দিনগুলিতে তাঁরা পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন। গান শুনে, সিনেমা দেখে, তাস বা দাবা খেলে কিংবা বই পড়ে সময় কাটান। সহকর্মীদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা-আনন্দে মেতে ওঠেন। নয়তো মহাকাশযানের ছোট ছোট জানালা দিয়ে দূরের পৃথিবীকে দেখে সময় কাটান। আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশন পৃথিবীকে ৪৫ মিনিট পর পর ঘুরে আসে বলে, সেখানে থাকা মহাকাশচারীরা ২৪ ঘণ্টায় অনেকবার সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখতে পান। এটা দেখাও তাঁদের অন্যতম বিনোদন।

বিচিত্র ভাবে ঘুমিয়ে আছেন মহাকাশচারীরা

মহাকাশচারীরা কী ভাবে ঘুমান! 

একজন মহাকাশচারী মহাকাশে যে ভাবে ইচ্ছা সে ভাবে ঘুমোতে পারেন। কারণ,মহাকাশে কোনটা ‘উপরদিক’ বা কোনটা ‘নীচ’ বোঝা যায় না। তবে ঘুমোনোর আগে মহাকাশচারীরা নিজেকে বিছানার সঙ্গে বেল্ট দিয়ে বেঁধে নেন। যাতে ভারহীনতার জন্য বিছানা থেকে ভেসে গিয়ে দেওয়ালে বা কোনো কিছুতে আঘাত না করেন, বা নিজে আঘাতপ্রাপ্ত না হন।

মহাকাশচারীদের কেবিনগুলোতে গান শোনার এবং হালকা আলোর ব্যবস্থা থাকে। মহাকাশচারীদের দৈনিক ৮ ঘণ্টা করে ঘুমানো বাধ্যতামূলক। মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, মহাকাশে দিন রাত বলে কিছুই নেই, তাহলে তাঁরা ঘুমোন কী ভাবে! আসলে মহাকাশচারীদের ঘুমোনোর সময়ও আগে থেকে নির্দিষ্ট করা থাকে।

Comments are closed.