বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪

গণধোলাইয়ে মৃত্যুর ইতিহাস সন্ধানে

রাজীব সাহা

ইংরেজিতে যাকে বলে মব লিঞ্চিং, তার বাংলা করা হয়েছে গণধোলাই। যদিও লিঞ্চিং মানে শুধু মারধর বোঝায় না। দলবদ্ধভাবে এক বা একাধিক ব্যক্তিকে পেটানো, কোপানো, পোড়ানো অথবা আর কোনওভাবে কষ্ট দিয়ে হত্যা করা, তারই নাম মব লিঞ্চিং।

লিঞ্চিং শব্দটা এসেছে চার্লস লিঞ্চ নামে এক আমেরিকান নাগরিকের নাম থেকে। তিনি অষ্টাদশ শতকের লোক। ভার্জিনিয়া প্রদেশে তুলোর ক্ষেতের মালিক ছিলেন। আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ব্রিটেনের অনুগামীদের শাস্তি দিতেন। বিচারের তোয়াক্কা রাখতেন না। কাউকে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধী মনে হলেই সঙ্গে সঙ্গে কোতল।

চার্লস লিঞ্চ

এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকায় মব লিঞ্চিং-এর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, তা হল এক ধরনের দলবদ্ধ হিংসার বহিঃপ্রকাশ। জনতা ন্যায়বিচারের নামে কাউকে যন্ত্রণা দিয়ে হত্যা করে। ধরে নেওয়া হয়, সেই লোকটি কোনও অপরাধ করেছে। যদিও তার বিচার হয় না। লোকটি সত্যিই অপরাধ করেছিল কিনা, তা প্রমাণ করার দায় থাকে না কারও।

গত কয়েক বছর ধরে ভারতে গোরক্ষকরা দেশের নানা প্রান্তে তাদের গোমাতাকে রক্ষার নামে বেছে বেছে মূলত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপরে আঘাত হানছে। ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার কিছুদিন আগে থেকে গোরক্ষকদের বাড়বাড়ন্ত হয়েছিল। পরবর্তীকালে সরকার কয়েকটি ক্ষেত্রে কড়া ব্যবস্থা নিলেও তারা সংযত হয়েছে প্রমাণ নেই।

দলবদ্ধভাবে কাউকে পিটিয়ে মারা এদেশে কি খুব নতুন কিছু ঘটনা?

উত্তর হল, না। আগে হয়তো গোরক্ষকদের দাপট দেখা যায়নি, কিন্তু ছেলেধরা অপবাদ দিয়ে মানুষকে পিটিয়ে মারা হতই। চোর বদনাম দিয়েও অনেককে ওইভাবে মারা হয়েছে। ডাইনি সন্দেহে প্রাণ গিয়েছে কত মহিলার। গত কয়েক দশকে এই ধরনের ঘটনার সন্ধান পাওয়া যাবে ভুরি ভুরি।

আমেরিকায় মব লিঞ্চিং। কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাসকে ফাঁসি দিয়েছে জনতা।

ঠিক কবে থেকে এরকম মব লিঞ্চিং শুরু হল?

আমাদের দেশে বড় ধরনের দলবদ্ধ হিংসার প্রকাশ ঘটে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামার সময়। সেদিক থেকে বলা যায়, অখণ্ড ভারতে ১৯৪৬-‘৪৭ সালের দাঙ্গার সময় মব লিঞ্চিং-এর অনেক ঘটনা হয়েছে। কলকাতায় ১৯৪৬ সালের ১৬ অগাস্ট দাঙ্গা শুরু হয়েছিল। তার তিন দিনের মধ্যে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়। ওই ঘটনা ‘দি গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ নামে কুখ্যাত। মৃতদের বেশিরভাগই ছিল মব লিঞ্চিং-এর শিকার। দাঙ্গার সময় ভুল করে যারা গিয়ে পড়েছিল ভিন্ন সম্প্রদায়ের দখলে থাকা এলাকায়, তারা প্রায় সকলে দলবদ্ধ হিংসার শিকার হয়েছিল।

কলকাতা থেকে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের নানা প্রান্তে। সেখানেও মব লিঞ্চিং হয়েছে অনেক।

তারও আগে এদেশে মব লিঞ্চিং-এ মানুষ মরত কি?

খুব নির্দিষ্ট করে জানা যায় না। তবে চারের দশকের আগেও খুচখাচ দাঙ্গা হয়েছে এই দেশে। তাতে যে কেউ জনতার হাতে মারা যায়নি, এমন কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

তবে আমাদের দেশে ঊনিশ শতক বা তার আগে মব লিঞ্চিং-এর ইতিহাস পাওয়া যায় না। ইউরোপ-আমেরিকায় সেই আমলে বহু মানুষকে জনতার হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে। আমাদের দেশ এই পাপ থেকে মুক্ত ছিল। মনে হয় বিংশ শতকেই এই বিপদ এসে জুটেছে ভারতে।

মধ্যযুগে ইউরোপে মব লিঞ্চিং। ধর্মদ্রোহী সন্দেহে দুই মহিলাকে পুড়িয়ে মারছে জনতা।

মধ্যযুগে জার্মানিতে একরকমের মব লিঞ্চিং-এর ঘটনা জানা যায়। তখন কোনও বিশেষ ধরনের অপরাধীকে জনতার হাতে তুলে দেওয়া হত। জনতা তাকে হত্যা করত। ইংল্যান্ডের কোনও কোনও জায়গায় এবং স্পেনেও ওই ধরনের শাস্তি চালু ছিল। মধ্যযুগের ইউরোপে অনেক দেশে মানুষ মনে করত ইহুদিরা বিধর্মী, পাপী। তাই জনতার তাদের অনেকে মারা পড়ত। স্পেন, রাশিয়া ও পোল্যান্ডে এমন হত্যাকাণ্ড ঘটত প্রায়ই।

মব লিঞ্চিং-এর জন্য সবচেয়ে কুখ্যাত আমেরিকা।

সেখানে একসময় তুলোর ক্ষেতে বড় সংখ্যক কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিক কাজ করত। তুলো চাষের অর্থনীতিই নির্ভরশীল ছিল কৃষ্ণাঙ্গদের শ্রমের ওপরে। তাদের কেউ অবাধ্য হলে বা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে জনতা পশুর মতো তাড়া করত তাকে। তারপর যন্ত্রণা দিয়ে হত্যা করত। অন্য কৃষ্ণাঙ্গদেরও শাসিয়ে রাখা হত, তোমরাও যদি মালিকের কথা না শোন, এরকম বীভৎস মৃত্যু আছে কপালে।

ঠিক কতজনকে লিঞ্চ করা হয়েছি আমেরিকায়?

খুঁটিতে বেঁধে এক কৃষ্ণাঙ্গকে পুড়িয়ে মেরেছে জনতা। ১৯১৬ সালে তোলা ছবি। মৃতের নাম জেসি ওয়াশিংটন। বয়স ১৮। ঘটনাস্থল ওয়াকো, টেক্সাস, আমেরিকা।

তার কোনও হিসাব নেই। কী করে থাকবে? আদালত কাউকে শাস্তি দিলে তার একটা রেকর্ড থাকে। কিন্তু শহর থেকে বহু দূরে যেখানে বিচার ছাড়াই একটা হতভাগ্য লোককে গাছের ডালে ঝুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তার হিসাব রাখবে কে?

ইতিহাসবিদদের ধারণা, ১৮৮১ থেকে ১৯৬৮-র মধ্যে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে অন্তত ৪৭৪৩ জনকে মব লিঞ্চিং করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৪৪৬ জন কৃষ্ণাঙ্গ। দক্ষিণের ১২ টি প্রদেশে ১৮৭৭ থেকে ১৯৫০-এর মধ্যে এইভাবে মারা হয়েছে ৪০৮৪ জনকে। বাকি ৩০০ জন মরেছে অন্যান্য প্রদেশে।

আমেরিকার দক্ষিণের রাজ্যগুলোতেই একসময় কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের দিয়ে তুলো চাষ করানো হত। এখনও সেখানে বর্ণবৈষম্য বেশি। মব লিঞ্চিং-এর ঘটনাও সেখানেই বেশি।

‘টু কিল এ মকিং বার্ড’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ১৯৬০ সালে বইটি প্রকাশিত হয়।

আমেরিকার একটা বিখ্যাত উপন্যাস ‘টু কিল এ মকিং বার্ড’। লেখক হারপার লি। প্রকাশকাল ১৯৬০ সাল। অত্যন্ত জনপ্রিয় উপন্যাস। পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছিল। পরে তা থেকে একটি সিনেমাও হয়। তাতে অ্যাটিকাস ফিঞ্চ নামে উকিলের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন গ্রেগরি পেক।

সেই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় বিষয় হল আমেরিকার বর্ণবৈষম্য। সেই সূত্রে এসেছে মব লিঞ্চিং-এর প্রসঙ্গ। টম রবিনসন এক কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিক। অভিযোগ, সে এক শ্বেতাঙ্গ তরুণীকে ধর্ষণ করেছিল। টমের সমর্থনে দাঁড়ালেন অ্যাটিকাস ফিঞ্চ। স্থানীয় শ্বেতাঙ্গরা নিন্দা করতে লাগল। একদিন অ্যাটিকাস পড়লেন মারমুখী জনতার খপ্পরে। তাদের দাবি, বিচারের দরকার নেই, টমকে এখনই তুলে দিতে হবে তাদের হাতে।

টমের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ, তার সত্যতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। কিন্তু জনতা ধরেই নিয়েছে, অভিযুক্ত যেহেতু কৃষ্ণাঙ্গ, তাই সে নিশ্চয় অপরাধী। তার বিরুদ্ধে প্রমাণ দরকার নেই। আগেই ঝুলিয়ে দাও গাছ থেকে।

‘টু কিল এ মকিং বার্ড’ ছবির দৃশ্য। আদালতে অ্যাটিকাস ফিঞ্চ ও টম রবিনসন। অ্যাটিকাস ফিঞ্চের ভূমিকায় গ্রেগরি পেক। টম রবিনসনের ভূমিকায় ব্রুক পিটার্স। ১৯৬২ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটি হলিউডের ক্ল্যাসিক সিনেমাগুলির অন্যতম।

হলিউডের আরও একটি বিখ্যাত ছবির নাম ‘টক অব দি টাউন’। ১৯৪২ সালে মুক্তি পেয়েছিল। তাতেও আছে মব লিঞ্চিং-এর প্রসঙ্গ। ছবিতে লিওপোল্ড ডিলগ নামে চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অতীত দিনের বিখ্যাত নায়ক কেরি গ্রান্ট। অভিযোগ, সে শহরের একটি কারখানা পুড়িয়ে দিয়েছে। তাতে মৃত্যু হয়েছে একজনের। জনতা তাকে খুঁজছে লিঞ্চিং করবে বলে।

 

এইভাবে মব লিঞ্চিং স্থান পেয়েছে আমেরিকার পপুলার কালচারে।

মানুষ কখন কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে দলবদ্ধভাবে অপরকে খুন করতে যায়?

মব মেন্টালিটি বা ভিড়ের মানসিকতা নিয়ে গবেষণা হয়েছে অনেক। এখনও হচ্ছে। গবেষকদের মধ্যে মতবিরোধও আছে যথেষ্ট। তবে মব ভায়োলেন্সের কারণ হিসাবে কয়েকটি বিষয়ে তাঁরা একমত।

‘টক অব দি টাউন’ ছবির দৃশ্য। ১৯৪২ সালের ছবি। কেন্দ্রীয় চরিত্র লিওপোল্ড ডিলগের ভূমিকায় কেরি গ্রান্ট। কারখানায় আগুন দেওয়া ও এক ব্যক্তিকে হত্যার দায়ে তাকে পিটিয়ে মারতে চেয়েছিল জনতা। এক আইনজ্ঞের সহায়তায় সে রক্ষা পায়।

প্রথমত, দেশের এক বড় অংশের মানুষ প্রচলিত বিচার ব্যবস্থায় আস্থা রাখে না। তাদের মতে, কোর্টে গেলে বৃথা সময় নষ্ট হবে। অপরাধীরা টাকার জোরে বা প্রভাব খাটিয়ে ছাড়া পেয়ে যাবে ঠিক। এই ভাবনা থেকে আইন হাতে তুলে নেওয়ার মানসিকতা সৃষ্টি হয়।

দ্বিতীয়ত, কোনও ধর্ম বা বর্ণের মানুষকে অপরাধী বলে ধারাবাহিকভাবে প্রচার করা হয়েছে জনতার মধ্যে। তাতে দেশের এক বড় অংশের মানুষ বিশ্বাসও করেছে। ফলে সেই সম্প্রদায়ের মানুষকে দেশের যে কোনও দুর্গতির জন্য দায়ী ভাবছে অনেকে। তাদের কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে প্রমাণ ছাড়াই বিশ্বাস করে ফেলছে।

তৃতীয়ত, আর্থিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের মধ্যে মানুষ বড় একা হয়ে পড়েছে। সে চাইছে কোনও একটা গোষ্ঠীতে যোগ দিতে। সেই গোষ্ঠীর কাজকর্মকে নির্বিচারে সমর্থন করছে। তাদের হয়ে নানা হিংসাত্মক ঘটনায় অংশ নিচ্ছে।

এইরকম গোষ্ঠীর মধ্যে ঢুকলে মানুষ ব্যক্তিগত স্বভাব-চরিত্র, রুচি, যুক্তিবোধ হারিয়ে ফেলে কিছুক্ষণের জন্য। হয়তো দেখা যাবে, যে লোকটা একটা কুকুরকেও কখনও ঢিল ছুঁড়ে মারেনি, সেই দাঙ্গার সময় মানুষ খুন করছে ঠান্ডা মাথায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মব ভায়োলেন্সে অংশগ্রহণকারীদের কোনও শাস্তি দেওয়া হয় না। প্রথমত অত লোককে শাস্তি দেওয়া এমনিতেই মুশকিল। তার ওপরে এই সব ক্ষেত্রে মানুষের সেন্টিমেন্ট কাজ করে। গণধোলাইয়ে অংশগ্রহণকারীদের কড়া শাস্তি দিয়ে মানুষের কাছে বিরাগভাজন হতে চায় না কোনও সরকার।

শাস্তির ভয় ছাড়াই অপরাধ করতে পারে বলে অনেকে মব ভায়োলেন্সে অংশ নেয়। মারপিট, ভাঙচুর, হত্যা ইত্যাদি করে।

Comments are closed.