বুধবার, ডিসেম্বর ১১
TheWall
TheWall

খড়গের লোভে মাকে মেরে ফেলেছিল মানুষেরা, এক বছর পরেও কেঁদে চলেছে গন্ডার শিশু ‘আর্থার’

রূপাঞ্জন গোস্বামী

সূর্য ওঠার সময় মায়ের সঙ্গে ঝোপের ভেতর থেকে বার হয়েছিল গন্ডার ছানাটি। তার আগে এক পেট দুধ খাইয়ে দিয়েছে মা। না হলে সে বড্ড জ্বালাতন করে। বার বার মায়ের পেটের নীচে ঢুকে পড়ে দুধের লোভে। পায়ে পা জড়িয়ে পড়ার উপক্রম হয় মায়ের। সে জন্য মাঝে মাঝে আলতো করে গুঁতো মারে মা ছদ্ম রাগ দেখিয়ে। সামান্য দূরে সরে গিয়ে আবার কান নাড়তে নাড়তে ফিরে আসে ছানাটি। হাসি মাখা কুতকুতে চোখ মেলে দেখে মা, তার অবাধ্য ছানার কাণ্ড।

মাত্র চার সপ্তাহ বয়স

এর মধ্যেই ছানাকে অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়েছে গন্ডার মা। কী ভাবে খাবার চিনতে হয়। কী কী খাবার তাদের খাওয়া উচিত। কোনগুলো খেতে নেই।  বিপদের গন্ধ পেলে মায়ের সামনের দু’পায়ের নীচে কী ভাবে দাঁড়িয়ে পড়তে হবে। কী ভাবে রাতে ঘুমোবার সময়, মায়ের গলার নীচে শুয়ে থাকতে হবে। সামান্য অবাধ্য কিন্তু বুদ্ধিমান ছানা শিখে নিয়েছিল সব।

সেদিন ভোরে প্রসন্ন মনেই মায়ে আর ছানায় চরতে বেরিয়েছিল। প্রচণ্ড গরম পড়েছিল সে বার। সাভানা ঘাসের প্রান্তর ঝলসে লাল হয়ে যাচ্ছিল। তাই তো সকাল সকাল চড়তে বার হওয়া। যেটুকু সবুজ মেলে। পুব আকাশে তখন সবে সূর্য উঠছিল।

আড়মোড়া ভেঙে একে একে জেগে উঠছিল দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রুগার ন্যাশনাল পার্কের তৃণভোজী ও মাংসাশী প্রাণীরা। শুরু হতে যাচ্ছিল নতুন দিনের নতুন জীবন যুদ্ধ। দিনের শেষে কেউ পেট ভরিয়ে ঘুমাবে, কেউ পড়ে থাকবে কয়েকটা হাড়ের টুকরো হয়ে। 

দক্ষিণ আফ্রিকার  ক্রুগার ন্যাশনাল পার্ক

মা আর ছানা হাঁটছিল পুবের জঙ্গলটার দিকে

জঙ্গলের সামনে থাকা ঘন ঝোপের আড়াল থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছিল কয়েকটি ধাতব নল। চেক রিপাবলিকের তৈরি CZ452 পাওয়ার-রাইফেলের নল। কানফাটানো শব্দে কেঁপে উঠেছিল জঙ্গল। আকাশে উড়েছিল হাজার খানেক পাখি।  আতঙ্কে দৌড় শুরু করেছিল ওয়াইল্ড বিস্ট ও হরিণেরা।

তারপর আবার একটা কানফাটানো শব্দ, তারপর আবার একটা। শাবককে ছেড়ে গন্ডার মা পালাবার চেষ্টা করেনি। তিনটি .22 Winchester Magnum Rimfire কার্টিজ থেকে ছুটে এসেছিল তিনটি ৪০ গ্রেনের বুলেট। সজোরে গিয়ে বিঁধেছিল মা গন্ডারের কানের পাশে। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসছিল। তবুও বাচ্চাকে ছাড়েনি মা গন্ডার।

অবশেষে মা গন্ডার দেখতে পেয়েছিল তার দিকে এগিয়ে আসতে থাকা শত্রুদের। কয়েক পা দৌড়ে শত্রুদের আক্রমণ করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু পারে নি। হুমড়ি খেয়ে পড়ে গিয়েছিল। আবার উঠে দৌড়াবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু আবার পড়ে গিয়েছিল। আর উঠতে পারেনি মা গন্ডার ।

রক্ত গড়াচ্ছিল মা গন্ডারের কানের পাশ থেকে। সেই অবস্থাতেও মা গন্ডার তার শাবককে মুখ দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিল  আর্তনাদ করতে করতে। মরতে বসা এক মা তার আদরের নাড়ি ছেঁড়া ধনকে বুঝি বলতে চাইছিল, ‘পালা সোনা পালা। এরা মানুষ, তোকেও মেরে ফেলবে।” বুঝতে পারেনি ছোট্ট ছানা। ধাক্কা খেয়েও বারে বারে ফিরতে
চেয়েছিল মায়ের কাছে।

শাবকটি দেখেছিল ঘাসবন চিড়ে এগিয়ে আসছিল কয়েকটা পশু

এই ধরনের পশুদের কোনও দিন দেখেনি ছানা। একটু জ্ঞান হওয়ার পর জঙ্গলে অনেক ধরনের পশু দেখেছে সে। সবাই তার মাকে ভয় পায়। মায়ের কাছে ঘেঁষেনা কোনও পশু। এরা তবে কোন জানোয়ার। ভয় না পেয়ে তার মায়ের দিকে এগিয়ে আসছে! কী সাহস পশুগুলোর!

কিন্তু মা উঠছেনা কেন? তার দিকে আসার চেষ্টা করলে, চিতা, সিংহ, হায়নাদের যেমন তাড়া করে মা। কেন তাড়া করছে না এই পশুগুলোকে? খানিক আগেও মা চিৎকার করছিল। মায়ের মনে হয় খুব কষ্ট হচ্ছিল। কানের পাশের গর্ত দিয়ে লাল রঙের জলের মতো কী গড়িয়ে পড়ছিল। মা মাথাটা একবার তুলছিল আবার ধপাস করে ফেলছিল। এখন আর মাথাও তুলছে না।

দু’পায়ে হাঁটা পশুগুলো একসময় কাছে এসেছিল। গন্ডার মায়ের চারটে পা আকাশের দিকে তোলা, মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে, উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করতে গিয়ে নিথর হয়ে গিয়েছিল কখন যেন।

চোরাশিকারীরা কাটতে শুরু করেছিল মা গন্ডারের খড়গ

শিশু গন্ডারটি তখনও ভেবেছিল, তার মা বেঁচে আছে। মাকে বাঁচাতে চার সপ্তাহের বাচ্চাটি আক্রমণ করেছিল দু’পায়ে হাঁটা পশুগুলোকে। চোরাশিকারীদের একজন গন্ডার শিশুটির পায়ে গুলি করেছিল। আরেকজন ছুরি বসিয়ে দিয়েছিল শিশুটির পিঠে। আর্তনাদ করে উঠেছিল গন্ডার শিশুটি। এইটুকু জীবনে এত ভয়ঙ্কর যন্ত্রণা সে পায়নি।

মারাত্মক আহত হয়েও গন্ডার শিশুটি সমানে লড়ে গিয়েছিল দু’পায়ে হাঁটা পশুগুলোর সঙ্গে। মাকে বাঁচাবার শেষ চেষ্টা করে গিয়েছিল। কিন্তু সে জানত না, তার মা কবেই তাকে ছেড়ে চলে গেছে। দু’পায়ের পশুগুলো মায়ের দু’টি খড়গ নিয়ে দ্রুত চলে গিয়েছিল। মাকে জাগাবার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল গন্ডার শিশুটি।

এক সময় পা দু’টি সামনে ছড়িয়ে তার ওপর মুখ রেখে বসে পড়েছিল সে। তার সারা শরীর কাঁপছিল। চোখ থেকে ঝড়ছিল জলের ধারা। ঝাপসা চোখে দেখেছিল আকাশে উড়তে থাকা একদল পাখিকে। চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে ক্রমশ নিচে নেমে আসছিল পাখিগুলো। শকুনদের চিনতো না গন্ডার শিশু।

আকাশ থেকে নেমেছিল কিছু দু’পেয়ে, তাদের নাম মানুষ

২০ মে ২০১৮, ভোরের দিকে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রুগার ন্যাশনাল পার্কের স্কুকুজা অঞ্চল থেকে গুলির আওয়াজ শুনতে পেয়েছিলেন পার্কের রেঞ্জাররা। সঙ্গে সঙ্গে ফোন গিয়েছিল স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা Care for Wild এর দফতরে। এমপুমালাঙ্গাতে অবস্থিত বিশ্বের সবচেয়ে বড় গন্ডার অভয়ারণ্য, Care For the Wild sanctuary পরিচালনা করে সংস্থাটি।

সংস্থাটির পশু চিকিৎসক ও স্বেচ্ছাসেবী পিটার বাস, হেলিকপ্টার করে তাঁর টিম নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। গন্ডার শিশুটিকে জীবিত দেখে তার কাছে যেতে চেয়েছিলেন। তাঁকেও আক্রমণ করেছিল রক্তাক্ত গন্ডার শিশুটি। ভেবেছিল আবার দু’পায়ের পশুগুলো মাকে আক্রমণ করতে এসেছে।

সময় নষ্ট না করে ঘুমের ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়ানো হয় গন্ডার শিশুটিকে। কারণ তার পায়ের ও পিঠের ক্ষত দিয়ে ক্রমাগত রক্ত ঝড়ছিল। দেরী করলে শিশুটিকে আর বাঁচানো যাবে না। ঘুমের ওষুধে আচ্ছন্ন গন্ডার শিশুটিকে নিয়ে উড়ে গিয়েছিল হেলিকপ্টার Care for Wild Rhino Sanctuary-এর দিকে। ঘাসের বুকে রয়ে গিয়েছিল নিস্পন্দ মা গন্ডার। শকুনগুলো নীচে নেমে এসেছিল।

শুরু হয়েছিল শিশু গন্ডারটির চিকিৎসা

এরপর,  Care for Wild Rhino Sanctuary এর নির্জনে, লোকচক্ষুর আড়ালে শুরু হয়েছিল শিশু গন্ডারটির চিকিৎসা। মিচেল পটগিয়েটার নামে এক স্বেচ্ছাসেবীর নেতৃত্বে। সাধারণত মায়ের কাছ থেকে দুরে সরিয়ে নেওয়া হলে মানসিক আঘাতে কয়েকদিনের মধ্যে মারা যায় শিশু গন্ডাররা। কিন্তু একটি বিশাল টিম ঝাঁপিয়ে পড়েছিল শিশুটিকে বাঁচাবার জন্য।

আহত আর্থার

গন্ডার শিশুটির সাহস, অদম্য লড়াই ও তার জীবনীশক্তির জন্য নাম রাখা হয়েছিল আর্থার। মধ্যযুগের লড়াকু ব্রিটিশ চরিত্র কিং আর্থারের নামে। Care for Wild এর প্রতিষ্ঠাতা, পেট্রোনেল নিউউড প্রথমেই হেলিকপ্টারে করে উড়িয়ে এনেছিলেন ক্ষত বিশেষজ্ঞ ও প্লাস্টিক সার্জেন লিজ উইলসন চ্যান্ডলারকে।

আর্থারের ডান পায়ে তখনও বিঁধেছিল গুলি। পিঠে ছিল ছুরির আঘাতে সৃষ্টি হওয়া চার ইঞ্চি গভীর ক্ষত। যে ক্ষতটি ভয়ঙ্করভাবে তার শিরদাঁড়া ছুঁয়েছিল। ডঃ চ্যান্ডলারের সুচিকিৎসায় সেরে উঠছিল আর্থার।

 তার মাকে খুঁজতে শুরু করেছিল আর্থার

অদ্ভুত ভাবে ডাকতে শুরু করেছিল আর্থার। ওটা ছিল কান্নার আওয়াজ। তার মায়ের জন্য কাঁদছিল অনাথ আর্থার। গন্ডার শাবকদের কান্না চেনে Care for Wild। তারা বুঝেছিল সবার আগে ভালোবাসা প্রয়োজন আর্থারের।

এগিয়ে এসেছিল Gift of the Givers নামে আরেকটি সংস্থা। অনাথ শিশু গন্ডারদের মনের লালনপালনে যাদের ছিল অবাক করা সাফল্য। তাদের সদস্যরা পালা করে থাকতে শুরু করেছিল আর্থারের সঙ্গে। খাওয়া, শোওয়া, খেলা সব একসঙ্গে। কিন্তু, কয়েক মিনিটের জন্য একা হলেই কেঁদে উঠছিল আর্থার। তার করুণ কান্না যে শুনেছিল তার চোখ ভরে উঠেছিল জলে।

আজও বিষন্ন আর্থার

এক বছর কেটে গেছে, এখনও কাঁদে আর্থার। একটি গন্ডার শাবক সাধারণত মায়ের সঙ্গে থাকে তিন বছর। কিন্তু আর্থারের জীবনে মা ছিল মাত্র চার সপ্তাহ। এখনও রোজ সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে তার মাকে ডাকে। হৃদয় বিদারক ডাক। আসলে শরীরের ক্ষত সেরে গেলেও, দু’পেয়ে জানোয়ারগুলি তার বুকে যে গভীর ক্ষত এঁকে দিয়ে গেছে, তা আর কোনও দিনই সারবে না।

Comments are closed.