বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪

দাউদাউ বাড়ি, তরতরিয়ে মই বেয়ে উঠে হোস পাইপ হাতে কে ওই অগ্নিকন্যা?

চৈতালী চক্রবর্তী

সালটা ২০০৫। দেশ জুড়ে সে দিন দেওয়ালির আলো। দিল্লির দমকল দফতরে বেজে উঠল ফোন। আগুন লেগেছে শাস্ত্রী নগরের একটি জুতো কারখানায়। দাউদাউ করে জ্বলছে দোতলা বাড়ির উপরের তলা। দাহ্য বস্তু জমা থাকায় আগুন বিধ্বংসী চেহারা নিয়ে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের বাড়ি, দোকানগুলিতেও। ইঞ্জিন নিয়ে ছুটে গেলেন দমকল কর্মীরা। ভিড় জমালেন সাংবাদিকরা। তুমুল কোলাহল, চেঁচামেচির মাঝে কেউ খেয়ালই করলেন না কমলা ইউনিফর্ম গায়ে জনা ২০ দমকলকর্মীর মধ্যে সবচেয়ে তৎপর এক তরুণী দমকলকর্মী। তরতর করে মই বেয়ে উঠে হোস পাইপ হাতে তিনি যেন এক অগ্নিকন্যা। খবর হলো পরে। সংবাদপত্র, সংবাদমাধ্যমগুলিতে ফলাও করে লেখা হলো পুরুষদের সঙ্গে সমান তালে পাল্লা দিয়ে অসাধারণ সাহসিকতার নজির রেখেছেন এক মহিলা দমকলকর্মী।

কে এই অগ্নিকন্যা? কমলা পোশাক গায়ে, মাথায় হেলমেট চাপিয়ে পুরুষ দমকলকর্মীর সঙ্গেই এতদিন চোখ সইয়েছে দেশ। সেখানে কোথা থেকে এলেন এই তরুণী! এক হিন্দি কাগজ খবর করলো ওই তরুণীর নাম হর্ষিনী কানহেকার। বয়স ২৪ বছরের আশপাশে। নাগপুরের ন্যাশনাল ফায়ার সার্ভিস কলেজের (NFSC)কৃতী ছাত্রী। তখনও কলেজের গণ্ডি পার হননি। নাম ছড়িয়ে পড়ল হু হু করে।

হর্ষিনী কানহেকার

নাগপুরের মেয়ে হর্ষিনী। ডানপিটে মেয়েটা একদিন কৃতিত্বের ছাপ রাখবে, সেটা আগেই বুঝেছিলেন হর্ষিনীর মা, বাবা। পড়াশোনায় বিশেষ মন ছিল না নাসিকের সিডিও মেরি স্কুলের এই ছাত্রীর। দৌড়ঝাঁপ, বিপদের মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়াতেই ছিল তাঁর আনন্দ। নাগপুরের অমৃতাবাই দাগা কলেজ থেকে বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করে হর্ষিনী ভর্তি হন এমবিএ কোর্সে। গড়পড়তা সিলেবাসে মন নেই, আর পাঁচজনের মতো ডিগ্রি নিয়ে চাকরি করতে হবে, সেই বাসনাও নেই। বরাবরই স্রোতের উল্টো দিকে হাঁটা হর্ষিনী শুরু করলেন এনসিসি। ইউনিফর্ম পরে প্যারেড করার সময়েই একদিন শুনলেন দেশের প্রথম মহিলা পাইলট শিবানি কুলকার্নির নাম। শিবানির লড়াই মুগ্ধ করলো হর্ষিনীকে। দেশের জন্য কিছু করার সংকল্প নিয়ে নিলেন সেদিনই।

২০০২ সাল। এমবিএ ছেড়ে ন্যাশনাল ফায়ার সার্ভিস কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য প্রবেশিকা পরীক্ষা দিলেন। ৩০টি আসনের মধ্যে প্রথমেই নাম উঠল হর্ষিনীর। স্মৃতির পাতা ফল্টে হর্ষিনী বললেন, ‘‘ইউনিফর্ম গায়ে দেশের জন্য কিছু করবো, এটাই ছিল আমার লক্ষ্য। এনএফএসসি-তে ফায়ার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ফর্ম ফিলামের দিনই ম্যানেজমেন্টের লোকেরা বলেন সেনাবাহিনী বা বায়ুসেনার কলেজে অ্যাপ্লাই করুন। এটা শুধুমাত্র পুরুষদের কলেজ।’’ এনএফএসসি সাধারণত পুরুষদেরই বাছাই করে। কিন্তু একদিন টেলিগ্রাম এল বাড়িতে। হর্ষিনীর জানালেন, বাছাই পর্বেও শুরু হলো ঝামেলা। স্বাস্থ্য পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা ডাক্তাররা বললেন, ‘‘বেটা, এই কোর্স শারীরিক কসরতের। তুমি পারবে তো?’’ ততক্ষণে এক অদ্ভুত জেদ চেপে গেছে তরুণীর। সব রকম পরীক্ষাতে যোগ্যতা প্রমাণ করে ‘ফায়ার ফাইটার’ হওয়ার দৌড়ে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলেন হর্ষিনী।

‘‘প্রথম যেদিন কলেজে পা রাখি সহপাঠীরা হাসাহাসি শুরু করে। কারণ তারা সকলেই ছিল পুরুষ। গোটা কলেজে আমি একমাত্র মহিলা, যে দমকলকর্মী হওয়ার প্রশিক্ষণ নিতে এসেছে।’’ হাসি-মস্করা, টিপন্নী অবশ্য থেমে যায় কিছুদিনের মধ্যেই। হর্ষিনীর মিষ্টি স্বভাব এবং তেজের কাছে হার মানতে বাধ্য হয় পুরুষ-বাহিনী। বরং তারাই হয়ে ওঠে হর্ষিনীর পরম বন্ধু। শুরু হয় কঠিন লড়াই। হর্ষিনীর কথায়, ‘‘কঠোর অনুশীলন করেছি। একদিনের জন্যও ক্লাস মিস করিনি। নিয়মিত ড্রিল, প্যারেড করতাম। ভারী হোস পাইপ, সাকশন পাইপ, ডামি দিয়ে আমাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। কখনও মনে হয়নি মেয়ে বলে পারবো না। কলেজে থাকতেই নানা জায়গায় আগুন নেভানোর কাজে গিয়েছি।’’

ততদিনে দিল্লির শাস্ত্রী নগরের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নাম ছড়িয়ে গেছে হর্ষিনীর। আরও কয়েকটা জায়গায় সিনিয়রদের সঙ্গে গিয়েছেন আগুন নেভানোর কাজে। জানিয়েছেন, কলেজ সবসময় পাশে থেকেছে। এমনকি মহিলা বলে তাঁর বিশেষ প্রশিক্ষণের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের থেকে অনুমতিও নেন কলেজ কর্তৃপক্ষ।

২০০৬ সালে হর্ষিনী যোগ দেন গুজরাটের মেহসেনা দমকল কেন্দ্রে। তখন তাঁর বয়স ২৬। ‘অয়েল অ্যান্ড ন্যাচরাল গ্যাস কমিশন’ (ওএনজিসি)-র অধীনে ফায়ার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে শুরু হয় তাঁর কর্মজীবন। কিছুদিনের মধ্যেই মেহসেনা দমকল কেন্দ্রের ইন-চার্জের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। দিল্লি, কলকাতায় একাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ডাক পড়ে হর্ষিনীর। হোস পাইপ হাতে বীরাঙ্গনার বেশে হর্ষিনীকে দেখে মুগ্ধ হয় দেশ। ২০১০ সালে তাঁকে স্থানান্তরিত করা হয় মুম্বই ড্রিলিং সার্ভিসে।  কমলা পোশাকে কখনও তিনি অগ্নিকন্যা, কখনও বন্যা দুর্গতদের জন্য বাড়িয়ে দিচ্ছেন হাত, কখনও ভেঙে পড়া বহুতলের চাঙড় সরিয়ে উদ্ধার করছেন আটকে থাকা শিশুদের, আবার কখনও বন্যপ্রাণীর আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য ডাক পড়ছে তাঁর। দশভূজা হয়ে যে কোনও কর্তব্যেই অবিচল থেকেছেন হর্ষিনী।

‘নারী হয়ে কেউ জন্মায় না, বরং নারী হয়ে ওঠে,’ ১৯৫৯ সালে সিমোন দ্য বোভোয়া বলেছিলেন। সদ্যোজাত তার লিঙ্গ সম্পর্কে সচেতন থাকে না। তাকে নারী হিসেবে ‘নির্মাণ’ করে সমাজ। নারীবাদ, পুরুষতন্ত্র, লিঙ্গবৈষম্যের ছক বাঁধা ধ্যানধারণার বাইরে হর্ষিনী যেন এক ঝোড়ো হাওয়া, যিনি মুহূর্তে তছনছ করে দিতে পারেন গতানুগতিক সমস্ত রীতি রেওয়াজকে। বাইক চালাতে ভালোবাসেন হর্ষিনী।

বাইক চালিয়ে দুর্গম পথ পাড়ি দিতে ভালোবাসেন হর্ষিনী।

দুরন্ত গতিতে তাঁর বাইক ছুটে চলে লে-লাদাখের খারদুং লা পাস, কার্গিলের বিপদসঙ্কুল পথ বেয়ে। ‘‘কোনও কাজই লিঙ্গ দিয়ে বিচার হয় না। পুরুষতন্ত্র, নারীবাদ এগুলো শুধুমাত্র কল্পকথা। লক্ষ্যে অবিচল থাকতে হবে। প্যাশন ভুললে চলবে না। জীবন একটাই, তাই স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দেওয়াটাই প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ,’’ হর্ষিনীর কথায়, “ভারতের গোটা নারীসমাজের প্রতিনিধি আমি। আমাকে দেখেই সাহস পাবেন মহিলারা। চার দেওয়ালের বেড়াজাল টপকে এগিয়ে আসবেন সকলে।”


বিশ্বের প্রথম মহিলা ‘ফায়ার ফাইটার’ ছিলেন মলি উইলিয়ামস

মলি উইলিয়ামস

মহিলা দমকলকর্মীদের তালিকায় এখনও এগিয়ে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৮ সালের হিসেবে মার্কিন মুলুকে মোট মহিলা দমকলকর্মীর সংখ্যা ১ কোটিরও বেশি। বিশ্বের প্রথম মহিলা দমকলকর্মী ছিলেন মলি উইলিয়ামস। ১৮১৮ সালের নিউ ইয়র্ক সিটির ওসেনাস ইঞ্জিন কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আফ্রিকান মহিলা মলি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডে অসংখ্য মহিলারা এই কাজে এগিয়ে এসেছিলেন। যুক্তরাজ্যে প্রথম মহিলা দমকলকর্মী নিয়োগ হয় ১৯৭৬ সালে, অস্ট্রেলিয়ায় ১৯৮১-তে। ১৯৯৩ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার দমকল দফতরের প্রথম ডেপুটি প্রধান হন রোজমেরি ব্লিজ।

১৯১২ সালে অস্ট্রিয়ায় তৈরি হয় মহিলা ফায়ার ব্রিগেড। অস্ট্রেলিয়াতেও বহু মহিলা দমকল দফতরের সঙ্গে যুক্ত। ২০১৫ সালের হিসেবে ফ্রান্সে সাড়ে ৬ শতাংশ মহিলা রয়েছেন দমকল বাহিনীতে। জার্মানিতে এই সংখ্যাটা ৩ শতাংশের কাছাকাছি। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দমকল কেন্দ্র রয়েছে জাপানের টোকিওতে ‘টোকিও ফায়ার ডিপার্টমেন্ট’ (TFD)। মোট ১৭,০০০ মহিলা রয়েছে টোকিওর দমকল বাহিনীতে। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই ফায়ার অফিসার পদে রয়েছেন।


কলকাতার মেয়ে তানিয়া এয়ারপোর্ট অথরিটির দমকল বিভাগে প্রথম মহিলা কর্মী

তানিয়া সান্যাল

দু’চোখে স্বপ্ন ছিল আমলা হওয়ার। পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার সময়েই ভাগ্যের মোড় ঘোরে। বর্তমানে এই মেয়ে এয়ারপোর্ট অথরিটির দমকল বিভাগে প্রথম মহিলা কর্মী। নাম তানিয়া সান্যাল। দমদম-সিঁথি এলাকার বাসিন্দা তানিয়া এয়ারপোর্ট অথরিটি অগ্নিনির্বাপণ ও সুরক্ষা দফতরে প্রথম মহিলা কর্মী।

স্কুলের পাঠ শেষ করে তানিয়া রামমোহন কলেজ থেকে বটানি নিয়ে স্নাতক হন। স্নাতকোত্তর করেন বারাসত গভর্নমেন্ট কলেজ থেকে। তাঁর স্বপ্ন ছিল একজন আমলা হওয়ার। লিখিত পরীক্ষায় ভাল ভাবে পাশও করে যান তিনি। তার পরেই দিল্লিতে প্রশিক্ষণের জন্য তাঁর ডাক পড়ে। মোট ৫৫ জনের প্রশিক্ষণ হয়। তার মধ্যে তানিয়াই একমাত্র মহিলা।

২০০৯ সাল থেকে দমকল কেন্দ্রে মহিলাদের নিয়োগে ছাড়পত্র দেয় চণ্ডীগড় পুরসভা। মুম্বই দমকল দফতর ২০১২ সালেই পাঁচ মহিলা কর্মী নিয়োগ করেছে। দ্বিতীয় দফায় সেখানে মহিলাদের নিয়োগ শুরু হবে।

আরও পড়ুন:

ওঁরা ত্রিশূরের চালিকা-শক্তি, চলুন চিনে নিই মহিলা-ব্রিগেডকে

Comments are closed.