সমাধি ভেঙে কারা বের করে নিয়েছিল চার্লি চ্যাপলিনের মৃতদেহ!

ঘটনাটিতে আমেরিকার হাত আছে বলে অনেকে বিবৃতি দিয়েছিলেন। কারণ আজীবন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছেন চ্যাপলিন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রূপাঞ্জন গোস্বামী

সমাধি থেকে শবদেহ চুরির ঘটনা বিরল নয়। দেশে বিদেশে হামেশাই শবদেহ চুরি হয়ে যায়। মৃতদেহকে কঙ্কালে পরিণত করে চোরাবাজারে বেচে দেওয়ার ব্যবসাটা বেশ পুরোনো। কিন্তু, তা বলে বিশ্বখ্যাত অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিনের মৃতদেহ চুরি! কল্পনা করতেই অবাক লাগে। কিন্তু ঘটনাটি সত্যি। শবদেহ চুরির  ইতিহাসে এটি হয়ত সবচেয়ে বিখ্যাত শবদেহ চুরির ঘটনা। যা হয়ত আমরা অনেকেই জানিনা।

চ্যাপলিন প্রয়াত হয়েছিলেন ১৯৭৭ সালের ডিসেম্বর মাসে, ৮৮ বছর বয়েসে। সুইৎজারল্যান্ডের লেক জেনিভার কাছে, কর্সিয়র-সার-ভেভেই ( Corsier-sur-Vevey) সমাধিক্ষেত্রে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। এর দুমাসে পর, ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চার্লির স্ত্রী উনা ও’নিল একটি ফোন পেয়েছিলেন। ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এসেছিল ভাঙা  ভাঙা ইংরেজি বলা এক ব্যাক্তির গলা।

স্ত্রী উনা সঙ্গে চার্লি

ব্যক্তিটি বলেছিল, “চার্লির মৃতদেহ কবর খুঁড়ে বের করে নেওয়া হয়েছে। এটি এখন আমাদের কাছে আছে। ৬ লক্ষ ডলার পেলে সেটি ফেরত দেওয়া হবে।”  ফোনে কেউ ফাজলামি করছে ভেবে স্ত্রী উনা ব্যক্তিটিকে হেসেই জানিয়েছিলেন, ” আপনি যা বলছেন তা জানলে চার্লি নিজেই হেসে লুটোপুটি খেত।” ফোনটা কেটে দিয়েছিলেন উনা। ফোনটিকে একদমই পাত্তা দেননি। ভেবেছিলেন কেউ মস্করা করছে।

ঘটনাটির কয়েক ঘন্টা পর উনার কেমন যেন খটকা লাগে। ফোনের ওপারে থাকা মানুষটির বলার ভঙ্গিতে কিন্তু মস্করার চিহ্নমাত্র ছিল না। আর দেরী করেননি উনা। সঙ্গে সঙ্গে ফোন করে পুলিশকে সব কথা জানিয়েছিলেন। চার্লির স্ত্রীকে নিয়ে বিশাল পুলিশ বাহিনী ছুটে গিয়েছিল সমাধিক্ষেত্রে। যেখানে দু’মাস আগে মাটির নিচে শুইয়ে আসা হয়েছিল হাসির রাজা চার্লিকে।সেখানে পৌঁছে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন উনা। হতবাক হয়েছিল পুলিশ বাহিনীও। তারা বুঝতে পেরেছিল ফোনের ব্যক্তিটি সত্যিই ইয়ার্কি করেনি।

চার্লির সমাধিতে পুলিশের কর্তারা।

চার্লির সমাধিটি খুঁড়ে ফেলা হয়েছে এবং সমাধি থেকে  কফিন সমেত চার্লির শবদেহ উধাও। কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন স্ত্রী উনা। ছুটে এসেছিল মিডিয়া। কারণ শবদেহটি সাধারণ কোনও মানুষের নয়, বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কৌতুকাভিনেতা প্রবাদপ্রতীম চার্লি চ্যাপলিনের। মূহুর্তের মধ্যে খবরটি রেডিও মারফত ছড়িয়ে পড়েছিল সুইৎজারল্যান্ড সহ সারা ইউরোপে। ঘটনাটি সংবাদ মাধ্যমে আসার পর বিশ্বজুড়ে নিন্দা, সমালোচনার ঝড় উঠেছিল।

ঘটনাটিতে আমেরিকার হাত আছে বলে অনেকে বিবৃতি দিয়েছিলেন। কারণ আজীবন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে  গর্জে উঠেছেন চ্যাপলিন। এটা সত্যি,আমেরিকানরা পছন্দ করলেও আমেরিকার প্রশাসন চ্যাপলিনকে পছন্দ করত না। কারন তারা বরাবর চ্যাপলিনকে কমিউনিস্ট ভেবে এসেছে। রাশিয়ার প্রতি চার্লির অকৃত্রিম ভালবাসাকে চিরকাল ঘৃণা করে এসেছে আমেরিকা। চার্লিকে পদে পদে হেনস্থা করবার চেষ্টা চালিয়ে গেছে আমেরিকা। লন্ডনে ‘লাইমলাইট’ ছবির প্রিমিয়ারে গিয়ে আর কোনওদিন আমেরিকায় ফিরতে পারেননি চ্যাপলিন। রি-এন্ট্রি ভিসা দেয়নি আমেরিকা। তাই আমেরিকার পক্ষে চার্লির শবদেহ চুরি করা অসম্ভব নয় বলে মনে করেছিলেন ইউরোপের বেশিরভাগ মানুষই।

অন্যদিকে পুলিশ শুরু করেছিল পুলিশের কাজ।  ইউরোপের প্রত্যেকটি দেশের সীমানায় নজরদারি শুরু হয়েছিল। নজরদারি শুরু হয়েছিল মৃতদেহ সংরক্ষণকারী সংস্থাগুলির ওপরেও। সুইৎজারল্যান্ডের পুলিশ চার্লির বাড়ির আশেপাশের শহরগুলির প্রায় ২০০ টি টেলিফোন বুথে আড়ি পেতেছিল। আড়ি পেতেছিল চার্লির  স্ত্রী উনার ফোনেও।

একদিন গভীর রাতে উনার ফোন বেজে উঠেছিল। কন্ট্রোল রুম থেকে কলটা রেকর্ড করতে শুরু করে দিয়েছিলেন পুলিশের অপারেটর। ফোনে ভেসে এসেছিল একই ব্যাক্তির গলা, চাপা গলায় সে বলেছিল “টাকা না দিলে আপনার আট সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে ছোট দুই সন্তানকে মেরে ফেলা হবে।”  আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠেছিলেন উনা। ঘুম ভেঙে বিছানায় উঠে বসেছিল চার্লি ও উনার দুই নাবালক সন্তান  ক্রিস্টোফার ও অ্যানি। কলটির রেকর্ডিং শুনে প্রমাদ গুণেছিল পুলিশ প্রশাসনও। অত্যন্ত সঙ্গীন অবস্থার দিকে যেতে চলেছে ঘটনাটি। কয়েক ঘন্টার মধ্যে চার্লির বাড়ি ঘিরে ফেলেছিল বিশাল পুলিশ বাহিনী। চার্লির স্ত্রী উনা ও তাঁর ছেলেমেয়েদের জন্য চব্বিশ ঘন্টার প্রহরী নিয়োগ করা হয়েছিল।

পুরো সুইজারল্যান্ড জুড়ে বিশাল তল্লাশি শুরু করেছিল সুইস পুলিশ। পাঁচ সপ্তাহ ধরে তদন্ত ও খানাতল্লাশির পর একদিন গভীর রাতে পুলিশ ঘিরে ফেলেছিল চার্লির পারিবারিক ভিটে কর্সিয়র থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে থাকা একটি গাড়ি সারাইয়ের কারখানা। কারখানার ভেতর ঘুমিয়েছিল দুই ব্যাক্তি। তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুলিশের বাছা বাছা কম্যান্ডোরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল দুজনের ওপর। কারখানা থেকে গ্রেফতার হয়েছিল পোল্যান্ডের রোমান ওয়ার্ডাস আর বুলগেরিয়ার গানস্ক গানেভ নামে দুই রিফিউজি। পেশায় তারা অটো মেকানিক। ধরা পড়ার পর তারা পুলিশকে কাছের একটি ভুট্টাক্ষেতে  নিয়ে গিয়েছিল। যেখানে তারা চার্লি চ্যাপলিনের দেহ সমেত কফিনটি পুঁতে রেখেছিল।

এই ক্ষেতে লুকিয়ে রাখা হয় চার্লির কফিন

দোষীরা আদালতকে জানিয়েছিল অর্থনৈতিক দূর্দশা কাটাবার জন্যই তারা অপরাধটি করে ফেলেছিল। ওয়ার্ডাস জানিয়েছিল, একটি ইতালীয় খবরের কাগজে শবদেহ চুরির একটি খবর পড়ে সে অনুপ্রাণিত হয়েছিল। বেশি টাকার আশায় বেছে নিয়েছিল চার্লি চ্যাপলিনের মত বিশ্ববিখ্যাত মানুষের শবদেহ। ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসে, শবদেহ চুরি আর মুক্তিপণ আদায়ের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয় রোমান ওয়ার্ডাস আর গানস্ক গানেভ। ওয়ার্ডাসকে দেওয়া হয়েছিল সাড়ে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। সেই ছিল ঘটনাটির মূল চক্রান্তকারী। অপর অপরাধী গানেভের হয়েছিল আঠেরো মাসের সশ্রম কারাদণ্ড। শবদেহ অপহরণ কাণ্ডে তার ভূমিকা কম থাকায়।

ভুট্টা ক্ষেত খুঁড়ে পাওয়া গেল সেই কফিন, যার মধ্যে ছিল চ্যাপলিনের মৃতদেহ

বিচার চলাকালীনই চ্যাপলিনের দেহটি পুনরায় সমাধিস্থ করা হয়েছিল সেই একই সমাধি ক্ষেত্রের একই জায়গায়, যেখান থেকে দেহটি চুরি করা হয়েছিল। তবে এবার চার্লিকে সমাধিস্থ করার পর সমাধিটি কংক্রিট দিয়ে ঢালাই করে দেওয়া হয়েছিল। যাতে রোমান ওয়ার্ডাস আর গানস্ক গানেভের মতো একদিনে বড়োলোক হবার খেলায় আর না কেউ মেতে উঠতে পারে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More