ছিন্নমূল মানুষদের ঈশ্বর ১০৩ বছরের অরুণা মুখোপাধ্যায়, ৭২ বছর ধরে চা বিস্কুটই তাঁর খাবার

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    ভারত তখন সদ্য ভাগ হয়েছে। ভারতের পূর্বে ও পশ্চিমে আত্মপ্রকাশ করেছে পূর্ব (বাংলাদেশ) ও পশ্চিম পাকিস্তান। উদ্বাস্তুদের ঢল নেমেছিল ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতে। ঢল নেমেছিল আসামেও। গুয়াহাটি স্টেশন হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশ থেকে আগত বহু ছিন্নমূল পরিবারের শেষ আশ্রয়।

    উদ্বাস্তুদের দেখে বিরক্ত হয়েছিলেন বেশিরভাগ স্থানীয় মানুষ। কিন্তু শরণার্থীদের নিদারুণ অবস্থা দেখে কেঁদে উঠেছিল ৩১ বছরের অরুণা মুখোপাধ্যায়ের মন। তিনি যে বাংলাদেশের বিক্রমপুরের কন্যা। স্বামী যদুলাল মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে অনেক আগেই চলে এসেছিলেন গুয়াহাটিতে। স্বামী ছিলেন গুয়াহাটির কটন কলেজের রসায়ন বিভাগের অধ্যপক।

    অরুণাদেবী সীমিত আর্থিক ক্ষমতা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেন অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াবেন। স্বামীকে নিয়ে, পায়ের তলার মাটি হারানো পরিবারের শিশুদের জন্য দুধের বালতি হাতে স্টেশনে ছুটেছিলেন অরুণাদেবী। স্টেশনে গিয়ে এক মর্মান্তিক দৃশ্যের সম্মুখীন হয়েছিলেন তাঁরা। কাতারে কাতারে মানুষ ঘন্টার পর ঘন্টা না খেয়ে বসে আছেন।

    খেতে না পেয়ে ক্রমশ ঝিমিয়ে পড়তে থাকা শিশুগুলিকে যখন বাটি করে দুধ খাওয়াচ্ছিলেন অরুণাদেবী, তাঁকে অবাক করে দিয়ে তাঁর পায়ে লুটিয়ে পড়েছিলেন শিশুগুলির মায়েরা। কাতর কন্ঠে তাঁরা বলেছিলেন, “মা গো, আমাদেরও খেতে দিন, আমরাও বাঁচতে চাই। আমরা মরে গেলে এদের কে দেখবে মা। আমাদের বাঁচান।”

    বাঁচতে চাওয়া মায়েদের কাতর আর্তি শক্ত করে দিয়েছিল অরুণাদেবীর চোয়াল। স্বামীকে বলেছিলেন তিনি কিছু পরিবারকে নিজের বাড়ি নিয়ে যেতে চান। স্বামী প্রথমে রাজি হননি। কিন্তু অরুণাদেবী স্বামীর কথা শোনেননি । তিনি তাঁর সঙ্গে কয়েকটি পরিবারকে নিয়ে তাঁর বাড়িতে ফিরেছিলেন।

    নিজেদের বাড়িতে বেশি ঘর ছিল না। সবকটি পরিবারকে নিজের বাড়ির বাগানে ত্রিপল খাটিয়ে রাখার ব্যবস্থা করলেন। শুধু থাকার ব্যবস্থা করলেই হবে না। খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। শিশুদের জন্য ও স্তন্যদাত্রী মায়েদের জন্য দুধের ব্যবস্থা করতে হবে। সাধ্যমত চেষ্টা করতে লাগলেন অরুণাদেবী। স্বামী, চার ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে গড়া এক সুখের সংসার মাথায় উঠল। কারণ তিনি এখন ছিন্নমূল ও অসহায় মানুষগুলোরও মা।

    অরুণা মুখোপাধ্যায়

    কিন্তু একদিন, স্বামীর মুখে অন্য ধরণের একটি কথা শুনলেন অরুণা। স্বামী যদুলাল অরুণাকে বলেছিলেন শরণার্থীদের বাড়িতে তোলায় সংসারে অনেক বেশি টাকা খরচ হচ্ছে। এ বার রাশ টানা দরকার। অরুণার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল। অরুণা বুঝতে পেরেছিলেন তিনি যুদ্ধে একা হয়ে গেলেন। কিন্তু তবুও লড়াই ছাড়লেননা অরুণা।

    অভিমানে, সেদিন থেকে অরুণা সব কিছু খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন, শুধু চা আর বিস্কুট ছাড়া। তাঁর খাওয়ার জন্য যে খরচ হত, ঠিক করলেন সেটা খরচ করবেন অসহায় মানুষগুলোর পেটে সামান্য গরম ভাত জোগানোর জন্য এবং শিশুদের দুধের জন্য।

    কিন্তু সেই সামান্য টাকায় কি এতগুলো পেট চলবে! স্বামী ও ছেলেমেয়েরা রোজ বাড়ি থেকে নিজেদের কাজে বেরিয়ে গেলে লুকিয়ে কাগজের ঠোঙা তৈরি করতেন অরুণা দেবী। তারপর সেগুলি গোপনে বিক্রি করে শরণার্থীদের জন্য টাকা জোগাড় করতেন।

    কুড়িয়ে নেওয়া কাঠ ও খেজুরপাতা জ্বালিয়ে বাগানের মাটির উনুনে নিজে হাতে রান্না করতেন। অরুণাদেবীকে সাহায্য করতেন শরণার্থী মহিলারা, চোখ ভরা জল নিয়ে। তাঁরা বুঝতে পারতেন, তাঁদের জন্যই জীবনযুদ্ধের আগুনে উনুনের খেজুরপাতার মতই জ্বলছেন অরুণা দেবী। তাঁদের নতুন মা। যিনি জীবনে আর ভাত খাননি। কেন ভাত খাননি অরুণা দেবী! তাঁর উত্তর ছিল, “কত লোক না খেয়ে আছে। আমি ভাত খাবো কোন মুখে!”

    বেশ কয়েকমাস পরে, সরকারের তরফ থেকে গুয়াহাটির গান্ধী বস্তি এলাকায় শরণার্থীদের থাকার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। শরণার্থীরা অরুণাদেবীর বাড়ি ছেড়ে চলে যান আশ্রয়শিবিরে। তবুও অরুণাদেবীর যুদ্ধ শেষ হয়নি। বরং বলা যায়  নতুন করে শুরু হয়েছিল।

    শরণার্থী শিবিরে গিয়ে শরণার্থীদের নিয়মিত যত্ন ও দেখভাল করতেন। একদিন অরুণা দেবী বুঝলেন, সর্বহারা মানুষগুলির মুখে শুধু খাদ্য জোগালেই হবে না। নিজেদের পায়ে দাঁড়াবার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। অরুণাদেবী শুরু করেছিলেন সেলাই, বাটিকের নক্সা তোলা ও রান্না শেখানোর স্কুল। তাঁর হাত ধরে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল অনেক ছিন্নমূল পরিবার।

    সর্বক্ষণের সঙ্গিনীর সঙ্গে অরুণা দেবী

    পরবর্তীকালে অরুণাদেবী স্থাপন করেছিলেন জেএলএম মেমোরিয়াল প্রাথমিক স্কুল। কিছু বছর আগে শুরু করেছেন গ্লাস পেন্টিং ও কাপড়ের খেলনা বানানোর স্কুল, আঁকার স্কুল এবং গান শেখানোর স্কুল।

    অরুণাদেবীর বয়েস এখন ১০৩। বয়েসের ভারে দৃষ্টি হয়েছে ঝাপসা। কানেও ভালো শুনতে পান না আজকাল। রান্না শেখানোর ও বাটিকের নক্সা তোলার স্কুল বন্ধ করে দিতে হয়েছে কালের দাবি মেনে। তবুও অদম্য জেদ আর ইচ্ছাশক্তি নিয়ে প্রাথমিক স্কুল, সেলাই শেখানোর স্কুল, আঁকার স্কুল আর গান শেখানোর স্কুলগুলি চালিয়ে যাচ্ছেন অরুণাদেবী। সম্বল বলতে মানুষের ভালোবাসা আর প্রবল উৎসাহ।

    মানুষের ভালোবাসা তাঁর সম্বল

    ১৯৬৮ সালে প্রয়াত হয়েছিলেন স্বামী যদুলাল। উচ্চশিক্ষিত সন্তানেরা সকলেই ভারত ছেড়েছিলেন একে একে। প্রবাসে তিন ছেলেও প্রয়াত হয়েছেন। এক ছেলে ও মেয়ে আজ জীবিত। তাঁরা কানাডা থেকে অরুণাদেবীর খবর রাখেন।

    ছেলেমেয়েরা মাকে তাঁদের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিনি ছেলেমেয়েদের বলেছিলেন, “এ দেশ আর এ দেশের মানুষ ছেড়ে আমি কোথাও যাব না। বাঁচতে হলে এ দেশেই বাঁচবো, মরতে হলে এ দেশেই মরবো।”

    তা বলে অরুণাদেবীকে নিঃসঙ্গ বা অসহায় ভাববেন না। পল্টনবাজারের কেবি রোডের বাড়িতে সর্বক্ষণ ব্যস্ততায় কাটে তাঁর। সর্বক্ষণের সঙ্গিনী রূপা দেবনাথকে নিয়ে দাপটের সঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছেন নিজের হাতে তৈরি জেএলএম মেমোরিয়াল প্রাথমিক স্কুল, ঊষা এমব্রয়ডারি স্কুল, শিল্পী মিউজিক কলেজ ও আর্ট স্কুল। মাত্র কয়েক বছর আগে শুরু করেছেন বৃদ্ধাশ্রম। যার নাম দিয়েছেন ‘আনন্দধারা আপনগেহ’। তাঁর লড়াই তাই থামেনি, থামবেও না।

    সর্বহারাদের জন্য তাঁর হিমালয়সম অবদানের জন্য অরুণাদেবী পেয়েছেন ঐতিহ্যমণ্ডিত ম্যাগসেসাই পুরস্কার। একটি সম্বর্ধনা সভায় অরুণা দেবী বলেছিলেন, “ সাম্য, সুবিচার ও স্বাধীনতার সপক্ষে কাজ করতে গেলেই বাধার সম্মুখীন হতে হবে। ঢেউয়ের বিরুদ্ধে থাকা ভীষণ কঠিন। আজকাল সুবিচারের জন্য গলা তুললেই সমাজে আমাদের বিশ্বাসঘাতক বলে চিহ্নিত করা হয়। অন্যদিকে যাঁরা দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেন, তাঁদেরকেই দেশপ্রেমিক বলে তুলে ধরা হয়। কিন্তু আমরা হাল ছাড়বো না। আমাদের লড়াই চলবেই

    পুরস্কার যাঁর কাছে গিয়ে ধন্য হয়

    যতদিন বাঁচবেন মানুষের জন্য কাজ করে  যাবেন অরুণা দেবী। গরীব মানুষদের ভাত জোটে না বলে যিনি আজও মুখে তোলেন না ভাত। গরীবদের গায়ে গরম পোশাক ওঠে না বলে কড়া শীতেও গায়ে দেন না গরম পোশাক। সেই অক্লান্ত  বিপ্লবী অরুণাদেবী তাঁর শতবর্ষ উদযাপনের সভায় তাই বলিষ্ঠ কণ্ঠে জানিয়ে দিয়েছিলেন,” শতবর্ষ গুণে লাভ নেই। যত দিন বাঁচব ,মানুষের ভালবাসা পাথেয় করে আমি আমার কাজ চালিয়ে যেতে চাই।”

    মনে পড়ে যায় ভূপেন হাজরিকার ‘মানুষ মানুষের জন্য’ গানটির সেই বিখ্যাত লাইনগুলি,

    বলো কী তোমার ক্ষতি, জীবনের অথৈ নদী
    পার হয় তোমাকে ধরে, দুর্বল মানুষ যদি।
    মানুষ যদি সে না হয় মানুষ, দানব কখনো হয় না মানুষ
    যদি দানব কখনো বা হয় মানুষ, লজ্জা কি তুমি পাবে না…ও বন্ধু।

     অরুণাদেবীর জীবনযুদ্ধের কথা শুনলে সত্যিই লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে আসে। যাঁকে এই বয়েসে, আজও, মানবাধিকারের লড়াই চালিয়ে যেতে হয় পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের উঠোনে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More