সময় পেরিয়ে চলেছি সাগরসঙ্গমে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অরিন্দম বসু

    শিয়ালদহ থেকে বিকেল চারটে পঁয়তাল্লিশের নামখানা লোকাল। দশ নম্বর প্ল্যাটফর্মের এক চায়ের দোকানদার বললেন, ‘উঠতে পারবেন না। চিঁড়ের মতো চ্যাপ্টা হয়ে যাবেন, যা ভিড় হবে। লক্ষ্মীকান্তপুর লোকাল ধরে ওখানে চলে যান। ওখান থেকে ফাঁকায় ফাঁকায় উঠে চলে যাবেন নামখানা অবধি।’ আমার মতি সে দিকে ছিল না। গতিও নয়। নামখানার ট্রেনেই চেপে বসলাম। মানে, বসার জায়গাও পেয়ে গেলাম। বসে অদ্ভুত লাগছিল। এর আগে এলাহাবাদে প্রয়াগের পূর্ণকুম্ভে গিয়েছি। সে তো অনেক দূরের যাত্রাপথ। আর এ যেন ঘরের কাছ থেকে রওনা দিয়ে একটু পাড়া বেড়িয়ে আসার মতো ব্যাপার। তবে তা যে আদৌ নয়, তা টের পেয়েছিলাম পরে।

    তবে তার আগে ভাগবত বিশ্বাসের কথা বলি। না ভাগবতের ওপরে বিশ্বাস নয়। নদিয়ার মাঝদিয়ার কৃষ্ণগঞ্জের ভাগবত বিশ্বাসের সঙ্গে দেখা হয়ে গিয়েছিল শিয়ালদহের প্ল্যাটফর্মেই। সাত-আট জনের দল। তিন মহিলা আছেন। প্লাস্টিক বিছিয়ে বসে পড়েছেন। পোঁটলাপুটলি, ব্যাগের ওপর শোয়ানো মোটা মোটা বাঁশের লাঠি গোটা কয়েক। সঙ্গে কাপড়ও আছে। এই দিয়েই তাঁবু খাটিয়ে নেবেন সাগরমেলায়, যেখানে জায়গা পাবেন।

    আমি টালিগঞ্জে থাকি শুনে বললেন, ‘আমাদের কৃষ্ণগঞ্জ, আপনার টালিগঞ্জ। আমরা সব গঞ্জের মধ্যেই থাকি তা হলে।’ ভাগবতের সঙ্গেই গেরুয়া ধুতি আর পাঞ্জাবিতে বসে ছিলেন রঞ্জিত বিশ্বাস। এই নিয়ে পাঁচ বার হবে গঙ্গাসাগর। তবে যে সবাই বলে, সব তীর্থ বারবার– গঙ্গাসাগর এক বার। এক গাল হাসলেন রঞ্জিত বিশ্বাস। ‘কই আমি তো এত বার গেনু, বেঁচে থাকলে আবার যাব।’ পাশেই বসে হরেকৃষ্ণ বিশ্বাস। গালে কাঁচাপাকা দাড়ি ভর্তি। ডান পা একটু ছোট বলে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হয়। তিনি এই প্রথম বার সাগরে যাচ্ছেন দলে ভিড়ে। ভ্যালভ্যালে চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘দেখার কী আছে বলো দেখি সেখানে?’ হাত নেড়ে রঞ্জিত বলে উঠলেন, ‘কী দেখবে, কী দেখবে, সাগর দেখবে আর মানুষ দেখবে। মানুষই তো রয়েছে দেখার মতো। একসঙ্গে ঘুরে ফিরে সব দেখেশুনে একসঙ্গে চলে যাব।’

    ট্রেনে উঠে পেয়ে গেলাম বিহারের আরা জেলার হরিরাম সিংকে। মাথাজোড়া টাক, মোটা গোঁফ। স্ত্রী ও দাদাকে নিয়ে যাচ্ছেন গঙ্গাসাগর। এ বারই প্রথম। সেনাবাহিনীর চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। ছেলে চাকরি পেয়ে গিয়েছে। মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন গত বছর। আর কী, এবার পুণ্য করতে বেরিয়ে পড়াই যায়। গঙ্গাসাগর থেকে ফিরে যাবেন পুরী। সেখান থেকে বাড়ি ফিরে দরিদ্র নারায়ণ সেবা দেবেন। সাগরমেলায় কোথায় থাকবেন তার ঠিক নেই।

    বললেন, ‘শুনেছি বিচালির ঘর থাকে অনেক। একটা পেয়ে যাব ঠিক।’ তবে এই ভাবে লোকাল ট্রেনে তীর্থে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আগে হয়নি হরিরামের। ভিড় দেখে তাঁর দাদার কথা বন্ধ। স্ত্রী কামরার দেওয়াল মাথা হেলিয়ে পড়ে রয়েছেন। যদিও তার মধ্যেই সবেদা আর গাঠিয়া ভাজা কিনে খেলেন। বারবার জানতে চাইছিলেন, কাকদ্বীপ থেকে লঞ্চ কখন পাওয়া যাবে।

    আমার পাশেই বসেছিলেন বারুইপুর মালঞ্চর প্রতিমা পাণ্ডা। কালো চেহারায় মাথায় ঘোমটা। শাড়িটা একেবারে নতুন কিনেছেন সাগরে যাবেন বলে। স্বামী নিতাই পাণ্ডাও রয়েছেন, বিরাট এক ব্যাগ কোলে নিয়ে। আর আছেন মেনকা দাস। তাঁর মাথাতেও ঘোমটা। প্রতিমা বললেন, ‘এ হল আমাদের গেরাম প্রতিবেশী। মেলায় যাবে বলল, তাই সাথে নিয়ে নিলুম।’ প্রতিমা আর নিতাই এর আগেও গঙ্গাসাগরে গিয়েছেন। জমি জিরেত আছে। এক মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। চার ছেলে। তারাও কাজ জুটিয়ে নিয়েছে যে যার মতো। কত দূর দূর থেকে লোক চলে আসছে গঙ্গাসাগরে। আর তাঁরা মাত্র এক বার গিয়েই ক্ষান্ত থাকবেন? তাই কখনও হয়?

    ট্রেনে তীর্থযাত্রীদের ভিড়। রোজ যাঁরা এ পথে যাতায়াত করেন, তাঁদের বড় অসুবিধে। কয়েকটা দিন যদিও কষ্ট মেনে নিচ্ছেন। প্রায় সকলের সঙ্গেই অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি ছোট বড় ‘এস’, অর্থাৎ হুক। এই নিয়েই কামরার জাল লাগানো দেওয়ালে, জালনার শিকে, মাল রাখার বাঙ্কে ঝুলছে রকমারি ব্যাগ। ভিন্ রাজ্য থেকে আসা তীর্থযাত্রীরা তাই দেখে হাঁ করে তাকিয়ে।

    কাকদ্বীপ স্টেশনে মানুষের ঢল। বাংলা ও হিন্দিতে মাইকে বারবার ঘোষণা হচ্ছে, লঞ্চে চড়ার টিকিট স্টেশনের বাইরে বেরিয়েই কেটে নিন। সোজা চলতে থাকুন। কোথাও দাঁড়়াবেন না। ট্রেনে যাঁদের সঙ্গে ছিলাম, এক মুহূর্তেই তাঁরা হারিয়ে গেলেন ভিড়ে। যেন সে রকমই কথা ছিল। নানা রকমের অনেক মানুষ। মেলার দিকে চলেছে ভিড়! আমি টোটোয় চেপে বসলাম অপরিচিতদের সঙ্গে। বৃদ্ধ মাকে নিয়ে উঠে পড়েছেন আকাশ শর্মা। বছর তিরিশ বয়স। আসছেন জৌনপুর থেকে। বললেন, আজই সকালে নেমেছি ট্রেন থেকে। কিছুই বুঝতে পারছি না, কী ভাবে যে পৌঁছব!

    টোটো নামিয়ে দিল লট নম্বর আটের কাছে। মাইকে বেজে চলেছে, জয় জয় সন্তোষী মাতা, কখনও বা অনুপ জলোটার হিন্দি ভজন। জেটি ঘাট থেকে নদী পেরিয়ে কচুবেড়িয়া যাওয়ার লঞ্চ ছাড়বে। বার্জও যাবে। এক একটা লঞ্চে চারশো লোক নেবে। বার্জে তিন হাজার। কিন্তু সে সবই পাওয়া যাবে রাত ১১টার পরে। কেন না, এখন নদীতে ভাঁটা চলছে। জোয়ার না এলে কিছুই করার নেই।

    আমার চোখের সামনে অবশ্য বহু ক্ষণ চার পাশের সমস্ত কিছু অবিশ্বাস্য হয়ে উঠতে শুরু করেছে। একটু আগেই যে বাঁশবন, কলাবাগান, পুকুর, নাবাল জমির মাঝখান দিয়ে সরু ঢালাই রাস্তা দিয়ে এসেছি, তা আর মনে নেই। ধান ক্ষেতে এখন কেটে নেওয়া ধান গাছের শুকনো চারা। তার থেকে কিছু দূরে মাটির ঘরের দাওয়ায় বসে আধাে ঘুমে এলিয়ে রয়েছেন এক জন। সোয়েটারের উপরে চাদর মুড়ি দেওয়া। পাশে বসে ঢুলছেন তাঁর ঘরওয়ালি। রাজস্থানের ঢোলপুর জেলা থেকে এসে পশ্চিমবঙ্গের গঙ্গাসাগরে যাওয়ার পথে এই সুখ আসলে জীবন আর পুণ্য অর্জনের মাঝখানে একটু জিরিয়ে নেওয়া।

    জেটিতে যাওয়ার লাইন অন্তত দু’কিলোমিটার লম্বা হয়ে গিয়েছে এর মধ্যেই। দেদার লোক আসছে। অপেক্ষা করতে করতেই উবু হয়ে বসে গুনগুন করে গান গাইছেন অউধ-অযোধ্যা থেকে আসা দেহাতের মহিলারা, “লঙ্কামে যাকে দেখো… রাম সীতা মাইয়াকো দেখো… বনবাস মে।” হাতে হাতে তালি পড়ছে। তাঁদের যিনি প্রায় পাহারা দিয়ে দাঁড়িয়ে সেই রামকিশোর সিংহের মাথায় বিরাট পাগড়ি। গোঁফও বিরাট। পাকিয়ে রয়েছে গালে। হাতে মোটা লাঠি।

    কনৌজ থেকে এসেছে ১৮ জনের দল। তাঁদের মধ্যে একজন নবীন শর্মা এই ঠান্ডাতেও ঘেমে-নেয়ে অস্থির। এর পরেও লঞ্চে নদী পেরিয়ে, হেঁটে, বাসে, আবার হেঁটে, কপিল মুনির আশ্রমে পৌঁছোনো যাবে শুনে বলেই ফেললেন, ‘আব সমঝা, কিঁউ সব তীরথ বারবার গঙ্গাসাগর এক বার।’ বললাম কী বুঝেছেন?  হাসলেন নবীন, এখানে এক বার আসতে গিয়ে মানুষ এত দুবলা পাতলা হয়ে যাবে যে পরের বার আর আসতে পারবে না।’ তাঁর কথা শুনেই যদিও দলের একজন চেঁচিয়ে উঠলেন,’ কিউ নেহি আয়েঙ্গে? গঙ্গা মাইয়া জিতনা বার বুলায়েঙ্গে, আয়েঙ্গে!’

    ভগীরথের মর্ত্যে গঙ্গাকে নিয়ে আসার যে পৌরাণিক কাহিনি, তার এক অন্য অর্থ হয়তো খুঁজে পাওয়া যেতে পারে এই গঙ্গাসাগরের যাত্রাপথে। গঙ্গার স্রোতধারাকে হিমালয় থেকে সমতল ভূমিতে নিয়ে এসে কুরু, পাঞ্চাল, কোশল প্রভৃতি দেশের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্য ছিল ভগীরথের। শুধুমাত্র গঙ্গার জল ভাগীরথীর খাতে নিয়ে এসে সাগর সঙ্গমের পথ প্রশস্ত করার কথা না ভাবলেই ভাল হবে। ভাগীরথীর ধারাকেই পবিত্র জাহ্নবী বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন ভারতীয়রা। তাকে পুণ্যস্রোত বলে গ্রহণ করেছে। এই ভাগীরথীর সঙ্গম মোহনায় সাগরদ্বীপে মহর্ষি কপিলের আশ্রম ও সিদ্ধিস্থান হিসেবে পুণ্যভুমি এবং এবং বহু প্রাচীন যুগ থেকে তীর্থস্থান বলে বিবেচিত হয়ে আসছে।

    তবে এটাও মনে রাখা দরকার, যে কপিল মুণিকে স্মরণ করে সাগরদ্বীপের মন্দির ৪০৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আগে তৈরি হয়নি। এ বিষয়ে সাক্ষ্য দিতে পারে এনএনএল দে-র The Geographical Dictionary of Ancient and Medieval Bengal. মন্দির প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই উত্তর ভারতের অবাঙালি বৈরাগী ও সন্ন্যাসী সম্প্রদায় এই মন্দিরের তীর্থস্থানের উপর তাদের কর্তৃত্ব বজায় রেখেছে। তবে এ-ও মনে রাখা ভাল, যে সুপ্রাচীন যুগে সাগর সঙ্গম পর্যন্ত নিম্ন গাঙ্গেয় উপত্যকা বলতে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান সব চেয়ে বেশি প্রযোজ্য।

    কথা যখন কিছুটা ঘুরে গেল, তখন চট করে আরও কিছুটা বলে নেওয়া যায় যায় বোধ হয়। ডায়মন্ডহারবার–কাকদ্বীপ রোডের পাশের নিশ্চিন্তপুর গ্রাম। এখন বড় রেলস্টেশন। সমৃদ্ধ জায়গা। এর দক্ষিণ দিক দিয়ে গিয়েছে সুন্দরবন সীমাবাঁধ, ইংরেজিতে বললে এমব্যাঙ্কমেন্ট। এই সীমাবাঁধের  দক্ষিণ সাগরদ্বীপে কিন্তু ইংরেজ আমলে জঙ্গল হাসিল করার জায়গাগুলোর মধ্যে পড়েনি। সুন্দরবন নিম্নভূমি এলাকার মধ্যে নিরাপদ ও বসবাসের উপযোগী ছিল এই অঞ্চল। সাগরদ্বীপ ও তার চার পাশের অঞ্চল সেই সময়কার গঙ্গারিডির মূল ভূখণ্ড ছিল এবং এখনকার তীর্থনগর ‘গঙ্গে’ বন্দর নামে খ্যাতি পেয়েছিল। এ নিয়ে অনেক দিন গবেষণা করেছেন সাগরদ্বীপের নরোত্তম হালদার। তিনি বলেছেন, ‘কালীঘাটের দক্ষিণ থেকে সাগরদ্বীপ পর্যন্ত আদিগঙ্গার পশ্চিম ভূখণ্ড ছিল একই ভূখণ্ড। সাগরদ্বীপের তীর্থস্থানে পৌঁছনোর একটি প্রশস্ত নদীপথ ছিল। পরে আরও অনেক নদীপথ তৈরি হয়।’

    রামায়ণে উল্লেখ রয়েছে সাগরদ্বীপের জনহীন অরণ্যে সাংখ্যদর্শন প্রণেতা চন্দ্রবংশীয় ক্ষত্রিয় ঋষি কপিলের সাধনস্থল ছিল সাগরদ্বীপ। তারপর সূর্যবংশীয় ভগীরথের আমলে মহাতীর্থ হিসেবে গঙ্গাসাগর সঙ্গমে পুণ্যার্থীদের আসা যাওয়া ও মানুষের থাকার মতো বসতি তৈরি করেছিল। পৌরাণিক কাহিনি বলছে, সগর রাজার অশ্বমেধ যজ্ঞের অশ্ব চুরি করে দেবরাজ ইন্দ্র কপিলমুণির আশ্রমে লুকিয়ে রেখেছিলেন। ঘোড়া খুঁজতে খুঁজতে সগরের ষাট হাজার ছেলে কপিলমুণির আশ্রমে চলে আসেন। ঋষিকে তাঁরা চোর বলে গালিগালাজ করেছিলেন। কপিল তাঁদের পুড়িয়ে ছাই করে দেন। বহু বছর পরে সগরের পরিত্যক্ত ছেলে অসমঞ্জের বংশজাত ভগীরথ গঙ্গার জলপ্রবাহ হিমালয় থেকে উত্তর ভারতের পথে বঙ্গদেশে নিয়ে আসেন। সগর রাজার ছেলেরা প্রাণ ফিরে পায় সেই জলধারায়। মথুরাপুর এলাকায় ছত্রভোগ নামের জায়গায় গঙ্গা শতধারায় ভাগ হয়ে সমুদ্রে রওনা দেয়। বলা হয়, এখানেই গঙ্গাদেবী নিজের জ্যোতির্ময় চক্র ভগীরথকে প্রদর্শন করেন। পরে এখানেই গড়ে ওঠে চক্রতীর্থ।

    রাত সাড়ে এগারোটা-বারোটায় ভেসেল ছাড়বে এক, দুই, চার, পাঁচ নম্বর জেটি থেকে। যাবে এল সি টি জেটি থেকেও। মাথায়, কাঁধে, হাতে পোঁটলা, ব্যাগ, নাইলনের বস্তা নিয়ে হেঁটে চলেছে মানুষ। মাঝে মাঝেই পাণ্ডাদের রঙিন পতাকা উঁচু হয়ে রয়েছে লাঠির আগায়। কোথাও বা পতাকার অভাবে কম্বলের টুকরোও। পাণ্ডারা যে দল নিয়ে এসেছেন তাদের চেনানোর জন্যই এই ব্যবস্থা। না হলে যে কোথায় হারিয়ে চলে যায় তার ঠিক কী? সেই ভয়েই মহিলারা হাঁটছেন একে অন্যের শাড়ি বা চাদরের খুঁট ধরে। রাস্তায় বাঁশের ব্যারিকেড পড়ে গেলেই দাঁড়িয়ে বা বসে গুন গুন করে রামভজন একযোগে। এক জনকে দেখলাম একা চলেছেন। পাতলা ধুতি। গায়ে কম্বল জড়ানো। বাঁ হাতে কমণ্ডুল। ডান হাতে লাঠিতে ভর দিয়ে পা টেনে টেনে যেতে গিয়ে অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে পড়েছেন। মাথায় লাগানো লটবহর। তবু যাবেন। যে করেই হোক পৌঁছনোটাই উদ্দেশ্যে। তার আগেপিছে ট্রলি ব্যাগ টেনে দিয়ে চলেছেন সুবেশ বাঙালি পরিবার। জয় সীয়ারাম ধ্বনি উঠছে কোথা থেকে।

    গোয়ালিয়রের রণজিত সিং চৌহান অসহায় মুখ করে বিডিও অফিসের সামনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। মেয়ে, বউ, নাতি, বৃদ্ধ বাবা রয়েছেন সঙ্গে। মাইকে বাংলায় ঘোষণা শুনে কিচ্ছু বুঝতে পারছিলেন না। নাসিক, হরিদ্বার, এলাহাবাদের কুম্ভে গিয়েছেন, কিন্তু এখানে এসে ভয় ভয় করছে। খুব ঝক্কি যাওয়ার। তবু ভিড়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হিন্দুস্তানি লোগ তো অ্যায়সা হি হ্যায়। আধ্যাত্মিক ভাব রহতা হ্যায় হৃদয় মে।’

    আমার হৃদয়ে কী আছে আমি জানি না। পৌরাণিক কাহিনি, গঙ্গা নদীর ইতিহাস, জলজঙ্গলের কাব্য বয়ে আমি শুধু অগুণতি মানুষের সঙ্গে হেঁটে চলেছি। দূরে জেটিঘাট। দাঁড়িয়ে রয়েছে বার্জ ভি ভি গিরি। এই হিম ঠান্ডার ভেতর দিয়ে, কুয়াশার ভেতর দিয়ে নিয়ে যাবে ও-পারে। তার পরেও যাত্রা কম নয়। নবকুমারদের নৌকা পথ হারিয়ে ছিল। আধুনিক জলযান ঠিক পৌঁছে যাবে। তবে তার যে সব মনে হয়েছিল – আহা কী দেখিলাম, জন্মজন্মাতরেও ভুলিব না– সে সময় নদীর স্রোতে, সাগরের ঢেউয়ে ধুয়ে গিয়েছে। আমি নিছকই এক যাত্রী। সময় পেরিয়ে চলেছি।

    অরিন্দম বসুর এখনও পর্যন্ত আটটি উপন্যাস, দেড় শতাধিক গল্প ও একটি ভ্রমণকাহিনি প্র‌কাশিত হয়েছে। প্রকাশিত গ্র‌ন্থ বারোটি। উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন ‘পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি’র পুরস্কার, ‘নমিতা চট্টোপাধ্যায় সাহিত্য পুরস্কার’। গল্পের জন্য পেয়েছেন ‘গল্পসরণি’ ও ‘গল্পমেলা’ পুরস্কার,  নবীন সাহিত্যিক হিসেবে ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ’-এর পুরস্কার।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More