বুধবার, নভেম্বর ২০
TheWall
TheWall

সুচিত্রা থেকে শর্মিলা, রুপোলি পর্দায় কে পরেননি তাঁর করা শাড়ি? ধাত্রীগ্রামের টাঙ্গাইলকে দেশের সামনে মেলে ধরেছিলেন নির্মল ভট্টাচার্য

রূপাঞ্জন গোস্বামী

“যদি হই চোর কাঁটা ওই শাড়ির ভাঁজে, দুষ্টু যে হয় এমন কাজ তো তারই সাজে…।”
মহানায়ক উত্তমকুমারের লিপে কিশোর কুমারের গাওয়া ‘অমানুষ’ ছবির গানটা শুনেছেন? শর্মিলা ঠাকুর সেই দৃশ্যে ডবি নক্সায় বোনা হলুদ রঙের একটা তাঁতের শাড়িটা পরেছিলেন। সেটি কার জানেন ?

কিংবা , “এ বার মলে সুতো হবো, তাঁতির ঘরে জন্ম লবো, পাছা পেড়ে শাড়ী হয়ে দুলবো তোমার কোমরে, তোমরা যে যা বল আমারে…।”  মৌচাক সিনেমায় উত্তমকুমারের লিপে মান্না দে’র গাওয়া গানটি হয়তো শুনেছেন। ওই দৃশ্যে সাবিত্রী যে শাড়ি পরেছিলেন, সেটির স্রষ্টা কে জানেন?

যদি হই চোর কাঁটা ওই শাড়ির ভাঁজে

তাঁর নাম  নির্মল ভট্টাচার্য্য। ধাত্রীগ্রামের সবাই যাঁকে চেনেন নির্মল ঠাকুর নামে। তৎকালীন বাংলায় সিনেমায় এমন নায়িকা ছিলেন না যিনি তাঁর শাড়ি পরেননি।

সুচিত্রা, সুপ্রিয়া, সাবিত্রী, সুব্রতা থেকে শুরু করে হিন্দি ছবির হার্ট থ্রব শর্মিলা ঠাকুর, কিংবদন্তী নায়িকা বৈজয়ন্তীমালাও পর্দায় ও পর্দার বাইরে পরতেন নির্মল বাবুর শাড়ি।

যাঁর ধাক্কা-পাড়ের ধুতি পরে পর্দায় দেখা দিতেন মহানায়ক উত্তম কুমার, সৌমিত্র, কালী ব্যানার্জি, তরুণ কুমার, রঞ্জিত মল্লিক থেকে মুম্বাইয়ের গায়ক নায়ক বিশ্বজিৎও। তাঁর কাছ থেকে সিনেমার দৃশ্যে ব্যবহার করার জন্য শাড়ি কিনতেন সুখেন দাস থেকে সত্যজিৎ রায়।

নির্মল ভট্টাচার্য

 ইতিহাসের সন্ধানে ধাত্রীগ্রামে

ধাত্রীগ্রামের নিজের বাড়ির দোতলার ঘরে বসে স্মৃতি হাতড়ে চলেছিলেন বাহাত্তর বছরের নির্মল বাবু। ১৯৯২ সালে স্পাইনাল কর্ডে ধরা পড়েছিল প্লাজমা সাইটোমা। ২৭ বছর ধরে ক্যানসারের যন্ত্রণা ভোগ করছেন।

এবং বিস্ময়কর জীবনীশক্তি নিয়ে আজও বেঁচে আছেন। চলছে কড়া ওষুধ, বাড়িতে সর্বক্ষণের জন্য মজুদ অক্সিজেন। আমার সঙ্গে কথা বলতে খুবই কষ্ট হচ্ছিল তাঁর। মাঝে মাঝেই ফিকে হয়ে যাচ্ছিল স্মৃতি।

বাংলাদেশের ময়মনসিংহের কোকডহরা’তে (উতরাই) ছিল নির্মল বাবুদের আদি বাড়ি। বাংলাদেশে তাঁর বাবা মণীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের ছিল ‘বান্ধব প্রেস’। বেশ সচ্ছল ছিল পরিবারটি।

কিন্তু, পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের অত্যাচারে, পূর্ব-পাকিস্তান (বর্তমানে বাংলাদেশ) ছেড়ে ১৯৫৬ সালে ভারতে এসেছিলেন মণীন্দ্রনাথ। স্ত্রী, তিন ছেলে আর দুই মেয়েকে নিয়ে। নির্মল বাবুর বয়েস তখন সাত বছর।

প্রথমে পায়রাডাঙ্গা , তারপর অশোকনগর, সব শেষে পরিবারটি থিতু হয় বর্ধমানের ধাত্রীগ্রামে। সালটা ছিল ১৯৬২। বাংলাদেশ থেকে অর্থ আনলেও কিছু অসাধু মানুষের প্রতারণায় নিঃস্ব হয়ে যায় পরিবারটি। স্বচ্ছলতার রোশনাই থেকে দারিদ্রের অন্ধকারে এসে হাঁফিয়ে উঠতেন নির্মল।

অভাবে কারণেই পড়াশুনা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল মেধাবী নির্মলের। পেটের তাগিদে অল্প বয়েসেই নামতে হয়েছিল পথে। নির্মলের মা বাড়িতে কয়লার উনুনে বানিয়ে দিতেন হাত-রুটি, তরকারি, ডিম সেদ্ধ। কাটোয়া লাইনের ট্রেনে বিক্রি করতেন কিশোর নির্মল। এমন ভাবেই কোনও মতে চলছিল দিন গুজরান।

অন্ধকারে আলো হয়ে জ্বলেছিলেন নির্মল

ধাত্রীগ্রামে তখন বাংলাদেশ থেকে আসা তন্তুবায়দের বাস। তাঁরা টাঙ্গাইল শাড়ি বোনেন। কিন্তু খুবই অল্পদামে বিক্রি হয়। তবুও কোনও মতে সংসার চলে যায়। বাঁচার তাগিদে নির্মল ভেবেছিলেন তাঁত বোনা শিখবেন।

কিন্তু বামুনের ছেলেকে কেউ শেখাতে চান নি, পাপ হবে ভেবে। নাছোড়বান্দা নির্মল বাবু তাঁত বোনা শিখেছিলেন শান্তিলাল বসাকের কাছ থেকে। শান্তিলাল বাবুও  ছিলেন ময়মনসিংহের একই গ্রামের মানুষ।

মুলিবাঁশ আর বেড়া দিয়ে তৈরি করা বাড়িতে নিজের তাঁত বসিয়েছিলেন নির্মল বাবু। জন্ম নিয়েছিলেন ব্রাহ্মণ ঘরে, হয়ে গেলেন পেশাদার তন্তুবায়। বুনতে শুরু করেছিলেন অনবদ্য টাঙ্গাইল শাড়ি।

নিজে হাতে তাঁত বুনেছেন প্রায় ১০ বছর। টাঙ্গাইল শাড়িতে তিনি এনেছিলেন অসাধারণ বৈচিত্র। পাটলি পাল্লু, গিলা বুটি, মুগা ডুরে, মীরা নামের শাড়ি গুলি যেন প্রাণ পেত নির্মল বাবুর হাতে।

নিজের হাতে শাড়ি বুনতে গিয়ে দেখেছিলেন, এলাকায় শাড়ি বিক্রি করে দাম পাবেন না। দাম পেতে গেলে ধাত্রীগ্রামের টাঙ্গাইলকে সর্বভারতীয় স্তরে জনপ্রিয় করতে হবে। তাই একদিন ১৭টি শাড়ি নিয়ে নির্মল বাবু পাড়ি দিয়েছিলেন কলকাতায়।

দিনের বেলা বাড়ি বাড়ি, অফিসে অফিসে ঘুরে শাড়ি বিক্রির চেষ্টা করতেন। রাতে ম্যাডক্স স্কোয়ারে শুয়ে থাকতেন ছাতু খেয়ে। তখন নকশাল আমল। অবিবাহিত পুরুষদের কেউ বাড়ি ভাড়া দিতেন না।

শ্যামবাজারের এক প্রেসে নির্মলবাবুর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাসের স্ত্রী লাবণ্যপ্রভার। বাবা মণীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচয় সূত্রে। লাবণ্যপ্রভা দেবী লেক টেরেসে যেখানে থাকতেন, সেই বাড়িতেই নির্মলবাবুর ভাড়া থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। ভাড়াবাড়িতেই নির্মলবাবু তৈরি করেছিলেন তাঁর নিজের শো রুম ‘উপহার’।

টাঙ্গাইল শাড়িতে দক্ষিণ ভারতের পাটলি-পাল্লু ডিজাইন আনার মূল কৃতিত্ব কিন্তু নির্মল বাবুর। এই শাড়িগুলির কুঁচি ও আঁচল ভিন্ন ভিন্ন ডিজাইনের হত।

আরেকটি অসামান্য কৃতিত্ব আছে নির্মল বাবুর। তাঁতের শাড়ি যে একশো টাকার বেশি দামে বিক্রি করা যায়, পশ্চিমবঙ্গে  তিনিই সেটা প্রমাণ করে দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে ধাত্রীগ্রামের টাঙ্গাইল শাড়িকে বিখ্যাত করে দিয়েছিলেন রুপালী পর্দায় এনে।

পাশে দাঁড়িয়েছিলেন উত্তম কুমার

জ্যাঠা অবিনাশ ভট্টাচার্য্য ছিলেন স্টার থিয়েটারের ম্যানেজার। তাঁর সূত্রেই পরিচয় হল রূপোলি পর্দার নায়ক, নায়িকা, পরিচালকদের সঙ্গে। তখনকার দিনে সিনেমার পর্দায় নায়ক নায়িকাদের পরা পোষাক বাজারে এলেই সুপারহিট হয়ে যেত। দোকানে দোকানে ভিড় পড়ে যেত সেই পোষাক কেনার। নির্মল বাবু বুঝেছিলেন ধাত্রীগ্রামের শাড়িকে বিখ্যাত করতে গেলে,  সিনেমার পর্দায় নায়িকাদের অঙ্গে ওঠাতেই হবে টাঙ্গাইল শাড়ি।

শুরু হয়েছিল শাড়ির গাঁট নিয়ে নায়ক, নায়িকা, পরিচালকদের বাড়ি আর স্টুডিওতে ঘোরা। তাঁর চেষ্টা সফল হয়েছিল। তাঁর শাড়ির অনন্য বৈচিত্র ও সৌন্দর্য্য দেখে প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন মেজদা ওরফে উত্তমকুমার। আর ফিরে তাকাতে হয়নি নির্মল বাবুকে। একের পর এক সুপারহিট ছবিতে নায়িকাদের অঙ্গে উঠতে থাকে নির্মল ভট্টাচার্যের টাঙ্গাইল শাড়ি।

উত্তমকুমারে প্রায় পারিবারিক সদস্য হয়ে গিয়েছিলেন নির্মল বাবু। উত্তমের ময়রা স্ট্রিট ও গিরীশ মুখার্জি স্ট্রিটের বাড়িতে নিয়মিত ছিল যাওয়া আসা। মৃত্যুর আগের দিনেও উত্তমকুমারের বাড়ি শাড়ি দেখাতে গিয়েছিলেন নির্মল বাবু। খুব ভালোবাসতেন সুপ্রিয়া দেবীও। না খাইয়ে ছাড়তেন না।

উত্তম, সুপ্রিয়া, সত্যজিৎ খেতে ভালোবাসতেন ধাত্রীগ্রামের ‘পোড়াবাড়ির’ চমচম। টিনে করে এনে দিতেন নির্মল বাবু। দাম কিন্তু সবাই দিয়ে দিতেন। নিতে না চাইলে বরং রাগ করতেন।

স্মৃতি থেকে উঠে আসা কিছু মুহূর্ত

একবার, উত্তমকুমার যাচ্ছিলেন কাটোয়ার দিকে শুটিং করতে। নির্মল বাবু সেদিন কলকাতা থেকে ধাত্রীগ্রাম ফিরবেন। খবর পেয়ে তড়িঘড়ি করে হাওড়া গিয়ে সেই ট্রেন ধরেছিলেন। ব্যান্ডেলে গাড়ি থেমেছিল। নির্মলবাবু নিজের কামরা থেকে দৌড়ে উত্তমকুমারের কামরার দরজার কাছে গিয়েছিলেন। উঠতে দেয়নি পুলিশ।

পুলিশকে বলেছিলেন, উত্তমকুমারের সর্বক্ষণের সঙ্গী বংশীকে একবার  ডেকে দিতে। বংশী এসে বলেছিলেন কামরায় উঠতে দেবে না পুলিশ। নিজের কামরায় ফিরে এসেছিলেন নির্মল বাবু। কয়েক স্টেশন পরে আবার বংশীই এসে হাজির তাঁর কম্পার্টমেন্টে । উত্তম কুমার ডাকছেন। নির্মলকে দেখে উত্তম অবাক হয়ে বলেছিলেন,

-কিরে নির্মল, তুই এই ট্রেনে ?
-এ তো আমার রোজের কাহিনী দাদা।

-এত কষ্ট করিস তুই!

অবাক বিস্ময়ে নির্মল বাবুর দিকে তাকিয়েছিলেন মহানায়ক। পাশাপাশি বসে দুজনে ধাত্রীগ্রাম পর্যন্ত গিয়েছিলেন। ধাত্রীগ্রাম স্টেশনে ট্রেন ঢোকার আগে নির্মল বাবু উত্তমকুমারকে  অনুরোধ করেছিলেন, ” দাদা একবার ধাত্রীগ্রামের মাটিতে পায়ের ধুলো দিন।” কথা রেখেছিলেন উত্তমকুমার। ধাত্রীগ্রাম স্টেশনে নেমে ছিলেন মহানায়ক, কয়েক মিনিটের জন্য।

বেঙ্গল হোম ইন্ড্রাস্ট্রিজে নির্মল বাবু গিয়েছিলেন শাড়ির গাঁট নিয়ে। সেখানকার ম্যানেজার তাঁর যাওয়ার খবর পেয়ে বলেছিলেন, “নির্মল, শাড়িগুলো নিয়ে ভেতরে এসো।” ম্যানেজার মহিলার ঘরের ভেতরে বসে আরেকজন মহিলা শাড়ি দেখছিলেন।

‘নির্মল’ নামটি শুনে বাঙলির হৃদয় তোলপাড় করা ভঙ্গিতে ঘাড় ঘুরিয়েছিলেন ‘ম্যাডাম’। অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিলেন “তুমি এখানে নির্মল?” মহানায়িকা সুচিত্রা সেন জেনে অবাক হয়েছিলেন, নির্মলের শাড়িগুলিই তিনি এখান থেকে বেছে এতদিন কিনে নিয়ে যেতেন।

‘হাটেবাজারে’ ছবির লোকেশনে বৈজয়ন্তীমালাকে শাড়ি দেখাচ্ছেন নির্মলবাবু। ছবিতে আছেন ডঃ বালিও

বৈজয়ন্তীমালার ভগ্নিপতির বেলভেডিয়া রোডের বাড়িতেই দেখা হয়েছিল বলিউড ফিল্মের মহানায়িকা বৈজয়ন্তীমালার সঙ্গে। তিনি ও তাঁর স্বামী ডঃ বালি খুবই পছন্দ করতেন নির্মল বাবুকে। বৈজয়ন্তীমালা পছন্দ করতেন, গিলা ও কাঁকড়া বুটির টাঙ্গাইল শাড়ি। সে শাড়ি কোঠারি মিলের ২২০০ সানা, ১০০/২ কাউন্টের বিশেষ সুতো দিয়ে বোনা হত।

মুম্বাইতে বৈজয়ন্তীমালার বাড়িতে স্ত্রী সুচিত্রা ও শিশুপুত্র সুকান্তকে নিয়ে গিয়েছিলেন নির্মল বাবু। দিনটি ছিল পঁচিশে ডিসেম্বর। সবাইকে নিজের হাতে কেক খাইয়েছিলেন বৈজয়ন্তীমালা।

ভারত বিখ্যাত হল ধাত্রীগ্রামের টাঙ্গাইল শাড়ি

একে একে সব বিখ্যাত চিত্রপরিচালক তাঁর শাড়ি নিতে শুরু করেছিলেন। শাড়ি নিতেন খোদ সত্যজিৎ রায়ও। থিয়েটারের প্রয়োজনেও সরবরাহ করতেন টাঙ্গাইল শাড়ি। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন হিট সিরিয়ালেও তাঁর শাড়ি পরেই অভিনয় করেছেন সুপ্রিয়া দেবী। একসময় কলকাতার বহু সম্ভ্রান্ত ও বনেদি পরিবারের ফ্যাশন স্টেটমেন্ট ছিল নির্মলবাবুর শাড়ি ।

রাজ্য সরকারের তন্তুজ, তন্তুশ্রী এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বেঙ্গল হোম ইন্ডাস্ট্রিজ, মঞ্জুষা ইত্যাদি সংস্থায় ধাত্রীগ্রামের টাঙ্গাইল শাড়ি বিক্রির নেপথ্যে ছিলেন এই মানুষটি। ধাত্রীগ্রামের টাঙ্গাইল শাড়ি শিল্প ঘুরে দাঁড়িয়েছিল এই অক্লান্ত মানুষটির হাত ধরে।

আজও বুকের মাঝে ঢেউ তোলে টাঙ্গাইল

ক্যানসার ধরা পড়বার পরেও ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। দুই ছেলে এক মেয়ে তখন স্কুলে পড়ে। ব্যবসার হাল ধরার চেষ্টা করেছিলেন স্ত্রী সুচিত্রা ভট্টাচার্য। কিন্তু রোগাক্রান্ত স্বামী ও ছেলে মেয়েদের সামলে ব্যবসা দেখা, একসময় আর সম্ভব হল না। শাড়ির ব্যবসা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ২০০৫ নাগাদ।

নির্মলবাবুর সঙ্গে স্ত্রী সুচিত্রা ভট্টাচার্য

রুপোলী পর্দার কত বিখ্যাত নায়ক নায়িকার সঙ্গে দেখা হয়েছে, কিন্তু একটার বেশি ছবি ধরে রাখতে পারেননি কেন? প্রশ্নটি শুনে ম্লান হেসেছিলেন নির্মল বাবু, বলেছিলেন, “আমার তখন ক্যামেরা ছিল না বা ছবি তোলার মানসিকতাও ছিলো না। আমার মূল লক্ষ্য ছিল ধাত্রীগ্রামের টাঙ্গাইল শাড়ি জনপ্রিয় করা। কারণ আমার ওপর নির্ভর করেছিলেন ধাত্রীগ্রামের অনেক মানুষ ও তাঁদের পরিবার।”

উঠে আসার আগে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কোনও আশা অপূর্ণ আছে নির্মল বাবু ?
আমার দিকে একবার তাকিয়ে খাট থেকে নেমে ক্রাচ নিয়ে আস্তে আস্তে জানলার কাছে গেলেন নির্মল ঠাকুর। জানলার গ্রিল ধরে অস্ফূটে বলেছিলেন, “আমার কিছুই চাই না, শুধু ওপারের টাঙ্গাইল বাঁচুক এপারেও।”

তারপর খোলা জানালাটার বাইরে চোখ মেলেছিলেন। বুঝতে পারছিলাম, ফিকে হয়ে যাওয়া স্মৃতির পর্দায় ভেসে উঠছিল বিচ্ছিন্ন শব্দের দল। উত্তম..সুচিত্রা… সুপ্রিয়া.. সাবিত্রী.. সৌমিত্র….বনপলাশের পদাবলী…মৌচাক… অমানুষ….অরণ্যের দিনরাত্রি….সত্যজিৎ….. গিলাবুটি…মুগা ডুরে…বাংলাদেশ… আরও কত। বুঝতে পারছিলাম নির্মল বাবুর চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল। যেমন ঝাপসা হয়ে আসছিল জানলার বাইরেটাও, শ্রাবণের অঝোর ধারায়।

Comments are closed.