রবিবার, নভেম্বর ১৭

প্যারিসের রামধনু প্যারেডে দেবী দুর্গার কোলে একই সঙ্গে যিশু ও কৃষ্ণ

সোমঋতা ভট্টাচার্য

সূর্য যতই মাথার উপরে উঠছে ৩৬ ডিগ্রির দাবদাহ নিয়ে, প্যারিসের রাজপথে ততই ছড়িয়ে যাচ্ছে রামধনুর রং। রামধনুতে বুঝি শুধু সাতটা রং থাকে ? হবেও বা !  তবে এ রামধনু এক রং-এর সঙ্গে আর এক রঙের অভিযোজনে জন্ম দিচ্ছে আরও হাজার হাজার, লাখো লাখো রঙের, আর সেই সঙ্গে ঘুচে যাচ্ছে পায়ের একটার পর আর একটা বেড়ি। ঘুচে যাচ্ছে ভাষার বেড়ি, ধর্মের, দেশের, জাতপাতের, সম্প্রদায়ের, সর্বোপরি, লিঙ্গের। লাখো রঙের রামধনু তো সেই সব মানুষগুলোর জন্যই যাদের স্বাভাবিক ইচ্ছে, স্বাভাবিক প্রবৃত্তিগুলোকে সমাজ চোখ রাঙিয়ে দাবিয়ে রাখতে চেয়েছে, না জানি কত সহস্র বছর ধরে। সে চোখরাঙানি আজও অদৃশ্য নয়। তাই জুন মাসের শেষ শনিবার তাঁরা হাঁটলেন- মঁপারনাস থেকে রেপুবলিক চত্বর- পাঁচ কিলোমিটার। প্রাইড ওয়াক- গৌরবের পদযাত্রা।

আর গর্বের হবে না-ই বা কেন !  যখন বুকের গহীনে গুমরে থাকা অনেকটা কষ্ট,  রাগ, যন্ত্রণা, অপমান রামধনু-রং হয়ে যায়, হয়ে যায় গান কোনও অসহিষ্ণুতায় ভরসা না করে, সেই প্রতিবাদ মিছিল তখন রূপ নেয় প্রাইড ওয়াকের। মার্সেই-এর জুডিথ এসে হাত ধরে ইউক্রেনের অ্যান্টনির। বুকের উপরে লেখা- সমলিঙ্গের প্রতি বিতৃষ্ণা আসলে আত্ম-অবমাননারই সামিল। ক্লারা আর লিজা আফ্রিকান জ্যাজ়ের তালে দুলতে দুলতে এগিয়ে চলে। হাতে প্ল্যাকার্ড- শুধু মুক্ত হতে চাই। আর তার মাঝখানেই অভিজিতের হাত ধরে প্যারিসের প্রাইড ওয়াকে ঢুকে পড়ে এক টুকরো বাংলা। ঢুকে পড়ে বাংলার পটচিত্র-পুরাণ-লোকায়ত শিল্প। চিরকালীন দেশজ পৌরাণিক গাথাতেও তো ছিল অর্ধনারীশ্বরের আখ্যান। গাজন-চড়কের সময়ে ছেলে বহুরূপীরাই নানা দেবীর রূপ নিতেন। অভিজিৎ ঘোষের কাজ সেই  ‘আনকন্ডিশনাল ইকুয়ালিটি’  বা ‘নিঃশর্ত সাম্য’ নিয়ে। এ বছরের প্রাইড ওয়াক-এর থিম ছিল ‘একক পিতৃত্ব-মাতৃত্ব’ এবং ‘সন্তান গ্রহণের অধিকার’ । শান্তিনিকেতন এবং কলকাতার এনআইএফটি-র ছাত্র, বর্তমানে প্যারিসবাসী অভিজিৎ জানালেন, এ বছরের প্রাইড ওয়াকের থিমের সঙ্গে মিলে গিয়েছে তাঁর পটচিত্রধর্মী কাজ। বিশেষত দেবী দুর্গার কোলে ভগবান যিশু ও কৃষ্ণের ছবিটা।

গ্রিসের আলেকজান্দ্রা, জার্মানির থিয়েরি, স্পেনের পাস্কাল, বাংলাদেশের টিনা, পর্তুগালের ডেভিড, ফ্রান্সের ভিনসেন্ট, লাতিন আমেরিকার ব্রিকি, জন ব্যাপটিস্টরা যখন গৌরব-যাত্রায় অংশ নিলেন দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, শিব, কার্তিকের মুখোশ আর পোশাকে তখন আর এক বার ঘুচে গেল দেশ-কালের গণ্ডী। আরও সম্পূর্ণ হল সমতার ছবিটা।

১৯৬৯ সালে নিউ ইয়র্কের স্টোনওয়ালের ঘটনার সময় থেকেই সমকামী-রূপান্তরকামী মানুষদের এই প্রাইড-ওয়াক ছড়িয়ে নানা দেশে। সমকামীদের উপরে পুলিশি হেনস্থার প্রতিবাদে এবং সাম্যের অধিকার চেয়ে জনমত গড়ে উঠতে থাকে। আর ফ্রান্সে গত প্রায় চল্লিশ বছর ধরে পাঁচ লক্ষেরও বেশি মানুষ বছরের এই বিশেষ দিনটিতে অংশ নেন গৌরবের এই পদযাত্রায়। ইন্টার-এলজিবিটি নামক সংস্থার উদ্যোগে আয়োজিত এই পদযাত্রায় এ বছর অংশগ্রহণ করেছিল ৯০টি সংস্থা।

 

পেশায় বিজ়নেস ইংলিশ-এর অধ্যাপক সোমঋতা থাকেন ফ্রান্সে। স্বাধীন ভাবে সাংবাদিকতাও করেন তিনি। তবে নেশায় তিনি ফুড ব্লগার। তাঁর নিজের রান্নার একটি জনপ্রিয় ইউটিউব চ্যানেল আছে।

04
08
02
14
05
01
09
06
03
15
11
07
13
10
12
16
17

Comments are closed.