সোমবার, মে ২৭

সেকী, জীবনদায়ী অ্যাসপিরিন এবং মারণ ড্রাগ হেরোইনের জনক একই বিজ্ঞানী!

রূপাঞ্জন গোস্বামী

১৮৬৮ সালের এক জার্মান শিল্পপতির পরিবারে জন্ম নেন ফেলিক্স হফম্যান। তাঁর বাবা ব্যবসায়িক ভাবে রসায়নশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাড়িতে তাঁর ল্যাবরেটরি ছিল। দিনের শেষে হফম্যানের বাবা ল্যাবরেটরিতে ঢুকে নানান রায়াসনিক পদার্থের মধ্যে মিশ্রণ ঘটিয়ে কতো কী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। ছোট্ট ফেলিক্স তাঁর বাবাকে মন দিয়ে দেখতো। ছোট থেকেই নতুন কিছু উদ্ভাবনের ইচ্ছা ছিল ফেলিক্সের। ঠিক তার বাবারই মতো। একটু বড় হয়ে বিভিন্ন রাসায়নিকের মধ্যে মিশ্রণ ঘটিয়ে চেষ্টা করতেন বাবাকে চমকে দিতে। ইতিমধ্যে মিউনিখ ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করে ফেলেন ফেলিক্স হফম্যান। জার্মানির বিভিন্ন ফার্মেসিতে কেমিস্টের কাজ করেন, পৈত্রিক ব্যবসা থাকতেও। তাঁকে পেয়ে বসেছিল ওষুধ আবিষ্কারের নেশা। এমন কিছু করে যেতে হবে যাতে মানুষ তাঁকে তাঁর মৃত্যুর পরও মনে রাখে।

ফেলিক্স হফম্যান

রসায়নশাস্ত্র ও ফার্মাকোলজিতে হফম্যানের ছিল অবিশ্বাস্য দখল। হফম্যান, একদিন প্রফেসর অ্যাডলফ ভন বায়ারের চোখে পড়ে গেলেন। এই অ্যাডলফ ভন বায়ার পরবর্তীকালে (১৯০৫ সালে) কেমিস্ট্রিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। তিনি হফম্যানকে বললেন বিখ্যাত জার্মান রঙ প্রস্তুতকারক সংস্থা বায়ার-এ যোগদান করতে। এটি ছিল প্রফেসর বায়ারের নিজের কোম্পানি। ১৮৯৪ সালে হফম্যান বায়ার কোম্পানির ফার্মাসিউটিক্যাল রিসার্চ ডিপার্ট্মেন্ট-এ যোগদান করলেন। হফম্যান ছিলেন একজন সেরা স্তরের গবেষক, যিনি প্রাকৃতিক উপাদান থেকে নতুন রাসায়নিক পদার্থ সৃষ্টি করতেন। যেগুলি বায়ারের কোম্পানিতে ওষুধে ব্যবহৃত হতো।

অ্যাডলফ ভন বায়ার

আবিষ্কার হলো অ্যাসপিরিন

এ দিকে হফম্যানের বাবার বয়েস হয়ে গেছে। মারাত্মক আর্থ্রাইটিস তাঁকে কাবু করে ফেলেছে। হাঁটা চলা প্রায় বন্ধ। যন্ত্রণায় কাতরে ওঠেন সর্বক্ষণ। সেই যুগে পেনকিলার তেমন ছিল না। থাকলেও তার পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া ছিলো ভয়ঙ্কর। সারাদিনের কাজের মধ্যেও হফম্যানের মাথায় সব সময় একটা চিন্তা ঘুরতো। তাঁর বাবার যন্ত্রণা উপশমের একটা ওষুধ আবিস্কার করতেই হবে। ১৮৩০ সালে বিজ্ঞানীরা স্যালিসাইলিক অ্যাসিড নামে একটি যন্ত্রণা নাশক রাসায়নিক পদার্থকে উইলো গাছের ছালে পেয়েছিলেন। কিন্তু ব্যাথার যন্ত্রণা কমাতে গিয়ে রোগীরা স্যালিসাইলিক অ্যাসিড নিয়মিত খেলে পাকস্থলীতে যন্ত্রণা হতো। লুজ-মোশন হতো। হফম্যান বুঝলেন বাবার জন্য এটি নিরাপদ নয়। তাই স্যালিসাইলিক অ্যাসিডকে নিরাপদ করার জন্য দিন রাত এক করে ফেললেন। নিরাপদ করার একটি উপায়ও বের করলেন। তিনি ব্যবহার করলেন অ্যাসিটিক অ্যাসিড। যেটি ভিনিগারের উপাদান।

১৮৯৭ সালের আগস্ট মাসে হফম্যান চিকিৎসার পক্ষে নিরাপদ স্যালিসাইলিক অ্যাসিড আবিস্কার করলেন। নাম দিলেন অ্যাসিটাইল স্যালিসাইলিক অ্যাসিড। বায়ারের ফার্মাসিউটিকাল ল্যাবরেটারির প্রধান হেনরিক ড্রেসার হফম্যানের আবিস্কার করা নতুন রাসায়নিকটি নিজের শরীরেই প্রবেশ করালেন। ব্যথা ও জ্বর কমল পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া ছাড়াই। অ্যাসিটাইল স্যালিসাইলিক অ্যাসিড ওষুধের বাজারে এসে ঝড় তুললো ‘অ্যাসপিরিন‘ নাম নিয়ে। “A” এসেছে acetyl এবং “spirin” এসেছে Spirea নামের আরেকটি গাছ থেকে। যে গাছটি ছিল স্যালিসাইলিক অ্যাসিডের অল্টারনেটিভ উৎস। হফম্যানের বাবার যন্ত্রণার উপশম ঘটল। হফম্যান, বায়ারের ফার্মাসিউটিকাল ডিভিশনের হেড হয়ে গেলেন। ১৮৯৯ সালে বায়ার কোম্পানি অ্যাসপিরিনকে পাউডার হিসেবে বোতলে করে বিক্রি করা শুরু করে। মার্কেটে হিট হয়ে গেলো অ্যাসপিরিন। ঘরে ঘরে প্রবেশ করলো বায়ারের নাম।

হফম্যানের হেরোইন আবিষ্কার

ইতিমধ্যে হফম্যানের বন্ধু ড্রেসার কোডেইন-এর (codeine) যন্ত্রণানাশক ক্ষমতা আবিস্কার করেছেন। এই কোডেইন হলো আফিম থেকে পাওয়া মরফিন-এর (morphine) দুর্বল রূপ। হফম্যানের বন্ধু ড্রেসার চাইছিলেন শ্বাসকার্যের ওপর কোডেইন কী প্রভাব ফেলে তা জানতে। এবং কোডেইন শ্বাসকষ্ট ও সর্দিকাশির রোগীদের সাহায্য করতে পারে কিনা। ড্রেসার তাঁর বন্ধু হফম্যানকে মরফিনের ওপর সেই পদ্ধতিটি প্রয়োগ করতে বললেন। যে পদ্ধতিটি অ্যাসপিরিন আবিষ্কারের সময় হফম্যান স্যালিসাইলিক অ্যাসিডের ওপর করেছিলেন। হফম্যান তখন তাঁর নিজস্ব পদ্ধতিতে মরফিনের সঙ্গে অ্যাসিটাইল যৌগের সংশ্লেষ ঘটালেন। তৈরি হলো অ্যাসিটোমরফিন ওরফে মারণ ড্রাগ হেরোইন

কিন্তু হেরোইনের পেটেন্ট পেলো না বায়ার কোম্পানি। কারণ ব্যবহারকারীর হেরোইনের ওপর প্রচন্ড আসক্তি জন্মে যায়। তাছাড়া ১৮৭৪ সালে ইংল্যান্ডের কেমিষ্ট C. R. Alder Wright মরফিনের সঙ্গে অ্যাসেটিক অ্যানহাইড্রাস মিশিয়ে হেরোইনের একদম কাছাকাছি একটি রাসায়নিক আবিষ্কার করেন। কিন্তু তখন বস্তুটির নাম হেরোইন ছিল না।রাসায়নিক গঠনেও সামান্য পার্থক্য ছিল। তাঁকে হেরোইনের জনক বলে বলা হলেও, আজ যে রাসায়নিকটি ভয়ঙ্কর ড্রাগ হেরোইন নামে কুখ্যাতি কুড়িয়েছে, ফেলিক্স হফম্যান ওষুধ হিসেবে সেটি আবিস্কার করেন। অ্যাসিটোমরফিনের নাম হেরোইন দিয়েছিলেন ফেলিক্স হফম্যানই।

যাই হোক ফেলিক্স হফম্যান ও বায়ার কোম্পানি হেরোইনের মারণ ক্ষমতা আঁচ করতে পারেননি। তাই বায়ার কোম্পানি হেরোইনকে বিপুল্ভাবে সর্দি-কাশির ওষুধ হিসেবে বিক্রি করতে লাগল। এছাড়াও, প্রসববেদনা কমানোর ওষুধ হিসেবে, যুদ্ধে গুরুতর আহত সৈন্যদের যন্ত্রণা কমানোর ওষুধ হিসেবে, পাগলদের চেতনানাশক হিসেবেও হেরোইনকে বোতলবন্দী করে বিক্রি করতে শুরু করল। এমনকী শিশুদের অসুখেও হেরোইন ব্যবহার হতে লাগল।

 আজও অ্যাসপিরিন জীবন বাঁচায় আর হেরোইন জীবন কেড়ে নেয়

আবিষ্কারের ১২৫ বছর পরেও যন্ত্রণা উপশমে, জ্বর কমাতে, হৃদপিণ্ড ঘটিত সমস্যায় হফম্যানের আবিষ্কার অ্যাসপিরিন এখনও রমরমিয়ে চলছে। অ্যাসপিরিন শরীরে রক্তজমাট বাঁধার সম্ভাবনা দূর করে। অবরুদ্ধ ধমনী ঘটিত প্রাণহানী থেকে রোগীকে রক্ষা করে। এ পর্যন্ত সারা পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে ও বাঁচিয়ে চলেছে এই অ্যাসপিরিন।অন্যদিকে হেরোইনের ব্যবহার মহামারীর আকার ধারণ করেছে।

বর্তমান যুগে হেরোইন আর অ্যাসপিরিন

প্রতিবছর গোটা পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ লোক মারা যান অতিরিক্ত মাত্রায় হেরোইন সেবনের জন্য। ফেলিক্স হফম্যান মানুষের যন্ত্রণা কমাতেই অ্যাসপিরিন আর হেরোইন আবিস্কার করেছিলেন। আমরা যদি হেরোইনকে নেশার কাজে লাগাই, তার দায় আমাদের। ফেলিক্স হফম্যানের নয়। তাই, পৃথিবীর সবচেয়ে বন্দিত ওষুধ  অ্যাসপিরিন ও পৃথিবীর সবচেয়ে নিন্দিত ওষুধ হেরোইন-এর আবিষ্কারক  ফেলিক্স হফম্যান তাঁর মৃত্যুর পরেও অমর হয়ে আছেন।

 

Shares

Comments are closed.