প্রাচীন মিশরের এক রহস্যময় প্রতীক ‘হোরাসের চোখ’

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    মিশরের নীল নদের অববাহিকায় গড়ে উঠেছিল এক প্রাচীন সভ্যতা। যিশুখ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৩১৫০ বছর আগে প্রথম ফারাওয়ের শাসনকালে সভ্যতাটি তার সুসংহত রূপ ধারণ করেছিল। এর পর তিনহাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে এই সভ্যতার বিস্ময়কর উত্থান। খ্রিস্টপূর্ব ৩১ অব্দে রোমানরা মিশর দখল করে এই সভ্যতাকে তাদের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে। শেষ হয় ফারাওদের শাসন।

    এই তিনহাজার বছর ধরে মিশরীয় সভ্যতাকে সুরক্ষা দিয়ে আসছিল এক রহস্যময় চোখ। অন্তত প্রাচীন মিশরীয় পুঁথি তাই বলে। প্রাচীন মিশরীয় শিলালিপি,পুথি, চিত্রকর্ম, পিরামিডের দেয়াল, যুদ্ধের রথ থেকে নৌকা সবেতেই আঁকা থাকত এই রহস্যময় চোখের প্রতীক। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে প্রাচীন মিশরীয়রা বিশ্বাস করত এই রহস্যময় চোখ তাদের সভ্যতাকে সব ধরনের বিপদ থেকে রক্ষা করে।

    সেই চোখ কার!

    প্রাচীন মিশরের পুরান অনুযায়ী পৃথিবী সৃষ্টি হওয়ার পর ঈশ্বর পৃথিবীকে রক্ষা ও শাসন করার জন্য পাঁচজন দেবতা পাঠান। এঁরা হলেন পৃথিবীর দেবতা গেব, আকাশের দেবী নাট ও এঁদের দুই ছেলে দুই মেয়ে। ছেলেদের নাম ওসাইরিস ও সেট। মেয়েদের নাম আইসিস নেফথাইস। মর্তে এসে ওসাইরিসের সঙ্গে আইসিসের বিবাহ হয় এবং সেটের সঙ্গে নেফথাইসের।

    ওসাইরিস

    দেবতা গেব তাঁর প্রথম সন্তান  ওসাইরিসের হাতে পৃথিবীর শাসনভার তুলে দেন। ওসাইরিস তাঁর বিচক্ষণতা দিয়ে সারা পৃথিবী  শাসন করতেন। মিশরের মানুষ তাঁকে খুব ভালোবাসত। ওসাইরিসের ভাই, সেট ছিলেন ভীষণ লোভী ও ক্রুর মানসিকতার। তাঁর লোভ ছিল ওসাইরিসের সিংহাসনের ওপর। সঙ্গীসাথীদের নিয়ে সবসময় ভাবতেন কীভাবে ওসাইরিসকে সিংহাসন থেকে সরানো যায়। কোনও উপায় না দেখে ওসাইরিসকে প্রাণে মারার ছক করলেন।

    ওসাইরিসের দেহের মাপে রত্নখচিত একটি সিন্দুক বানালেন সেট। তারপর একদিন ওসাইরিসকে জানালেন ভোজের আমন্ত্রণ। ভোজে উপস্থিত ছিলেন সেটের বন্ধুরা। সুরাপানের পর সবাই যখন নেশায় আচ্ছন্ন তখন সেট ভোজনকক্ষে নিয়ে আসেন সেই সিন্দুকটি। সিন্দুকটির সৌন্দর্য্যে মোহিত হয়ে যান উপস্থিত সবাই।

    সেট

    সেট সেই ভোজসভায় এক অদ্ভুত ঘোষণা করলেন। সেট বললেন, যিনি এই সিন্দুকের ভেতরে শুতে পারবেন, এই সিন্দুক তাঁর। উপস্থিত সবাই একে একে চেষ্টা করলেন কিন্তু শুতে পারলেন না। কারণ সিন্দুকটি ওসাইরিসের মাপেই তৈরি করা হয়েছিল। সব শেষে ওসাইরিস সিন্দুকে ঢুকে শুয়ে পড়লেন। সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দেওয়া হয় সিন্দুকের দরজা। রাতের অন্ধকারে সিন্দুক নিয়ে রথ ছোটে নীল নদের দিকে। গভীর রাতে নীল নদের মিশকালো জলে নিক্ষেপ করা হয় সিন্দুকটিকে। শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যু হয় ওসাইরিসের।

    দেবী আইসিস

    নীল নদের জলে ভাটার টানে ভেসে চলে ওসাইরিসের কফিন সাগরের পানে। সাগরে পৌঁছানোর আগে সিন্দুকটি আটকে যায় ফোনিসিয়ার কাছে অবস্থিত বাইব্লোসের মাটিতে। একটি বিশাল গাছ সিন্দুকটিকে ঘিরে বাড়তে থাকে। একসময় সিন্দুকটি ঢুকে যায় গাছের গুঁড়ির ভিতর। বাইব্লোসের রাজা মালকান্ডার একদিন তাঁর স্ত্রী আস্টার্টেকে নিয়ে সাগরের তীরে বেড়াতে আসেন। তাঁর গাছটি দেখে খুব পছন্দ হয়। গাছটি কেটে,গুঁড়ির গায়ে নানা কারুকার্য করিয়ে তাঁর রাজসভায় রাখেন।   গুঁড়ির ভেতরে রয়ে যায় সেই সিন্দুক বা ওসাইরিসের কফিন।

    দৈববলে আইসিস জানতে পারেন তাঁর স্বামী আছেন বাইব্লোসের  রাজসভার পিলারের ভেতর। নিজের পরিচয় দিয়ে নিয়ে আসেন সেই পিলার। গুঁড়ি কেটে বের করেন ওসাইরিসের কফিন। সেটের স্ত্রী নেফথাইসের ভরসায় সিন্দুকটি রেখে স্বামীকে বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনীয় জড়িবুটি আনতে যান।

    কোনও ভাবে খবর পেয়ে, সেট এসে ওসাইরিসের দেহ টুকরো টুকরো করে কেটে নীল নদের জলে ও মরুভূমিতে ছড়িয়ে দেন। নেফথাইসের সহায়তায় ওসাইরিসের পুরুষাঙ্গ ছাড়া দেহের প্রায় সবকটি টুকরো খুঁজে পান দেবী আইসিস। টুকরোগুলিকে একত্রিত করে স্বামীর প্রাণ দান করেন আইসিস। ওসাইরিসের দেহের ভেতর জন্ম নেওয়া একটি অঙ্কুরকে নিজের গর্ভে স্থাপন করেন। অঙ্কুরটি থেকে জন্ম নেন শক্তিশালী দেবতা হোরাস

    দেবী আইসিসের কোলে শিশু হোরাস

    জীবন ফিরে পাওয়া পর বিধাতার আদেশে ওসাইরিস পাতালের দেবতা হয়ে সেখানে চলে যান। পৃথিবী শাসন করতে থাকেন  অত্যাচারী সেট। পুত্র হোরাসকে একাই লালনপালন করতে থাকেন আইসিস। বড় হতে হতে হোরাস শোনেন তার পিতার প্রতি কাকা সেটের অত্যাচারের কথা। এবার হোরাস প্রতিশোধ নেবার সুযোগ খুঁজতে থাকেন।

    যুবক হয়ে হোরাস কাকা সেটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। সারা মিশর ছিল হোরাসের পক্ষে। কারণ সেটের অত্যাচার ও অপশাসনে মিশরের মানুষ মৃতপ্রায় হয়ে বাঁচছিল। এর পর দফায় দফায় যুদ্ধ বাঁধে কাকা সেটের সঙ্গে ভাইপো হোরাসের। কখনও জেতেন কাকা সেট, কখনও হোরাস। কিন্তু সত্যের জয় হয়, হোরাসের হাতে নিহত হন সেট।

    পরাজিত হলেন সেট

    কিন্তু মৃত্যুর মুহূর্তে সেটের অস্ত্রের আঘাতে হোরাসের ডান চোখ করোটি থেকে উপড়ে আসে। চোখটি পড়ে মিশরের মাটিতে। সেই দিন থেকে মিশরের সুরক্ষার দায়িত্ব নিয়েছিল হোরাসের চোখ। যদিও পরে হোরাস তাঁর চোখ অলৌকিক ক্ষমতাবলে আবার বসিয়ে নিয়েছিলেন।

    যুদ্ধে জিতে হোরাস হয়ে উঠেছিলেন পৃথিবীর অধীশ্বর (মতান্তরে আকাশের দেবতা)। বাজপাখির ছবি দিয়ে প্রাচীন মিশরে তাঁর রূপ প্রকাশ করা হত। কারণ তিনি ছিলেন বাজের মতোই দুর্দমনীয় ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বাজপাখির রূপ ধরে সবার অলক্ষে আকাশ থেকে মিশরের ওপর নজরদারি চালাতেন।

    হোরাস

    হোরাসের চোখে রয়েছে অলৌকিক ক্ষমতা।

    প্রাচীন মিশরীয় লিপি থেকে জানা যায়, হোরাসের চোখ মাটিতে পড়ে ছয় টুকরো হয়ে গিয়েছিল। ছ’টি টুকরোর প্রত্যেকটি টুকরো মিশরের প্রত্যেকটি মানুষের এক একটি ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। সেগুলি হল গন্ধ, দৃষ্টি, চিন্তা, শ্রবণ, স্বাদ ও স্পর্শ। প্রাচীন মিশরের মানুষরা তাই তাঁদের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার জন্য হোরাসের চোখের প্রতীক ব্যবহার করতেন।

    হোরাসের চোখের সেই রহস্যময় প্রতীক

    যেহেতু অলৌকিক ক্ষমতার মাধ্যমে হোরাসের সেই চোখটি ফিরিয়ে আনা হয়েছিল, তাই প্রাচীন মিশরবাসীরা বিশ্বাস করতেন হোরাসের চোখের নানারকম অলৌকিক ক্ষমতা রয়েছে। আর এই বিশ্বাস থেকেই হোরাসের চোখের প্রতীকটি প্রাচীন মিশরের মানুষদের কাছে রক্ষাকবচ হয়ে ওঠে। প্রাচীন মিশরীয়রা মণিমানিক্যখচিত কবচে হোরাসের চোখ খোদাই করিয়ে  গলায় পরে থাকতেন। এমনকি মৃত মানুষের কফিনের ওপরও হোরাসের চোখ আঁকা হতো, তাঁর পারলৌকিক সুরক্ষার জন্য।

    মিশরের বাইরেও প্রভাব ফেলেছে হোরাসের চোখ।

    সুপ্রাচীন কাল থেকে আফ্রিকা ও  ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলোতে জেলেরা প্রায়ই তাদের নৌকা ও জাহাজের গায়ে হোরাসের চোখের প্রতীক এঁকে থাকেন। সামুদ্রিক দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার আশায় এই প্রথা চলে আসছে হাজার হাজার বছর ধরে। কাকতালীয় হলেও ভারত ও বাংলাদেশের যে সব মৎস্যজীবী সমুদ্রে মাছ ধরতে যান তাঁদের নৌকা ও ট্রলারের গায়েও আঁকা থাকে চোখ।

    জেলে নৌকার গায়ে আঁকা চোখের প্রতীক

    তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হল রহস্যময় সংগঠন ‘ইলুমিনাতি’-র সবচেয়ে বিখ্যাত লোগোটিতে হোরাসের চোখ ব্যবহার করা হয়েছে। ইলুমিনাতি হল, ১৭৭৬ সালের ১ মে, জার্মানির বাভেরিয়াতে তৈরি হওয়া এক গুপ্তসংগঠন। এই সংস্থার সদস্যদের মধ্যে আছেন বিশ্বের কিছু ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক নেতা, শিল্পপতি, ব্যাংকার ও মিডিয়া ব্যারন। তাঁরা কারা তা কেউ জানেন না।

    ষড়যন্ত্র -তত্ত্বে বিশ্বাসীরা ( conspiracy theorist) বিশ্বাস করেন ‘ইলুমিনাতি’ বিশ্বের সব দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে পৃথিবীতে যা কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে, ঘটছে বা ঘটবে তার পিছনে নাকি ছিল ও থাকবে ইলুমিনাতির ইশারা। এহেন ভয়ানক সংগঠনের প্রতীক হোরাসের চোখের অবিকল প্রতিরূপ! 

    ইলুমিনাতি সংগঠনের একটি লোগোতে হোরাসের চোখ

    ইলুমিনাতির মতো ষড়যন্ত্রকারী সংগঠনের হাতে পড়ে পৃথিবীর মানুষকে বিপদে ফেলবে নাকি হোরাসের চোখ! ভবিষ্যতই দেবে এর উত্তর। বাজপাখির দৃষ্টি নিয়ে হোরাসের চোখ যেভাবে তিনহাজার বছর ধরে বাঁচিয়ে রেখেছিল মিশরীয় সভ্যতা। তেমনই নিপুণভাবে ধ্বংস করেও দিয়েছিল ফারাওদের অনাচার দেখে।

    নিচের ছবিতে ক্লিক করুন, দ্য ওয়ালের পুজো ম্যাগাজিন পড়ুন বিনামুল্যে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More