শুক্রবার, ডিসেম্বর ১৪

শতবর্ষে কলাভবন

একরাম আলি

বিশ্বভারতীর কলাভবন বিভাগটি এবার একশো বছর পূর্ণ করল। এত-এত বছর পেরিয়ে আসার পরও কারো মনে হতেই পারে, নানা বিভাগে বিস্তৃত কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা মাত্র বিভাগ নিয়ে এত আদিখ্যেতা কীসের?

তাহলে আর-একটু বলতে হয়। সংক্ষেপে একটু পুরোনো কথা।

প্রকাণ্ড আর রুক্ষ এক তেপান্তরে দুটো মাত্র ছাতিমগাছ। মতান্তরে একটা। কতটুকুই-বা ছায়া দিতে পারে! কাছে-দূরে কিছু আগাছা অবশ্য ছিল। সেসবের ছায়া মানুষ পায় না। সেইসব নীচু ছায়া পোকামাকড়ের আশ্রয়। এমনই পুরুষালি নির্জনতায় নিজের মুখোমুখি হতে চেয়েছিলেন একজন। তিনি, অর্থাৎ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর চাওয়া এতই আন্তরিক ছিল, রায়পুরের সিংহ-পরিবারের কুড়ি বিঘে জমি মৌরসী পাট্টা নিয়ে (১৮ ফাল্গুন ১২৬৯ সাল) ক্রমে আশ্রমও বানিয়ে ফেলেছিলেন। নাম দিয়েছিলেন শান্তিনিকেতন। বয়স তখন সবে পঁয়তাল্লিশ পেরোচ্ছে। আর, ঊষর জমিটি নেওয়ার সময় তাঁর কনিষ্ঠতম পুত্রটির বয়স মাত্র এক বছর।

ষোলো বছর পর সেই আশ্রমের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা হয়। ততদিনে বিস্তর চেষ্টা করে গাছপালা লাগানো হয়েছে এবং জায়গাটি ছায়াঘনও হয়ে উঠেছে।

যে-স্থানটি নির্জনে ব্রহ্মোপাসনার উদ্দেশ্যে গড়ে উঠেছিল, জমি কেনার ঊনচল্লিশ বছর পর ১৯০১ সালে সেই আশ্রমই অন্য উপাসনার ক্ষেত্ররূপে নির্বাচিত হল সেই শিশুপুত্রটির দ্বারা। কী? না স্কুল করবেন। ততদিনে তিনি চল্লিশ বছরের পরিণত যুবক। পুত্রকন্যার জনক। বিখ্যাত কবি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

স্কুল-পালানো, স্বশিক্ষিত একজন বাবা কেমন শিক্ষাব্যবস্থা চান ছেলেমেয়েদের জন্যে? এ প্রসঙ্গে প্রথম মুখ খোলেন তিনি ১৮৯২ সালের ২৬ নভেম্বর, রাজশাহি অ্যাসোসিয়েশনের এক সভায়, রাজশাহি কলেজে। পুত্র রথীন্দ্রনাথের বয়স তখন চার বছর। সেই ভাষণটিই ‘শিক্ষার হেরফের’ নামে ‘সাধনা’ পত্রিকায় ছাপা হয়। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তার সেই সূত্রপাত। কী বলছেন তিনি সে-ভাষণে? বহুবার পঠিত। তবু একবার দেখি:

‘আমাদের দেহ সাড়ে তিন হাতের মধ্যে বদ্ধ, কিন্তু তাই বলিয়া ঠিক সেই সাড়ে তিন হাত পরিমাণ গৃহ নির্মাণ করিলে চলে না। স্বাধীন চলাফেরার জন্য অনেকখানি স্থান রাখা আবশ্যক, নতুবা আমাদের স্বাস্থ্য এবং আনন্দের ব্যাঘাত হয়। শিক্ষা সম্বন্ধেও এই কথা খাটে। যতটুকু কেবলমাত্র শিক্ষা অর্থাৎ অত্যাবশ্যক তাহারই মধ্যে শিশুদিগকে একান্ত নিবদ্ধ রাখিলে কখনোই তাহাদের মন যথেষ্ট পরিমাণে বাড়িতে পারে না। অত্যাবশ্যক শিক্ষার সহিত স্বাধীন পাঠ না মিশাইলে ছেলে ভালো করিয়া মানুষ হইতে পারে না— বয়ঃপ্রাপ্ত হইলেও বুদ্ধিবৃত্তি সম্বন্ধে সে অনেকটা পরিমাণে বালক থাকিয়াই যায়।’

‘স্বাধীন পাঠ’—এই কথাটাকে আমরা একটু দেখব।

শুরু করি গতমাসের একটা শান্তিনিকেতন-অভিজ্ঞতা দিয়ে। বিকেল পাঁচটা বাজে। রবীন্দ্রভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আচমকা নিজেকে গাইড পরিচয় দিয়ে একজন জানতে চাইলেন, আমি তাঁর সাহায্য চাই কিনা। সোমনাথ নামের সেই তিনি তাহলে ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেবেন সবটা। কথায় কথায় জানা গেল, তিনিও বিশ্বভারতীর ছাত্র ছিলেন। জুয়োলজি নিয়ে পড়া শুরু করলেও শেষ করতে পারেননি। ওই যে, ছবি আঁকার দিকে নেশা ছিল! প্র্যাক্টিক্যাল খাতায় পরিচ্ছন্ন ছবি দেখে মাস্টারমশাই পরামর্শ দেন কলাভবনে যেতে। ওটাই নাকি তাঁর ঠিক জায়গা। কিন্তু, সেই পরিখা আর টপকানো হয়নি সোমনাথের। কী করে হবে, নানা নিয়মকানুনের ফাঁসে আটকে গিয়ে সেই মুক্ত শান্তিনিকেতন তো আর নেই। নেই তার স্বপ্নদ্রষ্টা মানুষটিও। ফলে, কোনো শিক্ষাই সোমনাথের সামনে উন্মুক্ত হল না বটে, তবু কোন অজানা গিঁটে তিনি শান্তিনিকেতনেই বাঁধা পড়ে গেলেন। বেছে নিলেন অপটু গাইডের জীবন।

শিক্ষার মুক্ত ব্যবস্থার দিকে রবীন্দ্রনাথের চিন্তা বরাবরই ধেয়ে গেছে। কোন পথে এবং কীভাবে সেই মুক্তি আসবে, তার নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা তিনি করেছেন সারা জীবন। তাঁর মাথায় ছিল বিদ্যাচর্চা আর জীবনচর্চা একেবারে জড়িয়ে।

ব্রহ্ম বিদ্যালয়ে শুরুর দিকে কোনো ধরাবাঁধা পাঠক্রমও ছিল না। ছিল না পরীক্ষা-পাশের পড়াও। বাংলা ইংরেজি সংস্কৃত ভাষা শিক্ষার সঙ্গে বিজ্ঞান ভূগোল ইতিহাস শিক্ষা যেমন ছিল, তেমনই ছিল

নাচ গান অভিনয় আঁকা শেখার ব্যবস্থা। এ-সব কিছুর মধ্যে বড়ো শিক্ষা ছিল প্রকৃতির রূপ রস গন্ধ আর ভাবের সঙ্গে পড়ুয়াদের প্রত্যক্ষ পরিচয়লাভ।

‘শিক্ষার হেরফের’-এ তিনি লিখছেন:

‘পৃথিবীর পুস্তকসাধারণকে পাঠ্যপুস্তক এবং অপাঠ্যপুস্তক, প্রধানত এই দুই ভাগে বিভক্ত করা যাইতে পারে। টেক্সট বুক কমিটি হইতে যে-সকল গ্রন্থ নির্বাচিত হয় তাহাকে শেষোক্ত শ্রেণীতে গণ্য করিলে অন্যায় বিচার করা হয় না।’

এতেই না-থেমে বলছেন, “আখমাড়া কলের মধ্য দিয়া যে-সকল ইক্ষুদণ্ড বাহির হইয়া আসে তাহাতে কেহ রসের প্রত্যাশা করে না; ’সুকুমারমতি’ হীনবুদ্ধি শিশুরাও নহে।”

ফলে, আদিগন্ত প্রান্তর খোয়াই ক্ষীণস্রোতা নদী জঙ্গল আর মাঠঘাট-সমৃদ্ধ প্রকৃতিই ছিল মূল পাঠ্যপুস্তক।

এরই মাঝে ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠা হল কলাভবনের। যেদিন ঘোষণা হয়, সবার কাছে খবরটিও পৌঁছোয়নি। একটি ছাত্র (বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়) একদিন বই-খাতা নিয়ে গুটিগুটি ক্লাসে যাচ্ছেন, শালতলায় আরেক ছাত্র (ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ দেববর্মন) জানালেন, ‘গুরুদেব কলাভবন খুলেছেন। আমরা যারা ছবি আঁকতে চাই, সেখানে যেতে পারি। আমি চলে গেছি। তুমিও চল।’ ব্যস! তৎক্ষণাৎ একেবারে বাক্সবিছানা-সমেত দু-জনে হাজির। একটা ঘরে জায়গা হল দু-জনের। চোখের সমস্যা বিনোদবিহারীর। এমন ছাত্রকে নিতে মৃদু আপত্তি ছিল নন্দলালের। একদিন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং উপস্থিত। আপত্তির কারণ শুনে নন্দলাল বসুকে বললেন, ‘ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা কোরো না। সকলকে নিজের নিজের পথ খুঁজে নিতে দাও।’

আর, নন্দলাল বসু। প্রথম অধ্যক্ষ অসিতকুমার হালদার অল্পদিন পরে চলে যাওয়ার পর সেই যে এলেন তিনি, অবসরের পরও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রয়ে গেলেন ‘মাস্টারমশাই’ হয়ে। গোটা আশ্রম আর তার আশপাশের মাঠঘাট গ্রাম নদী জঙ্গল— সবটাই তাঁর ক্লাসঘর। শুধু সেটুকুই কেন, গোটা দেশ। ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে কোথায় যাননি! লেগেই থাকত চড়ুইভাতি, পিকনিক, এক্সকার্সন। দূরে গেলে থাকার জন্যে ব্যবস্থা ছিল নিজেদের তাঁবুর। রান্নার বাসনপত্র সঙ্গেই থাকত। সারা দিন ঘোরা, ছবি আঁকা, রান্না-খাওয়া, আর রাতে তাঁবুর সামনে লগ ফায়ার। গানের পর গান। ছেলেমেয়ে একসঙ্গে। তবু এতটুকু পা পিছলে যায়নি। একবার মুঙ্গেরের দিকে গভীর জঙ্গলে দল নিয়ে ঘুরতে গেছেন নন্দলাল, সে-বার আলাদা এক দলে রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে এল্মহার্স্ট। ঘুরতে ঘুরতে এসে সব দেখে এল্মহার্স্ট বিস্মিত– এত হইচই, ছবি আঁকা, এত মুক্তি, এত শৃঙ্খলা!

মুক্তির মধ্যে যে-শৃঙ্খলা, সেটা অর্জন করবার শিক্ষা অঙ্গীভূত হয়েই ছিল তখনকার শান্তিনিকেতনের জীবনচর্চায়। আর এমনই পরিবেশে গোটা দেশ থেকে শিক্ষার্থী আর শিক্ষক এসে মিলে গেছে। বিদেশ থেকেও। স্টেলা ক্রামরিশ যখন আসেন, তাঁর ক্লাসে রবীন্দ্রনাথও হাজির থাকতেন ছাত্রের মতো।

কত-কত ছাত্র পরে বিখ্যাত হয়েছেন, দেশজোড়া নাম হয়েছে তাঁদের, দেশের বাইরেও ছড়িয়ে গেছে নাম। তবু, সে-আর ক-টা! বিশ-পঁচিশটা? পঞ্চাশটা নাম? একশো বছরে অজস্র শিক্ষার্থী কলাভবনে এসেছেন। আঁকা বা ভাস্কর্য শিখে বিখ্যাত চিত্রকর বা ভাস্কর হলে ভালো। না-হতে পারলেও তাঁদের তো স্পর্শ করল সৃষ্টির অভাবনীয় আনন্দ, তার স্বর্ণালি রেণুগুলি— এই বোধ যদি জাগ্রত হয় বাদবাকি অগণিত অখ্যাত ছাত্রছাত্রীর, তবেই সার্থক কলাভবনের শতবর্ষ আয়ু, সার্থক রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তা। প্রতিষ্ঠালগ্নে বিশ্বভারতীর উদ্দেশ্য সম্বন্ধে তিনি বলেছিলেন–

‘জীবিকার লক্ষ্য শুধু কেবল অভাবকে নিয়ে, প্রয়োজনকে নিয়ে; কিন্তু জীবনের লক্ষ্য পরিপূর্ণতাকে নিয়ে– সকল প্রয়োজনের উপরে সে। এই পরিপূর্ণতার আদর্শ সম্বন্ধে য়ুরোপের সঙ্গে আমাদের মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু কোনো একটা আদর্শ আছে যা কেবল পেট ভরাবার না, টাকা করবার না, এ কথা যদি না মানি, তা হলে নিতান্ত ছোটো হয়ে যাই।’

জীবনের সেই পূর্ণতারই সন্ধানে শান্তিনিকেতন আর শ্রীনিকেতনের বহু শ্রমসাধ্য প্রতিষ্ঠা। বহু সাধনার ফল। কলাভবন সেই সাধনারই একটি গর্বিত অংশ।

Shares

Comments are closed.