মিশরের বুকে গত এক দশকের শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার, পাওয়া গেল রাজপুরোহিতের স্মৃতিসৌধ

খননক্ষেত্র থেকে প্রত্নতাত্ত্বিকরা প্রচুর বেড়াল ও গুবরেপোকার মমি আবিষ্কার করেছেন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    কায়রোর কাছেই মরুভূমি অঞ্চল সাক্করার বালির নিচে পাওয়া গিয়েছিলএক রাজকীয় সমাধিক্ষেত্র। ২০১৮ সালের এপ্রিল মাস থেকে সাক্কারায় খনন কার্য চালিয়ে আসছিলেন একদল মিশরীয় প্রত্নতাত্ত্বিক। নেতৃত্বে ছিলেন বিখ্যাত গবেষক ও প্রত্নতাত্ত্বিক এল-এনানি। ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে, প্রত্নতাত্ত্বিকরা আবিষ্কার করেছিলেন ৪৫০০ বছরের পুরোনো একটি সমাধি ক্ষেত্র। অনুমান করা হচ্ছে,সেটি হয়ত প্রাচীন মিশরীয় শহর মেমফিসেরর রাজকর্মচারীদের সমাধি ক্ষেত্র। প্রত্নতাত্ত্বিকরা বলছেন সমাধি ক্ষেত্রটি  মিশরীয় সভ্যতার পঞ্চম রাজপরিবারের আমলের।

    সাক্কারার বালির নিচে পাওয়া গেল ৪৫০০ বছরের পুরানো সমাধি ক্ষেত্র।
    পাওয়া গিয়েছিল বেড়াল আর গুবরে পোকার মমি

    ২০১৮ সালের ১০ নভেম্বর, মিশরের পুরাতত্ত্ব মন্ত্রক জানিয়েছিল এই প্রত্নতাত্বিক খননক্ষেত্র থেকে প্রত্নতাত্ত্বিকরা প্রায় ডজন খানেক বেড়ালের মমি আবিষ্কার করেছেন। একটি চুনাপাথরের কফিনে বেড়ালগুলির মমি রাখা ছিল। এছাড়াও তাঁরা আবিষ্কার করেছিলেন, ১০০ টির বেশী কাঠের বেড়ালের মূর্তি, বেড়ালের দেবতা বাসলেতের একটি ব্রোঞ্জ নির্মিত মূর্তি, সোনার পাতে মোড়া সিংহ, গরু, ঈগল, কাঠের সাপ, কুমিরের মূর্তি, শতাধিক চকচকে পাত্র, তাবিজ কবজ ও পবিত্র চিহ্ন সম্বলিত ফলক।

    পাওয়া গেল বেড়ালের মমি, সেগুলি প্রায় ৪৫০০ বছর পুরানো।

    ওই স্মৃতিসৌধেই আর একটা ছোট কফিনে পাওয়া গিয়েছিল গুবরেপোকার মমির বিপুল সম্ভার। প্রাচীন মিশরে গুবরেপোকা ছিল অতি পবিত্র প্রাণী। সৌভাগ্যের জন্য প্রাচীন মিশরে গুবরেপোকাকে মেরে তাবিজ ও লকেট করে পরার রেওয়াজ ছিল। গুবরেপোকার মমিগুলির মধ্যে দুটি গুবরেপোকা ছিল অতিকায় এবং লিনেনে জড়ানো।

    কায়রোর প্রফেসর সালিমা খান বলেছিলেন, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। মিশরীয় স্মৃতিসৌধগুলিতে জীবজন্তুদের মমি পাওয়া মামুলি ঘটনা। তবে এতগুলি বেড়ালের মমি একসঙ্গে আজ অবধি মিশরে পাওয়া যায়নি। মিশরের পুরাতত্ত্ব বিভাগের জেনারেল সেক্রেটারি, মোস্তাফা ওয়াজিরি বলেছিলেন “ গুবরেপোকার মমি সত্যিই নতুন আবিষ্কার। মিশরে এর আগে গুবরেপোকার মমি আবিষ্কৃত হয়নি।

    মিলেছিল গুবরে পোকার মমিও।
    পাওয়া গিয়েছে রাজ পুরোহিতের স্মৃতিসৌধ

    মিশরে প্রথম মিলেছিল কোনও রাজ পুরোহিতের সমাধি। সেটি ছিল মিশরের ফারাওদের প্রধান পুরোহিতের সমাধি। স্মৃতিসৌধের দরজার ওপর খোদাই করা মিশরীয় হায়ারোগ্লিফিক বা মিশরীয় চিত্রলিপি দেখে জানা গিয়েছিল মানুষটির নাম ওহাতিয়ে। খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০-২৩৫০ সময়কাল ধরে মিশরে রাজত্ব করেছিলেন পঞ্চম রাজবংশ। সেই রাজবংশের ফারাও নেফেরিরকার-এর পুরোহিত ছিলেন এই ওহাতিয়ে। লিপিতে লেখা ছিল তাঁর বিশাল উপাধি। যেমন ওহাতিয়ে ছিলেন রাজকীয় শুদ্ধিকরণ পুরোহিত, রাজকীয় কর্মকর্তা, রাজকীয় নৌকোর পরিদর্শক ইত্যাদি ইত্যাদি।

    মিশরে এই প্রথম পাওয়া গিয়েছিল রাজপুরোহিতের সমাধি

    স্মৃতিসৌধটির ভেতরে, বড়সড় একটি গ্যালারি পাওয়া গিয়েছিল। যার ভেতর পাওয়া গিয়েছিল চোখ ধাঁধানো উজ্বল রঙে আঁকা প্রচুর দেওয়াল চিত্র। ছবি গুলির মধ্যে ছিল ওহাতিয়ের মা, স্ত্রী ও অনান্য আত্মীয়ের ছবি। দেওয়ালের গায়ে আঁকা ছিল যন্ত্রসঙ্গীত পরিবেশনের ছবি। দেওয়াল চিত্রে উঠে এসেছিল সেই সময়কার দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ছবিও। যেমন, কী করে সুরা তৈরি হত, কী করে পাত্র তৈরি হত, এমনকি মমির সঙ্গে যে সব আসবাবপত্র দেওয়া হবে তার প্রস্তুতি পর্বের ছবিও।

    রাজপুরোহিতের সমাধির ভিতরে পাওয়া গেল আস্ত একটা আর্ট গ্যালারি।

    রাজপুরোহিত ওহাতিয়ের স্মৃতিসৌধটির ভিতরে পাওয়া গিয়েছিল, ৫০টির মতো রঙিন পাথর দিয়ে তৈরি অতিকায় মূর্তি। যেগুলির মধ্যে আছে পুরোহিত ও তাঁর পরিবারবর্গের মূর্তি এবং একজন অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তির মূর্তি। মিশরের পুরাতত্ত্ব বিভাগের পক্ষ থেকে মোস্তাফা ওয়াজিরি জানিয়েছিলেন, ” এটি গত এক দশকের শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার। এর আগে রাজ পুরোহিতের সমাধি মিশরে পাওয়া যায়নি। এই সমাধি আমাদের মিশরীয় সভ্যতার অতুলনীয় প্রাচুর্য্যের স্বরুপ প্রকাশ করছে।আমরা চাই বিশ্ব এগুলি জানুক”।

    ৪৫০০ বছর পর খোলা হল ফারাও নেফেরিরকার-এর পুরোহিত ওহাতিয়ের সমাধির দরজা।

    প্রত্নতাত্ত্বিক দলের প্রধান এল-এনানি জানিয়েছেন, “২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে বেড়ালের মমি ও ২০১৯ সালের শেষদিকে পুরোহিতের সমাধি আবিস্কৃত হয়েছে। কিন্তু আরও কিছু সময় লাগবে পুরো তথ্য পেতে। ২০২০ সালে স্মৃতিসৌধটির ভিতর আমরা পাঁচটি পৃথক সুড়ঙ্গ পেয়েছি। এর মধ্যে মাত্র একটি খোলা হয়েছে। অন‍্য চারটি এখনও বন্ধ অবস্থায় আছে।

    তিনি নিশ্চিত, এর মধ্যে একটি সুড়ঙ্গ প্রত্নতাত্ত্বিকদের দলটিকে  নিয়ে যাবে হয় সারকোফেগাসের (কফিন) দিকে। সেখানেই শুয়ে আছেন এই স্মৃতিসৌধের মালিক রাজপুরোহিত ওহাতিয়ে”। ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই ৪৫০০ বছর পর আলোর মুখ দেখবে রাজপুরোহিতের মমি। কিন্তু অতদিন অপেক্ষা করতে রাজি নন উৎসাহী পর্যটকরা। আপাতত বেড়াল, গুবরেপোকার মমি আর পুরোহিতের সমাধি দেখতে পর্যটকদের ঢল নেমেছে মিশরে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More