গ্যালিভারদের সমাজে লিলিপুট হয়ে বাঁচার লড়াই লড়ছে চৌহান পরিবার

হায়দ্রাবাদের চৌহান পরিবারের ১১ সদস্যের মধ্যে ৯ জনই বামন। একসময় পরিবারের ২১ সদস্যের মধ্যে ১৮ জনই ছিলেন বামন।

২৮১

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রূপাঞ্জন গোস্বামী

একই বাড়িতে থাকেন তাঁরা। সংখ্যায় ১১ জন। কিন্তু এঁদের মধ্যে ৯ জন দরজা দিয়ে বাইরে বার হলেই, হেসে ওঠে সুসভ্য সমাজ। কারণ তাঁরা বামন। হায়দ্রাবাদের চৌহান পরিবারের ১১ সদস্যের মধ্যে ৯ জনই বামন। একই পরিবারে এত সদস্য বামন হওয়া খুবই বিরল।

একসময় পরিবারের ২১ সদস্যের মধ্যে ১৮ জনই ছিলেন বামন। প্রায় এক শতাব্দী ধরে জীবনের সর্বক্ষেত্রে এবং সর্বস্তরে উপহাস আর বঞ্চনার বোঝা টানতে টানতে চলেছে এই পরিবার। তবুও ভেঙে পড়েনি। চালিয়ে যাচ্ছে গ্যালিভারদের সমাজে লিলিপুট হয়ে টিকে থাকার লড়াই।

চৌহান পরিবার

হায়দ্রাবাদের চৌহান পরিবারের মানুষগুলি  Achondroplasia নামে এক জিনগত ত্রুটির শিকার। ফলে চৌহান পরিবারের সদস্যদের গড় উচ্চতা মাত্র তিনফুট। পরিবারের সদস্যদের জিনে থাকা এই ত্রুটির ফলে পরিবারের সদস্যদের হাত-পা ছোট ছোট হয়, কিন্তু বাকি দেহ স্বাভাবিক আকারেরই থাকে। কিন্তু ছোট পায়ের জন্য তাঁদের উচ্চতা কম হয়। ফলে সমাজের অন্য সব খর্বকায় মানুষের মতই তাঁদেরও ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপ সইতে হয়। কিন্তু একটি বিষয়ে তাঁরা গর্বিত তাঁদের চৌহান পরিবারই ভারতের সর্ববৃহৎ বামন পরিবার।

“যখন আমরা বাইরে যাই, মানুষ আমাদের ঘিরে ধরে এবং অদ্ভুত প্রশ্ন করে, কেন তোমরা বেঁটে, তোমরা কোথায় থাকো! সবাই আমাদের খেপায়। আমরা কি ইচ্ছা করে বামন হয়ে জন্মেছি!’ চোখ ছলছল করে ওঠে পরিবারের কর্তা ৫২ বছর বয়েসী রামরাজ চৌহানের।

বাড়ির দরজায় রাম রাজ চৌহান

রামরাজ বিয়েবাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে অতিথিদের স্বাগত জানানোর কাজ করেন। সবাই তাঁকে দেখে হাসতে হাসতে বিয়ে বাড়িতে ঢোকেন। কেউ মস্করা করে মাথায় চাঁটিও মারেন। গোঁফ ধরে টানেন। রামের যখন বিয়েবাড়ির কাজ থাকে না, তিনি তখন আত্মীয়র মুদির দোকান সামলান।রামরাজেরা সাত বোন ও চার ভাই। এঁদের মধ্যে ৮ জনই বামন। এঁদের মধ্যে অনেকেই আজ জীবিত নেই l

রামরাজ জানিয়েছিলেন, “একটা বয়েসের পরে আমাদের পা দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন চলতে অপরের সাহায্য লাগে। আমার ছোট ভাই আর দুই বোন এখন হাঁটতেই পারে না। আমার এখনই হাঁটতে কষ্ট হয়। ছোটো পা দুটো আমার ভারী শরীরের ভার আর নিতে পারছে না। আমি আমার বাবা ও ঠাকুরদাকেও একই সমস্যায় ভুগতে দেখেছি।” রামরাজের স্ত্রী’র উচ্চতা স্বাভাবিক ছিলো। তিনি মারা গিয়েছেন, ১৯৯৩ সালে তৃতীয় সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে। ফলে রামকে একাই দুই মেয়েকে মানুষ করতে হয়েছে।

চৌহান পরিবারের সদস্যরা বেশিদূর পড়াশুনা করতে পারেন না। স্কুলে, কোচিং-এ সহপাঠী ও শিক্ষকরা উত্যক্ত করেন, উপহাস করেন। তাই তাঁরা স্কুলে যান না। কিন্তু রামরাজের মেয়ে এত বাধা সত্বেও গ্র্যাজুয়েট হয়েছেন। রামরাজ জানেন, পড়াশুনা করলেও এই সমাজ তাঁদের মতো বামনদের চাকরি দেবে না।

রামরাজের কথায়, “জানেন, আমাদের চাকরি পেতে কত জনের পা ধরতে হয়েছে। কেউ আমাকে চাকরি দিতে চাননি। কারণ, সবার এক কথা ছিল, চাকরি না হয় দিলাম, কিন্তু কাজটা সামলাবে কীভাবে? কেউ জানতে চাইলেন  না, আমি আমার দৈনন্দিন জীবনের সব কাজগুলি নিঁখুত ভাবে করি কীভাবে।

চৌহান পরিবারের পুরুষদের তবুও অস্থায়ী কাজ জুটে যায়, কিন্তু চৌহান পরিবারের মহিলাদের জীবন অভিশপ্ত। তাঁদের না দিচ্ছেন কেউ চাকরি, না করছেন কেউ বিয়ে। রামরাজের বড় মেয়ে অম্বিকা অ্যাকাউন্ট্যান্টের কাজ করতে চান, কিন্তু তাঁর উচ্চতাই সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চাকরি খুঁজতে গেলে তাঁকে শুনতে হয়, ‘তোমার জন্য আলাদা চেয়ার টেবিল বানাতে দিতে হবে’, ‘অফিসের হাসাহাসি শুরু হবে, কাজের পরিবেশ নষ্ট হবে’। রাম জানিয়েছেন তাঁর ছোটো ভাই টেলিফোন বুথে কাজ করেন, তাঁর বৌদির টেলারিং-এর দোকান আছে, এভাবেই সবাই মিলে জোড়াতালি দিয়ে সংসার চালিয়ে নেন।

বাড়ির খাট-বিছানা-আলমারি থেকে স্টোভ পর্যন্ত নিজেদের উচ্চতার সঙ্গে মানানসই করে বানিয়ে নিয়েছেন রামরাজেরা। হাল ছাড়েননি। চৌহান পরিবারের সদস্যরা তাঁদের বামনত্বের জন্য ভগবানকে দোষ দেন না। কারণ রামরাজের বাবা বলে গিয়েছিলেন, ভগবান শ্রী বিষ্ণুও বামন অবতার রূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তাই বামনত্বের জন্য কষ্ট না পেতে।

আত্মীয়ের দোকানে বসে ক্রেতাকে জিনিস দিতে দিতে হেসে ফেললেন রামরাজ, “সত্যি কষ্ট পাই না। কত মানুষ আমাদের দেখে হাসেন, ঠাট্টা, ইয়ার্কি, ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপ করেন। ভাবি অনেকের মনে কত দুঃখ কষ্ট থাকে, তাঁরাও তো আমাদের দেখে মজা পেয়ে হাসেন। এটাও ভগবানের ইচ্ছা। আমরা তাঁদের কষ্ট দুর করতে পারছি এক মিনিটের জন্য হলেও।

রামরাজ তাঁর দুই মেয়েকে সবসময় বলেন, সমাজ তোমাদের কিছু দিক বা না দিক, লোক তোমাদের দেখে আনন্দ পাচ্ছে, তাদের দুঃখ কিছু সময়ের জন্য ভুলে যাচ্ছে। এটা ভাবতে পারলেই দেখবে ভগবান তোমাদের সঙ্গে সঙ্গে চলবেন।” আশার আলোয় সহসা চোখের মণি দুটো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তিনফুট তিন ইঞ্চির রামরাজ চৌহানের।

চার্লি চ্যাপলিন একবার বলেছিলেন, আমি বৃষ্টির মধ্যে কাঁদি। যাতে আমার চোখের জল কেউ দেখতে না পান। কারণ দর্শকরা ভাবেন আমার দুঃখ নেই। আমি চির-আনন্দের দেশে থাকি। আমি চাই না ওঁদের এই ভুল ভাঙুক, তাহলে ওঁরা কষ্ট পাবেন। হ্যাঁ, অন্যের মুখে হাসি ফুটিয়ে, চোখে জল না এনে, কাঁদতে পারেন রামরাজেরা। কারণ সমাজ তাঁদের সম্মান দেয়নি, চাকরি দেয়নি, তেমনই দেয়নি চোখে জল আনার অধিকারও।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More