রবিবার, অক্টোবর ২০

অনশন চালিয়ে তিলে তিলে স্বেচ্ছামৃত্যু ধর্ষিতা কিশোরীর, বাধা দেয়নি ডাচ সরকারও, ক্ষোভে উত্তাল বিশ্ব

রূপাঞ্জন গোস্বামী

 ১৭ বছরের ডাচ কিশোরী অবশেষে তার বহু কাঙ্খিত মৃত্যুকে ছুঁতে পারল। গত কয়েকবছর ধরেই সে ডাচ সরকারকে লাগাতার স্বেচ্ছামৃত্যুর (euthanasia) অধিকার দেওয়ার জন্য আবেদন করে যাচ্ছিল। কিন্তু সরকার তা প্রত্যাখ্যান করে। অবশেষে গত রবিবার নিজের বাড়িতেই মারা গেল দীর্ঘদিন ধরে চূড়ান্ত হতাশা ও নিদ্রাহীনতায় ভুগতে থাকা কিশোরী নোয়া পোথোভেন। ডাচ সরকার নোয়ার নিজের পছন্দ করে নেওয়া স্বেচ্ছামৃত্যু পদ্ধতিতে বাধা দেয়নি। যা নিয়ে সারা বিশ্ব জুড়ে উঠেছে তুমুল বিতর্কের ঝড়।

সরকার অনুমোদিত স্বেচ্ছামৃত্যু চাওয়া নোয়ার আবেদন ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে খারিজ হয়ে যায়।সরকার অনুমোদিত যে ক্লিনিকে নোয়া স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন জানায়, সেই ক্লিনিক নোয়ার আবেদন খারিজ করে বয়স কম থাকার কারণ দেখিয়ে।

চলে যাওয়ার কথা নোয়া জানিয়েছিল ইনস্টাগ্রামে

হল্যান্ডের আর্নহেমের নোয়া পোথোভেন, তার ইনস্টাগ্রাম পোস্টে ব্যাখ্যা করেছিল, কেন সে অনশনকেই তার স্বেচ্ছা মৃত্যুর পথ হিসেবে বেছে নিয়েছিল। সে জানায়, বাঁচার জন্য লড়াই করছিল, কিন্তু বাল্যকালে ধর্ষিতা হওয়ার চরম হতাশা আর আত্মগ্লানি থেকে বেরিয়ে আসা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। ২০১৪ সালে দুই ব্যক্তি কিশোরী নোয়াকে ধর্ষণ করে, তার পর থেকেই নোয়া চলে যায় চরম হতাশার অন্ধকারে। কিছুতেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি সে, যদিও প্রচুর চেষ্টা করেছিল মৃত্যুর আগে।

“বছরের পর বছর লড়াই করে গেছি, অবশেষে ফুরিয়ে গেছি আমি। আর একটু পর থেকে আমি খাওয়া বন্ধ করে দিচ্ছি । অনেক আলোচনা ও অনেক মূল্যায়নের পর সিদ্ধান্ত নিলাম আমাকে চলে যেতেই হবে। কারণ আমার যন্ত্রণার কোনও উপশম খুঁজে পাওয়া গেল না এবং তা সহ্যের সীমা পেরিয়ে গেছে।” 

ইনস্টাগ্রামে করা তার জীবনের শেষ পোস্টে নোয়া লিখেছিল, তাকে যেন কেউ অনুকরণ না করে। সব শেষে লিখেছিল, “আমাকে যেতে দেওয়ার জন্য সবাইকে জানাই ভালোবাসা“।

হল্যান্ড সরকার আগেই বলেছিল নোয়ার স্বেচ্ছামৃত্যুতে তারা বাধা দেবেনা। কিন্তু তারা নোয়াকে ডাক্তারির সাহায্যে স্বেচ্ছামৃত্যু দিতে অপারগ। কারণ হল্যান্ডে স্বেচ্ছামৃত্যুর অধিকার দেওয়া নিয়ে আইন থাকলেও নোয়া সেই আইনের আওতায় পড়ছে না। ফলে অনশন চালিয়ে নোয়াকে তিলে তিলে মৃত্যুর কাছে পৌঁছতে হল। যা ছিল তার হতাশার চেয়েও অনেক অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক।

স্বেচ্ছামৃত্যু নিয়ে কী বলছে ডাচ আইন!

ডাচ সরকার স্বেচ্ছামৃত্যুর (euthanasia) অনুমতি দেয়। যদি সেটা হল্যান্ডের স্বেচ্ছামৃত্যু সম্পর্কিত বিতর্কিত আইন ‘Termination of Life on Request and Assisted Suicide (Review Procedures) Act, 2002′ এর আওতায় পড়ে তবেই।  সেই আইনে বলা আছে, ডাক্তাররা রোগীর আবেদনে সাড়া দেবেন তখনই, যখন তাঁরা নিজে থেকেই মনে করবেন এ বার রোগীকে স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি দেওয়া উচিত। এবং সেই রোগীকে তখনই অনুমতি দেওয়া যাবে, যখন কোনও ভাবেই ডাক্তারির সাহায্যে তার আর উন্নতি ঘটানো সম্ভব নয়। এবং রোগীর যন্ত্রণাও কারও পক্ষে আর চোখে দেখা সম্ভব নয়।

এর পর, ডাক্তার রোগীকে জানাবেন, তাঁর পরিস্থিতি বর্তমানে কেমন এবং আর কী কী পরীক্ষা করার দরকার আছে। তারপর তাঁরা দু’জনেই সম্মত হবেন যে, স্বেচ্ছামৃত্যু ছাড়া আর কোনও পথ খোলা নেই। এর পরেও একজন নিরপেক্ষ ডাক্তার, যাঁর এই কেসের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই, তিনি রোগীকে দেখবেন এবং লিখিত ভাবে জানাবেন তাঁর সম্মতি। তবেই মিলবে কাঙ্ক্ষিত মৃত্যু। ডাক্তাররা কোনও ক্লিনিকে ওষুধ দিয়ে চিরতরে ঘুম পাড়িয়ে দেবেন রোগীকে।

এই পৃথিবী আর তার পৃথিবী নয়

২০১৮ সালেই কিশোরী নোয়া আত্মজীবনী লিখেছিল। বইটির নাম Winning or Learning detailing her struggles with PTSD, depression, anorexia and self-harm। অ্যাওয়ার্ড পাওয়া বইটিতে নোয়া লিখেছিল তার ছোট্ট জীবনের বিভিন্ন মুহূর্তের কথা। কী ভাবে তার ফুলের মত জীবনে নেমে এসেছিল দুঃখের সাইক্লোন। কী ভাবে তার জীবন তছনছ হয়ে গিয়েছিল। নোয়া লিখেছিল, কেন এই পৃথিবী আর তার পৃথিবী নয়। 

কিশোরী নোয়া, হাতে আত্মজীবনী

আজ নোয়ার মৃত্যুর পর সারা বিশ্বে উঠেছে ঝড়। নোয়ার যাওয়াটা কি যন্ত্রণা মুক্ত করা যেত না, আইন যখন আছেই!  ধর্ষণজনিত সীমাহীন হতাশায় ভোগা নোয়া কবেই আত্মঘাতী হতে পারত, অন্য যে কোনও পদ্ধতিতে। কিন্তু তা সে করেনি। কারণ সে বাঁচতে চেয়েছিল। মৃত্যুর সঙ্গে জীবনের আপ্রাণ লড়াই  চালিয়ে হেরে গিয়ে মৃত্যুর বুকে তার শেষ আশ্রয় চেয়েছিল। এবং ডাচ সরকারের অনুমতি নিয়েই। সেটা কি তাকে দেওয়া যেত না! মানুষের জন্যই তো আইন, নাকি আইনের জন্য মানুষ! সেটা কি একবার বুঝতে চেষ্টা করেছিল অমানবিক ডাচ সরকার!

Comments are closed.