বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪

১৩৯টি পাগলা হাতিকে সুস্থ করেছেন, অ্যাডভেঞ্চারের গল্প শোনালেন এশিয়ার ‘এলিফ্যান্ট ম্যান’ কুশল কোনওয়ার শর্মা

চৈতালী চক্রবর্তী

সালটা ১৯৯৪। ফেব্রুয়ারি মাসের কনকনে ঠাণ্ডায় অরুণাচলের ঘন অরণ্যে পাখিরাও মুখ লুকিয়েছে। দিনের বেলাতেও ঘন অন্ধকার জঙ্গলে। পাহাড়ি খাদ বেয়ে ঝরছে ‘পাগলা নুল্লা।’ অসমিয়াদের ভাষায় পাগলা-জলপ্রপাত। তাকে পিছনে ফেলে বন্দুক হাতে ছুঠছেন এক যুবক। একা। সামনে বিকট চিৎকার করতে করতে গাছপালার জঙ্গল ভেঙে ছুঠছে ৯ ফুটের একটা মাকনা হাতি। আচমকাই সব স্তব্ধ। জঙ্গল যেন নির্বাক হয়ে গেছে আসন্ন বিপদের আশঙ্কায়। পাগলা হাতি যতটা দুরন্ত, ততটাই তার বুদ্ধি। আচমকা আক্রমণ করে শুঁড়ে পেঁচিয়ে আছড়ে ফেলাই তার নেশা। থেমে গেলেন যুবক। চোখ-কান খোলা রেখে বন্দুকটা আরও চেপে ধরলেন। একটা শুকনো পাতার মৃদু খসখসানি, ঠিক পাশের ঝোপের ভিতর থেকেই বেরিয়ে এল বিরাট দাঁতাল। সেকেন্ডের অপেক্ষা। গর্জে উঠল ঘুমপাড়ানি বন্দুক। মানুষের ক্ষিপ্রতার কাছে আত্মসমর্পণ করল দাঁতাল।

গল্পটা এ ভাবেই শুরু করেছিলেন ডঃ কুশল কোনওয়ার শর্মা। ‘এলিফ্যান্ট ডক্টর অব ইন্ডিয়া।’ হাতি বিশেষজ্ঞ, পশু চিকিৎসক, গবেষক ডঃ শর্মাকে অসম সরকার খেতাব দিয়েছে, ‘দ্য এলিফ্যান্ট ম্যান অব এশিয়া।’ বর্ষার সন্ধ্যায় তাঁকে ফোন করতেই সেই পরিচিত হাসিমাখা গলাটা শুনে মন ভরে গেল। দিনভর ছুটছেন। কখনও সরকারি কাজে। কখনও সেমিনারে, দেশে-বিদেশে। তার মাঝেই অধ্যাপনা, গবেষণা সবই। হাতিদের পরিচর্চা তো রয়েছেই। পাগলা হাতিকে কাবু করতে বনে-জঙ্গলে দৌড়চ্ছেন, আবার হাতি অসুস্থ হলেই ডঃ শর্মার ডাক। উত্তর-পূর্বের পাহাড়ি এলাকা তাঁকে ছাড়া যে অচল! কথা দিয়েছিলেন নিজের অভিজ্ঞতা বলবেন, সেই মতোই শুরু হল আড্ডা।

ডঃ কুশল কোনওয়ার শর্মা


মনে পড়ে লক্ষ্মীর কথা…আমার কৈশোরের খেলার সঙ্গী

পশু প্রেম তো আর বলে কয়ে আসে না। ডঃ কুশল কোনওয়ার শর্মার হাতি-প্রেমের কথা অজানা নয় দেশবাসীর। শুধু দেশের গণ্ডি নয়, ইন্দোনেশিয়াতে গিয়েও পাগলা হাতি ধরে চিকিৎসা করে এসেছেন ডঃ শর্মা। ‘দ্য এলিফ্যান্ট ম্যান’ অব এশিয়ার পরিচিতি আন্তর্জাতিক স্তরেও। সালটা ঠিক মনে পড়ে না ডঃ শর্মার। তখন তিনি কিশোর। অসমের কামরূপ জেলার বড়মা গ্রামের বর্ধিষ্ণু পরিবার। ‘নীল পাহাড়িয়ার দেশে’ ভাইবোনদের মধ্যে তিনি একটু অন্যরকম। মন পড়ে থাকে গ্রাম লাগোয়া পাহাড়ি জঙ্গলের আনাচ কানাচে। স্কুল শেষ হলেই ছুটে চলে যান লক্ষ্মীর কাছে। লক্ষ্মী কুনকি হাতি। কিশোর কুশল শর্মার সঙ্গে তার বন্ধুত্বের টান। ‘‘আমার পরিবার পছন্দ করত না। বর্ধিষ্ণু ব্রাহ্মণ পরিবারের ছেলে কি না বনে-জঙ্গলে হাতি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পড়াশোনা শিকেয় তুলে মাহুত হতে চায় নাকি!’’ ডঃ শর্মার জেদ ধোপে টেকেনি। পাঠিয়ে দেওয়া হয় ভিন রাজ্যের স্কুলে। ১৯৭৫ সাল। ডঃ শর্মা তখন ১৭। ফিরে এসে ঠাকুমার কাছে জানতে পারেন লক্ষ্মী মারা গেছে কোনও এক কঠিন রোগে। ভুটানের পাহাড়ি খাদে তার দেহ পড়েছিল। শর্মার কথায়, ‘‘কেন মারা গেল লক্ষ্মী? কেন হল না তার চিকিৎসা? জবাব দিতে পারেননি ঠাকুমা, কারণ পশু চিকিৎসকই যে নেই রাজ্যে।’’

খুব প্রিয় এক হাতি-বন্ধুর সঙ্গে ডঃ কুশল কোনওয়ার শর্মা

১৯৮৩ সাল। ভেটেনারি কলেজ থেকে ডিগ্রি নিয়ে বেরিয়েছেন কুশল কোনওয়ার। ছোটখাটো ডাকও পাচ্ছেন। ১৯৮৬-তে মাস্টার্সের পরে ভেটেনারি সার্জারি নিয়ে পিএইচডি। ১৯৯৪ সালে এলিফ্যান্ট অ্যানাস্থেশিয়ায় স্পেশালিস্ট। ডঃ শর্মার কথায়, ‘‘আগে সরকারি আইন তেমন পাকাপোক্ত ছিল না। হাতি দলছুট হয়ে ভাঙচুর চালালে, বা কুনকি-মাকনারা উত্তেজিত হয়ে উঠলে তাদের ‘পাগলা হাতি’ দাগিয়ে দিয়ে মেরে ফেলার নির্দেশই দেওয়া হত। ট্রাঙ্কুলাইজেশনের চল তেমন ছিল না। এখন পশু সংরক্ষণে ট্রাঙ্কুলাইজেশন বা ঘুমপাড়ানি গুলি ছুড়ে বন্য পশুকে নিয়ন্ত্রণে আনার আইন হয়েছে।’’

১৩৯টি পাগলা হাতিকে বন থেকে ধরে এনেছি…

‘‘শুরুটা হয়েছিল অরুণাচল, অসম, মেঘালয় দিয়ে। পরে গোটা দেশেরই বিভিন্ন অভয়ারণ্য বা পাহাড়ি এলাকা থেকে ১৩৯টি পাগলা হাতি ধরে এনেছি। তাদের চিকিৎসা করে সুস্থ করেছি। ২০ বার হাতির আক্রমণের মুখে পড়েছি। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি,’’ ডঃ শর্মা জানিয়েছেন, তাঁর এই প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়েছে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার’ (IUCN)। ‘‘Elephant is my life,’’ ডঃ শর্মার কথায়, ‘‘৩২ বছর ধরে অবসর নিইনি। প্রতি সপ্তাহান্তে হাতিদের খাবার খাওয়াই। বছরে সেই সংখ্যা ৭০০। নিজের রাজ্যে শুধু নয়, ভিন রাজ্যে গিয়েও তাদের দেখাশোনা করি। আহতদের অস্ত্রোপচার করি, ক্ষতস্থানে যখন ওষুধ লাগাই দেখেছি ওদের চোখ থেকে জল পড়ে। পশুদের মন আছে, তাদের যন্ত্রণা আছে, ভালোবাসা দিয়ে আঁকড়ে ধরলে ওরাও কথা বলে।’’ ২০১৮ সালে অসমের রাজ্যপাল ডঃ জগদীশ মুখি তাঁকে খেতাব দেন ‘দ্য এলিফ্যান্ট ম্যান অব এশিয়া।’

অসমের রাজ্যপাল জগদীশ মুখির থেকে পুরস্কার নিচ্ছেন ডঃ শর্মা

‘‘ওরা বলেছিল আমি বিশ্ব রেকর্ড করেছি। তার পুরস্কারও পেয়েছি। আমি শুধু হাতিদের বাঁচাতে চাই। গোটা দেশেই হাতি মৃত্যু সাঙ্ঘাতিক ভাবে বেড়েছে। পাগলা হাতিকে না মেরে তার চিকিৎসার প্রয়োজন। তাই দেশে-বিদেশে যেখানেই ডাক পাই ছুটে যাই।’’

প্রতিটা অভিযান ছিল রহস্য-রোমাঞ্চে ভরপুর


লক্ষ্মীকে বাঁচাতে পারিনি…মানিককে বাঁচিয়েছিলাম

অরুণাচলের পাহাড়ি জঙ্গলে পাগলা হাতি মানিককে ধরার গল্প দিয়েই আড্ডা জমে উঠেছিল। ডঃ শর্মা বললেন, মানিক আসলে বুনো দাঁতাল নয়। সে পোষ মানা মাকনা হাতি। বয়স ২৮ বছর। অরুণাচলের পশ্চিম কামেং জেলায় রাজেশ গোয়েলের বাড়িতে ছোট থেকে তাকে প্রতিপালন করা হয়েছিল। বন দফতরের কাজেও লাগত মানিক। শান্ত, নিরীহ হাতিটা ছিল এলাকাবাসীর বন্ধু। একদিন হঠাৎ করেই সে উত্তেজিত হয়ে ওঠে। পায়ের শিকল ছিঁড়ে মাহুত আলিকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে জঙ্গলে পালিয়ে যায়।  পথে অনেক ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে, ফসল নষ্ট করে, মানুষ খুনও শুরু করে। মানিক হয়ে ওঠে এলাকার ত্রাস।

বন্দুকের ট্রিগারে চোখ, গর্জে উঠল গুলি

ডঃ শর্মার কথায়, ‘‘ইটানগরের মুখ্য বনপাল মানিককে মেরে ফেলারই নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু রাজেশের ফোন পেয়ে আমি ছুটে যাই। মারতে মানা করি। তিন-চারদিন ধরে জঙ্গলে ঘুরে বেরিয়ে শেষে কাবু করি ওকে।’’ কুয়াশা মাখা শীতের বিকেলে মানিকের পায়ের পেষণেই প্রাণ যেতে পারত ডঃ শর্মার। কিন্তু, মমতা হারিয়ে দিয়েছিল হিংসাকে। ডঃ শর্মা জানিয়েছেন, ৭-১০ দিনের চিকিৎসায় মানিক সুস্থ হয়ে ওঠে। এখন আবার আগের মতো দিব্যি শান্ত, নিরীহ মাকনা হাতি হয়ে গেছে।

রোঙ্গা গোরার রহস্য…

ডিব্রুগড়ের পাহাড়ি জঙ্গল ঘেরা এলাকা রোঙ্গা গোরা। মানুষের থেকে হাতির সংখ্যাই বেশি। অ্যাডভেঞ্চারের আরও একটা ঝাঁপি খুললেন ডঃ শর্মা। ‘‘বেহালি ফরেস্ট রিজার্ভের ফোনটা পেয়েই ব্যাগ পত্তর গুছিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম। অল্পবয়সী একটা মাকনা সেই এলাকার ত্রাস হয়ে উঠেছে। মাহুতকে তো মেরেইছে, চা শ্রমিকদের মানুষ খুন করে মাটি, ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে রাখছে। আদিবাসীরা তটস্থ হয়ে উঠেছেন।’’ ডঃ শর্মা বললেন, যে দিন পা রাখেন আদিবাসী গ্রামে, তাঁকে বলা হয়েছিল, হাতি নয় আসলে দেবী ভর করেছেন হাতির উপর। তাই পাপীদের মারছে সে। বোকো এলাকার একটি শিশুরও মৃত্যু হয়েছে রহস্যজনক ভাবে। সন্দেহ তাকেও মেরে টেনে নিয়ে গেছে হাতি।

মেঘালয়ের একটি ঘন জঙ্গলে দামাল হাতির খোঁজে

বিশ্বনাথ-চারিয়ালি ডিভিশনে হাতির আতঙ্ক তখন জাঁকিয়ে বসেছে। ডঃ শর্মা বললেন, ‘‘পায়ের ছাপ আর জঙ্গল ভাঙার চিহ্ন ধরে জিপে করে আমরা রওনা দিলাম। পথে পড়ে জিয়া ভোরেলি নদী, এখন যেটা নামেরি ন্যাশনাল পার্ক। জঙ্গলের অনেকটা গভীরে দেখা মেলে সেই হাতির। ২১ বছরের রূপধান। মাহুত রাভাকে মেরে মাটির নীচে চাপা দিয়েছে সে। তার উপরেই দাঁড়িয়ে হুঙ্কার ছাড়ছে।’’ কুশল শর্মা জানালেন, হাতিকে ঘিরে রেখে গালিগালাজ, চেঁচামেচি করছিল জনা ২৫ আদিবাসী। তাদের সরিয়ে ৪০ মিটার দূর থেকে বন্দুকের নিশানা স্থির করি। আচমকাই কেউ ক্যানেস্ত্রারা পেটায়। আর হাতিও দৌড় শুরু করে। শুঁড়ে পেঁচিয়ে একজনকে তুলতে যাবে, গর্জে ওঠে ডঃ শর্মার বন্দুক। জ়াইলাজিনের প্রভাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান হারায় বিশাল দাঁতাল। ‘‘রূপধান এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। তার একটি কুনকি সঙ্গীও হয়েছে। জানেন, সে দিন যখন গুলি খেয়ে সে জ্ঞান হারাচ্ছিল, টলতে টলতে শুঁড়টা গুটিয়ে নিয়েছিল মাথার কাছে। মনে হচ্ছিল, একটা দুরন্ত শিশু ঘুমের আগে তার মা’কে খুঁজছে।’’


‘যখন ওদের ক্ষতে ওষুধ লাগাই, দেখেছি ওদের চোখ দিয়ে জল পড়ে’..ডঃ কুশল কোনওয়ার শর্মা

‘পাগলা হাতি’ বলি বটে..হাতি কিন্তু আসলে পাগল হয় না, এটা একটা রোগ

চা বাগান এলাকাগুলিতে হাতির উপদ্রব নিয়ে অনেকে বলে থাকেন। চা শ্রমিকরা নেশার জিনিস চাষ করেন। সেগুলো খেয়েই পাহাড়ি এলাকায় বেশিরভাগ হাতি দামাল হয়ে ওঠে। ভাঙচুর চালায়। তাকে আহত করলে, সেই প্রতিশোধ স্পৃহাও তীব্র হয়, জানালেন ডঃ শর্মা। ‘হাতিরা বনেই সুন্দর’, বুনো হাতি যত সুস্থ বাচ্চার জন্ম দিতে পারে, মানুষের সংস্পর্শে এলে সেটা হয় না।

যৌন ইর্ষাও রয়েছে এই রোগের পিছনে। সঙ্গিনী দখলের লড়াইয়ে পুরুষ দাঁতালের টেস্টোস্টেরন অনেক বেশি নিঃসরণ হয়। সেই ফেরোমনের গন্ধ অত্যন্ত তীব্র। তারও প্রভাব কাজ করে সাঙ্ঘাতিক ভাবে। আবহাওয়ার বদলও একটা বড় কারণ। মানুষের সমাজে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ খাওয়াতে পারে না হাতিরা। শুধু হাতি নয় গণ্ডার, বাঘ সংরক্ষণেও ভূমিকা নিয়েছেন ডঃ কুশল কোনওয়ার শর্মা। জানিয়েছেন, মানস ন্যাশনাল পার্ক, উত্তরপ্রদেশের দুধওয়া ন্যাশনাল পার্ক, মধ্যপ্রদেশের কানহা ন্যাশনাল পার্ক, উত্তরবঙ্গের একাধিক অভয়ারণ্যে কাজ করেছেন তিনি। বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের বার্তা দিতে চলতি বছরেই আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজন করেছেন তিনি। ওই সেমিনারে যোগ দেবেন ইউরোপ, আমেরিকার প্রাণী বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও বিজ্ঞানীরা।

এখন দিনের ১২ ঘণ্টা কাটে গুয়াহাটির ভেটেনারি সায়েন্স কলেজে। তিনি সেখানকার সার্জারি ও রেডিওলজি বিভাগের প্রধান। বাকি সময়টা হাতিদের পরিচর্চা ও অস্ত্রোপচারে। ‘এলিফ্যান্ট এন্ডোথেলিওট্রপিক হার্পসভাইরাস’ (EEHV- Elephant endotheliotropic herpesvirus)- এর প্রভাবে হাতিদের বিশেষ সংক্রামক রোগ নিয়ে বর্তমানে গবেষণা করছেন তিনি। ‘‘১৩৯টিকে বাঁচিয়েছি। ওদের রোগ-মুক্ত করব। হাতি-হত্যা নয়, ওদের বাঁচানোই আমার জীবনের লক্ষ্য। আর একটাও লক্ষ্মীকে মরতে দেবো না,’’ গলা ভারী হয়ে এল ডঃ কুশল কোনওয়ার শর্মার।

ছবি সৌজন্যে: ডঃ কুশল কোনওয়ার শর্মা

Comments are closed.