রবিবার, জানুয়ারি ১৯
TheWall
TheWall

জঙ্গি তাণ্ডব, আদিবাসী বিক্ষোভ, রাজনৈতিক অস্থিরতায় পঙ্গু! এক বছর ধরে ইন্টারনেট নিষিদ্ধ এই দেশে!

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

চৈতালী চক্রবর্তী

প্রযুক্তির বিশ্বায়নের যুগে তো চারদিকেই ডিজিটাল ডিজিটাল রব। ইন্টারনেট ছাড়া আবার ভাবা যায় নাকি কিছু! শত ব্যস্ততার মাঝেও দিনমানে মোবাইল, ল্যাপটপ, ট্যাব কপচিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় একবার ঢুঁ না মারলেই নয়। নিত্যদিনের কাজও তো রয়েছে, সে পেশাগত হোক বা না হোক। এমন সময় যদি হঠাৎ কানে আসে ইন্টারনেট সেন্সরশিপ করে দিয়েছে সরকার, তাহলে কেমন হবে? মোদ্দাকথা ইন্টারনেট পুরোপুরি নাকচ করে দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে একরকম তালা পড়ে গেছে শুনলে আর যাই হোক আমাদের দেশের মানুষের আর্তনাদ শোনা যাবে ঠিকই। কিন্তু, মধ্য আফ্রিকার এই ছোট্ট দেশে ততটা ঠিক হয়নি। অসন্তোষ দানা বেঁধেছে ঠিকই, তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপও খাইয়ে নিয়েছে মানুষ।

ইন্টারনেট পুরোপুরি নিষিদ্ধ হয়ে গেছে এই দেশে। তাও আবার এক বছর ধরে। এই ব্যবস্থা কতদিন কার্যকরী থাকবে তাও অজানা। দেশের নাম চাদ। মধ্য আফ্রিকার এই ছোট্ট দেশে ইন্টারনেট সেন্সরশিপ চালু করে দিয়েছে সে দেশের সরকার। কাজেই হোয়াটস্অ্যাপ, ফেসবুক, ভাইবার, টুইটার, স্কাইপ-সহ গুচ্ছ মেসেজিং অ্যাপ এবং সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এই দেশে ঝাঁপ বন্ধ করে দিয়েছে।

কিন্তু কেন এই ব্যবস্থা?

চাদের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইদ্রিস ডেবি জানিয়েছেন, সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে দেশে মাথা চাড়া দিচ্ছিল হিংসা, গণহত্যার মতো ঘটনা। আদিবাসী তাণ্ডবে একসময় দেশের পরিস্থিতি হয়ে উঠেছিল ভয়ানক। কাজেই গুজব, হিংসা রুখতে তড়িঘড়ি এই ব্যবস্থা নেয় সরকার।

প্রেসিডেন্ট ইদ্রিস ডেবি

২০১৮ মার্চ থেকে, পুরোপুরি ব্ল্যাকআউট হয়ে যায় সোশ্যাল মিডিয়া। ইন্টারনেট উইথআউট বর্ডারের (IWB)একজিকিউটিভ ডিরেক্টর জুলি ওউনো বলেছেন, ‘‘গত বছর মার্চেই আমাদের কাছে খবর আসে চাদের বহু জায়গায় হোয়াটস্অ্যাপ অ্যাকসেস করা যাচ্ছে না। গতি কমেছে ইন্টারনেটেরও। পরে সরকারি তরফে পাকাপাকি ভাবে ঘোষণা করা হয় দেশে ইন্টারনেট সেন্সরশিপ চালু হয়ে যাবে।’’ জুলির মতে, বিগত কয়েক বছরে সোশ্যাল মিডিয়া মারফৎ ধর্মীয় উস্কানিমূলক ভিডিও, গুজব বন্যার জলের মতো ছড়িয়ে পড়ছিল দেশে। তার জেরে সাম্প্রদায়িক হিংসা, আদিবাসী বিক্ষোভের মতো ঘটনা ঘটে। প্রভাবিত হয় দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়াও।

চাদ জর্জরিত অশিক্ষা, দারিদ্র ও রাজনৈতিক অস্থিরতায়

চাদ প্রজাতন্ত্রের উত্তরে লিবিয়া, পূর্বে সুদান, দক্ষিণে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, দক্ষিণ-পশ্চিমে ক্যামেরুন ও নাইজেরিয়া এবং পশ্চিমে নাইজার। নাইজেরিয়া, চাদ, ক্যামেরুন ও নাইজার— এই চার দেশ নিয়ে গঠিত আফ্রিকার সমগ্র চাদ হ্রদ অঞ্চল। অশিক্ষা, দারিদ্র, আমলাতন্ত্র, রাজনৈতিক অস্থিরতায় জর্জরিত এই দেশ। বারে বারেই সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে।

২০০৯ সাল থেকে নাইজেরিয়ায় মাথা চাড়া দিয়েছে ইসলামিক জঙ্গি সংগঠন বোকো হারাম। গত আট বছরে জঙ্গি সংগঠনটির হাতে খুন হয়েছে কুড়ি হাজারেরও বেশি মানুষ। গৃহহীন কয়েক লক্ষেরও বেশি। লাগাতার সন্ত্রাস নড়বড়ে করে দিয়েছে তেল সমৃদ্ধ নাইজেরিয়ার অর্থনৈতিক কাঠামোও। পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে দুর্ভিক্ষ। ৬ কোটিরও বেশি মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে বাস করছেন। পঙ্গু প্রশাসন, বেকারত্বে ডুবে রয়েছে যুবসমাজ।

১৯৯০ সাল থেকে প্রেসিডেন্ট পদের দায়িত্বে রয়েছে ইদ্রিস ডেবি। তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারের লাগাম ছাড়া দুর্নীতিও বহুল সমালোচিত৷ ২০১৪ সালে অপরিশোধিত তেলের দাম ৫০ ভাগ নেমে যাওয়ায় দেশটির অর্থনৈতিক সংকটও প্রবল হয়। ২০১৬ সালে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্থ দেশের তালিকায় ছয় নম্বরে ছিল চাদ৷ ব্রিটেনের প্রতিনিধি ম্যাথু রিক্রফ্ট বলেছেন, নাইজেরিয়া, চাদে মানবাধিকার, নারীসুরক্ষার বালাই নেই। একসময় রাষ্ট্রপুঞ্জের রিপোর্ট জানিয়েছিল, সমগ্র চাদ হ্রদ অঞ্চলকে সঙ্কট থেকে উদ্ধার করতে কোটি কোটি ডলার অর্থ প্রয়োজন। যার অর্ধেকের বেশিই প্রয়োজন ধুঁকতে থাকা নাইজেরিয়া ও চাদের জন্য। নয়তো স্রেফ খাদ্যাভাবে মারা যাবেন কয়েক লক্ষ মানুষ।

একদিকে জঙ্গি গোষ্ঠী অন্যদিকে আদিবাসী বিক্ষোভের জন্য দায়ী করা হয় ইন্টারনেটকেই

চাদে বাড়তে থাকা সন্ত্রাস, হিংসার জন্য ইন্টারনেটকেই দায়ী করেছে প্রশাসন। নাইজেরিয়ার উত্তরাঞ্চল মূলত বোকো হারামের প্রধান ঘাঁটি। ২০১১-১২ সালে এই জঙ্গি গোষ্ঠীর তাণ্ডবে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয় দেশে।

আদিবাসী বিক্ষোভ চাদে

তার উপর রয়েছে আদিবাসী বিক্ষোভের মতো ঘটনা। উত্তর চাদের জাঘাওয়া আদিবাসীদের বিক্ষোভে একসময় উত্তাল হয়ে উঠছিল চাদের একটি এলাকা। সরকারি সূত্র জানাচ্ছে, দেশের একটি নির্দিষ্ট অংশে আদিবাসী হিংসার এই ঘটনা হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুকের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে গোটা দেশে। ছড়ায় গুজব, ভুয়ো খবরও। তার জেরে হিংসার ঘটনা বহুগুণ বেড়ে যায়। এই পরিস্থিতি ঠেকাতেই দেশে ইন্টারনেট পরিষেবায় লাগাম পরানোর কথা ভাবে প্রশাসন।

পক্ষে ও বিপক্ষে মত

ইন্টারনেট বন্ধ করে গুজব তো রোখা গেল, কিন্তু দেশের রাজনীতি-অর্থনীতি তাতে কতটা ক্ষতিগ্রস্থ সেই নিয়ে পক্ষে ও বিপক্ষে মত রয়েছে বিস্তর। অনেকেই বলেছেন, এই ব্যবস্থা চালু থাকলে দেশে বাড়তে থাকা হিংসার ঘটনা রোখা যাবে। কমবে সন্ত্রাস, গণহত্যার মতো ঘটনা।

সালিম আজিম আসানি

বেসরকারি ডিজিটাল সংস্থার কর্ণধার সালিম আজিম আসানির কথায়, ‘‘গত এক বছর ধরে দেশে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ। কাজকর্ম লাটে উঠেছে। এই ব্যবস্থা চলতে থাকলে চাদের মতো দেশে অশিক্ষা, বেকারত্ব আরও বাড়বে।’’ সংস্থা চালানোর জন্য ব্যয়বহুল ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেন তিনি। জানিয়েছেন, বিদেশের সংস্থাগুলির সঙ্গে এই ভিপিএনের সূত্রেই যোগাযোগ রাখতে হয়। তবে এই ব্যবস্থা অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ। ইন্টারনেট সেন্সরশিপের কারণে দেশের অর্থনীতিও একসময় বেহাল হয়ে যেতে পারে বলে মত তাঁর।

তবে ইন্টারনেট সেন্সরশিপকে দেশের নিরাপত্তার জন্য আদর্শ বলেই মনে করেন নাইজেরিয়ার প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রদূত জন ক্যাম্পবেল। তিনি বলেছেন, ‘‘ভৌগোলিক অবস্থানের দিক দিয়ে চাদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা দেশ। সুদান ও লিবিয়ার সীমান্তবর্তী হওয়ায় নিরাপত্তার প্রশ্নটাও বড় হয়ে দাঁড়ায়। তাই সে দিক থেকে দেখতে গেলে নয়া ব্যবস্থা মোটেই ক্ষতিকর নয়।’’ তাঁর মতে, মার্কিন সাহায্যপুষ্ট ‘ট্রান্স-সাহারা কাউন্টারটেররিস পার্টনারশিপ’-এর সদস্য চাদ। উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকান দেশগুলিতে সন্ত্রাস রোখার প্রশ্নে চাদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।

আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন মত জানিয়েছেন, ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের প্রাক্তন সদস্য তথা পলিসি এক্সপার্ট মহম্মদ সানি আবদুল্লাহি। তাঁর মতে, ‘‘চাদের মতো দেশে যেখানে আর্থিক সঙ্কট ও বেকারত্ব সমস্যা একটা বড় ইস্যু, সেখানে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়াটা বোকামো। বরং ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণে রেখে দেশের সার্বিক উন্নতির চেষ্টা করাটাই সরকারের প্রধান কর্তব্য।’’

আরও পড়ুন:

তুঙ্গ নদীর তীরে এই জনপদে সকলের মুখেই দেবভাষা, জানতেন কি?

Share.

Comments are closed.