বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪

থ্রিলারের থেকেও কম নয় ব্রুস লি’র মৃত্যু, খুন হয়েছিলেন? (প্রথম পর্ব)

রূপাঞ্জন গোস্বামী

 ২০ জুলাই ১৯৭৩, শেষের শুরু

ঘুম থেকে উঠলেন মার্শাল আর্ট সম্রাট ব্রুস ইয়ুন ফান লি। হাল্কা প্রাতরাশ সেরে টাইপ করাতে বসলেন তাঁর আমেরিকান অ্যাটর্নি আদ্রিয়ান মার্শালকে। ব্রুস লি-এর সামনে অনেকগুলো বড় বড় প্রজেক্ট। ওয়ার্নার ব্রাদার্সের সঙ্গে বেশ কিছু ছবি, তাঁর বায়োগ্রাফি নিয়ে হানা-বারবারার একটা আ্যনিমেশন ছবির সিরিজ। এ ছাড়াও আছে নতুন কিছু বই লেখা ও একগাদা বিজ্ঞাপনের অফার। ব্রুস লি সত্যিই হংকংয়ে তাঁর সাম্রাজ্য তৈরি করতে চলেছেন।

চিঠি লিখে, ব্রুস লি তাঁর কৌলুং টং-এর প্রাসাদ থেকে গেলেন গোল্ডেন হার্ভেস্ট স্টুডিওতে। সেখানে দেখা করলেন এক সময়ের জেমস বন্ডের চরিত্রাভিনেতা অস্ট্রেলিয়ার জর্জ ল্যাজেনবির সঙ্গে। ব্রুস লি’র সঙ্গে তাঁর আলোচনা হল ‘গেম অফ ডেথ’ ছবিটায় ল্যাজেনবির অভিনয় করা নিয়ে। হাজির ছিলেন স্টুডিও ম্যানেজার অ্যাণ্ড্রে মর্গ্যান।

গোল্ডেন হার্ভেস্ট স্টুডিও

এর পর ব্রুস লি তাঁর প্রায় সব কটি ছবির প্রডিউসার রেমন্ড চাও-এর অফিসে গিয়ে বললেন তিনি ছবিটিতে ল্যাজেনবিকে চান। চাও প্ল্যান দিলেন সবাই মিলে ডিনারে গিয়ে ডিলটা ফাইনাল করা যাক। ব্রুস আবার ফিরলেন গোল্ডেন হার্ভেস্ট স্টুডিওতে। সেখানে ব্রুস পকেট থেকে হাসিসের পাউচ বের করে অ্যাণ্ড্রে মর্গ্যানকে দিলেন। দুজনেই কিছুক্ষণ নেশা করলেন। জর্জ ল্যাজেনবি আর ব্রুসকে নিয়ে মর্গ্যান লাঞ্চে যাবেন ভেবে ছিলেন কিন্তু ব্রুসের অন্য প্ল্যান থাকায় তা বাতিল হল।

ব্রুসের ইচ্ছে ‘গেম অফ ডেথ’-র নায়িকা বেটি টিং পেই-এর অ্যাপার্টমেন্টে লাঞ্চ করা। অতএব গোল্ডেন হার্ভেস্ট স্টুডিও থেকে জর্জ ল্যাজেনবি ফিরে গেলেন হায়াত হোটেলে। ব্রুস ল্যজেনবিকে প্রমিস করলেন, বিকেলেই ফিরে এসে তাঁকে বলবেন যে ল্যাজেনবিকে কত টাকা দিতে পারবেন ‘গেম অফ ডেথ’-এ অভিনয় করার জন্য।

ছবির বাম দিকে রেমন্ড চাও

দুপুর ১২.৪৫

ব্রুস স্টুডিও থেকে তাঁর মার্সিডিজে উঠলেন। নিজেই ড্রাইভ করে পৌঁছে গেলেন ৬৭ বেকন হিল রোডে, বেটি টিং পেই-এর অ্যাপার্টমেন্টে। ঘড়িতে তখন দুপুর একটা। সাজানো গোছানো ছিমছাম অ্যাপার্টমেন্ট। পরের কয়েক ঘন্টা দুজন একান্তে কাটালেন। দুজনের মধ্যে শারীরিক সম্পর্কও হল।  এবং ব্রুস আবার বেটির সঙ্গে হাসিস সেবন করেছিলেন। কিন্তু হার্ড ড্রিংকস বা হার্ড ড্রাগ দুজনের  কেউই নেন নি ।

ব্রুস নাকি বেটিকে সারাক্ষণ ল্যাজেনবির কথা বলছিলেন। কেন তাঁকে ‘গেম অফ ডেথ’ ছবিতে দরকার, এসব। ব্রুস বেটিকেও ভালোবাসার খাতিরে ‘গেম অফ ডেথে’-এ রোল অফার করে ছিলেন। তাঁর গার্লফ্রেন্ডের রোল। কিন্তু বেটি পর্দায় ব্রুসের গার্লফ্রেন্ডের ভূমিকায় ততটা স্বছন্দ হবেন না বলে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন অফার। জানিয়ে দিয়েছিলেন, রিয়েল লাইফে যাঁকে ভালোবাসেন পর্দায় তাঁর সঙ্গে ভালোবাসার অভিনয় করতে পারবেন না।

সন্ধ্যা ৬ টা

‘গেম অফ ডেথ’  ছবির প্রডিউসার রেমন্ড চাও বেটির অ্যাপার্টমেন্টে এলেন। কেন এসেছিলেন তা আজ পর্যন্ত স্পষ্ট হয়নি। চাও আর মর্গ্যান সারা বিকেল নাকি গোল্ডেন হার্ভেস্ট স্টুডিওতে ব্রুসের ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন। জর্জ ল্যাজেনবির সঙ্গে ডিলটা ফাইনাল করার জন্য। দিনটির তাপমাত্রার ছিলো ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইট, আদ্রতা ছিল প্রায় ৮৪ শতাংশ।

চাও পরে বলেছিলেন ব্রুসের শরীর ভালো লাগছিল না। চাওয়েরও শরীর ভালো লাগছিল না । দুজনে জল খেলেন । ব্রুস  ‘গেম অফ ডেথ’ ছবির বিভিন্ন দৃশ্যের একক অভিনয় করে যাচ্ছিলেন ।   একের পর এক দৃশ্যে অভিনয় করেই ছবির গল্পটা  শুনিয়ে দিচ্ছি্লেন  ব্রুস । তাই তাঁকে একটু বেশি কাহিল লাগছিল। তবুও তিনি অভিনয় করে যাচ্ছিলেন , স্ক্রিপ্ট ছাড়াই।

ব্রুস ও বেটি টিং পেই

সন্ধ্যা ৭ টা

অভিনয় করতে করতে হটাৎ ব্রুস অজ্ঞানের মতো হয়ে গেলেন। তার মাথায় তীব্র  যন্ত্রণার কথা জানালেন। তখন ঘড়িতে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। একটু আগে ব্রুস প্ল্যান করেছিলেন ল্যাজেনবিকে হোটেল থেকে তুলে ডিনারে  যাবেন। সেই মতো , বেটিও পোশাক পরিবর্তন করে নিয়েছিলেন।

কিন্তু ব্রুসের মাথা ব্যাথা ক্রমশ বাড়তে লাগলো। ব্রুস বললেন , তিনি একটু বিশ্রাম করতে চা্ন। এই সময় রেমন্ড চাও নাকি লাফিয়ে উঠে দাঁড়ান এবং ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চান। বেটি তার পর ব্রুসকে একটা ব্যথানাশক  ইকুয়াজেসিক পিল দেন। এই পিলটিতে ৩২৫ মিগ্রা অ্যাসপিরিন (aspirin )এবং ২০০ মিগ্রা মেপ্রোবামেট ( meprobamate ) ছিল। ব্রুস নাকি  এর আগেও বহুবার বেটির কাছ থেকে এই ওষুধটা নিয়েছেন , মাথা ব্যাথা কমাতে।

রেমন্ড বললেন তিনি হোটেলে চলে যাচ্ছেন, ব্রুস আর বেটি পরে ডিনারে এলে আসতে পারেন। ব্রুস বেটির শোবার ঘরে গেলেন। পোশাক খুলে , মেঝেতে রাখা ম্যট্রেসের ওপর শুয়ে পড়লেন । বেটি বেডরুমের দরজা বন্ধ করে লিভিং রুমে চলে গেলেন। সেখানে তিনি সোফায় বসে টিভি দেখতে থাকলেন।

সন্ধ্যা  ৭.৪৫

বেটির ঘর থেকে  রেমন্ড বেরিয়ে গেলেন ল্যাজেনবিকে হায়াত হোটেল থেকে তুলে মিরামার হোটেলের জাপানি রেস্টুরেন্টে ডিনার খাওয়ানোর জন্য। ৩০ মিনিট হোটেলের বারে ল্যাজেনবির সঙ্গে কাটিয়ে রেমন্ড চৌ আবার বেটির অ্যাপার্টমেন্টে ফোন করেন। বেটি ফোনের ওপার থেকে জানান ব্রুস ঘুমোচ্ছেন । রেমন্ড আর ল্যাজেনবি  যেন তাঁদের ছাড়াই  ডিনার সেরে নেন

ধোঁয়াশাঃ ব্রুস অসুস্থ হয়ে শুতে যান ৭.১৫ মিনিটে। বেরিয়ে যাবেন বলেও রেমন্ড ৩০ মিনিট রয়ে যান  বেটির ঘরে। কেন ?

রাত ৯.৩০

ডিনার সেরে   রেমন্ড আবার ফোন করেন বেটিকে। বেটি বলেন ব্রুস এখনও ঘুমোচ্ছেন। কিন্তু তিনি ব্রুসকে জাগাতে ভয় পাচ্ছেন । রেমন্ড বলার পর বেটি তাঁর শয়নকক্ষে ঢোকেন। মেঝেতে একইরকম ভাবে শুয়ে আছেন ব্রুস। কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বেটি ফিসফিস করে ডাকেন “ব্রুস ব্রুস” । ব্রুস সাড়া দেন না।

বেটি এবার ব্রুসের কাঁধ ধরে নাড়ান, জোরে  জোরে ডাকেন ।তবুও ব্রুস জাগেন না। ভয় পেয়ে যান বেটি। ঝাঁকাতে থাকেন ব্রুসের কাঁধ। চিৎকার করতে থাকেন “ব্রুস ব্রুস”। উন্মত্তের মতো বেটি দৌড়ে যান ফোনের কাছে , রেস্টুরেন্টে রেমন্ডকে ফোন করেন। বলেন ব্রুস জাগছেন না । রেমন্ড বেটিকে শান্ত হতে বলেন । বলেন তিনি বেটির ফ্ল্যাটে এক্ষুনি আসছেন।

ধোঁয়াশাঃ বেটি  তাঁর নিজস্ব ডাক্তারকে ফোন না করে কেন  প্রোডিউসার রেমন্ড চাওকে ফোন করলেন ?

জীবনের শেষ ইন্টারভিউয়ে ব্রুস লি

রেমন্ড পরে মিডিয়ায় বলেছেন , সেই সময় তাঁর মনে পড়ছিল ১০ মে-এর কথা। সেরিব্রাল ইডিমায় আক্রান্ত হয়ে ব্রুস প্রায় মরতে বসেছিলেন। সে যাত্রায়  ডঃ লংস্ফোর্ড বাঁচিয়ে ছিলেন ব্রুসকে। এক্ষেত্রেও রেমন্ড সেই ডাক্তারকেই ফোন করেন। কিন্তু ফোন ব্যস্ত ছিল।

তখন সেল ফোন আসেনি। রেমন্ডকে বার বার গাড়ি থেকে নেমে  বুথ থেকে ডাক্তারকে ফোন করতে হচ্ছিল। লাইন ব্যস্ত ছিল। পরে জানা গেছিল, সেই সময় ডাক্তারের মেয়ে বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে টেলিফোনে ব্যস্ত ছিল। ইতিমধ্যে রেমন্ড চলে এসেছিলেন বেটির অ্যাপার্টমেন্টে।

যখন রেমন্ড বেটির শয়নকক্ষে ব্রুসকে দেখেন তখন ব্রুস সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় মাটিতে পাতা ম্যাট্রেসে শুয়েছিলেন। বেটি ব্রুসের শরীরের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁপছিলেন।
তখনও ডেকে যাচ্ছিলেন “ব্রুস, ব্রুস”

এই  লিঙ্কে পড়ুন : থ্রিলারের থেকেও কম নয় ব্রুস লি’র মৃত্যু।খুন হয়েছিলেন? (দ্বিতীয় পর্ব)

তথ্যসূত্র: শেষপর্বে

দ্য ওয়ালের ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন।

 

Comments are closed.