বৃহস্পতিবার, জুন ২৭

জানেন কি বাংলায় এমএ ডিগ্রি দেয় পাকিস্তানের করাচি বিশ্ববিদ্যালয়

দ্য ওয়াল ব্যুরো: বন্দর শহর, মাফিয়ার শহর, কত নামেই না পরিচিতি পাকিস্তানের রাজধানী করাচি শহরের।  কিন্তু প্রায় অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সেই শহরেই যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য়ের রীতিমতো নজরকাড়া চর্চা চলছে তা জানেন আর কতজন? এমন তেমন চর্চা নয়, রীতিমতো একটা ডিসিপ্লিন হিসেবে বাংলা পড়ানো হয় করাচি বিশ্ববিদ্য়ালয়ে। বাংলা ভাষায় সার্টিফিকেট কোর্স ,পাস, অনার্স, এমনকি এমএ ডিগ্রি পান ছাত্র ছাত্রীরা।

১৯৫৩ সালে যাত্রা শুরু করে আজ ৬৬ বছর ধরে বিভাগটি বিরতিহীন ভাবে চলছে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ। প্রথম বিভাগীয় প্রধান ছিলেন অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান; পরে স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্য়ালয়ের উপাচার্য হন। 

পাকিস্তানের অর্থনৈতিক রাজধানী করাচিতে পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) থেকে আসা প্রায় পনেরো লক্ষ বাংলাভাষী মানুষের বাস। করাচির মচ্ছিবাজারই বলুন বা লায়েরির বাঙালি মার্কেটই ধরুন, বেশিরভাগ দোকানের সাইনবোর্ড বাংলায় লেখা। এমনকী, খাতির আপ্যায়নও বাংলায়। কারণ সিংহভাগ ক্রেতা ও বিক্রেতাই বাংলাভাষী। বাংলায় লিটল ম্যাগাজিন মায় খবরের কাগজও বের হয় করাচি থেকে। যদিও  বাঙালি বাসিন্দাদের  সিটিজেন কার্ড, ভোটার কার্ড, বিদ্য়ুৎ, পানীয় জল-সহ সরকারি সু্যোগ সুবিধা মেলে না বলে ক্ষোভ-বিক্ষোভ-আন্দোলনও চলে নিয়মিত।

কল্পনা করুন, সন্ধ্যার সুরেলা আজানের শেষে কোনও কোনও বাড়িতে করাচি বিশ্ববিদ্য়ালয়ের কোন হিজাব পড়া ছাত্রী হয়তো পড়েন রবি ঠাকুরের গোরা নয়তো চণ্ডালিকা কিংবা মানিক বন্দ্য়োপাধ্য়ায়ের পদ্মানদীর মাঝি। এবং অনুবাদ নয়, রবি  ঠাকুর ও মানিকের  প্রাণের ভাষাতেই।  অথচ একদিন এই পাকিস্তানই পূর্ববঙ্গে বাংলাভাষার কণ্ঠরোধ করে  বাঙালীর উপর চাপিয়ে দিতে গিয়েছিল উর্দু ভাষা।

করাচি ইউনিভার্সিটির ওয়েবসাইট ( http://www.uok.edu.pk/faculties/bengali/courses.php) জানাচ্ছে বাংলা সাহিত্যকে গভীর ভাবে অনুধাবন করা ও স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্দেশেই এই বিভাগ ও বিভাগীয় ডিগ্রির অবতারণা।
প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য থেকে আধুনিক যুগের সাহিত্য ছাড়াও বিষয় বহির্ভূত অথচ প্রয়োজনীয় কিছু বিষয়ে পাঠদান করা হয় বিভিন্ন স্তরে।

বছর দুই আগে প্রকাশিত করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসপেক্টাসে বলা হয়, বাংলা বিভাগটিতে বাংলা সাহিত্যের ওপর প্রায় দুই হাজার গ্রন্থ রয়েছে। (uok.edu.pk/admissions/2016/prospectus.pdf)। রয়েছে বাংলা বিভাগটির নিজস্ব প্রকাশনাও।

বরাবরই উচ্চমানের ফ্যাকাল্টি করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। অধ্য়াপক সায়েদ আলি আহসান, অধ্য়াপক মহম্মদ ফারুক, অধ্য়াপক সায়েদ আলি আশরাফ, অধ্য়াপক এবিএম মঈনুদ্দিন চৌধুরী প্রমুখ বিখ্যাত শিক্ষাবিদেরা পড়ান নিয়মিত। বিদেশ থেকে আসেন অতিথি শিক্ষকেরাও।

করাচি ইউনিভার্সিটির বাংলা বিভাগ

করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট ও মাস্টার ডিগ্রির বিভিন্ন সেমেস্টারে, নিম্নোক্ত বিষয়গুলি পড়ানো হয়
ভাষাবিজ্ঞান ও ধ্বনি বিজ্ঞান
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস- প্রাচীন (৬৫০-১২০০) মধ্য (১২০১-১৮০০)
● আধুনিক (১৮০০-১৯৭০)।
আধুনিক বাংলা গদ্য, উপন্যাস ছোটগল্প, প্রবন্ধ, ফিকশন, নাটক, কবিতা,বাংলা লোকগাথা, ছড়া, প্রবাদ, ধাঁধা, সাহিত্য সমালোচনা।
● রবীন্দ্র কাব্য, বিশ্ব সাহিত্য
● বিশ্বের বাছাই করা সেরা সাহিত্যিক, বাংলা সাহিত্যে মুসলিমদের অবদান (১৮০০-১৯৭০)।
● বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ, জসীমউদ্দীন, ফারুক আহমেদের অবদান
● কুরআন শরিফ ও বুখারি শরিফ থেকে অনুবাদ।
● উর্দু সাহিত্য ও উর্দু থেকে বাংলা অনুবাদ।

বাংলা বিভাগের ছাত্র ছাত্রীদের বাংলা ছাড়াও পড়তে হবে বেসিক ম্যাথ, ইংরাজি, কম্যুনিটি ডেভেলপমেন্ট, পাকিস্তান স্টাডিজ, প্রাত্যহিক বিজ্ঞান, পরিবেশ বিজ্ঞান, ইসলামিক স্টাডিজ ইত্যাদি বিষয়গুলি। বাংলা বিভাগ বিভিন্ন সময় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনার করে থাকে। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের মানবাধিকার ও বাংলা সাহিত্যে অবদান নিয়ে প্রতি বছরই সেমিনার  হয়। এই সেমিনারগুলিতে বাংলাদেশ থেকে বিখ্যাত শিক্ষাবিদরা তাঁদের পেপার পড়ার সুযোগ পেলেও ভারতীয় শিক্ষাবিদরা এখনও করাচি বিশ্ববিদ্য়ালয়ে ব্রাত্য।

করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েট বা মাস্টার্স করার পর ছাত্রছাত্রীরা পাকিস্তানের করাচি সংলগ্ন এলাকায় শিক্ষকতা করার সুযোগ পান।  এ ছাড়াও পাকিস্তানে বাংলাদেশি ব্যাঙ্কের বিভিন্ন শাখায় বা কর্পোরেট সেক্টরে কাজ, বা অনুবাদক বা দোভাষীর কাজ ও পান।

বাংলা বিভাগে পড়ানোর জন্য়  ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গের অধ্যাপকেরা হয়তো ডাক পান না ,বাংলাদেশী অধ্য়াপকদেরই সেখানে আধিক্য। তবুও করাচি বিশ্ববিদ্যালয়কে পড়াতেই হয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র থেকে মানিক বন্দোপাধ্যায় ও অন্য়ান্য় বরণীয় বাঙালি সাহিত্যিকদের সৃষ্টি। কারণ সাহিত্যের কোনও ধর্ম হয় না আর এঁরা ছাড়া আধুনিক বাংলা সাহিত্যই হয় না।

Leave A Reply