সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৬

কালাম ও তাঁর  প্রিয় বন্ধু অর্জুনের বিরল ভালোবাসা আজও ভোলেনি ১০ নম্বর রাজাজি মার্গ

রূপাঞ্জন গোস্বামী

ভারতের ১১তম রাষ্ট্রপতি পদ থেকে, ২০০৭ সালে অবসর নিয়েছিলেন দার্শনিক বিজ্ঞানী এপিজে আব্দুল কালাম। নতুন দিল্লির রাইসিনা হিলসের ৩২০ একর জায়গা জুড়ে থাকা, ৩৪০ কামরার রাষ্ট্রপতি ভবন ছেড়ে, সামান্য কটি বই, সিডি আর সেতার নিয়ে উঠে এসেছিলেন লুটিয়েন দিল্লির ১০ নম্বর রাজাজি মার্গের বাংলোতে। যেটিতে এখন থাকেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়।

ডঃ আব্দুল কালামের কাছে ১০ নম্বর রাজাজি মার্গের আট কামরার বাড়িটিও ছিল অনেক বড়। প্রকৃতিপ্রেমী কালামের ইচ্ছা ছিল বাগান ঘেরা ছোট্ট একটি বাড়িতে থাকার। কিন্তু দেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির মর্যাদার সঙ্গে মানানসই ও নিরাপত্তার দিক থেকে উপযুক্ত এর চেয়ে ছোট বাংলো খুঁজে পাওয়া যায়নি।

মাটির কাছাকাছি থাকতে চাইতেন কালাম

২০০৭ থেকে ২০১৫ সালে প্রয়াত হওয়া পর্যন্ত ১০ নম্বর রাজাজি মার্গেই ছিলেন আব্দুল কালাম। এখানেই শুরু হয় অর্জুনের সঙ্গে কালামের সেই বিস্ময়কর বন্ধুত্ব।

“অর্জুনকে চেনেন”

১০ নম্বর রাজাজি মার্গের বাংলোতে কালামের সঙ্গে যাঁরাই দেখা করতে যেতেন, তাঁদের প্রত্যেককে কালাম সাহেবের একটি প্রশ্নের সম্মুখীন হতেই হত। আপনাদের সঙ্গে কি আমার প্রিয় বন্ধুর অর্জুনের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে? উত্তরের অপেক্ষা না করে কালাম বলতেন, “চলুন বন্ধু অর্জুনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। দেখবেন কী দারুণ বন্ধু সে।”

অতিথিদের নিয়ে যেতেন বাড়ির সামনের বাগানে। যেখানে রাজকীয় যোদ্ধার মতো বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অর্জুন। শরীরে বয়েসের ছাপ পড়েছে, কিন্তু তবুও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সে।

প্রকৃতি ও শিশুদের মাঝে স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন কালাম

হতভম্ভ অতিথিদের দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে ডঃ কালাম বলতেন, “এই হল আমার প্রিয় বন্ধু অর্জুন। বয়েস হল প্রায় ১১০ বছর। অনেক কিছুই দেখেছে অর্জুন। অনেক ইতিহাসের সাক্ষী আমার বন্ধু। ভাবুন আপনারা, সে দেখেছে গান্ধীজিকে নেহেরুজিকে। সে দেখেছে স্বাধীনতা যুদ্ধ, দেখেছে নতুন ভারতের জেগে ওঠা। অর্জুন তার হৃদয়ে ধরে রেখেছে ভারতের ইতিহাসের পুরো একটা অধ্যায়। সত্যি অবাক করার মত,তাই না?”

কালাম যখন এসব বলতেন, অর্জুন তার ঝাঁকড়া মাথা ঝাঁকিয়ে সমর্থন করত তার প্রিয় বন্ধু কালামের কথা। যদিও অর্জুন বয়েসে কালামের চেয়ে তিন দশকের বড়। কালামের পিতা জয়নুল আবেদিনের বয়সী। কিন্তু বয়েসে বড় এই অর্জুনের সঙ্গেই গড়ে উঠেছিল শিশুর মতো সরল কালামের নিখাদ ভালোবাসা।

অর্জুন কিন্তু মানুষ নয়

কালামের প্রিয় বৃদ্ধ বন্ধু অর্জুন হল একটি শতাব্দী প্রাচীন অর্জুন গাছ (Terminalia arjuna)। যে মানুষ না হয়েও কালামের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু ছিল। যে কালামের জীবনের এক অজানা দিক আমাদের কে দেখার সুযোগ দিয়েছিল। তাই যাঁরা কালামের কাছে যেতেন তাঁরা কালামের সঙ্গে সঙ্গে অর্জুনের সঙ্গেও সেলফি নিতে ভুলতেন না।

১০নং রাজাজি মার্গের বাংলোর বাগানে ডঃ কালাম প্রতিদিন হাঁটতে যেতেন। হাঁটা শেষ করে দাঁড়িয়ে পড়তেন অর্জুনের সামনে। মুখে ফুটে উঠত শিশুর মত সরল হাসি। একে অপরের কুশল বিনিময় করতেন। গাছটির চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে ডঃ কালাম মাথা দোলাতেন গাছটির দিকে তাকিয়ে। নিঃশব্দে অর্জুনের সঙ্গে কথা বলতেন। যেটা দূরে বা পাশে দাঁড়ানো লোকেরা বুঝতে পারতেন না। তাঁরা ডঃ কালামের কাণ্ড দেখে অবাক হতেন। 

কিন্তু ডঃ কালামের মুখের অভিব্যক্তি দেখে বোঝা যেত তিনি অর্জুনের সঙ্গে ভাব বিনিময় করার ভাষা জানেন। একসময় বন্ধুর সঙ্গে দিলখোলা আলাপচারিতায় তৃপ্ত ডঃ কালাম ফিরে আসতেন তাঁর ঘরে। ফেরার আগে হাত তুলে সেদিনের মত বিদায় জানাতে ভুলতেন না।

১০ নং রাজাজি মার্গের বাংলো এবং ছবির বামদিকে কালামের প্রিয় বন্ধু অর্জুন

“পৃথিবীকে কিছু দেওয়ার জন্য বেঁচে আছে অর্জুন”

২০১২ সালের এক সকালে ডঃ কালাম ও  সৃজন পাল সিং বাগানে হাটছিলেন। সৃজন পাল সিং ছিলেন কালাম সাহেবের সহযোগী ও উপদেষ্টা। কালামের সঙ্গে বহুবছর ধরে ভ্রমণ ও অনান্য কার্যক্রমে অংশ নিয়ে আসছিলেন। মানুষ কালামকে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন।

সেদিন হাঁটতে হাঁটতে ডঃ কালামকে সৃজন পাল সিং জিজ্ঞেস করেছিলেন, “অর্জুনের মধ্যে বিশেষত্ব কী আছে স্যার ! তাকে কেন এত ভালোবাসেন আপনি ? কালাম দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। অবাক  বিস্ময়ের চোখে মিনিট খানেক তাকিয়েছিলেন সৃজন পাল সিংয়ের দিকে।

ডঃ কালামের সঙ্গে সৃজন পাল সিং

তারপর স্বভাবোচিত নরম গলায় ডঃ কালাম বলেছিলেন ,” ওকে ভালোবাসি, কারণ অর্জুন পৃথিবীকে কিছু দেওয়ার জন্য বেঁচে আছে। যে শুধু অন্যকে দেওয়ার জন্যই বেঁচে থাকে, সে আমার চোখে সবচেয়ে শ্রদ্ধার পাত্র।” কালামের চোখ গর্বে চকচক করে উঠেছিল।

তিনি বলেছিলেন,” অর্জুনের বেঁচে থাকার লক্ষ্য একটাই -আমি কী দিতে পারি, আমি আর কী দিতে পারি।  সেই জন্যই দেখুন অর্জুন আজও গর্বিতভাবে এবং আনন্দের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে এই বয়েসেও।” মাথা নিচু করে ফেলেছিলেন সৃজন পাল সিং। অনুভব করছিলেন, তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে ১১০ বছরের অর্জুন হাসছিল। এখানেই কাহিনীটির সমাপ্তি ঘটেনি।

“যান উত্তর খুঁজে আনুন”

ডঃ কালাম একদিন সিং সাহেবকে ডেকে পাঠিয়ে একটি অবাক করা প্রশ্ন করেছিলেন। বলেছিলেন, “আপনি বলতে পারবেন, ঠিক কতগুলি জীবন বাঁচিয়ে রেখেছে অর্জুন?” সিংজি এবারও হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন। বড়ই কঠিন প্রশ্ন। মিটিমিটি হেসে ডঃ কালাম বলেছিলেন, “যান উত্তর খুঁজে আনুন”।

সিংজি গিয়ে অর্জুনের ডালে সঙ্গে পাকিয়ে থাকা ১১ টি লতা গুণে এলেন। ডঃ কালামকে বললেন, “স্যার অর্জুন ১১টি জীবন বাঁচিয়ে রেখেছে। এছাড়াও পৃথিবীকে অক্সিজেন দিচ্ছে।” ভুরু কুঁচকে হেসেছিলেন কালাম, বলেছিলেন,” ওহ , আপনি অর্জুনের গায়ে পাখির বাসা দেখতে পাননি! তাহলে তো আবার যেতে হবে আপনাকে”।

বয়েসের ছাপ অর্জুনের শরীরে তবুও সতেজ তরুণের মত দৃপ্ত সে

আবার অর্জুনের কাছে গেলেন সিংজি। এই কাজটি বেশ কঠিন। কারণ অর্জুনের সারা শরীর পাতায় ভর্তি। পাতাগুলি ভেতরের ডালগুলিকে ঢেকে রেখেছে। তবুও সিংজি বিভিন্ন প্রজাতির পাখিদের ১২টি বাসা দেখতে পেলেন। ফিরে এলেন কালামের কাছে। মাথা চুলকে বলেছিলেন,” স্যার অর্জুন ১১টি লতা আর ১২ টি পাখির বাসাকে আশ্রয় দেয়।”

হাতে ধরা বইটি থেকে মুখ তুলেছিলেন কালাম, “আবার আপনি কিছু মিস করে এলেন। এ বার চলুন আমার সঙ্গে।” দুজনে এসে দাঁড়ালেন অর্জুনের সামনে। অর্জুনের গুঁড়ির নীচে ঘন ঝোপ। সেই ঝোপের দিকে আঙুল দেখালেন। তারপর নিজেই সন্তর্পণে ঝোপ ফাঁক করলেন।

সিংজিকে বললেন, “দেখুন আপনি এটা দেখতে পেয়েছেন?  পাননি।” অবাক বিস্ময়ে সিংজি দেখেছিলেন ঝোপের ভেতর লুকিয়ে আছে ময়ুরের একটি বাসা। যেখানে এক ময়ূরী কয়েকটা ডিম পেড়েছিল।

সিংজি বলেছিলেন, “হ্যাঁ স্যার আমি এটা মিস করেছি।” কালাম সিংজির পিঠে হাত রেখে বলেছিলেন,

“কেন জানেন ? আমরা প্রায়শই সেই সব সমস্যার সমাধান করতে যাই, যেগুলি আমাদের মাথার ওপরে থাকে। সেই জন্য সমস্যা গুলি জটিল ও বিশাল দেখায়। আমাদের মন প্রথমেই ওইদিকেই যেতে বলে। আর এই জন্যেই আমরা নীচে থেকে আসা, মাটির কাছ থেকে আসা প্রেরণাগুলিকে অবহেলা করি।

অর্জুনের ছত্রছায়ায় থাকা বৃহত্তম পাখির বাসাটি  এবং এর ভিতরে থাকা ফুটতে যাওয়া জীবনগুলিকে আপনি দেখতে ভুলে গেছেন। কারণ বাসাটি মাটিতে ছিল। শিকড়ের কাছাকাছি ছিল। একটা কথা জানবেন, হীরে মাটির ভেতর লুকিয়ে থাকে। আকাশের উচ্চতায় থাকেনা।” 

সেদিন সিংজি অনুভব করেছিলেন কালাম-অর্জুনের বন্ধুত্বের গভীরতা ও স্বরুপ।

“পাখি বন্ধুরা খেলো?”

কয়েক সপ্তাহ পরে, ময়ুরের বাসাটি প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠেছিল। ১০ নম্বর রাজাজি মার্গের নতুন সদস্য হয়েছিল ৫ টি ময়ূর ছানা। কালামের ইচ্ছায় বাংলোর ডাইনিং রুমের পিছনের জমিতে ফিডারের সাহায্যে ময়ূর ছানাদের খাওয়ানো শুরু হয়েছিল।

রোজ ডাইনিং রুমে খাওয়া শুরু করার আগে কালাম জানতে চাইতেন ময়ূরছানারা খাওয়া শুরু করেছে কিনা। ইতিবাচক উত্তর পাওয়ার পর তিনি খাওয়া শুরু করতেন। পরবর্তীকালে ময়ূর ছানাদের সঙ্গে আরও পাখি জুটেছিল। পায়রা, টিয়াপাখি, কোকিল, ময়না, চড়াই, দাঁড়কাক।

লম্বা কোনও ট্যুর থেকে ফিরে সবার আগে কালাম দেখা করতেন বন্ধু অর্জুনের সঙ্গে। ক্লান্ত শরীর নিয়েও কুশল বিনিময় করতেন। নিজে ঘুরে ঘুরে দেখতেন তাঁর প্রিয় বন্ধু ও বন্ধুর পরিবারের সবাই ঠিক আছে কিনা।

 বিদায় কালাম

২০১৫ সালের ২৭ জুলাই, আইআইএম শিলং-এর মঞ্চে “Creating a Livable Planet Earth” বিষয়ে বক্তৃতা দেওয়ার সময়েই চিরকালের জন্য অর্জুনকে ছেড়ে বিদায় নেন কালাম। পরের দিন, সামরিক শকটে করে নিস্পন্দ কালাম ফিরে এসেছিলেন ১০ নং রাজাজি মার্গের বাংলোয়। সারা ভারত সেদিন কেঁদেছিল।

প্রাক্তন প্রেসিডেন্টকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখোপাধ্যায়

বাংলোর হলঘরে শুয়েছিলেন কালাম। ফুলে ফুলে ভরে উঠেছিল কালামের শবাধার। সকলের অলক্ষ্যে, সন্ধ্যার বৃষ্টিকণা হয়ে ঝরে পড়ছিল অর্জুনের অগনিত সবুজ চোখের জল। কান্নায় কাঁপতে থাকা শরীর থেকে অবিরাম ঝরে পড়ছিল হলুদ ফুল।

অর্জুন ভাবছিল, উদভ্রান্ত বাতাস যদি মাত্র একটিবারের জন্য বাড়ির ভেতর পৌঁছে দেয় একটি হলুদ ফুল। যে ফুলের গায়ে লেগে আছে, ফুলের মত মানুষটির জন্য অর্জুনের শেষ চুম্বন।

Comments are closed.