অসুখ যেন অভিশাপ! ‘হাড়ে সোনা আছে’, তাই মানুষ শিকার করে হাত-পা কেটে নিচ্ছে মানুষই!

২২

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

শুধু জীবজন্তুই নয়, খোদ মানুষকেও ‘শিকার’ করে মানুষই!

না, কোনও দ্বন্দ্বে বা যুদ্ধকালীন হত্যাকাণ্ডে নয়। অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে নেওয়ার জন্য মানুষ শিকারের ঘটনা ঘটছে আফ্রিকার কয়েকটি দেশে, এই ২০১৯ সালেও। যদিও এই শিকার পদ্ধতি নতুন নয়। ঘৃণ্য এই কাণ্ডটি চলছে বহু দিন ধরেই। এটা বন্ধ করতে কম লড়াই করেনি মানবাধিকার সংগঠনগুলি।

কিন্তু সাম্প্রতিকতম একটি ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই আরও এক বার পরিষ্কার হয়ে গেছে, লড়াই রয়েছে লড়াইয়ের জায়গায়। মানবাধিকারের কোনও তোয়াক্কা না করেই এখনও অবাধে চলছে মানুষ শিকার। কেটে ফেলা হচ্ছে তাদের হাত-পা, বিক্রি করা হচ্ছে হাড়! না, যে-সে মানুষ নয়। এই কাজের জন্য টার্গেট করা হচ্ছে, ‘অ্যালবিনিজ়ম’ রোগে আক্রান্ত অ্যালবিনো মানুষদের।

এ ভাবেই শিকার করে হাত কেটে নেওয়া হয় অ্যালবিনোদের!

বাংলায় সে রোগের নাম শ্বেতী। তবে এ ক্ষেত্রে শরীরের কিছু অংশে সাদা ছোপ নয়, জিনগত সমস্যায় তাদের ত্বকে মেলানিন নামক রঞ্জকের উপস্থিতি প্রায় না থাকায়, সারা গায়ের চামড়ার রং-ই অস্বাভাবিক রকমের ফ্যাকাসে ও সাদা হয়। আর সেই সাদা চামড়াই তাদের চিহ্নিত করে, ‘সোনার মানুষ’ হিসেবে। সোনার লোভেই তাদের শিকার করে কেটে ফেলা হয় হাত পা। মেরেও ফেলা হয়। নির্মম এ চিত্র আফ্রিকার দেশ জাম্বিয়া, তানজানিয়া, মোজাম্বিক ও মালাউয়ির।

গত বছরের ডিসেম্বর মাসে আচমকাই খোঁজ মিলছিল না তানজানিয়ার বাসিন্দা, চার বছরের ছোট্ট মেয়ে পেন্ডো ইম্যানুয়েল নানডির। তার বাবা পুলিশে অভিযোগ জানাতে গেলে, উল্টে বাবাকেই গ্রেফতার করে পুলিশ। দাবি করে, তিনি তাঁর মেয়েকে বিক্রি করে দিয়েছেন টাকার লোভে! কিন্তু কেন এক জন বাবা তাঁর মেয়েকে বিক্রি করবেন! কারণ তাঁর মেয়ে অ্যালবিনো। এবং এই অ্যালবিনিজ়মের কারণেই সে খুব সহজে শিকার হয়েছিল দুষ্কৃতীদের।

তথাকথিত সভ্যতার আলো থেকে পিছিয়ে থাকা আফ্রিকার এই দেশগুলিতে এখনও অন্ধ বিশ্বাস আছে, অ্যালবিনো মানুষের হাড়ে নাকি সোনা আর নানা ঔষধি পদার্থ থাকে। তাই তাঁদের ধরে, অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কেটে, হাড় বার করে, তা দিয়ে তৈরি হয় ওষুধও! আর এই অন্ধ বিশ্বাসের কারণে, কখনও কখনও অপহরণের পরে হাত-পা কেটে তিলে তিলে মেরেও ফেলা হয় অ্যালবিনোদের। আর স্থানীয় ওষুধ ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি হয়ে যায় তাঁদের দেহের নানা অংশ। গোপনে।

এ সব কুসংস্কার বন্ধ করতে যে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকার চেষ্টা করেনি, তা নয়। তানজানিয়ায় যেমন কঠিনতম নির্দেশ আছে, অ্যালবিনো-শিকারি ধরা পড়লেই যেন সর্বোচ্চ বিচারে মৃত্যুদণ্ড হয়। কিন্তু তার পরেও হামেশাই ঘটে চলছে, অ্যালবিনো শিকার। পেন্ডোর ঘটনা প্রকাশ্যে না এলে হয়তো ফের আলোচিতও হতো না এই ঘৃণ্য অভ্যাস।

পুলিশ এবং কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে শেষমেশ উদ্ধার করা হয় ছোট্ট পেন্ডোকে। তবে জীবিত অবস্থায় নয়, হাত-পা কাটা, মৃত অবস্থায়। আশঙ্কা অবশ্য আগেই ছিল, তাকে জীবিত পাওয়া যাবে কি না। জীবিত পাওয়া গেলেও, তার শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলি আস্ত থাকবে কি না। ঠিক যেমন নৃশংস ভাবে হাত কাটা অবস্থায় ফেরত পাওয়া গেছিল ১০ বছরের আর এক ভাচ্চা মিউয়িগুলু মাটোনাঙ্গেকে। স্কুল থেকে ফেরার পথে আচমকা অপহৃত হয়েছিল সে।

২০১৩ সাল থেকে সামনে আসতে শুরু করেছিল এই অ্যালবিনো-শিকারের ঘটনাগুলি। সরকারি হিসেব বলছে, এ পর্যন্ত ৭৪টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে অ্যালবিনো মানুষদের উপর। ৫৯ জন হাত-পা কাটা অবস্থায় কোনও ভাবে বেঁচে গিয়েছেন প্রাণে। বলাই বাহুল্য, খুন হয়ে যাওয়া অ্যালবিনোর সংখ্যা এই সরকারি হিসেবের থেকে আরও অনেকটা বেশি। এ ছাড়াও, কবর থেকে কত অ্যালবিনো মানুষকে যে তুলে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে হাড়ের জন্য, তার ইয়ত্তা নেই।

কখনও কখনও খোদ কোনও অ্যালবিনো মানুষই শিকারির দেখানো লোভের ফাঁদে পড়ে যান। মোটা টাকার বিনিময়ে রাজি হয়ে যান পরিবারের কারও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ শিকারিদের হাতে তুলে দিতে। তথ্য বলছে, শুধু ওষুধ তৈরি বা সোনা খোঁজা নয়। অনেকে বিশ্বাস করেন, অ্যালবিনো মানুষের হাড় ঘরে রাখলে সমৃদ্ধি আসে, সৌভাগ্য বাড়ে। তিন থেকে চার হাজার মার্কিন ডলারে বিক্রি হয় এক এক জন অ্যালবিনো মানুষের হাত বা পা। সারা দেহের হাড় কেউ কিনতে চাইলে তার দাম পড়ে ৭৫ হাজার থেকে এক লক্ষ মার্কিন ডলার।

অ্যালবিনোদের হাড় ও হাড় থেকে তৈরি ওষুধ।

তাই কুসংস্কারে আচ্ছন্ন গরিব এলাকায় যে খুব সহজেই অ্যালবিনোরা আক্রান্ত হবেন, তাতে আর আশ্চর্য কী! আট বছরের একটি অ্যালবিনো মেয়ে যেমন বলছিল, “আমি ঘুমোচ্ছিলাম মায়ের পাশে। ঘুম ভেঙে গেল শব্দে। চোখের সামনে দেখলাম বাবা আর কয়েকটা লোক এসে আমার মাকে জোর করে আটকে, হাত কেটে নিয়ে চলে গেল। আমার বাবার কাঁধে মায়ের হাত– আমি নিজে দেখলাম।”

তথ্য ও গবেষণা বলছে, আফ্রিকার সাহারা মরুভূমি ঘেঁষা দেশগুলোয় এই অ্যালবিনিজ়ম অসুখের প্রভাব সব চেয়ে বেশি। আর ওই অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে অশিক্ষার কারণে কুসংস্কারের হারও এত বেশি যে, সামাজিক অবহেলার কারণে তাঁদের কার্যত একঘরে হয়ে থাকতে হয়। আর এই অসহায় মানুষগুলোই সোনা এবং ওষুধের লোভে, হাড়ের লোভে শিকার হন ‘সভ্য’ মানুষের লালসার!

তবে শেষ কয়েক বছরে কোনও কোনও অ্যালবিনো মানুষের সঙ্গে ভিন্ গোষ্ঠীর মানুষের বিয়ে বা পরিবার তৈরি হওয়ায়, কোনও কোনও অ্যালবিনো পরিবারে স্বাভাবিক চামড়ার শিশু জন্মাচ্ছে। ঠিক একই ভাবে, কোনও কোনও কালো চামড়া অর্থাৎ স্বাভাবিক চামড়ার পরিবারেও জন্মাচ্ছে অ্যালবিনো শিশু। ফলে ভয় ঢুকে যাচ্ছে সেখানেও।

ইতিহাস বলছে, সোনার জন্য মানুষ কত কিছুই না করেছে সারা পৃথিবী জুড়ে। কত রকমের ‘গোল্ড রাশ’ চলছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। কেউ দুর্গম পাহাড় পেরোচ্ছে, কেউ অতল সাগরে নামছে। কিন্তু তাই বলে, সোনার জন্য মানুষ শিকার করে খুন করা, এই ২০১৯ সালেও! এক অ্যালবিনোর কথায়, “পশুর মতো সিঁটিয়ে থাকি আমরা, সাদা চামড়ার মানুষগুলো। আমরা লুকিয়ে থাকি। ভয়ে-ভয়ে থাকি, কখন শিকার হয়ে যাব, নিজেরাও জানি না।”

এই সাদা চামড়া, অর্থাৎ অদ্ভুত চর্মরোগ অ্যালবিনিজ়মের কারণেই মানুষগুলি ‘অমূল্য’ করে তুলেছে৷ কারণ তাঁদের মেরেই লাখপতি হচ্ছে শিকারির দল৷ টাকার স্বপ্নে বিভোর শিকারির দল তাদের মেরে দেহ থেকে খুবলে নেয় হাড়৷ এই হাড়ই কিনে নেয় স্থানীয় ওষুধ ব্যবসায়ীরা৷ কুসংস্কারে ছেয়ে থাকা স্থানীয় বাসিন্দারা অ্যালবিনো রোগীদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলেন৷ একঘরে হয়ে থাকা অ্যালবিনোরা শিকারিদের সহজ নিশানা হয়ে যায়৷ একলা পেয়ে অবহরণ করা হয় ওই অ্যালবিনো মানুষকে৷ তার পরে দেহ বিক্রি করে দেওয়া হয় চোরাকারবারিদের কাছে৷ কখনও চোরাকারবারিরাই মানুষগুলিকে শিকার করে।

অ্যালবিনোরা বলছেন, এ যেন এক অদ্ভুত লড়াই লড়তে হচ্ছে আজীবন। শিশু থেকে বৃদ্ধ, পরিবারের কোনও মানুষই নিরাপদ নন। এমনকী পরিবারের মানুষের তরফেও যে কখন কার উপর বিপদ আসবে, কেউ জানে না। কারণ তীব্র অভাব ও অনটনের কারণে লোভের ফাঁদে পা দেওয়া খুব অস্বাভাবিক নয় এই প্রান্তিক মানুষগুলোর কাছে। তার উপরে ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলা চোরাশিকারিদের আতঙ্ক তো আছেই। শুধু চামড়ার রঙের কারণে, জিনগত ত্রুটির কারণে তাঁরা যেন ‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরী’ দশায় বাস করছেন।

“এর থেকে মুক্তি কোথায়! কী ভাবে বাঁচব আমরা!”– এই হাহাকার নিয়েই এক একটা দিন পার করছেন মরু-আফ্রিকার সাদা মানুষগুলো।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More