শুক্রবার, ডিসেম্বর ৬
TheWall
TheWall

বাগদাদি নয়, আইসিস তৈরি করেন জর্ডনের আবু মুসাব আল-জারকাউই

রূপাঞ্জন গোস্বামী

২০০৩ সাল, ৯/১১-এর টুইন টাওয়ার হামলার আতঙ্ক কাটেনি আমেরিকার। আফগানিস্তানের তোরাবোরা গুহায় কার্পেট বোম্বিং করেও লাদেন ও আল-জাওয়াহিরিকে মারতে পারেনি আমেরিকা। সারা বিশ্বের জেহাদিদের কাছে ওসামা বিন লাদেন তখন মহানায়ক।

লাদেন সহ আলকায়েদার অনান্য সব বড় নেতাকে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের আদিবাসী এলাকায় বেঁধে ফেললেও, কখন লাদেন কী ঘটাবেন তাই নিয়ে আশঙ্কিত আমেরিকা। তারা চায় যেভাবেই হোক লাদেনের ওপর থেকে জেহাদি বিশ্বের নজর ও সমর্থন শূন্যে নামিয়ে ফেলতে হবে, একইসঙ্গে গলার কাঁটা ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে যেভাবেই হোক গদিচ্যুত করতে হবে।

এ্র জন্য দরকার তৃতীয় এমন একজনকে যে বিশ্বব্যাপী জেহাদের স্বপ্ন দেখে না। যার নজর আরব সীমানায় কেন্দ্রীভূত। যার আরবের দেশগুলিতে ধর্মীয় গৃহযুদ্ধ লাগিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আছে। সেই জেহাদির সঙ্গে সাদ্দাম ও লাদেনের সম্পর্ক স্থাপন করে তাকে খতম করার ইস্যু নিয়ে ইরাকের মাটিতে নামবে আমেরিকা।

৯/১১-এর টুইন টাওয়ার হামলা

পাওয়া গিয়েছিল তৃতীয় নাম

২০০১ সালে  কুর্দি সিক্রেট সার্ভিস আমেরিকাকে জানিয়েছিল এমন একটি নাম। ইরাকের মাটিতে এই বিদেশি জেহাদি ক্রমশ তার জমি শক্ত করছিল। সাদ্দাম ও লাদেনের সঙ্গে এই জিহাদির সম্পর্ক ছিল, তবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল না।

আমেরিকা গোয়েন্দারা সেই জিহাদির ঘাড়ে ২০০০ সালের জর্ডনে আত্মঘাতী হামলা, ২০০১ সালের ইজরায়েলের নাগরিক ইতঝাক স্নির ও ২০০২ সালের আমেরিকার নাগরিক লরেন্স ফলির হত্যার দায় চাপিয়েছিল। এছাড়াও  ৯/১১ পরবর্তী প্রায় সমস্ত বড় হামলায় সঙ্গে সেই জিহাদির যোগসূত্র  পেয়েছিল সিআইএ।

রাতারাতি বিশ্ব চিনেছিল এক অখ্যাত বেদুইন জেহাদি্কে

দিনটি ছিল ৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৩, রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের সাধারণ সভায় ভাষণ দিতে উঠেছিলেন কলিন পাওয়েল। বলেছিলেন, “ইরাক আজ ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসবাদীদের মুক্তাঙ্গন। যার মাথা হচ্ছে আবু মুসাব আল-জারকাউই, যে হচ্ছে ওসামা বিন লাদেনের  লেফটেন্যান্ট।”

আমেরিকা রাতারাতি আল-জারকোউইকে বিশাল উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল। ওসামা বিন লাদেন আর সাদ্দাম হোসেনের ছবি মুছে উঠে এসেছিল জারকাউই এর ছবি। পর্দার পিছনে শুরু হয়েছিল  আমেরিকা শুরু করেছিল ইরাক আক্রমণের সলতে পাকানো।

আবু মুসাব আল-জারকাউই

আল জাজিরা টিভির পর্দায় সেদিন নিজের নামটা শুনে চমকে উঠেছিলেন আল-জারকাউই। লাদেনের সঙ্গে তাঁর মতো সাধারণ জেহাদি মৌলবাদী আরব দেশগুলিতে হাজার হাজার আছে। পৃথিবীর কুখ্যাততম দুই সন্ত্রাসবাদীর তালিকায় যে তিনি থাকবেন তা স্বপ্নেও ভাবেনি আল-জারকাউই।

নিরাপত্তা পরিষদে কলিন পাওয়েলের ভাষণের মাত্র  একমাসের মধ্যে সমর্থন জুটিয়ে ইরাকে নামে মার্কিন বাহিনী। সাদ্দাম হোসেনকে গদিচ্যুত করে ২০ মার্চ।  নিরাপত্তা পরিষদে বলা পাওয়েলের কথাগুলি আপনা আপনিই ভবিষৎবাণীর রূপ নিতে শুরু করেছিল।

রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের সাধারণ সভায় ভাষণ দিচ্ছেন কলিন পাওয়েল

আহমেদ ফাদিল আল-খালাইলে

আবু মুসাব আল-জারকাউইয়ের আসল নাম ছিল আহমেদ ফাদিল আল-খালাইলে। জর্ডানের জার্কায় ১৯৬৬ সালের অক্টোবর মাসে বানি আহাসান নামে এক বেদুইন সম্প্রদায়ভুক্ত পরিবার জন্ম আবু মুসাব আল-জারকাউইয়ের। 

অসহনীয় দারিদ্র ছিল আল-জারকাউইয়ের নিত্যসঙ্গী। পড়াশুনো ছেড়ে  জড়িয়ে পড়েছিলেন স্থানীয় অপরাধ চক্রে কিছুদিনের মধ্যে অপরাধে জড়িয়ে জেলে যেতে হয়েছিল আল-জারকাউইকে। জেলের ভেতর জেলবন্দি মৌলবাদী নেতারা তাঁকে মৌলবাদের দীক্ষিত করেন। জেল থেকে জার্কার অদূরে ‘আল-হুসেন বেন আলি’ মসজিদে নিয়মিত যাতায়াত শুরু করেছিলেন। যেটি ছিল সন্ত্রাসবাদী তৈরির সূতিকাগার।

আল-জারকাউইকে রিক্রুট করে নিয়েছিল আরব-আফগান ব্যুরো নামে একটি জেহাদি সংস্থা, যারা সোভিয়েত রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য আফগানিস্তানে আরব গেরিলা পাঠাত। জারকাউইও অনেক ভেবে চিনতে মুজাহিদ হয়েছিলেন, কারণ মদ্যপ গুন্ডার চেয়ে মুজাহিদরা আরব বিশ্বে বেশি সম্মান পান।

জর্ডনের জার্কা, আল-জারকাউইয়ের জন্মস্থান

আবু মুহম্মদ আল-মাকদিসির সঙ্গে পরিচয়

১৯৮৯ সালে আল-জারকাউইকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল আফগানিস্তানে। পেশোয়ার সীমান্তে পরিচয় হয় আরব বিশ্বে বিখ্যাত সালাফি চিন্তাবিদ ও মৌলবাদী নেতা আবু মুহম্মদ আল-মাকদিসির সঙ্গে। ১৯৯৩ সালের শেষের দিকে দুজনে ফিরে আসেন জর্ডনের জার্কাতে।

মৌলবাদী নেতা ইসসাম বারকাউইওয়ের গুপ্ত জিহাদি গ্রুপ বায়াত আল ইমামে যোগ দিয়ে জর্ডনের শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পরিকল্পনা করেন। ১৯৯৪ সালের মার্চ মাসে মাকদিসি আর জারকাউইকে গ্রেফতার করে জর্ডন পুলিশ। দুজনকেই ১৫ বছরের জন্য জেলে পাঠানো হয়।

আবু মুহম্মদ আল-মাকদিসি

আল-সুয়াকার জেলে আল-জারকাউইকে কাটাতে হয়েছিল ৭ বছর। জেলে কাটানোর সময় তাঁর ব্যক্তিত্বকে পুরো বদলে ফেলেছিলেন আল-জারকাউই। সহ্য করেছিলেন প্রচুর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। আট মাসের বেশি তাঁকে রাখা হয়েছিল কুকুরের খাঁচার মতো একক সেলে। যে সেলের জানলা দিয়ে আসত জর্ডনের মরুভূমির উষ্ণ বাতাস।

সেলের বাইরে থাকার সময়টুকুর পুরোটাই জারকাউই ব্যয় করতেন শরীরচর্চা করে। জেলের ভেতরে জেলরক্ষীদের কাছে তিনি ছিলেন হায়নার দলের নেতাদের মতো। ভীষণ রগচটা ধাতের ছিলেন, সবসময় মারকুটে মেজাজে থাকতেন। যাঁকে বশে রাখা মুস্কিল ছিল।

১৯৯৯ সালের বসন্তে দুজনকেই মুক্তি দেওয়া হয়। মুক্তি পেয়ে আল-জারকাউই তৈরি করেছিলেন জামাত আল তৌহিদ ওয়াল-জিহাদ। এই সেই মূল সন্ত্রাসবাদী গ্রুপ, পরবর্তীকালে যার সঙ্গে বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী গ্রুপ মিলে তৈরি হয়েছিল আইসিস।

জামাত আল তৌহিদ ওয়াল-জিহাদ  গঠন করে  চেচনিয়ার বিদ্রোহে যোগ দেবেন বলে জর্ডন থেকে গোপনে পাকিস্তানে চলে যান জারকাউই। কিন্তু তাঁর চেচনিয়া যাওয়া হয়নি। ভিসা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও পাকিস্তানে থাকার জন্য গ্রেফতার করা হয় জারকাউইয়কে। জামিন পাওয়ার পর বিরক্ত জারকাউই গোপনে চলে যান আফগানিস্তানে ।

জামাত আল তৌহিদ ওয়াল-জিহাদের পতাকা

জারকাউইয়ের সঙ্গে বিন লাদেনের দেখা

আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের জন্য তখন লড়াই চলছিল নর্দান অ্যালায়েন্সের সঙ্গে তালিবান বাহিনীর।  ২০০০ সালের কোনও একটা সময়ে কান্দাহারের কোনও ডেরায় জারকাউইয়ের সঙ্গে দেখা হয় ওসামা বিন লাদেনের। দুজনে এসেছিলেন ভিন্ন দুটি আরব সমাজ থেকে। একজন শিক্ষিত, অত্যন্ত ধনী ও ক্ষমতাবান। অপরজন  ছিলেন অশিক্ষিত, দরিদ্র এবং ক্ষমতায় প্রথমজনের চেয়ে কয়েক আলোকবর্ষ দূরে।

লক্ষ্য ও পথের পার্থক্য ছিল দুজনের মধ্যে। লাদেনের চোখে ছিল আমেরিকার ধ্বংস ও পৃথিবীব্যাপী জিহাদের স্বপ্ন। জারকাউইয়ের চিন্তার পরিধি ছিল ক্ষুদ্র। তিনি আগ্রহী ছিলেন আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি বা তামিল টাইগারদের মতো স্থানীয় গ্রুপ করে স্থানীয় আমেরিকাপন্থী শাসকদের বিরুদ্ধে লড়তে।

ওসামা বিন লাদেন

ফলে লাদেন আল-জারকাউইকে আলকায়েদার আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী নেটওয়াকে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ জানানো সত্বেও আল-জারকাউই রাজি হননি। কিন্তু যাঁরা আল-জারকাউই চিনতেন তাঁদের মতে  জারকাউইয়ের  এরকমই। সামনে কে আছেন, তিনি কত বড় মাপের তার তোয়াক্কা করতেন না। তিনি কখনও কারও আদেশ মানেননি।

এরপর  আলকায়দা মিলিটারি অপারেশনের কমান্ডার সাঈফ আল-আদেল আল-জারকাউইকে স্বাধীনভাবে একটি সন্ত্রাসবাদী ট্রেনিং ক্যাম্প খুলতে অনুরোধ করেন। ২০০০ সালেই ইরান সীমান্তে আফগান শহর হেরাটে, তালিবানের আর্থিক সহায়তায় ঝুন্দ আল-শাম নামে ট্রেনিং ক্যাম্প শুরু করেন আল-জারকাউই।  হেরাট ক্যাম্প থেকে তৈরি হওয়া সন্ত্রাসবাদীরা জর্ডানে গিয়ে আত্মঘাতী হামলা চালাক। এটাই ছিল আল-জারকাউইয়ের একমাত্র লক্ষ্য।

গিয়েছিলেন ইরাকে

২০০২ সালের শুরুতে আমেরিকার আক্রমণে তালিবান সরকার পরাস্ত হয় আফগানিস্তানে। আল-জারকাউই পালিয়ে যান ইরাকের ফালুজায় তিনি আরেকটি সন্ত্রাসবাদী ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপন করেন এবং নতুনভাবে তোলেন জামাত আল তৌহিদ ওয়াল-জিহাদ গ্রুপকে। তিনি আঁচ করেছিলেন ইরাকে আমেরিকা হানা দিতে পারে। যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেন।

২০০৩ সালের মার্চে সাদ্দাম হোসেনের সরকারের পতন হয়। জারকাউই অপেক্ষা করেছিলেন আগস্ট ২০০৩ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত। আমেরিকানদের সঙ্গে প্রথমেই যুদ্ধ বাধাতে চাননি জারকাউই । কারণ তিনি জানতেন কোনওদিনই আমেরিকার ফাইটার জেট , মিসাইল ও হাইটেক অস্ত্রের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারবে না তাঁর দল। তিনি সুন্নি উগ্রবাদী সংগঠনগুলির জোট বাঁধার অপেক্ষায় ছিলেন।

অন্যদিকে সাদ্দামের অনুগত ও শিয়া ধর্মীয় নেতা মুক্তাদা আল-সদর ক্রমশ ইরাকে হয়ে উঠছিলেন আমেরিকা বিরোধী শক্তির প্রধান মুখ। জারকাউই ভয় পাচ্ছি্লেন আমেরিকার বিরুদ্ধে শিয়া আর সুন্নি এক না হয়ে যায়।

কারণ ২০০৪ এর বসন্তে আল সদরের বিপ্লব মুগ্ধ করেছিল সুন্নি সন্ত্রাসবাদীদের। সুন্নি এলাকায় ঝুলতে শুরু করেছিল আল সদরের পোস্টার। আল-জারকাউইয়ের পক্ষে যেটা মেনে নেওয়া সম্ভব ছিলনা। তাই আল-জারকাউই  প্রস্তুত হচ্ছিলেন দুটি যুদ্ধের জন্য। একটা আমেরিকার বিরুদ্ধে ও অন্যটি শিয়ার বিরুদ্ধে।

শিয়া নেতা মুক্তাদা আল-সদর

 আমেরিকার ফাঁদে পা দিয়েছিলেন আল-জারকাউই

২০০৩ সালের ১৯ আগস্ট বাগদাদের রাষ্ট্রসঙ্ঘের দফতরে বিস্ফোরণ ঘটান আল-জারকাউই। মারা যান ২২ জন। ২৯ আগস্ট নাজাফে শিয়াদের পবিত্র মসজিদে বিস্ফোরণ ঘটান আল-জারকাউই। মারা যান বিশিষ্ট শিয়া নেতা আয়াতোল্লা বাকের আল-হাকিম সহ ৮৩ জন।

২০০৪ সালের জানুয়ারি মাসে লাদেনকে লেখা আল-জারকাউইয়ের ১৭ পাতার চিঠি আমেরিকার হাতে আসে। সেখানে তিনি ইরাকে সুন্নি সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু শিয়াদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ লাগাতে চান বলে জানান। লাদেন চিঠিটি পেয়েছেন কিনা বা কী উত্তর দেবেন তার তোয়াক্কা না করেই ২০০৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি, শিয়াদের আশুরা উৎসবে বোমা বিস্ফোরণ ঘটান আল-জারকাউই। 

একইসঙ্গে বাগদাদ ও কারবালায় ১৮৫ জন শিয়ার মুণ্ডচ্ছেদ করে আল-জারকাউইয়ের বাহিনী।   ১১ দিন পরে গাড়িবোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে হত্যা করে ১০২ জন ইরাকি পুলিশকে। যাতে সাদ্দাম পরবর্তী শিয়া সরকারের সেনা ও পুলিশ আমেরিকাকে সাহায্য না করে।

 জেহাদি বিশ্বের নজর পুরোপুরি সরে যায় ওসামা বিন লাদেনের ওপর থেকে। সালাফি মৌলবাদীদের নয়নমণি হয়ে যান আবু মুসাব আল-জারকাউই। হয়ে ওঠেন আমেরিকা ও শিয়াদের বিরুদ্ধে জেহাদের একমাত্র মুখ।

২০০৪ সালের ৯ এপ্রিল আমেরিকান নাগরিক নিকোলাস বার্গকে অপহরণ করে মুণ্ডচ্চেদ করেন। এই হত্যা ছিল ইন্টারনেটে প্রচারিত প্রথম হত্যাকাণ্ড যা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায়। এর পরেও ২০০৪ সালের অক্টোবরে ক্যামেরার সামনে ব্রিটিশ নাগরিক কেন বিগলের মুণ্ডচ্ছেদ নিজের হাতে করেন আল-জারকাউই। সারা বিশ্ব শিউরে ওঠে আল-জারকাউইয়ের নৃশংসতায়।

৩৫ বছরের এক স্কুলছুট জেহাদি আল-জারকাউইয়ের মাথার দাম আমেরিকা রাখে ২৫ মিলিয়ন ডলার। সাদ্দাম হোসেন, ওসামা বিন লাদেনের মাথার দাম যা ছিল, আবু মুসাব আল-জারকাউইয়ের মাথার দাম তাই রেখেছিল আমেরিকা। তিনজনের উচ্চতা এক বোঝাতে।

অবশেষে লাদেনের প্রশংসা পেলেন আল-জারকাউই

২৭ ডিসেম্বর ২০০৪ ,আল জাজিরা চ্যানেল প্রচারিত এক ভিডিওতে বিন লাদেন অবশেষে আল-জারকাউইয়ের প্রশংসা করেন। জারকাউইকে তানজিম কাইদাত আল জিহাদ ফি বিলাদ আল রাফিদাইন বা  আল কায়েদার ইরাক (একিউআই) আমীর ঘোষণা করেন।

লাদেনের কথা মতো ২০০৬ সালে তৈরি করেছিলেন ছ’টি সুন্নি জেহাদি গ্রুপের সম্মিলিত সংগঠন মুজাহিদিন সুরা কাউন্সিল। যারা লড়াই শুরু করেছিল পশ্চিমী জোটের বিরুদ্ধে। ছ’টি গ্রুপ হল,  আল কায়েদা (ইরাক), জৈশ আল-তাইফা আল-মানসুরা, কাতবিয়ান আনসার আল-তৌহিদ ওয়াল সুন্নাহ, সারায় আল-জিহাদ গ্রুপ, আল-ঘুরাবা ব্রিগ্রেডআল-আহওয়াল বিগ্রেড। আল-জারকাউই হয়েছিলেন সদ্যগঠিত মুজাহিদিন সুরা কাউন্সিল-এর প্রথম আমীর।

আল-জারকাউইওকে ইরাকের আলকায়দা শাখার আমীর করলেন বিন লাদেন

আল-জারকাউই মাথার ভিতর ঘুরছিল ইরাক ও খিলাফতের সময়কার প্রদেশ বিলাদ আল-শাম (বৃহত্তর সিরিয়া) এলাকা নিয়ে ‘খিলাফত’ প্রতিষ্ঠার প্ল্যান। তার জন্য একটি আন্তর্জাতিক ও সেনাবাহিনীর মতো যুদ্ধে পটু একটি জেহাদি সংগঠন তৈরির প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছিলেন আল-জারকাউই। সংগঠনটির নাম নিয়েও ভাবছিলেন। আলকায়দার সঙ্গে আল-জারকাউইয়ের বিচ্ছেদ আসন্ন হল। অন্যদিকে জারকাউইকে মারার প্রস্তুতি শুরু করেছিল আমেরিকা।

৭ জুন, ২০০৬

বাগদাদের ৩০ মাইল উত্তর-পূর্বে দিয়ালা প্রদেশের বাকুবা। সেখানে বসে নতুন সংঘঠনটির চূড়ান্ত খসড়া তৈরি করছিলেন জারকাউই। সঙ্গে ছিলেন অতি ঘনিষ্ঠ কিছু সহযোগী। ইরাকি সিকিউরিটি ফোর্সের কাছে পাকা খবর দিয়েছিল স্থানীয় সোর্স। রাতের আঁধারে উড়ে এসেছিল দুটি এফ-সিক্সটিন ফাইটার জেট। দুটো ৫০০ পাউন্ডের বোমা ফেলেছিল চিহ্নিত বাড়িটির ওপর।

আমেরিকার আক্রমণে নিহত হন ৬ জন। তাঁদের মধ্যে একজন মহিলা ও একজন কম বয়সী পুরুষও ছিলেন। আর ছিলেন
৩৯ বছরের আবু মুসাব আল-জারকাউইও। তাঁর ফিঙ্গারপ্রিন্ট, শরীরে থাকা আগের ক্ষত চিহ্ন আর ট্যাটু দেখে নিশ্চিত হয় ইরাকি ও মার্কিন গোয়েন্দারা। কিছুদিন পরে আল-জারকাউইয়ের শবদেহের ছবি প্রকাশ করে আমেরিকা।

এখানেই বোমা ফেলেছিল আমেরিকা

আবু মুসাব আল-জারকাউইয়ের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ইরাকের আলকায়দা ভেঙে গিয়েছিল। জামাত আল তৌহিদ ওয়াল-জিহাদ  সংগঠন ও আল-জারকাউইয়ের অনুগত দেশি ও বিদেশি জেহাদিরা আল-জারকাউইয়ের বাকি কাজটা সম্পূর্ণ করে।

আবু মুসাব আল-জারকাউইয়ের মৃত্যুর কয়েক মাস পর, ২০০৬ সালের ১৩ অক্টোবর আত্মপ্রকাশ করে আল-জারকাউইয়ের তৈরি করে যাওয়া সেই সংগঠন। নাম আদ দাওলাহ আল ইসলামিয়া ফি আল ইরাক ওয়াশ শাম বা ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড শাম। দুনিয়া জুড়ে আতঙ্কের ঝড় তোলা যে সংগঠনকে দুনিয়া চেনে আইসিস নামে।

Comments are closed.