কালী ব্যানার্জী কাজের জন্য হাজির হন অঞ্জন চৌধুরীর দরজায়

৪,৬৭৪

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এয়ারফোর্সে নাম লিখিয়ে বাড়িতে কিছু না বলে পঞ্জাবে ট্রেনিং নিতে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু ছেলের খবর পেয়ে বাবা ওদের কলকাতার আপিসে ঘোরাঘুরি করে ঘরের ছেলেকে ঘরে ফিরিয়ে আনেন। তাতেও রক্ষে নেই ,পলাতক মন আবার দিল্লির ওয়ারলেস হেডকোয়াটার্সে চাকরি নিয়ে পালালো। ছেলেটি থাকত তখন লালকেল্লায়। কিন্তু সেখানে ইংরেজ শাসনের হিংস্রতা দেখে পালিয়ে আসেন। কলকাতায় ফিরে এসে আমেরিকান সেনা হাসপাতালে দো-ভাষীর কাজ নিলেন। সেখানেও মন টিঁকলো না। এরপরেই চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ। হিরন্ময় সেনের ‘বার্মার পথে’ ছবিতে প্রথম অভিনয় তাঁর। তুলসী নামে একটি ভিলেন চরিত্রে।
তিনি কালী বন্দ্যোপাধ্যায়। পুরো নামটা অনেকেরই অজানা, কালীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়। যার জন্মশতবার্ষিকী আজ। ২০ নভেম্বর ১৯২০ জন্ম।

পরিবারের গল্প:

আদি নিবাস ঢাকা,বিক্রমপুর। যদিও কালী ব্যানার্জী সেখানে কোনদিন যাননি। কলকাতারই ছেলে তাই কালী। লেক মার্কেটে পৈত্রিক বাড়ি। বাবা ছিলেন মণীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, পেশায় বড় উকিল। মা গৃহবধূ, অসাধারণ সুন্দরী ভবানী দেবী। এগারো জন ভাইবোন ছিলেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায়রা। ছোট থেকেই ফুটবল, লাঠি খেলা, ছোরা খেলায় পারদর্শী ছিলেন কালী। 
ওঁনাদের বাড়িতে একটা নোনা ফলের গাছ ছিল। যেদিন কালী জন্মগ্রহণ করেন সেদিন প্রথম নোনা ফল পেকেছিল গাছে তাই কালীর ডাক নাম হল নোনা।
বামপন্থী মনোভাবাপন্ন লোক ছিলেন। কমিনিউস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন তাঁর ভাবী স্ত্রীও। আই.পি.টি.এ তে অভিনয় করার সুবাদে স্ত্রী প্রীতি দেবীর সঙ্গে আলাপ। দুজনেই প্রথম যৌবন থেকে বামপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী সেখান থেকেই একসাথে কাজের সূত্রে প্রেম থেকে পরিণয়। তখনকার দিনে রেজিস্ট্রি করে বিয়ে। কালী বাবুর এক মেয়ে। দুই নাতনি।

কালীর প্রতিযোগী ছিলেন উত্তমকুমার
———-
এবার চলে আসি কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিল্পী সত্ত্বা প্রসঙ্গে, কালী বন্দ্যোপাধ্যায়কে যে ছবি প্রথম খ্যাতি ও পরিচিতি এনে দিল তা ছিল ‘বরযাত্রী’। গণশার চরিত্রে আইকনিক কালী। কালী ব্যানার্জ্জীর কথায় একটু তোতলানো ভাব ছিলই জন্মসূত্রে। গণশা চরিত্রটাও ছিল তোতলার। তাতেই হিট করে গেলেন কালী। কিন্তু অভিনেতা হিসেবে স্বীকৃতি পেতে লেগে গেল আরও দশ বছর। উত্তম-সুচিত্রার রোম্যান্টিক যুগে একা কালী বাবু বিভিন্ন প্রান্তিক মানুষের চরিত্রে অভিনয় করে একের পর এক ছবি হিট করে প্রশংসিত হচ্ছেন। সেই লড়াইটা ছিল কঠিন এবং আশ্চর্যের। তাঁর কোনও নায়িকা লাগত না,জুটি লাগত না সমস্ত খেটে খাওয়া মানুষের প্রতিমূর্তি হয়ে তিনি ছবির নায়ক হয়ে উঠতেন। যেমন ‘অযান্ত্রিক’ এ ভাঙা গাড়ির ড্রাইভার,’ডাকহরকরায়’ কাঁধে বোঝা নেওয়া ডাকহরকরা (এই ছবিটি লুপ্ত, কী করে বুঝবেন আর কালী বাবুর অভিনয় ক্ষমতা), ‘লৌহকপাট’ এ নরঘাতী ফকির,’বাড়ি থেকে পালিয়ে’ তে বৃদ্ধের ছদ্মবেশে যুবক ফেরিওয়ালা বা ‘রিক্সাওয়ালা’ ছবিতে দুর্দান্ত অভিনয়। আর যে ছবির কথা বলতেই হয় মৃণাল সেন পরিচালিত হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রযোজিত ‘নীল আকাশের নীচে’ তে নায়কের ভূমিকায় কালী বন্দ্যোপাধ্যায়। মুখে প্লাস্টার অফ প্যারিস,চুন ঢেলে চিনা ম্যানের আদল তাঁর মুখে আনা হল তাও পুরোটা এল না শেষমেষ নিজের অভিব্যক্তি দিয়ে সম্পূর্ন চিনা যুবক হয়ে উঠলেন। এই রোল উত্তম কুমার করতে উঠেপড়ে লেগেছিলেন কিন্তু চিনা ম্যানের আদল তাঁর মুখে এল না। উত্তমের নামে ছবি বেশি চলত। কিন্তু শেষমেষ কালীই বাজিমাৎ করলেন। লোক দেখল এক অনন্য কালী ব্যানার্জীকে। বড় খবর যেটা দিল্লীতে ছবিটি প্রদর্শিত হয় প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুকে দেখাতে। জওহরলাল কেঁদে ফেলেছিলেন এক চিনা ফেরিওয়ালার ভূমিকায় কালী ব্যানার্জ্জীর অভিনয় দেখে। আবার ‘তিনকন্যা’ র ‘মণিহারা’ র ফণিভূষণকে কি ভোলা যায়? ‘নাগরিক’,’টনসিল’,’পরশপাথর’,’কাবুলিওয়ালা’ তেও তাঁর উপস্থিতি অনবদ্য। দেবী চৌধুরাণীতে ভিলেন শ্বশুর হরবল্লভ যে প্রফুল্ল সুচিত্রা সেনকে বলবেন ‘চুরি করে হোক,ডাকাতি করে হোক নিজের অন্ন নিজে যোগাড় কর, গরীবের মেয়েকে আমরা বউমা করে ঘরে তুলব না।’ সেই লোভী নৃশংস ইংরেজদের স্তাবক কালীকে ভুলি কি করে?

কালী বন্দ্যোপাধ্যায় সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিক ত্রয়ীর ছবির নায়ক। যা আর কোনও অভিনেতা হতে পারেননি।

কিছুই না পেয়ে চলে গেছেন কালীদা।’ -মাধবী মুখার্জ্জী
———-
মাধবী মুখোপাধ্যায় শতবর্ষে কালী বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে জানালেন ‘ ‘প্রজাপতি’,’ক্ষুধা’ নাটকে কালীদার অভিনয় দেখেছিলাম অনবদ্য। যতগুলি মঞ্চ নাটক করেছেন সবকটি অসাধারণ। ছবি তো আপনারা জানেনই। একটা ছবি করেছিলেন নরেশ মিত্রর পরিচালনায় ‘কালিন্দী’। কালীদা অসাধারণ, ঐ ছবিতে সরজুবালা দেবী,সবিতা বসু চ্যাটার্জ্জীও ছিলেন। যে কোন রোলে ওঁনার তুলনা হয়না। সেই হিসেবে সেই সম্মান উনি পাননি। কিছুই পাননি এইটেই খারাপ লাগছে আজ ওঁনার শতবর্ষে। কিছু না পেয়ে চলে গেছেন। পরবর্তীকালে অঞ্জন চৌধুরীর অনেক ছবি করেছেন। অঞ্জন চৌধুরী অনেক করেছেন ওঁর জন্য। আমার বাড়িতেও আসতেন।বৌদির সঙ্গেও ভালো পরিচয় ছিল। শেষ কথা যেটা কালীদার সঙ্গে হয়েছিল সেটাই খারাপ লাগে আমার , বলেছিলেন ‘ মাধবী আমি কি ভালো কাজ পাব না?’

নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন কালী ব্যানার্জ্জীকে আনলেন অঞ্জন চৌধুরী
————-

বাংলা থেকে কালী বাবু বম্বেতেও গেছিলেন। হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়ের ‘বার্বুচি’ করেছেন। সেখানেও বিশেষ কিছু সুবিধা হল না। বাংলা ছবির টানেও ফিরে এলেন কলকাতায়। কিন্তু ততদিনে এখানকার পরিচালকেরা তাঁকে ভুলে গেছেন। সত্যজিৎ রায়,মৃণাল সেনরা কটা ছবি বছরে বানান আর তাতে কালী বাবুকে নিলে তবেই। এভাবে কি একজন শিল্পীর পেট চলে,সংসার চলে? একটা সময় ওঁনার হাতে কোন ছবি ছিল না,গাড়ির তেল কেনার টাকা ছিল না। তখন কালী ব্যানার্জীর কথা কোনও পরিচালকের মনে পড়েনি।
আর কিছুটা সারল্যে ভরা ভোলেভালা লোক ছিলেন। নিজে কত রোজগার করলেন সেই হিসেব জানতেন না। লেক মার্কেটে থাকতেন কিন্তু বাজার হিসেব করে করতে পারতেন না। সবটাই স্ত্রী প্রীতি বন্দ্যোপাধ্যায় সামলাতেন।

এ হেন মানুষ কাজ না থাকার অবসাদে ডুবে যাচ্ছিলেন। এমন সময় কালী ব্যানার্জীর অন্নদাতা হয়ে দেখা দিলেন অঞ্জন চৌধুরী। কি ছিল সেই ঘটনা?
প্রয়াত পরিচালক অঞ্জন চৌধুরীর পরিবার থেকে দুই কন্যা চুমকি চৌধুরী, রিনা চৌধুরী এবং জামাতা চুমকির স্বামী সজল ভট্টাচার্য তিনজনেই জানালেন সেই অঞ্জন চৌধুরীর কাছে কালী ব্যানার্জীর আসার ঘটনা। ‘গুরু দক্ষিণা’ র জন্য বাবা (অঞ্জন চৌধুরী) চিত্রনাট্য লিখছেন তখন। ভবেশ কুন্ডু প্রযোজক ছবির। গুরুদক্ষিণাতে বাবা গুরুর রোলে ভেবেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে। এমন সময় একদিন বাবাকে সিকিউরিটি গার্ড এসে খবর দিল একজন বয়স্ক পাগলা পাগলা গোছের লোক আপনার খোঁজ করছে। বাবা স্ক্রিপ্ট লেখা থামিয়ে বললেন ‘কে সে নাম বলেছে কিছু?’ তখন জানতে পারলেন বয়স্ক লোকটি বলেছে তাঁর নাম কালী ব্যানার্জী। সেটা শুনেই বাবা তড়াক করে উঠে বাইরে গিয়ে দেখেন হাত জোড় করে উনি দাঁড়িয়ে। বলছেন ‘আমার নাম কালী ব্যানার্জী, একজন অভিনেতা। তোমার নাম শুনেছি অঞ্জন চৌধুরী অনেক হিট ছবি কর। তোমার ছবিতে ছোট রোলে যদি আমায় নাও।’ বাবা তো তখন ওঁনার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলেন আপনি ভেতরে আসুন। ওঁনাকে বসিয়ে বাবা ভবেশ কুন্ডুকে বললেন ‘তোকে আর গুরু খুঁজতে হবে না, আমি গুরু পেয়ে গেছি। সৌমিত্র চ্যাটার্জ্জীকে গুরু সাজাতে হত কিন্তু কালী ব্যানার্জী গুরু হয়েই বসে আছেন।’ তার আগে আমাদের সঙ্গে পরিচয়ই ছিল না কালী জ্যাঠুর। ‘নীল আকাশের নীচে’ দেখেছি যা। ‘গুরু দক্ষিণা’র পর থেকে পরপর বাবার ছবি ‘ছোট বউ’, ‘বিধিলিপি’,’অভাগিনী’ অজস্র ছবিতে কাজ করে গেছেন। এবং গুরু দক্ষিণা তো আইকনিক হিট।’
অঞ্জন চৌধুরীর হাত ধরেই নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন রূপে কালী ব্যানার্জী এলেন।

সত্যজিতের ছবি করেছেন কিন্তু তার মানে সে আর ছবি করবে না সারাজীবন খেতে পাবেন না?

অনেক ফিল্মবোদ্ধাই বলেন সাদা উইগ পরে কালী ব্যানার্জী মেলোড্রামা করতেন। না, ওঁনার চুলটাই তখন সাদা ছিল। কখনও মেক আপ,অতি বেশভূষা লাগত না তাঁর। অন্নদাতা অঞ্জন চৌধুরী কালী ব্যানার্জীর মতোই গীতা দে’কেও কাজ দেন সব ছবিতে রাখেন। বাণিজ্যিক ছবি চললেই আর্ট ছবি চলে। প্রোডিউসাররা তবেই আসেন। শিল্পীদের সেরা অভিনয় কর্মাশিয়াল ছবিতেও থাকে। ‘ছোট বউ’ ছবিতে অঞ্জন চৌধুরীর লেখা মারকাটারি হাউসফুল ডায়লগ অন্ধ শ্বশুর কালী ব্যানার্জীর কণ্ঠে আজও সবার মুখে মুখে সুপারহিট। ‘আমি তো অন্ধ চোখে দেখতে পাই না, তাই চাকরি করতে পারি না। ভাবছি ব্যবসা করব। ভেড়া বেচব, চার পেয়ে ভেড়ার থেকে দু পেয়ে মেজো ছেলের মতো ভেড়া বেশি দামে বিক্রি হবে।’ এসব ডায়লগ আজও ইউটিউবে মিলিয়ন ভিউ। সপ্তাহ ব্যাপী হিট থেকে বাংলা ছবি এখন দিন হিসেবে হিট ধরা হয়। এতেই বোঝা যায় তখন কতটা বেশি বাণিজ্য করত বাংলা ছবি।

সত্যজিৎ রায় পরেরদিকের ছবিতে আর কালী ব্যানার্জীকে নেননি। এই প্রসঙ্গে সত্যজিৎ ইউনিটের অশীতিপর চিত্রগ্রাহক সৌমেন্দু রায় জানালেন ‘ কালীদা আমাকে ভাইয়ের মতো দেখতেন। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গেও ওঁনার হৃদ্যতাও ছিল শেষদিন অবধি। পরের দিকে নেননি সেটার কারণ সত্যজিৎ রায় যাকে যে চরিত্রে মানাবে তাকে সেই রোলেই নিতেন। অন্য কাউকে না। তাই আর কালীদার সঙ্গে কাজ করা হয়নি।’

সিরিয়াস দর্শকদের মন রাখতে একজন অভিনেতা বললেন সত্যজিৎ রায়ের ছবি করেছি আমি কিন্তু তার মানে সে আর ছবি করবে না সারাজীবন খেতে পাবেন না? এটা তো ফিল্মবোদ্ধারা ভেবে দেখেননা।

‘পয়সার চেয়েও রোলটা কি করছেন কালী জ্যাঠু ভাবতেন’ – রিনা চৌধুরী

কালী ব্যানার্জী তা বলে অভাব নিয়ে অত দুঃখযাপন করতেন না। বরং ছবিপ্রেমী মানুষ হিসেবে খুব ভোলেভালা ছিলেন। সিনেমার গল্প করতে করতে অন্য কাজ ভুলে যেতেন।
এ প্রসঙ্গে অঞ্জন চৌধুরীর ছোট মেয়ে রিনা চৌধুরী বললেন ‘কালী জেঠু ছাড়া বাবা নড়ত না। আমৃত্যু কালী জেঠুকে বাবা ছবিতে রেখেছেন ভালো ভালো রোলে। কালী জেঠুর কাছে পয়সার চেয়েও রোলটা কি করছেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখন তো সব দেখি দাঁড়িয়ে থাকার চরিত্র করেন আর্টিস্টরা। একটা মজার ঘটনা বলি, কালী জেঠু আমাকে বলেছে তোদের বাড়ি তো বেহালায়, চল আমায় নিউ আলিপুরে নামিয়ে দিবি। তখন মেয়ের বাড়ি নিউ আলিপুরে থাকতেন। আমাদের গাড়িতে আমি আর কালী জেঠু উঠেছি স্টুডিও থেকে বাড়ি ফিরছি। সিনেমার গল্প বলে চলেছে। এবার আমি বলছি তোমার বাড়ি কিন্তু আমি চিনিনা। কোথায় নামবে বল? তোমার বাড়ি কিন্তু ছাড়িয়ে যাবে। আর তাই হল। আমি বলছি কোথায় তোমার বাড়ি গো। তখন বলছে ‘আরে আমার বাড়ি পেছনে ফেলে এসছি নামিয়ে দে নামিয়ে দে?’
তখন আবার ব্যাক করে কালী জেঠুকে নামালাম। বাড়ি এসে আমাকে বাবাকে বলছি এই কাণ্ড। আমি তো হেসেই খুন। সিনেমা ধ্যান সিনেমা জ্ঞান। নিজের বাড়ি ভুলে গেছে।’

‘মেজো বউ’ তে আমায় আলুরদম রুটি খাইয়ে দিচ্ছে কালী জেঠু – চুমকি চৌধুরী
————-
চুমকি চৌধুরী যিনি অঞ্জন চৌধুরীর বড় মেয়ে হওয়ার সাথে কালী ব্যানার্জীর স্ক্রীন কন্যা হিসেবেও বিখ্যাত। চুমকি জানালেন ‘ কালী জেঠুর একশো বছর হয়ে গেল দেখতে দেখতে। মনে পড়ছে ‘অভাগিনী’ শ্যুটিংয়ে কালী জেঠুর আমাকে ছাতা দিয়ে মারার একটা দৃশ্য ছিল। আমাকে এমন মেরেছে যে আমার গাল ফুলে ঠোঁট কেটে গেছে। প্যাক আপ করে দিতে হল। এত ইনভলভমেন্ট! রোলের ভিতর ঢুকে যেত। কী ভাবে একজন শিল্পী ঐ রোলে একাত্ম হয়ে যান দেখার মতো। পরে বলছে তোর লেগেছে মা আয় বরফ দিয়ে দিই। কালী জেঠু বাবাকে খুব ভালোবাসত। বাবার কখনও শরীর খারাপ শুনলেই জেঠু নিজে ডাক্তার নিয়ে চলে আসত। বাবা রসগোল্লা খেতে ভালোবাসত বলে কালী জেঠু রসগোল্লা নিয়ে আসত। আর কালী জেঠু চিরকালই ভুলো মনের মানুষ। ফ্লোরে দেখেছি জেঠু খুব স্ক্রিপ্ট মুখস্থ করত ভুলে যেত বলে। একবার বাবা জেঠুকে ক্যামেরা একশন বলেছে কিন্তু জেঠুর ডায়লগ কিছু মিলছে না। তারপর কাট কাট। বাবা বলল কালীদা আপনি কী ডায়লগ বলছেন? তখন বলছে কেন আমি তো খাতা দেখেই ডায়লগ বলছি। পরে দেখা গেল অন্য ছবির স্ক্রিপ্টের খাতা নিয়ে চলে এসেছে । এমন ভুলো লোক। সেটাই মুখস্থ করে এই ছবিতে বলছে।
একটা সিন ছিল ‘মেজো বউ’ তে আমায় আলুরদম রুটি খাইয়ে দিচ্ছে কালী জেঠু। জেঠুর খাবার বাড়ি থেকে আসত সবসময়। জেঠিমা রান্না করে দিত। নিজেও রান্না করত। ঐ খাবার ছিল কালী জেঠুর বাড়ির।
ডাবিং করতে ভীষণ ভয় পেত। একদম পছন্দ করত না। ডাবিংয়েও চোখে গ্লিসারিন দিয়ে প্রচুর কাঁদত। এবার এত কাঁদত ততক্ষণে সামনে থেকে ছবি চলে যাচ্ছে। সেটা দেখতে পেতনা। তারপর বলত আমি এই ডায়লগটা বলিনি। খুবই মজার মানুষ ছিলেন। একবার তো পাগলের মেক আপ করে আমাদের বেহালার বাড়িতে এসে হাজির। স্টুডিও থেকে চলে এসছে। দারোয়ান চিনতে পারেনি ঢুকতে দেবে না। ঝামেলা হচ্ছে দেখে বাবা বেরিয়েছে। তখন কালী জেঠু বলছে ‘অঞ্জনকে তোদের ভয় দেখাব বলে এরকম সেজে এসছি।’

একবার বাজার করতে গেছে গাড়ি নিয়ে। বাজারে গিয়ে এক বাউলের পেছন পেছন চলে গেছে গান শুনে। বাউলের রোল করছিল নিজেও তখন। বাজার নিয়ে পরে বাড়ি ফিরেছে তখন জেঠিমা বলছে তোমার গাড়ি কই? তখন বলছে গাড়ি নিয়ে গেছিলাম নাকি! ততক্ষণে গাড়ি হাওয়া। আবার লেক থানায় গেছে গাড়ির খোঁজ করতে। সেখানেও গিয়ে গাড়ির নম্বর ভুলে গেছে। পুলিশ তাঁকে নিয়ে দিশেহারা। ‘

 

‘বাবুজি পিতাজি এসব না বলে শঙ্কর আমাকে বাপি বলে ডাকুক।’
————-

কালী ব্যানার্জীর আরেকটা বিখ্যাত ছবি ‘বাদশা’। সেখানে যে বাচ্চা ছেলেটি ছিলেন মাষ্টার শঙ্কর তিনি এখন অবসরপ্রাপ্ত বাংলার অধ্যাপক ডঃ শঙ্কর ঘোষ, জানালেন ‘ কালী ব্যানার্জীকে প্রথম দেখি রাধা ফিল্ম স্টুডিওতে। অগ্রদূত গোষ্ঠীর প্রধান বিভূতি লাহার অফিস ঘরটা ছিল রাধা ফিল্মস স্টুডিওতে। ওখানে ‘বাদশা’ ছবির কাজ হয়েছিল। এখন চলচ্চিত্র শতবার্ষিকী ভবন হয়ে গেছে। কালী ব্যানার্জীর সঙ্গে বিভূতি লাহা আমার আলাপ করিয়ে দিলেন। তখন কালী ব্যানার্জীকে প্রণাম করলাম। তখন বিভূতি লাহা আমায় বললেন ‘তুমি ওঁনাকে অভিনয়ে হারাতে পারবে? আমি অবিবেচক বালকের মতো বললাম ‘হ্যাঁ পারব।’ কারণ তার আগে অত ছোটবেলায় আমাদের সিনেমা দেখার চল ছিল না। আমি চিনতাম না এঁদের। আর ‘বাদশা’ ই আমার প্রথম ছবি। পরে বুঝেছি কত বড় অভিনেতার সঙ্গে কাজ করেছি।
কালী ব্যানার্জী একটা জিনিস লক্ষ্য করলেন যে আমি আমার নিজের বাবাকে বাপি বলে ডাকতাম। তখন উনি বিভূতি লাহাকে বললেন ‘খোকা দা (ডাকনাম বিভূতি লাহার), শঙ্কর আমাকে চিত্রনাট্যের এই বাবুজি পিতাজি এসব না বলে বাপি বলে ডাকুক।’
তখন থেকে সারা ছবি জুড়ে কালী ব্যানার্জীকে শুধু বাপি বলে গেলাম। এবং সেই ডাক কি যে মারাত্মক ছুঁয়ে গেছিল দর্শকদের তার নমুনা, সেই দৃশ্য যেখানে অসিতবরণের হাতে আমায় তুলে দিচ্ছেন কালী ব্যানার্জী এবং কালী ব্যানার্জী বলছেন ‘বাচ্চু আমি তোর কেউ নই। উনি তোর বাবা তুই ওঁনার কাছে চলে যা।’ তখন আমি বলে বলছি ‘বাপি তুমি আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছ?’ বেশ আমি চলে যাচ্ছি, আর কোনদিনও আসব না।’ ফ্লোরে সবাই কাঁদছে।সত্যিই দর্শকদের কাঁদিয়ে দিয়েছিল ঐ দৃশ্য।

কত বিখ্যাত গান বাদশা তে ‘লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া’, ‘শোন শোন মজার কথা ভাই’, ‘পিয়ারীলালের খেলা দেখে যা’। শ্যুটিংয়ে কুকুরটাকে আনা হয়েছিল চণ্ডী বাবু বলে একজন লোক লালবাজারে কুকুর সাপ্লাই করতেন তাঁর থেকে। ছাগল আর বাঁদরটা হচ্ছে যারা রাস্তায় খেলা দেখায় তাঁদের ছমাসের জন্য রাখা হয়েছিল স্টুডিওর মধ্যে। আমি একদিন বাঁদরটাকে কলা খাবি করে খুব উত্যক্ত করেছিলাম। আর বাঁদর দিল আমার গালে কামড়ে। দরদর করে রক্ত। কালী ব্যানার্জী, বিভূতি লাহা সব ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। সে যাত্রায় বাড়ি ফিরলাম। চোদ্দদিন চোদ্দটা ইঞ্জেকশান। আমি সুস্থ হলে আবার বাদশার শ্যুটিং শুরু হল। কথাটা যেটা কালী ব্যানার্জী সব ডেট ক্যান্সেল করলেন শুধু আমার জন্য। আমি সুস্থ হতে আবার কাজ হল। এরপর ‘বৌদি’ ছবিতেও ওঁনার সঙ্গে কাজ করেছি। তখন সরাসরি উনি আমার বাবার রোলে।
এই ছবির ঘটনা হচ্ছে আমার বাবার কারখানা লকডাউন হয়ে গেছে চাকরি নেই। মায়ের টিবি হয়েছে। সংসার চালাতে আমি কিশোর ছেলে অনেক টাকা নিয়ে ফিরেছি। তখন কালী ব্যানার্জী বলছেন তুই চুরি করেছিস ভিক্ষে করেছিস! বলে আমায় ঠাস করে চড়। পরে জানতে পারছে আমি জুতো পালিশ করে টাকা জোগাড় করে এনেছি। তখন আমায় উনি আর সন্ধ্যারাণী বুকে জড়িয়ে ধরেছেন। শট শেষে চড়ের চেয়েও সোহাগ করলেন বেশি।
পরে বড় হয়ে অঞ্জন চৌধুরীর ছবিতে নিউ থিয়েটার্স এক নম্বরে ছোট বৌ (স্ত্রীন শেয়ার নেই কিন্তু দেখা হত), বিধিলিপি অনেক ছবি করেছি। কালী ব্যানার্জীকে ভেবেই অঞ্জন চৌধুরী ‘সন্তান’ ছবির স্ক্রিপ্ট লেখেন। কালী ব্যানার্জী মারা যাওয়ায় সত্য বন্দ্যোপাধ্যায় (পি.এল.টি)কে নিলেন বাবার রোলে। মির্নাভা
মঞ্চেও আমাকে উনি ওঁনার অভিনীত ‘ক্যান্সার’ নাটক দেখতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ওঁনার শেষ যে নাটক আমায় নাড়া দিয়েছিল ওঁনাকে বলেওছিলাম ‘রঙমহলে ‘অভিনয়’ নাটক। তরুন কুমারের পরিচালনায় সত্য ব্যানার্জীর (বড়) গল্প নিয়ে নায়িকা সুব্রতা চ্যাটার্জ্জীর বাবার ভূমিকায় কালী ব্যানার্জী, দারুন কমেডি অভিনয় করেন। যা হাসিয়েছিলেন! শতবর্ষের অবসরে আমার প্রণাম জানাই ওঁনাকে।’

শুধু দিয়েই গেলেন,পাননি কোন পুরস্কার, সম্মান
———–

কিন্তু এতবড় শিল্পীও দুর্দশার শিকার হয়েছেন। এই ওঁনার ডায়লগ ভুলে যাওয়া নিয়ে। কল শো করতে গেছেন খোলা মাঠে। এবার মঞ্চে ডায়লগ ভুলে গেছেন স্মৃতিভ্রংশতার কারণে। ফিল্মে রিটেক হয়। মঞ্চে তো এক টেকই ফাইনাল। বিরতিতে একজন দর্শক গ্রীনরুমে গিয়ে ওঁনার হাতে পাঁচ টাকার নোট গুঁজে দিয়ে বলেছেন ‘পরেরবার যখন আসবেন ডায়লগ মুখস্থ করে আসবেন।’

শেষটাও মর্মান্তিক ‘তান্ত্রিক’ ছবির শ্যুটিং এ রেন মেশিনে নকল বৃষ্টিতে ভিজে ওঁনার নিউমোনিয়া হয়ে যায়। অবিরত বমি। রামকৃষ্ণ সেবা প্রতিষ্ঠানে দেওয়া হয়। সেখানে এসিতে নিউমোনিয়া আরো বাড়ে। শেষ অবধি মৃত্যু।
খেলা দেখানো শেষ করে পাড়ি দিলেন অনন্তলোকে।

তাঁর বাড়ি লেক মার্কেটে কালী ব্যানার্জী সরণী রাস্তা হবার কথা হয়েছিল সেটাও বাস্তবায়িত হয়নি। সংসারেও বাড়ির ভাগ নিয়ে অশান্তি ছিল। সবমিলিয়ে ১৯৯৩ সালের ৫ ই জুলাই মারা যান নীরবেই। উনি বামপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন কিন্তু তখনকার মন্ত্রীরা সেই অর্থে শেষ শ্রদ্ধা বড় করে কিছু করেননি এখনকার মতো।

মেয়ের বিয়ে আলাদা সংসার হলে, কালী বাবুর স্ত্রী প্রীতি দেবীও খুব একা হয়ে পড়েন। পরে টালিগঞ্জ পাড়ার সঙ্গে এই পরিবারের সম্পর্কটাও ক্ষীণ হয়ে আসে।

কিন্তু কালী ব্যানার্জী তাঁর ছবিগুলো দিয়েই ক্লাস মাসে চির প্রণম্য থাকবেন। আর একটা কথা শেষে বলি এখনকার যে ফেসবুক ট্রোল পেজগুলো কালী ব্যানার্জীর ছবি দিয়ে অশ্লীল মিম বানান তাঁরা আগে মানুষটাকে জানুন তারপর নিজেদের কর্ম বিচার করুন। এমন শিল্পী একটাই জন্মায়।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More