এই ‘কড়ক’ চায়ের সঙ্গে মিশে আছে ইতিহাস, রোজ ২৫০ ভিখারিকে চা-রুটি খাওয়ান ৯৪ বছরের গুলাব জি

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

চৈতালী চক্রবর্তী

গোটা শহর যখন বালিশের নরম আদরে গুটিসুটি ঘুমে কাবু, তখন ঘুম ভাঙে বৃদ্ধের। ঘড়ির কাঁটায় ঠিক রাত ৩টে। এক সেকেন্ডও এ দিক, ও দিক নয়। বয়স ওই ৯৪ বছর হবে। মেদহীন, টানটান শরীর বয়সের ভারে নুয়ে পড়েনি। এখনও শিরদাঁড়া সোজা করে হাঁটেন। অন্ধকার থাকতেই স্নান সেরে, তৈরি হয়ে গুটিগুটি পায়ে গিয়ে দোকান খোলেন। ভোর চারটের মধ্যে চায়ের জল বসে যায়। দরম দুধে জাল দিতে দিতে অতীতে হারিয়ে যান বৃদ্ধ। আদা, লবঙ্গ, এলাচ, তেজপাতার সঙ্গে উথলে ওঠা দুধের গন্ধে ঘুম ভাঙে জয়পুরের।

গণপতি প্লাজার উল্টো দিকে সরু পার্কিং এলাকা ধরে গেলে পড়বে মির্জা ইসমাইল রোড। রাস্তার উপরেই ছোট্ট দোকান। ভিতরটা কিছুটা বাড়িয়ে এখন বসার জায়গাও আছে। কাউন্টারে গেলেই দেখা মিলবে হাসিমুখে বসে আছেন এক বৃদ্ধ। পরনে সাদা ফুলশার্ট ও সোনালি পাড়ের সাদা ধুতি, মাথায় সাদা টুপি। সাধারণত এই পোশাকেই পরিচিত তিনি। গুলাব সিং জি ধীরাওয়াত। গোটা জয়পুর যাঁকে চেনে ‘গুলাব জি চায়ওয়ালা’ নামে। এই চা-এ চুমুক দিতে লাইন পড়ে যায় সাধারণ থেকে নামী-দামি ব্যক্তিত্বদের। স্বাধীনতার আগে থেকেই গুলাব জি-র ‘কড়ক চা’ দেদার বিকোচ্ছে জয়পুরে। হালে এই চায়ের নাম ছড়িয়েছে গোটা দেশে। দেশীয় ই-কমার্স সংস্থা জ়োমাটোও ফলাও করে খুঁটিনাটি জানায় ‘গুলাব জি চায়ে ওয়ালে’র।

জয়পুরের অলিতে গলিতে চায়ের দোকান। হঠাৎ করে গুলাব জি চায়ের এত চর্চা কেন! কার কারণ একটা নয়, একাধিক। শুরুটা হতে পারে গন্ধ ও স্বাদ দিয়ে। ধীরে ধীরে চায়ের গভীরে যাওয়া যাবে। ঘন সর পড়া দুধে নানা রকম মশলা দিয়ে ‘কড়ক চা’ষ গুলাব জি-র ভাষায় ‘মশলা ম্যাজিক।’ ধোঁয়া ওঠা মশলা ম্যাজিকে একবার যিনি চুমুক দিয়েছেন, তিনি ঘুরে ফিরে আসবেন। অনেকক্ষণ ধরে ফুটিয়ে গ্লাস ভর্তি ঘন কড়ক চা খেয়ে বলতেই হবে, ‘বাহ! ওস্তাদ..বাহ!’ মাটির গ্লাসে ফুটন্ত তন্দুরি চা পেতে হলে একটু সবুর করতে হবে। সকালের লাইনে ‘মশলা ম্যাজিক’, ঘন দুধ চা-এর ভিড় একটু পাতলা হলে, বিকেল-সন্ধে থেকে বানানো শুরু হয় তন্দুরি চা। এই চায়ের অধিকাংশ খদ্দের আবার ১৮ থেকে ৩০। কলেজ শেষে বা অফিস ফেরত এক ভাঁড় তন্দুরি চায়ের সঙ্গে মিলবে গুলাব জি-র খাস গল্প এবং প্লেট ভর্তি ‘বান মাস্কা।’

‘‘শুরুটা হয়েছিল বাপ-দাদাদের আমলে। তখনও দেশ স্বাধীন হয়নি। ১৯৪৬ সাল। রাস্তায় ঘুরে ঘুরে চা বেচেছি। ছোট্ট একটা ঠেলা ছিল। তারপর চালার ঘর। আর এখন পাকা দোকান,’’ ফের স্মৃতির পথে হারিয়ে গেলেন গুলাব জি। শুরু হলো তাঁর ‘চা’য়ে পে চর্চা।’ অভাব থেকে চাওয়ালার সফর নয়। খানদানী, রাজপুত বংশে জন্ম গুলাব জি-র। খাওয়া-পরার অভাব হয়নি কোনওদিন। তবে ছোট থেকেই নিজের পছন্দে চলতে ভালোবাসতেন গুলাব জি। বাবা-দাদার জমানো টাকায় আয়েশি জীবন নয়, বরং পরিশ্রম করে রোজগার করাতেই বেশি আনন্দ পেতেন। বলেছেন, ‘‘প্রথম যখন চা বেচব বলে মনে করি, বাড়িতে কেউ মেনে নেয়নি। জমিদার বংশের ছেলে রাস্তায় ঘুরে চা বেচবে, এতে সম্মান তো ধুলোয় মিশবে! তবে আমি মানতে রাজি ছিলাম না।’’ জমিদারের ছাপ মারা খোলস বাড়িতেই ফেলে, চায়ের কেটলি হাতে নতুন সফর শুরু গুলাব জি-র। নাম হয় ‘গুলাব জি চায়ওয়ালা।’

১৯৭৪ সাল। ভবঘুরে চায়ওয়ালা ততদিনে এক চালের ছোট্ট মাথা ঢাকার জায়গা খুঁজে নিয়েছেন। বেশ নামও হয়েছে তাঁর চায়ের। গুলাব জি-র কথায়, ‘‘তখনকার হিসেবে ১৩৪ টাকায় একটা ছোট্ট এক চালের দোকান হয়। পসারও বাড়তে থাকে। একজন, দু’জন পথচলতি মানুষের জায়গায়, ধরা বাঁধা খদ্দেরদের লাইন পড়ে। রোজগারও বাড়তে শুরু করে।’’ তবে শুধু চায়ে চুমুক দিয়ে মন ভরে না লোকের। খুচরো খিদে মেটাতে চায়ের সঙ্গে টা-ও সমান জরুরি। মুচমুচে নাস্তার ব্যবস্থা করেন গুলাব জি। শুরুটা হয় সিঙাড়া দিয়েই। তাতেই খুশি রোজকার চায়ের খদ্দেররা।

৭৩ বছর কেটে গেছে। গুলাব জি-র চায়ের দোকানে এখন সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত লম্বা লাইন। দোকান বন্ধ হয় রাত ১০টার পরে। রোজের খদ্দের চার হাজারেরও বেশি। কোনও কোনও দিন আবার ঝটিতি সফরে চা খেয়ে যান সেলিব্রিটিরাও। মশলা চায়ের সঙ্গে সিঙাড়া, বান মাস্কা, কচুরি বান সন্ধের মধ্যেই চেটুপুটে সাফ হয়ে যায়। অনেকেরই ধারণা গুলাব জি-র চায়ের একটা সিক্রেট রেসিপি রয়েছে, যেটা ৭৩ বছর ধরে সাবধানে আগলে রেখেছেন বৃদ্ধ। স্বাদের যে এই বৈচিত্র্য, সেটা ওই গোপন রেসিপির জন্যই সম্ভব হচ্ছে। তবে এই সিক্রেট রেসিপির থিওরি একেবারেই উড়ায়ে দিয়েছেন গুলাব জি। তাঁর কথায়, ‘‘আমার দোকানের চা আলাদা কিছু নয়। সেই একই চা পাতা, দুধ, মশলা যা সকলে ব্যবহার করে আমিও তাই করি। মানুষের ভালোবাসার সঙ্গে মিশে গেছে জয়পুরের ইতিহাস, তাই চায়ের স্বাদ একটু অন্যরকম লাগে।’’

চায়ওয়ালা হিসেবেই যে নামডাক আছে গুলাব জি-র এমনটা কিন্তু নয়। তিনি একাধারে সমাজকর্মীও। ফি দিন ভোর ৬টা থেকে তাঁর দোকানের সামনে লাইন দেন আড়াইশোরও বেশি ভিখারি। প্রত্যেককে এক গ্লাস করে চা আর চার টুকরো মাখন রুটি যত্ন করে খাওয়ান গুলাব জি। ভোর বেলা তাঁর দোকানে গেলেই দেখা যাবে, রাস্তায় পাত পেড়ে বসে চা-পাঁউরুটি খাচ্ছেন শিশু, মহিলা থেকে বৃদ্ধ। রোদ-ঝড়-বৃষ্টিতে এই খাওয়ানোর কামাই নেই। ভিখারিদেরও আসার বিরাম নেই। ২৫০ জনের চেনা মুখ অনেক সময়েই বেড়ে ৩০০-৩৫০ হয়ে যায়। তাতে অবশ্য গুলাব জি-র চায়ের দোকানের দরজা বন্ধ হয় না। বলেছেন, ‘‘মানুষ ভুলে যায় কোনও কিছুই আমাদের নয়। খালি হাতেই ফিরতে হবে সকলকে। মানুষকে আনন্দ দেওয়ার মধ্যেই জীবনের সার্থকতা আছে। এই আনন্দের জন্য আমি এই কাজ করি।’’

এক গ্লাস কড় চায়ের দাম ২০টাকা। চার-থেকে পাঁচ হাজার খদ্দেরের ভিড় প্রতিদিন। যা রোজগার হয় তার একটা বড় অংশ দুঃস্থ মানুষদের জন্য ব্যয় করেন গুলাব জি। বাকিটা দিয়ে তাঁর সংসার ভালো মতোই চলে যায়। বলেছেন, ‘‘কুঁড়ে হলে জীবন পিছিয়ে পড়বে। শেষ নিঃশ্বাস অবধি পরিশ্রম করে যেতে চাই।’’ সবে তো ৯৪। ১০০ বছরেরও বেশি বাঁচতে চান গুলাব জি চায়ওয়ালা।

আরও পড়ুন:

অন্ধকার থেকে আলোর অভিযান! রাজস্থানের ঘরে ঘরে সূর্যের আলো পৌঁছে দিচ্ছেন সৌর-বান্ধবীরা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More