রবিবার, মার্চ ২৪

এমন নাকি দেখতেই ছিলেন না যিশুখ্রিষ্ট! বিজ্ঞান এঁকে ফেলল আসল ছবি, চমকে গেল বিশ্ব

রূপাঞ্জন গোস্বামী

পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত মুখ। তাঁকে চেনেন না এই বিশ্বে এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। লম্বা, ফর্সা, দোহারা চেহারা। মাঝ খানে সিঁথি কাটা কাঁধ অবধি লুটিয়ে নামা চকচকে মসৃণ চুল। টানাটানা উজ্বল মায়াবী দু’টি চোখ, চোখের তারা সবুজাভ। টানা ভুরু, পাতলা গোলাপি ঠোঁট, টিকালো নাক, বড় ঘন দাড়িতে ঢাকা অসামান্য সুন্দর একটি মুখ। যদি আপনি  একশো জনকে জিজ্ঞেস করেন, তাঁরা প্রত্যেকেই একই  উত্তর দেবেন। মানব সভ্যতার বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শিল্পীর তুলিতে,  বিভিন্ন ধর্মপুস্তকে,বিভিন্ন বই ও পত্রপত্রিকায়,হলিউডি সিনেমায়, থিয়েটারে, ক্যালেন্ডারে প্রভু যিশুর একই  সৌম্য রূপ সারা বিশ্বে সমাদৃত।

পৃথিবীর মানুষ যে রূপে প্রভু যিশুকে চেনেন

কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান, বিশেষ করে যে বিজ্ঞান অকাট্য ভাবে, অদেখা কোনও মানুষের ছবি গভীর গবেষণার পর এঁকে দিতে পারে, সেই ফরেন্সিক অ্যানথ্রোপোলজি (বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কিত নৃতত্ত্ববিদ্যা) বলছে সম্পূর্ণ অন্য কথা। বিজ্ঞানের এই শাখাটি কেবল মাত্র একটি হাড় থেকেও পুনর্গঠন পদ্ধতির সাহায্যে মানুষটিকে নিখুঁত ভাবে এঁকে ফেলতে পারে। তবে সঙ্গে সঙ্গে নয়। ছবিটা আঁকতে রীতিমত গবেষণা করতে হয় বিজ্ঞানীদের। বিজ্ঞানের এই বিশেষ এবং অত্যন্ত জটিল শাখাটি ২০১৫ সালে বলেছিল, যে রূপে আমরা প্রভু যিশুকে চিনি তিনি সেরকম দেখতেই ছিলেন না।

বিভিন্ন সাক্ষীর বয়ান শুনে আগে পুলিশ বিভাগের  শিল্পীরা অপরাধীর স্কেচ করতেন। সেই স্কেচ দিয়ে অপরাধী ধরা হতো। এখন সারা বিশ্বের পুলিশ বিভাগের শিল্পীরা, কম্পিউটারের সাহায্যে অপরাধীর ছবি আঁকেন। কিন্তু তার চেয়েও বহু কঠিন পদ্ধতিতে এবং একেবারে নিখুঁতভাবে প্রভু যিশুর ছবি আঁকার দাবি করেছিলেন একদল  ব্রিটিশ বিজ্ঞানী এবং  ইসরায়েলি আর্কিওলজিস্ট। বিজ্ঞানের আধুনিকতম প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা এবং ধর্মগ্রন্থের মেলবন্ধন ঘটিয়ে প্রভু যিশুর নিখুঁত (তাঁদের কথায়) ত্রৈমাত্রিক চিত্র তৈরি করেছিলেন তাঁরা।

ফরেনসিক অ্যানথ্রোপোলজি এভাবেই অদেখা মানুষের মুখের পুনর্গঠন করে

এই দলটির পুরোভাগে ছিলেন ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী এবং রিটায়ার্ড মেডিকেল আর্টিস্ট ডঃ রিচার্ড নিয়েভ। যিনি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ফরেন্সিক ফেসিয়াল রিকনস্ট্রাকশন আর্টিস্ট। অচেনা অদেখা মানুষকে নিয়ে রিসার্চ করে, সেই মানুষটির মুখাবয়বের ছবি প্রযুক্তির সাহায্যে  নিখুঁতভাবে আঁকতে বিশ্বে তাঁর জুড়ি নেই।  এর আগে, প্রায়  দুই দশক ধরে নিয়েভ প্রায় এক ডজন  বিখ্যাত মানুষের আসল মুখাবয়ব এঁকেছেন।  নিখুঁত, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং  চুলচেরা গবেষণা করে। বিখ্যাত মানুষগুলির মধ্যে আছেন আলেকজান্ডারের বাবা ম্যাসিডোনিয়ার দ্বিতীয় ফিলিপ,  ফ্রিজিয়ার রাজা মাইডাসও।  তাই পৃথিবীর ফরেন্সিক অ্যানথ্রোপোলজি নিয়ে গবেষণা করা বিজ্ঞানীরা একবাক্যে স্বীকার করেন, পৃথিবীতে যদি একমাত্র কেউ প্রভু যিশুর মুখাবয়ব  নিখুঁত ও বিজ্ঞান সম্মতভাবে আঁকতে পারেন,  তিনি হলেন  প্রফেসর রিচার্ড নিয়েভ। তবে যিশুর ছবি আঁকার ক্ষেত্রে নিয়েভের সামনে দুটি বাধা ছিল। প্রথমত  যিশুর শারীরিক কাঠামোর নমুনা পাওয়া যায়নি আর, দ্বিতীয়ত বাইবেলে প্রভু যিশুর শারীরিক গঠন বিষয়ে বেশি কিছু বলা নেই। তাই ডঃ নিয়েভ ও তাঁর টিমকে ২০০০ বছর পিছিয়ে, জীবিত অবস্থার যিশুর কাছে পৌঁছবার সূত্র  ও যিশু সংশ্লিষ্ট প্রমাণ খুঁজতে অত্যন্ত কষ্টকর গবেষণার পথ ধরতে হয়েছে।

ম্যানচেষ্টার ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী এবং রিটায়ার্ড মেডিকেল আর্টিস্ট ডঃ রিচার্ড নিয়েভ, ইনিই বিজ্ঞান স্বীকৃত উপায়ে এঁকেছেন যিশুর ছবি

প্রভু যিশুর আসল এবং নিখুঁত ছবি আঁকতে নিয়েভের টিম ইজরায়েলে খুঁজে পাওয়া যিশুর সময়ের তিনটি সেমেটিক করোটি এক্স-রে রিপোর্ট নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছিলেন। সর্বাধুনিক ফরেন্সিক পদ্ধতির সাহায্য নিয়েছিলেন তাঁরা। ফরেন্সিক অ্যানথ্রোপোলজি ছাড়াও ফিজিক্যাল অ্যানথ্রোপোলজি, প্রাইমেটোলজি প্যালিয়েণ্টোলজি, হিউম্যান অস্টিওলজি, নিউট্রিশন, ডেন্টিস্ট্রি, জিওগ্রাফি এবং ফিজিওলজির সাহায্য নিতে হয়েছে তাঁদের। সব তথ্য একত্রিত করে, কম্পিউটারাইজড টোমোগ্রাফির সাহায্যে প্রথমে যিশুর করোটি নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছিল। তারপর বিজ্ঞানীরা রীতিমত অঙ্ক কষে বার করেছিলেন এই করোটিতে পেশি ও চামড়া কোথায় কী ভাবে বসবে, চামড়ার রঙই বা কী হবে। তারপর তাঁরা ডিজিটাল 3D রিকনস্ট্রাকশন পদ্ধতিতে যিশুর মুখ, চোখ, নাক, কান ধীরে ধীরে তৈরি করেছিলেন, করোটির আকার অনুপাতে। অবশেষে বিজ্ঞানী নিয়েভ প্রযুক্তির সাহায্যে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, প্রভু যিশুর আসল মুখাবয়ব। যা চিরাচরিত প্রভুর যিশুর চেহারার চেয়ে সম্পূর্ণ অন্য রকম। প্রফেসর নিয়েভ ও তাঁর টিম দাবি করলেন, মানব সভ্যতার সবচেয়ে বিখ্যাত মুখটির এটাই সবচেয়ে নিখুঁত ছবি।

আমাদের চোখে যিশুখৃষ্ট,বিজ্ঞানের চোখে যিশুখৃষ্ট (ডান দিকে)

নিয়েভ এবং তাঁর টিমের মতে প্রভু যিশুর উচ্চতা ছিল পাঁচ ফুটের সামান্য একটু ওপর। অতএব তাঁকে লম্বা বলা যাবে না। গায়ের রঙ ছিল বেশ তামাটে। আমরা যিশুকে ধবধবে ফর্সা দেখে অভ্যস্ত। মুখের গড়ন লম্বাটে নয়, একটু চওড়াই ছিল। যিশুর চোখের মনির রঙ ছিল কালো, বাদামি নয়। তাঁর মাথায় ছবির দেখা কাঁধ পর্যন্ত লম্বা ও সোজা চুল ছিল না। যিশুর চুল ছিল ছোটো এবং কোঁকড়া। চুলে কোনও সিঁথি ছিল না। ছবির মতো বড় কপাল ছিল না, কপাল ছিল ছোটো এবং চুল দিয়ে ঢাকা। তাঁর ঠোঁট পাতলা নয়, মোটা ছিল। নাক টিকালো নয়, বরং ছিল চওড়া। বড় নয়, তাঁর দাড়ি ছিল ছোটই।

ফরেনসিক অ্যান্থ্রোপোলজির সাহায্যে আঁকা যিশুর ছবি

ডঃ নিয়েভের  বৈজ্ঞানিক উপায়ে আঁকা প্রভু যিশুর ছবি নিয়ে তোলপাড় হয়েছিল গোটা বিশ্ব। বিতর্কের ঝড় উঠেছিল।এখন সে ঝড় স্থিমিত। বিজ্ঞানীরা মানলেও, ডঃ নিয়েভের ছবির যিশুর রূপটি মেনে নিতে চাননি বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষ।  আমার মতোই তাঁরা বিজ্ঞানের আঁকা যিশুর ছবি মনেও রাখতে চান না। তাঁরা যিশুর চিরাচরিত প্রেমময় রূপটি বুকে আগলে রাখতে চান। তাঁরা বলছেন, বিজ্ঞান থাকুক বিজ্ঞানের জায়গায়। ধর্মে হাত দেওয়ার দরকার নেই। কারণ তাঁরা মানেন, বিজ্ঞানের সীমানা যেখানে শেষ, ধর্ম সেখানে থেকে শুরু।

সূত্র: https://www.forensicmag.com/article/2015/12/forensic-anthropology-recreates-face-jesus
https://www.popularmechanics.com/science/health/a234/1282186/
  https://www.indiatoday.in/fyi/story/forensic-anthropologist-uses-science-to-draw-the-most-accurate-look-of-jesus-277291-2015-12-15 
 
Shares

Comments are closed.