মঙ্গলবার, মার্চ ২৬

হাঁটু আর হাত নেই, তবুও প্রেমে আর সংগ্রামে সাফল্যের চূড়ায় তিনফুটের জেলিসা

রূপাঞ্জন গোস্বামী

ছোট্ট জেলিসা যখন পৃথিবীতে এসেছিল, চিকিৎসকেরা বলেছিলেন, তার জীবনটা আর পাঁচটা ছেলে-মেয়ের মতো হবে না। এমন বলার কারণও অবশ্য স্পষ্ট ছিল। কারণ দেখাই যাচ্ছিল, তার পায়ে উরুর পরেই রয়েছে পায়ের পাতা। মাঝখানের হাঁটু থেকে গোড়ালির অংশটা নেই। হাতেও নেই কনুই থেকে কব্জির অংশটা।

শুধু চিকিৎসকদের কথায় নয়। সন্তানকে দেখেও ভেঙে পড়েছিলেন জেলিসার মা ডেবরা। যেমনটা হয় প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্ম দেওয়া যে কোনও মায়ের ক্ষেত্রেই। কিন্তু আজকের ৩০ বছরের জেলিসা অস্টিন প্রমাণ করে দিয়েছেন, সমস্ত প্রতিবন্ধকতাকেই হারিয়ে দেওয়া যা আত্মবিশ্বাস দিয়ে। সে দিনের ভেঙে পড়া মায়ের কাছে আজ আর জেলিসা কোনও ব্যর্থতা নন, জেলিসা তাঁর গর্ব।

পরে জেলিসার মা ডেবরা অস্টিন সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন “আমি ভেবেছিলাম ও খুবই বড়-বড় পা নিয়ে জন্মাবে। ও যে ভাবে লাথি মারত আমার পেটের ভিতরে!” কিন্তু মায়ের আশা পূরণ হয়নি। পরিবর্তে, জেলিসার জন্মের পরে ডেবরাকে গ্রাস করেছিল একরাশ হতাশা।

শিশু জেলিসা কিন্তু দিব্যি ছিল। মায়ের হতাশা সে বুঝতেই পারেনি। সে নিজে নিজেই দিব্যি নিজের মতো লড়াইয়ের উপায় বার করে ফেলেছিল। যে বয়সে শিশুদের মা ছাড়া এক পা চলে না, সেই বয়স থেকেই জেলিসা নিজের কাজ নিজে করে নিত। তার মতো করেই।

দাঁত ব্রাশ করছে জেলিসা

তার মা-বাবা অবশ্য হাল ছাড়েননি। একের পর এক ডাক্তার দেখিয়েছেন তাঁরা। কিন্তু ডাক্তারেরা প্রতিবন্ধকতার নির্দিষ্ট কারণ জানাতে পারেননি। শুধু বলেছেন, জেলিসা সাধারণ জীবন যাপন করতে পারবে না কোনও দিন। ওর পা হাত তৈরি হবে না।

সেই জেলিসা, পা-হাত ছাড়াই তিন বছর বয়সে জেলিসা ভর্তি হল স্কুলে। আশ্চর্যের  ও সৌভাগ্যের কথা, জেলিসার  স্কুল জীবন খুবই আনন্দের ছিল। সকলের ভালবাসা পেয়েছিল সে। এক দিনের জন্যেও স্কুলে কোনও কটূক্তি শুনতে হয়নি তাকে।

পা দিয়ে টাইপ করে মেল পাঠাচ্ছে জেলিসা

জেলিসা সেই দিনগুলির কথা জানাতে গিয়ে বলেছেন, “আমায় সারা স্কুল ভালোবাসত। সবাই বলতো, আমি নাকি পুতুল-পুতুল ছিলাম।”   কিন্তু স্কুল আর স্কুলের বাইরের পরিবেশ এক ছিল না। রাস্তাঘাটে জেলিসাকে তার উচ্চতার জন্য আর প্রতিবন্ধকতার জন্য লাঞ্ছনার মুখোমুখি হতে হয়েছে বারবারই। আর এই লাঞ্ছনাই বাড়িয়েছে জেলিসার জেদ। কোনও কিছুই দমাতে পারেনি তাকে। আর সেই জেদেই আজ জেলিসা এক জন সফল ব্যবসায়ী।

প্রেমিক জোনাথনের সঙ্গে জেলিসা

আর পাঁচটা মেয়ের মতই জেলিসার জীবনে এসেছে প্রেমও। তার প্রেমিক জোনাথন শর্টারের সঙ্গে প্রায় ১৩ বছর আগে, এক বন্ধুর বাড়িতে প্রথম দেখা। পরিচয়ের পরে বন্ধুত্ব এবং তার পরে প্রেম এসেছে নিয়ম মেনেই। তবে প্রেম নিবেদন করেছিলেন জেলিসা নিজেই।

জোনাথন বলেছেন, “জেলিসা আমায় বলেছিল, ও আমায় ভালোবাসে। আমি প্রথমে চুপ করে ছিলাম। জেলিসা অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। ও ভেবেছিল, আমি ওকে ফিরিয়ে দেব। ভেবেছিল, আমি ঘর থেকে বেরিয়ে যাব। আর ফিরব না ওর জীবনে। চোখ ভরে ছিল জলে। ও হাত দিয়ে মুখ ঢাকতে যাচ্ছিল, কিন্তু আমি ওকে জড়িয়ে ধরেছিলাম সঙ্গে সঙ্গে। হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেছিল জেলিসা।”

ভালোবাসা, শুধু ভালোবাসা

এখন টেক্সাসে সাজানো গোছানো অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন জেলিসা-জোনাথন। জোনাথন জানিয়েছেন, জেলিসা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এক জন মানুষ। সে পায়ের অংশ দিয়েই সব কাজ করে। দাঁত মাজা থেকে ইমেল করা– সবেতেই স্বচ্ছন্দ জেলিসা। তবে জোনাথন প্রায়ই জেলিসাকে খাইয়ে দেন আদর করে। উঁচু তাক থেকে জিনিসপত্র পেড়ে দেন, আর পাঁচ জন সঙ্গীর মতোই। গাড়িতে উঠতেও সাহায্য করেন। ব্যাস ওইটুকুই।

জোনাথনের দাবি, এর বেশি সাহায্য করতে গেলে নাকি জেলিসার ভুরু কুঁচকে যায়। জোনাথন বলেছেন, “ওর হাত বা পা নেই, অথবা ও যে ছোট্ট, এটা আমার কাছে কোনও ব্যাপার নয়। এই ক্ষুদ্র জিনিসগুলো আমাদের ভালোবাসায় কোনও দিন অন্তরায় হয়নি, আর হবেও না। আমি ওকে স্বাভাবিক এক জন মানুষ হিসেবেই ভালোবাসি ও ব্যবহার করি। তাতেই আমরা ভাল আছি। সহানুভূতির চেয়ে ভালবাসা অনেক বড়।”

মায়ের সঙ্গে জেলিসা

আর জেলিসা বলছেন, “আমি আর জোনাথন খুব ভাল আছি।  দারুণ মিল আমাদের। আমি আশাই করিনি আমার জীবনে জোনাথনের মতো প্রেমিক পাব।  জোনাথন আমার পাশে আছে ভাবতেই ভাল লাগে।

তবু জোনাথনের মনে সামান্য হলেও অভিযোগ আছে। না জেলিসার প্রতি নয়, সমাজের প্রতি। সাধারণ মানুষ যখন তাঁদের দু’জনকে দেখেন, তখন অনেকে জোনাথনকে বলে, “ধন্যবাদ, দারুণ কাজ করেছো।” আবার  অনেকে জোনাথনকে ‘বোকা’ বলেন।

জেলিসার গভীর চোখের দিকে তাকিয়ে জোনাথন কেবল বলেন, “কিন্তু আমি কাউকে বোঝাতে পারি না যে আমি জেলিসার চেয়ে ভাল মন পাইনি। তাই তো আমি ওকে ভালোবেসেছি। জেলিসা এক জন সেরা মানুষ ও সেরা বন্ধু। দেখলেই আপনার ওকে ভালোবাসতে ইচ্ছা করবে।”

জেলিসার প্রতিবন্ধকতা তার মুখের হাসি কাড়তে পারেনি

জেলিসা নিজেও সমালোচনাকে কখনও পাত্তা দেননি, এখনও দেন না। তিনি একগাল হেসে বললেন, “মাকে বলা হয়েছিল, আমার হাত আর হাঁটু নেই। আমার বৃদ্ধি স্বাভাবিক হবে না। আমি হাঁটতে পারব না। এমনকী, আমি বেশি দিন বাঁচব না। এখন আমার বয়েস তিরিশ। দিব্যি বেঁচে আছি, সব কাজ করছি।”

জেলিসা তাঁর  পোশাকের ব্যবসা দিব্যি সফল ভাবে চালান। তাঁর ক্লায়েন্টদের জন্য সদ্য একটি ওয়েবসাইটও চালু করেছেন তিনি। পা দিয়েই নিয়মিত আপডেট করেন ওয়েবসাইটটি। তিনি বলেন, “পা দিয়ে আমি সব কিছুই প্রায় করতে পারি। আমার ডিকশনারিতে ‘পারব না’ কথাটা নেই। আমি আজ যেখানে, হাত, হাঁটু আর উচ্চতা থাকলেও এখানেই আসতাম। তাই ও সব না থাকার সামান্যতম দুঃখও নেই। এই মুহূর্তে  জোনাথনকে বিয়ে করা ছাড়া অন্য কিছু ভাবছি না।”

ভালোবাসার কাছে হেরে গেছে প্রতিবন্ধকতা

হ্যাঁ, এই বছরের গ্রীষ্মেই জেলিসা আর জোনাথন বিয়ে করবেন বলে ঠিক করেছেন। জেলিসা এখন ব্যস্ত নিজের, অর্থাৎ কনের পোশাক ডিজ়াইন করতে।

আপনিও একটু ভাবুন না, আমাদের আশপাশে কত জেলিসা আছে ডানা মেলার অপেক্ষায়। জোনাথনের মতোই কেউ কি তাঁদের ডানা হতে পারেন না!

Shares

Comments are closed.