জঙ্গিদের নয়নের মণি সে, দুঃস্বপ্নেও তার আনাগোনা! কে সেই ‘শয়তানের মা’! 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    ২১ এপ্রিল ভোর, কলম্বোর শহরতলী থেকে আলাদা আলাদা ভাবে বেরিয়ে পড়েছিল ওরা ন’জন। আট জন যুবক আর একজন মহিলা। রাস্তায় তারা কারও সঙ্গে কথা বলেনি। প্রত্যেকের পিঠে ব্যাক-প্যাক। যেন তারা কলেজে বা অফিসে যাওয়ার জন্য বেরিয়েছে। কিন্তু তারা জানে, আর কিছুক্ষণ পরে কেঁপে উঠবে কলম্বো, কেঁপে উঠবে বিশ্ব। কারণ তাদের দেহের বিভিন্ন জায়গায় আর ব্যাক-প্যাকে আছে ‘শয়তানের মা’

    ধীরে ধীরে ও  বিভিন্ন ভাবে দলটি ছড়িয়ে পড়ে কলম্বোর বিস্তীর্ণ এলাকায়। অপেক্ষা করে সেই সময়ের, যে সময়ে সবচেয়ে ভিড় জমা হবে। তারা জানে ভিড় আজ হবেই। আজ ইস্টার সানডে। চার্চে, হোটেলে আজ ফ্রি ব্রেকফার্স্ট দেওয়া হবে। তার লাইন এখন থেকেই বাড়তে শুরু করেছে। সাত সকালে পার্কে শিশুরা হুটোপাটি শুরু করেছে। কয়েক মুহূর্ত পরেই যারা রক্ত মাংসের নিথর তাল হয়ে যাবে। সেটা বুঝেও ৯টি মুখ নির্বিকার। তাদের মনে পড়েছে না, তাদের বাড়ির বাচ্চাদের কথা।

    মার্চে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে যখন হামলা করেছিল উগ্রপন্থীরা, তখন কি তাদের মনে পড়েছিল বাড়ির লোক গুলির কথা! তাই হামলার বদলা হামলা। মৃত্যুর বদলা মৃত্যু। ক্রুশেডের বদলা জিহাদ। সকাল ৮.৪৫ মিনিট নাগাদ কলম্বোর সেন্ট অ্যান্টনিস গির্জায় প্রথম বিস্ফোরণ ঘটায় সন্ত্রাসবাদীরা।

    লম্বোর বিস্ফোরণগুলির মধ্যে একটি বিস্ফোরণ ঘটার পরের অবস্থা

    চাপ চাপ রক্তের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মৃত নারী পুরুষ ,শিশুদের দেহাংশ, আহতদের আর্তনাদ, আতঙ্কিতদের চিৎকার এবং হতচকিত পুলিশ। এই নারকীয় অবস্থার মধ্যেই  মানববোমারা একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটাতে শুরু করে কলম্বোর উত্তরাংশে নেগোম্বো শহরতলির কাটুওয়াপিটিয়ায় সেন্ট সেবাস্টিন গির্জা, বাট্টিকালোয়ার গির্জা, সিনামোন গ্র্যান্ড হোটেল, শাঙ্গরিলা হোটেল এবং কিংসবারি হোটেলে।

    ইস্টার সানডের দিন, শ্রীলঙ্কা প্রত্যক্ষ করে জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে ন্যক্কারজনক সন্ত্রাসবাদী হামলা। ৩৫০ জন নিরীহ মানুষের মৃত্যু হয় কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। আহত হন হাজারের উপর মানুষ। এবং যারা এই নির্মম হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে, তারা  প্রত্যেকেই শ্রীলঙ্কার নাগরিক। শ্রীলঙ্কায় ধারাবাহিক বোমা বিস্ফোরণের প্রায় আড়াই দিন পর হামলার দায় ভার নেয় ইসলামিক স্টেট জঙ্গিগোষ্ঠী।

    বিস্ফোরণের আগের মুহূর্তে চার্চের পরিবেশ ও চার্চের বাইরে আত্মঘাতী জঙ্গি

    সঙ্গে সঙ্গে দায় না নিলেও এটা ইসলামিক স্টেট জঙ্গিগোষ্ঠীরই কাজ বলে ধরা পড়ে গিয়েছিল। ধরিয়ে দিয়েছিল ‘শয়তানের মা’। ৩৫০ জন নিরীহ মানুষের মৃত্যুর জন্য যে দায়ী ছিল। বিস্ফোরণের তীব্রতা ও ঝলসে যাওয়া মৃতদেহ পরীক্ষা করে ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা বুঝতে পারেন, বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে ট্রাই-অ্যাসিটোন ট্রাই-পারঅক্সাইড (Tri Acetone Triperoxide) বা TATP দিয়ে। যাকে বিশ্বের সন্ত্রাসবাদীরা ডাকে মাদার অফ সাটান বা শয়তানের মা নামে।

    ইরাক ও সিরিয়ার বাইরে, ইউরোপ, আমেরিকায় ইসলামিক স্টেট জঙ্গিরা যতগুলি বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে, তার মধ্যে বেশিরভাগই ঘটিয়েছে TATP দিয়ে। কারণ উন্নত বিশ্বের হাইটেক স্ক্যানারও ধরতে পারে না  এই বিস্ফোরককে। বিস্ফোরণ ঘটে যাওয়ার পরই বোঝা যায়,বিস্ফোরণটির পিছনে ছিল ‘শয়তানের মা। তবে আশার কথা বিজ্ঞানীরা শয়তানের মা’কে ধরার জন্য কেমিক্যাল সেন্সর আবিষ্কার করে ফেলেছেন।

    ‘মাদার অফ সাটান’ বোমা

    সন্ত্রাসবাদীরা কেন TATP কে  ডাকে ‘ শয়তানের মা‘ নামে? কারণ এই বিস্ফোরকটি অবিশ্বাস্য রকমের ভয়ঙ্কর।  সামান্য বিদ্যুৎ তরঙ্গে , ঝাঁকুনিতে, ঘর্ষণে, তাপে, সালফিউরিক অ্যাসিডে ও অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শে ফেটে যেতে পারে। মাদার অফ সাটান বিস্ফোরণের ফলে তাপমাত্রা উঠে যায় ২৩০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। প্রতি ইঞ্চি জায়গায়  ৭০০০০ কেজি চাপ সৃষ্টি হয়। ফলে মুহূর্তের মধ্যে আশপাশে থাকা সব কিছুকে ধুলো করে দেয় ‘ শয়তানের মা‘।

    পাথরের খাদানের উপযোগী বিস্ফোরক বানাতে গিয়ে ১৮৯৫ সালে মাদার অফ সাটান বিস্ফোরকটি আবিষ্কার করেন জার্মান বিজ্ঞানী রিচার্ড উল্ফেনস্টাইন১৮৯৯ সালে অ্যাডলফ ভন বায়ার ও ভিক্টর ভিলিজার নামে দুই বিজ্ঞানী মাদার অফ সাটান বা TATP রাসায়নিকটির ডায়ামার রূপ দেন পটাশিয়াম পারসালফেট যোগ করে। ট্রাইমার তৈরি করেন হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড যোগ করে। তাই মোট  তিনটে রূপে পাওয়া যায় মাদার অফ সাটানকে, ডাইমার (C6H12O4), ট্রাইমার (C9H18O6)টেট্রামার ( C12H24O8)। সাদা চিনির মত গুঁড়ো অবস্থায় বিস্ফোরকটিকে পাওয়া যায়। বিশুদ্ধ অবস্থায় বিস্ফোরকটি থেকে ফলের মতো গন্ধ বার হয়।

    মাদার অফ সাটান বোমার উপাদান  Tri Acetone Tri peroxide

    নাইট্রোজেনবিহীন এই বিস্ফোরকটি ২০০১ সালে প্রথম ব্যবহার করেন রিচার্ড রেইড নামে এক ব্রিটিশ উগ্রপন্থী। প্যারিস থেকে মিয়ামিগামী আমেরিকান এয়ারলাইন্সের  ফ্লাইট ৬৩ উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে বিমানে ওঠেন রিচার্ড রেইড। মাদার অফ সাটান দিয়ে তৈরি করা জুতো-বোমা পরে। কিন্তু এক যাত্রীর তৎপরতায় বিস্ফোরণের আগেই ধরা পড়ে যান।

    এর পর আলকায়দা আর আইসিস জঙ্গীদের হাতে পড়ে মাদার অফ সাটান। মধ্য প্রাচ্যের কিছু উচ্চশিক্ষিত বিজ্ঞানী ও গবেষক ওই দু’টি সন্ত্রাসবাদী দলে যোগ দেওয়ায়, মাদার অফ সাটান বোম মুড়ি-মুড়কির মত বানাতে ও ব্যবহার করতে শুরু করে সন্ত্রাসবাদী দল দু’টি। ইরাক বা সিরিয়ায় তারা আরডিএক্স ব্যবহার করলেও বিদেশে গণহত্যার ক্ষেত্রে তারা ব্যবহার করতে থাকে ‘মাদার অফ সাটান’ বোমা। প্যারিস বিস্ফোরণ, ম্যাঞ্চেষ্টার বিস্ফোরণ, ব্রাসেলস বিস্ফোরণ, ইন্দোনেশিয়ার সুরাবায়ার বিস্ফোরণ থেকে ২০১৯  শ্রীলঙ্কার বিস্ফোরণ। শত শত নিরীহ মানুষের মৃত্যু ঘটিয়েছে সন্ত্রাসবাদীরা এই মাদার অফ সাটান বোমা দিয়ে।


    ব্রাসেলস বিমানবন্দরে বিস্ফোরণ ঘটাবার কয়েক মিনিট আগে দুই সন্ত্রাসবাদী (কালো পোষাক)

    সন্ত্রাসবাদীদের কাছে মাদার অফ সাটান চোখের মণি হওয়ার কারণ, বোমা তৈরির কাঁচামাল সাধারণ দোকানেই পাওয়া যায়। কিন্তু আবার এই শয়তানের মা’ই তাদের দু’চোখের বিষ। কারণ, ‘মাদার অফ সাটান’ বানাতে গিয়ে ও  সংরক্ষণ করতে গিয়ে সন্ত্রাসবাদীরা, নিজেরাই ৪০% ক্ষেত্রে শিকার হয়। টার্গেট এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটাতে রাস্তায় নেমে বিস্ফোরণ স্থলে যাওয়ার আগে নিজেরাই উড়ে যায়। ২০১৭ সালে সেটাই ঘটেছিল স্পেনের বার্সেলোনাতে। শয়তানের মা যে কাউকে ছেড়ে কথা বলে না, সেটা সবচেয়ে ভালো বোঝে সন্ত্রাসবাদীরাই।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More