বুধবার, নভেম্বর ১৩

আরব মুলুকে সোনার কেল্লার মুকুল! পূর্বজন্মের খুনিকে চিনিয়ে দিয়েছিল তিন বছরের জাতিস্মর শিশু

  • 2.3K
  •  
  •  
    2.3K
    Shares

রূপাঞ্জন গোস্বামী

-তোমার নাম কী খোকা?
-এ জন্মের নাম বলব, না আগের জন্মের নাম?
-গত জন্মের বাড়ির কথা মনে পড়ে?
-হ্যাঁ, মনে পড়ে। হাঠোরি গ্রামে ছোট্ট একটি দুর্গ। তার ভেতর কিছু বাড়ি। সেই বাড়িগুলির পাশে ছিল আমাদের হাভেলি।

প্রশ্ন পর্বটি চলেছিল রাজস্থানের ভরতপুরের রাজসভায়।বহু বছর আগে। প্রশ্ন করছিলেন ভরতপুরের মহারাজা কিষণ সিংহ। উত্তর দিচ্ছিল প্রভু। সেলিমপুর গ্রামের ছোট্ট একটি ছেলে। পূর্বজন্মের অনেক কথা সে হুবহু বলে দিতে পারত। হাভেলির সামনে মাটিতে পূর্বজন্মে পুঁতে রাখা পাঁচটি পুরনো মুদ্রার কথা প্রভুই বলেছিল মহারাজাকে। ভরতপুরের মহারাজার লোকেরা মাটি খুঁড়ে সেই মুদ্রাগুলি উদ্ধারও করেছিল। প্রভু ছিল জাতিস্মর

জাতিস্মর কারা!

পৃথিবীর অনেক জায়গায় এমন কিছু শিশু দেখতে পাওয়া যায়, যাদের পূর্বজন্ম মনে রাখার অলৌকিক ক্ষমতা থাকে। পূর্বজন্মের প্রায় ২০ শতাংশ তথ্য এরা নিখুঁত ভাবে বলতে পারে। এই শিশুদের বলা হয় জাতিস্মর। এদের বয়স সাধারণত দুই থেকে সাত বছরের মধ্যে হয়। সাত বছর বয়স পর্যন্ত পূর্বজন্মের কথা এদের মনে থাকে। এবং পূর্বজন্মের পরিবারের সঙ্গে বর্তমান জন্মের পরিবারের কোন সম্পর্ক অথবা পরিচয় থাকে না।

জাতিস্মর ও জন্মান্তরবাদ নিয়ে বিজ্ঞান সন্দেহ প্রকাশ করলেও, ইউরোপ, আমেরিকার বেশকিছু বিখ্যাত মনস্তত্ববিদ মনে করেছিলেন ব্যাপারটার মধ্যে একটা রহস্য লুকিয়ে আছে। তাই এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে মনোবিজ্ঞানের একটি নতুন শাখা গড়ে তোলা হয়, যার নাম Parapsychology (পরামনোবিদ্যা)। জাতিস্মরদের নিয়ে গবেষণা করে এর সত্যতা প্রমাণ করার চেষ্টা করেন ইয়ান স্টিভেনসনক্যারল ব্যোমান প্রভৃতি বিশ্বখ্যাত প্যারাসাইকোলজিস্ট।

রাজস্থানের প্রভুই সোনার কেল্লার ‘মুকুল’

সত্যতা প্রমাণের চেষ্টা করেছিলেন হেমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। যিনি জাতিস্মর বালক প্রভুকে নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তাঁর উৎসাহেই কলকাতার লালমোহন ভট্টাচার্য রোডে ষাটের দশকে তৈরি হয় প্যারাসাইকোলজি সোসাইটি। যার আজীবন সদস্য ছিলেন সত্যজিৎ রায়।

সত্যজিৎ রায়ের ‘সোনার কেল্লা’ উপন্যাসে, তাই হয়তো মুকুল নামের আড়ালে লুকিয়ে ছিল প্রভু নামের সেই রাজস্থানি ছেলেটি। আর হেমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় উপন্যাসে হয়ে যান ডক্টর হেমাঙ্গ হাজরা। দু’জনে পাড়ি দেন রাজস্থানে। মুকুলের গতজন্মের সন্ধানে। শুরু হয়ে গিয়েছিল জমজমাট ‘সোনার কেল্লা’ রহস্য।

সোনার কেল্লা সিনেমায় জাতিস্মর মুকুল

 গোলান হাইটসের মুকুল

ইজরায়েল অধিকৃত গোলান হাইটস লাগোয়া, সিরিয়ার মরুভূমি অঞ্চলের শেষ প্রান্তে লুকিয়ে ছিলো ছোট্ট একটি গ্রাম।  গ্রামের আকাশে শীতের সূর্য তখন মাঝ গগনে। পাথুরে রাস্তা ধরে গ্রামের দিকে এগিয়ে চলেছিলেন ডঃ এলি ল্যাসচ। সঙ্গে তাঁর গবেষক দলের সদস্যরা। ডঃ ল্যাসচের হাত ধরে আছে তিন বছরের ছোট্ট একটি শিশু। তাঁদের পিছনে চলেছেন গ্রামের বহু লোক।

শিশুটির বাড়ি গোলান হাইটসে। ড্রুজ (Druze) আদিবাসী সমাজের এই শিশুটি দাবি করেছিল, গতজন্মে  সিরিয়ার এক গ্রামে সে জন্ম নিয়েছিল। শিশুটি বলেছিল তার গতজন্মের প্রতিবেশী তার মাথায় কুঠার দিয়ে আঘাত করে হত্যা করেছিল। পুনর্জন্মে বিশ্বাসী ড্রুজেরাও হতবাক হয়েছিল শিশুটির কথা শুনে।

কিন্তু তাঁরা খুনের তত্ত্বে বিশ্বাস করেন। কারণ, শিশুপুত্রটির মাথায় একটি লাল জন্মদাগ ছিল। ড্রুজ আদিবাসীরা বিশ্বাস করেন এই লাল জড়ুল আগের জন্মের প্রতীক। এবং দাগটি পূর্বজন্মে মাথায় কোনও বড় আঘাত লাগার সংকেত বহন করছে।

ডঃ এলি ল্যাসচ

গাজা স্ট্রিপের ডক্টর হেমাঙ্গ হাজরা

গাজা স্ট্রিপের স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ডঃ ল্যাসচ। প্যারাসাইকোলজি নিয়ে তাঁর আছে বিস্তর পড়াশুনো আর গবেষণা। ড্রুজ আদিবাসী শিশুটির খবর পেয়ে তিনি প্রচণ্ড উৎসাহী হয়ে পড়েন। শিশুটির পরিবারকে বুঝিয়ে শুনিয়ে শিশুটিকে নিয়ে সটান চলে এসেছিলেন সিরিয়ায়। দুটি গ্রাম দেখার পর তৃতীয় গ্রামটি চিনতে পেরেছিল জাতিস্মর শিশুটি। যে গ্রামে ছিল তার বাড়ি। যেখানে তাকে কুঠার দিয়ে কুপিয়ে খুন করা হয়েছিল।

গ্রামের কাছে এসেই, শিশুটি ডঃ ল্যাসচের হাত ছাড়িয়ে গ্রামের দিকে দৌড়াতে শুরু করেছিল। গ্রামের একটি বাড়ির সামনে গিয়ে একজনের নাম ধরে ডেকেছিল। একজন বৃদ্ধা মহিলা বেরিয়ে এসেছিলেন। শিশুটি  তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল, বৃদ্ধা কেমন আছেন, আর তাঁর শ্বাসকষ্ট এখনও আছে কিনা। বৃদ্ধা মহিলা অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, “কে তুমি, কী করে জানলে আমার এই রোগ আছে?”

সিরিয়ায় শিহরণ

এরপর শিশুটি গড়্গড় করে গ্রামের বাসিন্দাদের নাম বলতে থাকে। কোনটা কার বাড়ি বলে দিতে থাকে। উপস্থিত গ্রামবাসীরা স্তম্ভিত হয়ে যান। ডঃ ল্যাসচের টিম সব তথ্য লিখে নিতে থাকে। শিশুটির চোখ, এর পর ঘুরতে থাকে ভিড়ের ভেতর। কাকে যেন সে খুঁজতে থাকে। হঠাৎ শিশুটি একজন লোকের নাম ধরে ডেকে তার জামা টেনে ধরেছিল। বছর চল্লিশের লোকটি ও গ্রামবাসী স্বীকার করেছিল শিশুটি ঠিক নাম ধরেই ডেকেছিল।

ক্রোধে শিশুটির মুখ চোখ লাল হয়ে গিয়েছিল। সে চিৎকার করে বলে উঠেছিল “আমি তোমার প্রতিবেশী ছিলাম। আমাদের মধ্যে মারপিট হয়েছিল। তুমি আমাকে কুঠারের ঘা মেরে খুন করেছিলে।” শিশুটির কথা শোনা মাত্র লোকটির মুখ সাদা হয়ে গিয়েছিল আতঙ্কে।

শিশুটি এরপর লোকটিকে নিজের পূর্বজন্মের নাম বলেছিল। এ বারও স্তম্ভিত হয়ে যায় গ্রামবাসী। সেই নামে সত্যিই একজন লোক ওই গ্রামে বাস করতেন। কিন্তু লোকটি গত চারবছর ধরে নিরুদ্দেশ। শিশুটি তার পূর্বজন্মের খুনিকে বলেছিল, “আমার মনে আছে তুমি আমাকে কোথায় কবর দিয়েছিলে।” বলেই শিশুটি দৌড়াতে শুরু করেছিল। পিছন পিছন দৌড়াতে শুরু করেছিলেন গবেষক দলটি ও গ্রামবাসীরা।

গ্রাম থেকে দূরে, একটা মাঠে সবাইকে নিয়ে গিয়েছিল শিশুটি। সেখানে পাথর দিয়ে তৈরি করা একটি স্তূপের কাছে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। সেখানে শিশুটি  জানিয়েছিল “লোকটি আমার দেহ এই খানে কবর দিয়েছিল। আর কুঠারটি  ওখানে পুঁতে রেখেছিল”।

পাথর সরিয়ে কবর খোঁড়া শুরু হয়। বেরিয়ে আসে একটি কঙ্কাল। গায়ে চাষীর পোষাক। কঙ্কালটির মাথার খুলি দুভাগ হয়ে গেছে।  সুষ্পষ্ট ভাবে বোঝা যাচ্ছে কুঠার জাতীয় কোনও অস্ত্র দিয়ে মাথায় মারণ আঘাত হানা হয়েছিল। শিশুটির দেখানো  অপর জায়গাটি খুঁড়ে উদ্ধার করা হয় খুনে ব্যবহৃত কুঠারটিও।

সাজা পায়নি খুনি, কারণ জাতিস্মর বিষয়টিই বিজ্ঞানের কাছে অবৈজ্ঞানিক

গ্রামের লোক চেপে ধরতেই খুনি তার অপরাধ স্বীকার করেছিল। কিন্তু সিরিয়ার পুলিশে তাকে গ্রেফতার করেনি। কারণ জাতিস্মরের ভাষ্য বিজ্ঞানের কাছে আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়।  ফলে খুনির সাজা হয়নি। ছেলেটি ও খুনির নাম আজও অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। পুলিশও বেওয়ারিশ লাশ প্রাপ্তির মামলা দায়ের করে দায় সেরেছিল।

ডঃ ল্যাসচ মারা গিয়েছিলেন ২০০৯ সালে। তাঁর পরে আর কেউ বিষয়টা নিয়ে কোনও অনুসন্ধান করেননি। তবুও চাঞ্চল্যকর এই কাহিনীটি জাতিস্মর বিতর্ক আবারও উসকে দিয়ে গেছে। যাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়তো সম্ভব নয়।

সূত্রChildren Who Have Lived Before by Trutz Hardo

Comments are closed.