নয় দিদার অবিশ্বাস্য কীর্তি, লুকিয়ে করছিলেন দুঃস্থদের সেবা, দাদুরা জানতে পারলেন তিন দশক পর

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন  গোস্বামী

    আমেরিকার পশ্চিম টেনেসির একটি সম্ভ্রান্ত এলাকা। ৭৬ বছরের মিস্টার অ্যালেনের সন্দেহটা হয়েছিল আজ থেকে ৫ বছর আগে। তাঁর ও স্ত্রী’র জয়েন্ট অ্যাকাউন্টে জমা টাকাটা বেশ কম কম ঠেকছিল। তাঁর ৬০ বছরের স্ত্রীর গাড়ির মাইলোমিটারের রিডিং অনেক বেশি লাগছিল। বন্ধু স্মিথকে বলেছিলেন ঘটনাটা। ৭৪ বছরের বন্ধুরও একই সমস্যা। স্মিথ হেসে বলেছিলেন ,”দ্যাখো বুড়ো বয়েসে আমাদের বউরা কচি ছেলেটেলের প্রেমেটেমে পড়ল কিনা।”

    কিন্তু কেবলমাত্র এই দুজন নন, একে একে ন’জন অত্যন্ত ঘনিষ্ট বান্ধবীর স্বামীরা একই সমস্যার কথা জানিয়েছিলেন। মিস্টার অ্যালেন এক উইক-এন্ডে বাড়িতে ডেকেছিলেন মিটিং, তাঁর বাড়ির ড্রইংরুমে তাঁর স্ত্রীর মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছিল তিরিশ বছর ধরে চেপে রাখা এক অবিশ্বাস্য কাহিনি। যা শুনে ন’জন দাদু কেঁদে ফেলেছিলেন। উঠে জড়িয়ে ধরেছিলেন দিদাদের।

    শুরু হয়েছিল দিদাদের গোপন মিশন

    শিশুকাল থেকেই টেনেসিতে একসাথে আছেন এই নয় দিদা। এক স্কুলে পড়া, একই শহরে বিয়ে, একই জায়গায় বাড়ি কেনা। আজও একে অপরকে ‘সিস্টার’ বলে ডাকেন। আজ থেকে ৩৫ বছর আগে। এক দুপুরে তাস খেলতে খেলতে নয় বান্ধবী ঠিক করলেন তাঁরা অসহায়দের পাশে দাঁড়াবেন ,কিন্তু কাউকে না জানিয়ে। সেইদিনই  তৈরি হয়েছিল এক গুপ্ত সমিতি, নাম দেওয়া হয়েছিল The 9 Nanas

    সেবার জন্য দরকার অর্থ। তাঁরা ঠিক করলেন তাঁরা নিজেরাই নিজেদের পরিবারের সব কাপড় কাচবেন। লন্ড্রিতে পাঠাবেন না। ওই পয়সা জমিয়ে দুঃস্থদের সেবা করবেন।নয় দিদা শুরুর দিকে মাসে প্রায় ৪০০ ডলার জমিয়ে ফেলতেন। তখন অবশ্য তাঁরা দিদা ছিলেন না। বয়েস ছিল তিরিশের কোঠায়। বরেরা অফিস বেরিয়ে যাওয়ার পর দিদাদের কাচাকাচি শুরু হত, ফলে বরেরা  জানতেই পারতেন না।

    দিদাদের কয়েকজন, আজও তাঁদের নাম জানাতে চান না

    তহবিল তৈরি হওয়ার পর দিদারা তাঁদের চোখ কান খোলা রাখতে শুরু করলেন। তাঁদের জানতে হবে কারা অসহায়, কাদের সাহায্য প্রয়োজন। এটা খুবই কঠিন কাজ। কেউ কেউ ইচ্ছা করে অসহায়ের অভিনয় করেন, সেকথা তাঁদের মাথায় ছিল। তাই অপরের মুখে শোনা কথার চেয়ে নিজেদের চোখ কান ও মাথার ওপর ভরসা রাখলেন দিদারা। তাঁদের যাঁকে মনে হবে সাহায্য় করা প্রয়োজন একমাত্র তাঁকেই সাহায্য করবেন।

    খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল এক ভবঘুরে মানুষকে। ২৪ ডিসেম্বর রাতে রাস্তার ধারে শুয়ে ছিলেন প্যাকিংবাক্সের আড়ালে। ভোরের দিকে একটি গাড়ি এসে মানুষটির পাশে রেখে গিয়েছিল একটি প্যাকেট। পঁচিশে ডিসেম্বর সকালে মানুষটি পেয়েছিল এক পাউন্ড কেক, কমলা লেবু,শীতের জ্যাকেট, কম্বল ও কিছু টাকা। পেয়েছিল একটি চিরকুট, তাতে লেখা ,”কেউ একজন, যে তোমায় ভালোবাসে”

    তিন দশক ধরে চলেছে অভিযান, টের পায়নি কাক পক্ষীতেও 

    ৩০ বছর ধরে রোজ ভোর চারটের সময় ন’জন দিদা  চলে আসতেন এক দাদুর রেস্টুরেন্টের কিচেনে। কেউ মাখতেন ময়দা, কেউ ফেটাতেন ডিম, কেউ ছড়াতেন বাদাম, কেউ করতেন বেকিং। সূর্য ওঠার  অনেক আগে কেক তৈরি শেষ। রেস্টুরেন্টের কর্মীরা আসার আগে রেস্টুরেন্টের কিচেন ঝকঝকে করে দিয়ে দিদারা বেরিয়ে পড়তেন অপারেশনে। নয় দাদু তখন বাড়িতে গভীর ঘুমে অচেতন।

    পঞ্চাশ ষাটটি কেক নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন দিদারা। গাড়িতে যেতে যেতে এলাকা বুঝে তৈরি হত প্যাকেট। প্যাকেটে ঢুকত, জামাকাপড়, ফল, মাছ মাংস থেকে সব্জি ও বেবিফুড। নয় দিদা বাজপাখির চোখ নিয়ে খুঁজতেন আর্ত অসহায়দের। দেখা পেলেই, অসহায় মানুষটিকে না জানিয়ে পাশে প্যাকেটটা নামিয়ে দিয়ে দিতেন ছুট। প্যাকেটটা পেয়ে দুঃস্থ মানুষের মুখের হাসি দূর থেকে দেখে নিজেদের চোখের জল মুছে দিদারা খুঁজতেন পরের টার্গেট। দাদুরা বিছানা ছাড়ার আগেই অপারেশন শেষ হয়ে যেত দিদাদের।

    এরপর দিদাদের অপারেশন শুরু হয়েছিল টেনেসির বস্তি এলাকায়। চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে দিদারা সেই সমস্ত বাড়িকে চিহ্নিত করতে শুরু করলেন যেগুলির জানলায় ফ্যান লাগানো। এটা থেকে দিদারা বুঝতে পারতেন যে ওঁদের এয়ারকন্ডিশন মেশিন লাগাবার অর্থ নেই। রাতে লক্ষ্য করতেন কোন বাড়িতে আলো জ্বলছে না বা খুবই কম আলো জ্বলছে। সেই মতো বাড়ির নাম্বার জেনে নিয়ে কারেন্টের বিল লুকিয়ে মিটিয়ে দিতেন দিদারা।

    টেনেসির বস্তি এলাকা

    মুদি খানার দোকানে, ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কোনও দুঃস্থ পুরুষ বা মহিলাকে সংকুচিত হয়ে ঢুকতে দেখলে, পিছন পিছন ঢুকতেন দিদারা। দল বেঁধে নয়, দু’জন কি তিনজন। দিদারা দেখতেন, দুঃস্থ মানুষটি হয়ত কোনও পণ্য খুব আগ্রহ নিয়ে দেখছেন, কিন্তু দামটা দেখার পর মানুষটির মুখ ম্লান হয়ে উঠত। মানুষটি পণ্যটি তাকে রেখে দিতেন। এরপর এক দিদা পণ্যটি আবার তাক থেকে তুলে নিতেন। কাউন্টারে গিয়ে পণ্যটির দাম মেটাতেন। আর এক দিদা বিল সমেত পণ্যটি ফেলে দিতেন মানুষটি সঙ্গের ট্রলিতে। পণ্যের সঙ্গে বিলটি দিয়ে দিতেন পাছে মানুষটিকে দোকানের কর্মীরা চোর না ভাবেন।

    তিরিশ বছরে দিদারা শয়ে শয়ে অসহায় বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা মায়েদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, বিভিন্ন বিলের টাকা মিটিয়েছেন লুকিয়ে। দিদাদের বেশিরভাগের বয়েস এখন সত্তরের ওপরে। তাই দিদারা একজন যুবতীকে বেতন দিয়ে রেখেছেন, দুঃস্থদের চিহ্নিত করার জন্য। যুবতীটির সাংকেতিক নাম ‘সানি’।

    যুবতীকে তাঁদের মিশনে নেওয়ার আগে মিশনটি গোপন রাখার শপথ নেওয়ানো হয়েছিল। যুবতী বাড়িতে বলেছিলেন, তিনি মার্কেটিংয়ের কাজ করেন। যুবতীটি গাড়ি নিয়ে ঘোরেন, বন্ধুর মতো কথা বলেন দুঃস্থ ও অসহায়দের সঙ্গে। নাম ঠিকানা জোগাড় করেন। একদিন সকলের অলক্ষ্যে অসহায়দের দরজার বাইরে পৌঁছে যায় দিদাদের সাহায্য।

    The 9 Nanas দলের আরও তিন সদস্যা

    দাদুদের কাছে ধরা পড়ার পর কী বলেছিলেন দিদা মেরি!

    দিদাদের গুপ্ত সমিতির মুখপাত্র মেরি অ্যালেন দাদুদের বলেছিলেন, “তোমাদের অ্যাকাউন্ট থেকে বেশি টাকা নিইনি আমরা।  লন্ড্রির পয়সা বাঁচিয়ে, আমাদের বাড়ির অব্যবহৃত জিনিসপত্র বেচে টাকা জমাতাম। নিজেদের পরিবারের কেনাকাটার জন্য পাওয়া ফ্রি কুপনগুলো জমাতাম। প্রতি বুধবার গোল্ডস্মিথের ডিপার্টমেন্টাল স্টোর বিশাল ছাড় দেয়। বুধবারের সেল থেকে ৭০০ ডলারের জিনিস কিনতাম মাত্র ১০০ ডলারে।”

    নয় দাদু তখন চুপ। মেরি অ্যালেন বলেছিলেন, “তোমরা ন’জন তোমাদের এত এত টাকা কীভাবে খরচা করবে ভেবেছ! ঘুরে বেড়িয়ে আর অপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনে! আমরা কিন্তু ভেবেছিলাম অসহায়দের জীবনযন্ত্রণা অন্তত কিছুক্ষণের জন্য কমিয়ে দেব। তোমাদের থেকে সামান্য টাকা আমরা নিয়েছি বলে আজ মিটিং ডেকেছ!”

    সব শুনে দাদুরা রাগ করেননি। চোখের জল মুছতে মুছতে আরও শক্ত করে চেপে ধরেছেন দিদাদের হাত। দিদাদের মিশনে একে একে যোগ দিয়েছে ছেলে মেয়ে বৌমারাও। দিদাদের গোপন অপারেশন টেনেসিতে ধীরে ধীরে আন্দোলনের রুপ নিচ্ছে।

    তবে গত ৩৫ বছরে দিদারা দুঃস্থ ও অসহায়দের সেবায় খরচা করে ফেলেছিলেন প্রায় সাড়ে ছ’কোটি টাকা। এর সিংহভাগই দাদুদের অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া। দাদু অ্যালেন  দিদিমা মেরিকে একটু অনুযোগের সুরে বলেছিলেন, একবার বললেই পারতে। দিদা মেরি উত্তরে বলেছিলেন, ঢাকঢোল পিটিয়ে দান করলে গ্রহীতাকে ছোট করা হয়। আমরা সমাজের চোখে, অসহায়দের চোখে বড় হতে চাইনি। আর তোমাদের চোখে তো নয়ই।” দাদু আর কথা বাড়াননি।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More