ডুবতে বসা দ্বীপ আগলাচ্ছেন পাঁচ দশক ধরে , সুন্দরবনের রাঙাবেলিয়ার রঙ বদলেছেন ৮৪-র তুষার

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    সোহিনী চক্রবর্ত্তী

    কলকাতা থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে সুন্দরবনের ছোট্ট একটা দ্বীপ রাঙাবেলিয়া। কয়েক দশক আগেই হয়তো ধ্বংস হয়ে যেত পারত। ইতিহাসের পাতাতেই কেবল হদিশ মিলত যে, এখানে এককালে ছিল একটি দ্বীপ। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বলা ভালো সুন্দরবনের এই দ্বীপটিকে শেষ হয়ে যেতে দেননি বছর ৮৪-এর এক বৃদ্ধ। নাম তাঁর তুষার কাঞ্জিলাল। গোলগাল চেহারা। ফর্সা টকটকে রঙ। মুখে সর্বদাই লেগে রয়েছে হাসি। জীবনের প্রায় ৫০ বছরেরও বেশি সময় তিনি কাটিয়েছেন এই সুন্দরবনেই। নিজের সবটুকু দিয়ে আগলে রেখেছেন এখানকার বাসিন্দাদের। সর্বক্ষণ তাঁদের উন্নতির কথাই ভেবেছেন। আর শুধু ভাবনাই নয়, কাজকর্মে তাঁদের উন্নতি করেও দেখিয়েছেন তুষারবাবু।

    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্ধভক্ত তুষার কাঞ্জিলাল। জীবনের আদর্শ মানেন তাঁকেই। আর রবি ঠাকুরের অনুপ্রেরণাতেই এই পথ চলা শুরু তাঁর। তুষারবাবুর কথায়, “রবি ঠাকুরকে সবাই বিখ্যাত কবি, গল্পকার——এই ভাবেই চেনেন। তাঁর গানও জগৎ বিখ্যাত। তবে গ্রামীণ এলাকায় মানুষের উন্নতির জন্যও যে তিনি অনেক কাজ করেছিলেন, সে কথা অনেকেরই অজানা। তিনটি গ্রামকে দত্তক নিয়ে রবীন্দ্রনাথই তার নাম দেন শ্রীনিকেতন।” তুষারবাবু জানিয়েছেন, প্রথমবার সুন্দরবনে আসার পরই সেখানকার প্রেমে পড়েছিলেন তিনি। লবণাক্ত মাটি, ম্যানগ্রোভের জঙ্গল, জলাজমি, আর এখানকার সাধারণ মানুষের সরলতা ভীষণ ভাবে টেনেছিল তুষারবাবুকে। তখনই ভেবেছিলেন, এঁদের উন্নতির জন্য কিছু না কিছু করতেই হবে।

    কর্মসূত্রে দেশ-বিদেশের বহু জায়গায় ঘোরার পর নিজের ভিটেয় ফিরে আসেন তুষার কাঞ্জিলাল। খুঁজে পান সুন্দরবনের প্রত্যন্ত দ্বীপ রাঙাবেলিয়া। সময়টা তখন ১৯৬৭ সাল। সভ্যতার উন্নতির আলো সেখানে তখনও পৌঁছতে পারেনি। রাঙাবেলিয়াতে গিয়ে তুষারবাবু বুঝতে পারেন জীবনযাপনের ন্যূনতম সুবিধাটুকুও সেখানে নেই। না আছে পানীয় জলের ব্যবস্থা। না বিদ্যুৎ। পাকা রাস্তা, শিক্ষার মতো পরিষেবা সেখানে বিলাসিতা। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার হালও তথৈবচ। বরং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কোনোওমতে বেঁচে আছে গুটিকয়েক পরিবার। আর আতঙ্কে দিন গুনছে যে, এই বুঝি সাগরের গ্রাসে খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে তাঁদের বেঁচে থাকার শেষ সম্বলটুকুও।

    এই মানুষগুলোর নিত্যদিনের যন্ত্রণার সঙ্গী হয়েছিলেন তুষারবাবু। ওঁদের উন্নতিই হয়ে উঠেছিল তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। তাই শেষ পর্যন্ত ১৯৬৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে পাকাপাকি ভাবেই সুন্দরবনেই নিজের আস্তানা গড়লেন তুষার কাঞ্জিলাল। প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছে দিলেন প্রযুক্তির আলো। তাঁর হাত ধরেই উন্নয়নের দিকে একটু একটু করে এগোতে শুরু করল সুন্দরবন। পাকা সড়ক থেকে শুরু করে পানীয় জল, শিক্ষার সুব্যবস্থা——সব কিছুর ব্যবস্থা নিজে হাতে করেছেন তুষারবাবু।

    বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্যের সমাহার এই সুন্দরবনেই। তবে সুন্দরী এবং গরান গাছের গহন ছাওয়া ছাড়াও এই অঞ্চলের আর এক আকর্ষণ রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। ত্রাসও বটে। তবে সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এই ম্যানগ্রোভ অরণ্য ক্রমশ ক্ষয়ে যাতে বসেছে। একটু একটু করে এগোচ্ছে বিলুপ্তির পথে। তাই মানুষের উন্নতির পাশাপাশি ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণেও হাত লাগিয়েছিলেন তুষারবাবু। গত কয়েক দশক ধরে সুন্দরবন এবং আধুনিক সভ্যতার মাঝখানে মানবসেতু হয়ে কাজ করছেন তিনি। মর্ডান সোসাইটির খারাপটুকু ফেলে দিয়ে বাকি সব ভালোটাই সুন্দরবনকে দিতে চেয়েছেন তিনি। দিয়েওছেন। নিজের সবটুকু উজাড় করে ওই এলাকা, আর ওখানকার মানুষদের ভালো চেয়ে আসছেন গত ৫০ বছর ধরে।

    তবে তাঁর যাত্রাপথের শুরুটা ছিল বড্ড কঠিন। আর সবচেয়ে কঠিন ছিল ওখানকার বাসিন্দাদের বিশ্বাস অর্জন করা। তবে কথায় বলে যার শেষ ভালো তার সব ভালো। সম্ভবত তুষার কাঞ্জিলালের সৎ মনোভাবের জন্যই অল্পদিনের মধ্যে রঙ্গবালিয়াতে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন তিনি। কিন্তু এই সব কিছুর মধ্যেও সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ম্যানগ্রোভের নিত্যদিনের ক্ষয়। প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে সুন্দরবন এবং তার ম্যানগ্রোভ অরণ্য। কিন্তু প্রকৃতির রোষের শিকার এই এলাকার একটা বড় অংশ। প্রায় প্রতিদিনই সাগরের গ্রাসে চলে যাচ্ছে ভূখণ্ড। এমনিতেই নোনা মাটি হওয়ার দরুণ এখানকার মাটির বাঁধন একটু আলগা। তার মধ্যে ব্রিটিশ শাসনকালে থেকে আজ অবধি কেবল ক’টা টাকার লোভে যথেচ্ছ ভাবে ম্যানগ্রোভ ধ্বংস করে চলেছে একদল অর্থলোভী মানুষ। যার জেরেই আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে যেতে বসেছে সুন্দরবনের এই ম্যানগ্রোভের সমাহার।

    কিন্তু সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভকে ক্ষয়ের হাত থেকে বাঁচানোর পণ করেছিলেন তুষার কাঞ্জিলাল। আর সেই লক্ষ্যেই শুরু হলো যুদ্ধ। ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল আরও গাছ লাগানো। এর পাশাপাশি যে সব গাছ রয়েছে তাদের সঠিক ভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। নিজে এটা বুঝতে পারার পরেই গ্রামের সাধারণ মানুষগুলোকেও এটা বোঝাতে চেয়েছিলেন তুষারবাবু। প্রথমে খানিক ধাক্কা খেলেও, পরে সফল হন তিনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি গ্রামবাসীদের বিশ্বাস অর্জন করেন। তাঁদের বোঝাতে সক্ষম হন যে গাছ সংরক্ষণ আর নতুন গাছ রোপণের মাধ্যমেই বাঁচাতে হবে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভের সমাহারকে। তবে কেবল ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণ নয়, স্থানীয়দের জীবনযাপনেও উন্নয়নের ছোঁয়া দিতে চেয়েছিলেন তুষারবাবু। সেই জন্যই ওই এলাকার জন্য উপযুক্ত কৃষি পদ্ধতিতে চাষের কাজে পটু করে তুলেছেন গ্রামবাসীদের। তাদের নিজের হাতে তৈরি নানান সামগ্রীকে নিয়ে এসেছেন কুটির শিল্পের আওতায়। চালু করেছেন বেশ কিছু উন্নয়নমূলক প্রকল্পও।

    নিজের জীবনের ৫০ বছরেরও বেশি সময় শুধু সুন্দরবন, সেখানকার মানুষ আর ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণের জন্য দিয়েছেন তুষার কাঞ্জিলাল। এগুলোকে নিছক কাজ নয়, নিজের দায়িত্ব এবং কর্তব্য বলেই ভাবেন তিনি। নিজের দায়িত্বের প্রতি নিষ্ঠাবান হওয়ার জন্য যোগ্য সম্মান ‘পদ্মশ্রী’-ও পেয়েছেন তুষারবাবু। তবে এত ভালো ঘটনার মধ্যেই মাঝে মাঝেই সংশয় উঁকি দেয় তাঁর মনে। তিনি বলেন, “আগামী প্রজন্ম কতটা এই কাজে নিজেদের সঁপে দেবে এ ব্যাপারে একটু সংশয় রয়েছে। যদিও বহু তরুণ-তরুণী আমার সঙ্গে কাজ করেন। তাও চিন্তায় থাকি। আমার ভবিষ্যত প্রজন্ম কতটা এই ধারাকে বয়ে নিয়ে যেতে পারবে সে ব্যাপারে খানিক অনিশ্চয়তাতেই থাকি।“

    ১৫০ বছর আগে ব্রিটিশ সরকার সুন্দরবনকে ধ্বংস করার শুরুটা করে দিয়েছিল। তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়েছে আরও অবক্ষয়। তবে এই ক্ষয়ের মেরামতিতেই ময়দানে নেমেছেন তুষার কাঞ্জিলাল। দীর্ঘদিন ধরে তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বিপ্লব এনেছে। তবে আজ থেকে ৫০ বছর পর আগামী প্রজন্ম এই সৌন্দর্যের স্বাদ পাবে তো? এত বছর ধরে নিষ্ঠা ভরে নিজের দায়িত্বে অনড় থাকলেও,  এই একটা চিন্তাই তাঁকে বড় ভাবায়।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More