রবিবার, জুন ১৬

২০ বছর ধরে মুম্বইয়ে গণেশ প্রতিমা বানাচ্ছেন মহম্মদ শেখ,পড়েন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও

রূপাঞ্জন গোস্বামী

মহম্মদ শেখ ছিলেন ওড়িশার কৃষক। কিশোর বয়েসে একদিন উঠে পড়েছিলেন মুম্বইগামী ট্রেনে, ভাগ্য সন্ধানে।। চাষবাস ছাড়া কিছু জানতেন না তখন। একটা কাজের জন্য মুম্বইয়ের দরজায় দরজায় ঘুরছিলেন। সঙ্গে থাকা টাকা পয়সা  ক্রমশ ফুরিয়ে আসছিল। অচেনা মুম্বই শহরে কে দেবে তাঁকে কাজ! যে ব্যক্তির আশ্রয়ে ছিলেন ছিলেন, তিনি ক্রমশ বিরক্ত হচ্ছিলেন।

এক দিন কাজের তাগিদে খালি পেটে ঘুরতে ঘুরতে মাথা ঘুরে বসে পড়েছিলেন একটা এঁদো গলির একটি বাড়ির এক চিলতে বারান্দায়। জল এনে দিয়েছিল বাচ্চা একটি মেয়ে, তাকে সেই মুহূর্তে হিন্দুদের মা দুর্গা মনে হয়েছিল মহম্মদ শেখের। বারান্দাটির উলটো দিকে ছিল মেয়েটির বাবার ঠাকুরের মূর্তি তৈরির কারখানা। মেয়েটির বাবা গণেশ ঠাকুর গড়ছেন। বসে বসে তাই দেখছিলেন মহম্মদ।

মেয়েটির বাবা বুঝেছিলেন মহম্মদ অভুক্ত। বাড়ির ভেতর থেকে কারখানায় চা এলে, এক কাপ চা আর কিছু বিস্কুট পাঠালেন মহম্মদের জন্য। সেই বাচ্চা মেয়েটির হাত দিয়ে। মহম্মদ প্রাণ ফিরে পেলেন যেন। চা খেয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মূর্তিগড়া দেখতে থাকেন মহম্মদ। তাঁর মনে হল এই কাজটা তিনি পারবেন। ছোট বেলায় গ্রামের হিন্দু বন্ধুদের সরস্বতী ঠাকুর বানিয়ে দিতেন তিনি।

এর পর নিয়মিত মেয়েটির বাবার কাছে যেতে লাগলেন। চুপ চাপ বসে বসে দেখেন। প্রতিমাশিল্পী গড়েন দুর্গা, গণেশ, লক্ষ্‌ ঠাকুরের প্রতিমা। কথায় কথায় মহম্মদ জানতে পারেন প্রতিমাশিল্পী এসেছেন পশ্চিম বাংলার এক গ্রাম থেকে। মহম্মদ প্রতিমাশিল্পীর কাজে টুকিটাকি সাহায্য করতে থাকেন। বাঙালি কারিগর অবাক হয়ে যেতেন মহম্মদের কল্পনাশক্তি ও তুলির নিঁখুত টান দেখে। একদিন এক টুকরো কাঠ খোদাই করে গণেশ মূর্তিই বানিয়ে ফেললেন মহম্মদ। জড়িয়ে ধরেছিলেন প্রতিমাশিল্পী। মাস মাইনেতে নিজের কারখানায় নিয়ে নিলেন মহম্মদকে।

এ বার নিজের হাতে প্রতিমা তৈরি শুরু করলেন মহম্মদ। মাটি, কাঠ, পাথর যাই হাতের পাশে থাকুক না কেন, মহম্মদ বানিয়ে দেন নিখুঁত প্রতিমা। ক্রেতারা এসে মহম্মদের প্রতিমা আগে পছন্দ করতেন। বাঙালী প্রতিমাশিল্পী রাগ করতেন না। খুশিই হতেন। উৎসাহ দিতেন মহম্মদকে। পয়সা জমাতে বলতেন, যাতে সে নিজেই একটা কারখানা তৈরি করতে পারে।

কারখানায় কাজের ফাঁকে মুম্বইয়ের যত বিখ্যাত প্রতিমাশিল্পী আছেন, তাঁদের সবার কাজ ঘুরে ঘুরে দেখতেন মহম্মদ। ঘন্টার পর ঘন্টা শুধু দেখেই যেতেন। মূর্তি তৈরির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দেখতেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। প্রতিমা বিক্রির সময়ও হাজির থাকতেন। সেই জ্ঞান কাজে লাগাতেন ঠাকুর তৈরির সময়। সারা মুম্বই যখন ঘুমাত, টিমটিমে বাল্বের আলোয় গণপতি বাপ্পা বা মা দুর্গার চোখ আঁকতেন মহম্মদ। গভীর রাতে মহম্মদের জন্য চা করে নিয়ে আসতেন সেই বাঙালি প্রতিমাশিল্পী।

মহম্মদ একই সঙ্গে বিভিন্ন প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরতেন। প্রতিমাশিল্পীর কাছ থেকে নিয়ে আসার সময় রাস্তায় অনেক প্রতিমা ক্ষতিগ্রস্থ হত, সেগুলি সারিয়ে দিতেন মহম্মদ। এর জন্য কোনও পয়সা নিতেন না। তিনি বলতেন, “আমি নিজেকে নিজেই পরীক্ষা করতাম, আমি আগের অবস্থায় প্রতিমাকে ফিরিয়ে দিতে পারব কিনা। আল্লাহ-এর আশীর্বাদে পারতাম”

বছরের বিভিন্ন সময় মুম্বইয়ের প্রতিমাশিল্পীদের নিয়ে বিভিন্ন সেমিনার ও ওয়ার্কশপ করে বিভিন্ন সেচ্ছাসেবী সংগঠন। সেগুলোতে যোগ দিতেন মহম্মদ। বিখ্যাত প্রতিমাশিল্পীদের বক্তব্য শুনতেন। নিজের বক্তব্যও রাখতেন। তাঁর নাম শুনে সবাই ঘাড় বাঁকিয়ে দেখতেন। কিন্তু কেউ তাঁকে কোনও দিন নিরুৎসাহিত করেননি।

আজ, মুম্বই শহর থেকে কিছু দূরে, ভাইন্দারের বেকারি লেনে, ৩৯ বছরের মহম্মদ শেখের নিজের প্রতিমা তৈরির ওয়ার্কশপ আছে। এখন তিনি মুম্বইয়ের বিখ্যাত ও পরিচিত প্রতিমাশিল্পী। তাঁর কাছে প্রতিমার অর্ডার দেন চিত্রতারকা থেকে শুরু করে শিবসেনা নেতারা। বিভিন্ন আকৃতির শুধু গণেশই বানান বছরে ২০০টির বেশি। এর সঙ্গে বানান মা দুর্গার প্রতিমা। তবে তিনি প্রতিমার অতিকায়ত্বে বিশ্বাসী নন। তাঁর মতে প্রতিমা ছোট হলেই বেশি নিখুঁত হয়। দেখতেও সুন্দর লাগে।

মহম্মদের বিষয়ে আরও অনেক কিছু  বলা বাকি। মহম্মদ একজন পরিবেশপ্রেমী। তিনি বহুবছর ধরে প্রতিমায় রাসায়নিক রঙ ব্যবহারের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে আসছেন। দূষণমুক্ত ও পরিবেশবান্ধব উপাদান দিয়ে ঠাকুর তৈরি করে আসছেন তিনি। এবং সবাইকে প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করতে উৎসাহ দিয়ে আসছেন।

মহম্মদ বলেন, “বিষাক্ত রাসায়নিক রঙ ও  উপাদান দিয়ে তৈরি প্রতিমা সমুদ্রের জলে ফেলে সমুদ্রের জলের ক্ষতি করলে দেবতার অভিশাপ ফিরে আসবে জলদূষণ হয়ে। যার থেকে আমরা কেউই বাঁচব না। আমাদের নিজেদের বাঁচাতেই পরিবেশকে সুরক্ষা দিতে হবে”।  তিনি একবার সংবাদ মাধ্যমের সাহায্যে আবেদন জানিয়ে ছিলেন মুম্বইবাসীকে,  বলেছিলেন, “আপনারা রোজ কত বই আর ফুলের মালা ডাস্টবিনে ফেলে দেন। আমায় দিন আমি সেগুলি দিয়ে ঠাকুর তৈরি করব”।

এই হলেন মহম্মদ শেখ। যিনি নিজে একজন নিষ্ঠাবান মুসলমান। রমজানে উপবাস করেন, দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নমাজ পড়েন। ফযর, যুহর,আসর, মাগরিব,ঈশা, বিতর একটাও বাদ পড়ে না। মসজিদ থেকে ফিরেই লেগে পড়েন দেবতার রূপ ফুটিয়ে তোলার কাজে, ততটাই মন দিয়ে। যদি কেউ প্রশ্ন করেন, কেন রমজানেও ঠাকুর গড়া বন্ধ রাখেন না মহম্মদ! হাসি মুখে সরল মানুষটি সরল ভাবেই উত্তর দেন,রমজান পবিত্র মাস, আমাদের সেই মাসে শুদ্ধ ও পবিত্র কাজের মধ্যে জড়িয়ে থাকা উচিত। মূর্তি তৈরি করার মত পবিত্র কাজের সঙ্গে আমি জড়িয়ে আছি। এবং তা আল্লাহ’র ইচ্ছাতেই। নাহলে আমি এটা করতেই পারতাম না”।

মহম্মদের মনে পড়ে ১২ বছর আগের কথা। তাঁর পরিচিত এক ব্যক্তি, এক শেঠকে নিয়ে এসেছিলেন গণেশ মূর্তি কেনাতে। সেই শেঠ বিধর্মীর কাছে গণেশ মূর্তি কিনতে কুন্ঠা বোধ করছিলেন। মহম্মদের পরিচয় জেনে শেঠ বলেওছিলেন, এক বিধর্মীর হিন্দু দেবতার  বিগ্রহ তৈরি করা উচিত নয়। মহম্মদ তাঁকে বলেছিলেন, “আপনার  ঈশ্বরকে জিজ্ঞেস করুন ,কেন আমার  হাতেই তিনি সুন্দর ও নিখুঁত মূর্তি  তৈরির দায়িত্ব দিয়েছেন’। বলাই বাহুল্য সেই ক্রেতা এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারেননি। আজ ১২ বছর ধরে তিনি সবার আগে গণেশ প্রতিমা বায়না দিতে আসেন মহম্মদের কারখানায়। সত্যিই তো, শিল্পী আর তাঁর  শিল্পকে ধর্মের বাঁধনে বাঁধা  যায় নাকি!

Comments are closed.