বৃহস্পতিবার, জুন ২৭

জাপানেও আছেন মা সরস্বতী! সেখানে তিনি ‘বেঞ্জাইতেন’

 রূপাঞ্জন গোস্বামী

আমাদের ছোটবেলায় সরস্বতী পূজায় বুদ্ধমূর্তি সরস্বতীর খু্ব  চাহিদা ছিল। সরস্বতীর মুখটা ভারতীয়র মতো হবেনা, হতে হবে গৌতম বুদ্ধর মতো।  গ্রামে গঞ্জের প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে  মঙ্গোলয়েড  মুখের সরস্বতী দেখতে পাওয়া যেতো।  ভাবতাম, প্রথা ভাঙার অপচেষ্টায়, ছেলে ছোকরার দল  জোর করে প্রতিমাশিল্পীদের দিয়ে এসব করাচ্ছে। তখন স্বপ্নেও ভাবিনি,  এই বুদ্ধমূর্তি সরস্বতীর পূজা সত্যি সত্যিই  জাপানে হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে হয়ে আসছে।এবং জাপানবাসীর  সবচেয়ে  প্রিয় দেবী মা সরস্বতী, জাপানে পূজিতা হন বেঞ্জাইতেন ( 弁才天 , 弁財天 ) নামে ৷

দেবী বেঞ্জাইতেন

ভারতের অন্য রাজ্যে সরস্বতী চতুর্ভুজা হলেও, জাগ্রতা দেবী বেঞ্জাইতেন দ্বিভূজা। বাংলার মতো জাপানে দ্বিভূজা সরস্বতী পুজোরই চল রয়েছে৷ বেশিরভাগ বিগ্রহে, তাঁর কোনও বাহন নেই। তবে, কোনও কোনও বিগ্রহে তাঁর সঙ্গে  ড্রাগন অথবা সাপও দেখতে পাওয়া যায়। মা সরস্বতী ত্রিমুণ্ডধারী বৃত্রাসুরকে বধ করেন। বৃত্রাসুরের অপর নাম ছিল “অহি” বা সাপ (ঋগ্বেদ -৬.৬১.৭)। তাই কি  জাপানে  মা সরস্বতী বা বেঞ্জাইতেনের  সাথে সাপ ও ড্রাগনের মূর্তি পাওয়া যায়?

রাজহাঁসের জায়গায় কোনও বিগ্রহে যুক্ত হয়েছে ড্রাগন

হাজারেরও বেশি বছর ধরে জাপান, মা সরস্বতী ‘বেঞ্জাইতেন‘-এর পুজো করে আসছে , বিশুদ্ধ সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণ করে। এমনকি,  হোমযজ্ঞ পর্যন্ত করা হয় মা সরস্বতীর পুজায়। জাপানি ভাষায় হোম -কে বলে হাভান বা গোমা ৷ সরস্বতীর হাতে যেমন বীণা থাকে, তেমনি দেবী বেঞ্জাইতেনের  হাতেও একটি বিওয়া (বীণা !)  নামের এক ঐতিহ্যবাহী জাপানি বাদ্যযন্ত্র দেখতে পাওয়া যায়। মা সরস্বতী ভারতে বিদ্যা ও জ্ঞানের  দেবী।  কিন্তু  জাপানে তিনি জল,সময়,শব্দ,বাক্য,বাগ্মিতা,সৌন্দর্য্য, সঙ্গীত এবং জ্ঞানের দেবী।  তবে আজ জাপানিরা দেবী সরস্বতীকে  জনসাধারণ ও রাষ্ট্রের রক্ষয়িত্রী দেবী হিসেবে পুজো করে থাকেন। আমরা যেমন মা দুর্গা বা কালীর পুজো করে থাকি।

শক্তিরুপিনী বেঞ্জাইতেন’

জাপানে একশটিরও  বেশি মন্দিরে পূজিতা হন মা সরস্বতী। যেমন, সাগামি উপসাগরের এনোশিমা দ্বীপ, বিওয়া হ্রদের চিকুবু দ্বীপ এবং সেতো অন্তর্দেশীয় সাগরের ইৎসুকুশিমা দ্বীপের মন্দির গুলিতে। পশ্চিম টোকিয়োর ইনোকাশিরা পার্কে ,টোকিয়োর সবচেয়ে পুরোনো ও বিখ্যাত সরস্বতী মন্দিরটি আছে। ১০৪৭ খ্রিঃ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী কোওকেই (皇慶) দেবী সরস্বতীর  মন্দিরগুলি নিয়ে  একটি ইতিহাসও  রচনা করেন। জাপানে অনেক জায়গাতেই জলাশয়ের নাম বেঞ্জাইতেন‘ ৷ জলাশয়ের মাঝে বা কিনারায় একটি মন্দির থাকে।  যার মধ্যে কোনও বিগ্রহ থাকে না ৷ জলই সেখানে মা সরস্বতীর প্রতিভূ ৷ আশ্চর্য্য লাগে, ভারতেও সরস্বতী নামে বিখ্যাত নদী ছিল ৷ আর, দেবীর বাহন রাজহাঁস, পদ্মকে জল ছাড়া কল্পনা করা যায়না।


টোকিয়োর ইনোকাশিরা পার্কে সবচেয়ে পুরোনো ও বিখ্যাত সরস্বতী মন্দির

 মনে প্রশ্ন জাগতে পারে,  জাপানে কী ভাবে গিয়ে পৌঁছলেন মা সরস্বতী ?  কী ভাবেই বা জাপানে ছড়িয়ে পড়লো হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতি ? খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতক থেকে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত,  চম্পা দেশের হিন্দু রাজাদের প্রশান্ত মহাসাগর ও ভারত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ স্থলভাগ জুড়ে বিশাল প্রভাব ছিল৷ বর্তমানে মধ্য ও দক্ষিণ ভিয়েতনামের বিরাট অংশ জুড়ে ছিল সেই চম্পা রাজ্য।  এই  চম্পা রাজ্য হয়েই হিন্দু ধর্ম পৌঁছে গিয়েছিল জাপানে। সম্ভবত বৌদ্ধ ধর্ম জাপানে পৌঁছবার অনেক শতাব্দী আগেই। জাপানে মা সরস্বতীর বা  বেঞ্জাইতেন‘ পুজো শুরু হয় খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শতাব্দীর মধ্যে।


জাপানের ওসাকায় পৃথিবীর উচ্চতম সরস্বতী মন্দির

শুধু মা সরস্বতীই নয়। বহু শতাব্দী ধরেই  লক্ষ্মী,গণেশ, ইন্দ্র, ব্রহ্মা প্রভৃতি হিন্দু দেবদেবী জাপানে বৌদ্ধ দেবদেবী হিসেবে পূজিত হচ্ছেন।  দু’ধরনের বৌদ্ধমন্দির রয়েছে জাপানে  যা আদতে হিন্দু দেবদেবীদের মন্দির। একটি জি বা তেরা অন্যটি তেন্। যেমন কিচিজোও-জি অর্থাৎ লক্ষ্মীর মন্দির। এখানে আবার গণপতি বা গণেশের মূর্তিও পূজিত হচ্ছে ‘শোওতেন্’, ‘কানগেকিতেন্’ নামে।  মনে করা হয়, ৮০৬ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ  দেবতা গণেশ ভারত থেকে জাপানে আসেন । তাইশাকু-তেন্ হচ্ছে দেবতা ইন্দ্রের মন্দির। শিব বা  বিশামোনতেন্ (যোদ্ধাদের দেবতা), কুবের বা  দাইকোকুতেন্ (অর্থসম্পদ, বাণিজ্যের দেবতা)।

ঘন অরণ্যে মা সরস্বতী

যেভাবে  ভারতীয় দেবদেবীকে পরম শ্রদ্ধায় আপন করে নিয়েছে জাপান, ঠিক সেভাবেই  প্রাচীন
ভারতবর্ষের ধর্মীয় সভ্যতা-সংস্কৃতি আকর গ্রন্থ গুলিকেও তারা পরম ভালোবাসায় বুকে টেনে নিয়েছে।  এমন কোনও  প্রাচীন পুঁথি বাদ নেই যা জাপানি ভাষায় অনুবাদ হয়নি। যেমন ঋগ্বেদ, পাণিনি, মনুসংহিতা, অর্থশাস্ত্র, গীতা, উপনিষদ, মহাভারত, রামায়ণ, ত্রিপিটক, জাতক, পুরাণ, ইতিহাস, দর্শন, জ্যোতিষ, ভাষা, কলাবিদ্যা, নাট্যশাস্ত্র, থেকে কামশাস্ত্র। বিনয় বহেলের গবেষণা থেকে জানা যায়, ষষ্ঠ শতকের ভারতীয় সিদ্ধাম স্ক্রিপ্ট  জাপানে সংরক্ষিত আছে। যা সম্ভবত ভারতেই নেই। এ ছাড়া দক্ষিণ ভারতের সুপ্রাচীন বিজাক্ষরা হরফ ভারতে নেই, কিন্ত জাপানে পাওয়া গিয়েছে।

শিল্পীর তুলিতে দেবী সরস্বতী

জাপানের কোয়াসানে এখনও সংস্কৃত ভাষা শেখানো হয়। জাপানি হরফ ‘কেহ না ’তেও ষষ্ঠ শতকের দেবনাগরী হরফের প্রভাব রয়েছে বলে দাবি করেছেন বিনয় বহেল৷ হিন্দুদের যেমন অগ্নিদেব আছেন তাই হিন্দুরা অগ্নিপুজো করেন। তেমনি জাপানেও  শিঙ্গন ও তেন্দাই বৌদ্ধরা আছেন, যাঁদের অগ্নিপুজোর সঙ্গে সুপ্রাচীন হিন্দুধর্মের  রীতিনীতি ও অগ্নিপুজোর মিল আছে ৷ শিঙ্গনরা তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের শাখা। জাপানে অন্তত ১ ,২০০ মন্দিরে তাঁরা বিশুদ্ধ সংস্কৃত মন্ত্র উচ্চারণ করেই অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দেন৷ সংস্কৃত তাই তাঁদের কাছে অতি পবিত্র ভাষা৷

মা সরস্বতীর আপন দেশ ভারতে শিক্ষিতের হার, বয়স্কদের মধ্যে ৮০% ও তরুনদের মধ্যে  ৯৫.২%। অন্যদিকে জাপানে বহুবছর আগে থেকেই শিক্ষিতের  হার ৯৯%। এর অর্থ, মা সরস্বতীর পক্ষপাতিত্ব জাপানের দিকে। আর হবে নাই বা কেন। জাপান সারা বছর প্রতিদিন মা সরস্বতীর আরাধনা করে। নিজেদের অন্তর্নিহিত শক্তিকে বিকশিত করতে। আর আমরা মা সরস্বতীকে ডাকি পরীক্ষার আগে আর শুক্লা পঞ্চমীতে। জ্ঞানের দেবী কিন্তু সর্বজ্ঞ ।

The Wall-এর ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন। 

আরও পড়ুন : জাগ্রত হিন্দুদেবী ‘বিবি’ নানির ভয়ে আজও কাঁপে পাকিস্তান

Leave A Reply