শনিবার, এপ্রিল ২০

পার্বত্য চট্টগ্রামের জনপদকে ধর্ম আর লিপি দিয়ে তিন দশক নিখোঁজ বছর কুড়ির মেনলে

রূপাঞ্জন গোস্বামী

সময়টা ষাটের দশকের শুরু। পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলার চিম্বুক পাহাড়ের পাদদেশের গ্রাম পোড়া পাড়া। সেই গ্রামের মিষ্টি ছেলে মেনলে ম্রো। দিনভর ঘুরে বেড়ায় পাহাড়ে পাহাড়ে, ঝর্ণায় ঝর্ণায়, ছোটো ছোটো মাছ ধরে বেড়ায়। নয়তো কয়েক কিলোমিটার হেঁটে এ পাড়া ও পাড়ায় ঘুরে বেড়ায়, বিপদসঙ্কুল অরণ্যপথে। তার মনে একটুও শান্তি নেই।

বান্দারবানের অপরূপ নিসর্গ

মুরং জনগোষ্ঠীর ছেলে মেনলে। মুরং একটি ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠী। মুরং উপজাতিরা, ম্রু ও ম্রো নামেও পরিচিত। পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলার বিভিন্ন এলাকায় এই ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর  বাস। তোইন, মঙ্গু, তৈনফা, লুলোইং, উত্তরহানগড়, দক্ষিণ হানগড়, তঙ্কাবতী, হরিণঝুড়ি, টেকের পানছড়ি, রেনিখ্যং, পানতলা, থানখ্যং, সোয়ালক, তিনডো, সিংপা, আলীখং এবং ভারিয়াতালি অঞ্চলে এই জনগোষ্ঠীর মানুষরা থাকেন।

মেনলের দুঃখ তাদের  ধর্মের কোনও নাম নেই

মেনলে জানে, তাদের তিনজন দেবতা আছেন। বিশ্বের সৃষ্টিকর্তা ‘তুরাই‘ , পাহাড়ের দেবতা  ‘সাংতুং‘ এবং  নদীর দেবী ‘ওরেং’। মেনলে, পাহাড়ের গ্রামে গ্রামে ঘুরে  শুনেছে  বাইরের পৃথিবীর মানুষ কতো ধরণের ধর্ম মানে। মেনলের মনে একটাই দুঃখ তাদের ধর্মের কোনও নাম নেই।  আরও একটা দুঃখ আছে মেনলের। সেটা হলো তার গ্রামে কোনও স্কুল নেই। তাই প্রচন্ড ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও মেনলে পড়াশোনা করতে পারে না। সে মনের কথা লিখতে পারে না। কারণ মুরং জনগোষ্টীর নিজস্ব কোনও বর্ণমালা নেই।

বাদ্যযন্ত্র নিয়েমুরং উপজাতির পুরুষ

মেনলের জীবনে আশার আলো এল ১৯৮১ সাল। তার বয়স তখন ১৫ বছর। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড বান্দরবানের সুয়ালক ইউনিয়নে তৈরি হলো ‘ম্রো আবাসিক বিদ্যালয়’। মেনলে স্কুলে পড়ার জন্য ছুটে গেলেও স্কুল তাকে নিল না। কারণ, প্রাথমিক স্তরে পড়ার বয়স তার আর নেই। স্কুলের সামনেই অনশন শুরু করল নাছোড়বান্দা মেনলে। প্রধান শিক্ষক টি এন মং, মেনলের জেদের কাছে হার মানলেন। স্কুলে ভর্তি হলো সে।

মেনলের মনে দুঃখ, তাদের ভাষার বর্ণমালা নেই

তখন তার আনন্দ আর দেখে কে! পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী মেনলে, ভর্তির কয়েক মাসের মধ্যে ডবল প্রমোশন পেয়ে ক্লাস টু, পরের বছরই ক্লাস ফোরে উঠে পড়ল। স্কুলে পড়তে হয় বাংলা বর্ণমালা। মেনলের মনে দুঃখ, তারা আদিম এক জনজাতি, এই জনজাতিতে আছেন লক্ষ লোক। তা সত্বেও তাদের  পড়তে হচ্ছে অন্য ভাষার বর্ণমালা। যে ভাষা তার মাতৃভাষা নয়।

পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় ম্রো ভাষার প্রথম লিপি তৈরিতে হাত দিলো ১৮ বছরের তরতাজা অথচ ভাবুক যুবক মেনলে। পঞ্চম শ্রেণি অবধি পড়াশোনা করার পর সে বাড়ি ফিরে এলো। পড়ার অত্যন্ত ইচ্ছে থাকলেও পড়া হলো না। কারণ মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুল অনেক দূরে। তা ছাড়া ১৮ বছরের ছেলেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি নেওয়া হবে না, এটা মেনলে বুঝে গেছিল।

মুরং পরিবার

গ্রামে ফিরে ক্রমশ পাল্টে যেতে শুরু করেছিল মেনলে। তার মনে হচ্ছিল, এ পৃথিবী তার নিজের পৃথিবী । মুরং উপজাতি তার নিজের জাতি। কিন্তু তারা কতো পিছিয়ে আছে। কারও কোনও চিন্তা নেই। না আছে শিক্ষা, না আছে ধর্ম, না আছে ধর্মগ্রন্থ, না আছে উপাসনা গৃহ। ১৯৮৫ সালে মেনলে একার চেষ্টায় আবিস্কার করে ফেললেন ম্রো বর্ণমালা।

তার বর্ণমালায়  ছিল ৩১টি বর্ণ। যুবক মেনলে সারা দিন গুহায়, বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়াতো। নিজের মনে বিড়বিড় করতো। পাহাড়ি গুল্মের রস দিয়ে রঙ তৈরি করে ছবি আঁকতো যেখানে সেখানে। ১৯৮৬ সালের ৫ এপ্রিল। পাঁচ হাজার গ্রামবাসীর সামনে মেনলে প্রকাশ করল তার আবিস্কৃত ‘ক্রামা‘ বা ‘ম্রো’ বর্ণমালা।

সেই দিনই মেনলে মুরং উপজাতিদের উপহার দিল এক নতুন ধর্ম । ধর্মের নামও ‘ক্রামা‘। সে দিন হাজার হাজার গ্রামবাসী মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছিলেন মেনলে ম্রো-এর ‘ক্রামা’ ধর্মের নীতিকথা।  মুরং উপজাতির হাজার হাজার নরনারী, সেই বৃষ্টিভেজা দিনে চিৎকার করে কেঁদেছিল আর বলেছিল , ‘মেনলে তুমি মানুষ নও। তুমি হলে আমাদের ঈশ্বর ‘ক্রামাদি’। তুমি স্বর্গের দেবদূত। তুমি সৃষ্টি করেছে বর্ণমালা। তাই তুমি ঈশ্বর-পুত্র।

মুরং নববর্ষ উৎসব

হারিয়ে গেলেন মেনলে

৫ এপ্রিল থেকে ১৪  অগস্ট পর্যন্ত ‘ক্রামা‘ ধর্মের প্রবর্তক মেনলে ম্রো, ‘ক্রামা’ ধর্মের অনুশাসন, নীতিবাক্য প্রচার করেছিলেন বান্দরবানের পাড়ায় পাড়ায়। মুরং জনগোষ্ঠীর বহু মানুষ তাঁর ধর্মে দীক্ষিত হলেন। কিন্তু ওই বছরই ১৫ অগস্ট ভোরে তাঁকে আর গ্রামে খুঁজে পাওয়া গেলো না।

সেই ১৯৮৬ সাল থেকে আজ পর্যন্ত অনেক চেষ্টা করেও খুঁজে পাওয়া যায়নি ক্রামাদি মেনলে ম্রো‘কে। কেউ বলেন দেবতারা নিয়ে গেছেন সোনার রথে করে। কেউ কেউ দাবী করেন,মেনলে আরকান ও ভারত হয়ে হিমালয়ে গেছেন ধ্যান করতে। মেনলে যাবার সময় নাকি বলে গেছেন, ‘আমি তপস্যা করতে গেলাম। আবার ফিরে আসব।

মেনলের হারিয়ে যাওয়ার পর কেটে গেছে ৩২ বছর । ক্রামাদি মেনলে ম্রো  প্রবর্তিত  ধর্মমত এবং আবিষ্কৃত বর্ণমালা আজ স্বীকৃতি পেয়েছে। তাঁর বাণী রিইয়ুং-খ্তি (নীতিকথা) নামে একটি বইয়ে সংকলিত করা হয়েছে। প্রায় ২০০ পৃষ্ঠার বইটি বাংলা ও ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়েছে। মেনলে প্রবর্তিত  ‘ক্রামা বা ম্রো বর্ণমালার কম্পিউটার ফন্ট তৈরি হয়েছে। তাঁর আবিষ্কার করা বর্ণমালায় তৃতীয় শ্রেনি পর্যন্ত বই ছাপা হচ্ছে। বর্তমানে ম্রো বর্ণমালায় সাক্ষরতার হার ৭০%। সবটাই চলছে  এনজিওর তত্ত্বাবধানে।

ক্রামাদি মেনলে ম্রো-এর একমাত্র ছবি

সবই হচ্ছে, শুধু তিনিই নেই। কেউ জানে না তিনি কোথায়। আদৌ জীবিত আছেন কি না। কিন্তু তাঁর তো পৃথিবী ছাড়ার বয়স হয়নি, তাঁর বয়েস এখন মাত্র বাহান্ন। তাই মুরং উপজাতি এখনও তাঁর পথ চেয়ে আছে। তাঁরা মনে করেন, একদিন সাদা ঘোড়ায় চেপে পূর্ব দিক থেকে ফিরে আসবেন তাঁদের ঈশ্বর ‘ক্রামাদি’ রোজ সকালে পূর্বদিকে তাকিয়ে ‘ক্রামা‘ ধর্মের উপাসকরা বলেন, আমাদের জন্য সুসংবাদ নিয়ে ওই যে তিনি আসছেন

বিশ্বের ৯৯.৯৯ শতাংশ মানুষ ক্রামাদি মেনলে ম্রো-এর নামই শোনেননি। কিন্তু সারা বিশ্বে তিনি ছাড়া আর একটি মানুষ নেই, যিনি একটি জাতিকে একই সঙ্গে ধর্ম এবং বর্ণমালা উপহার দিয়েছেন। তাই তো তাঁকে ভোলেননি মুরং উপজাতিরা, ভোলেননি ‘ক্রামা’ ধর্মের অনুগামীরা। ভোলেনি হাজার হাজার স্কুলপড়ুয়া মুরং শিশু। তবুও মনে প্রশ্ন জাগে, আশৈশবের প্রিয় গ্রাম আর প্রিয় মানুষদের ছেড়ে মাত্র ২০ বছর বয়সে কেন হারিয়ে গেলেন মেনলে !  বান্দরবানের আকাশে পুবের সূর্য উল্টে আমাকেই জিজ্ঞেস করে, ভগবান বুদ্ধ আর ভগবান শ্রী চৈতন্য কীসের টানে ঘর ছেড়েছিলেন?

Shares

Comments are closed.