শুক্রবার, জুন ২১

কালো বলে শিক্ষক দিতেন কালো পেন্সিল, আতঙ্কিত বালিকা আজ সেলিব্রেটি

দ্য ওয়াল ব্যুরো:  স্কুলে যেতে চাইতো না অ্যাফ্রো-আমেরিকান এই কিশোরী। কারণ তার গায়ের রঙ। নিকষ কালো একরাশ অন্ধকার যেন। অথচ কত নিষ্পাপ দু’টি চোখ। মিষ্টি মুখ জুড়ে সাবলীল হাসি।  মাত্র দশ বছর বয়েসেই খেরিস রজার্সকে পুরোনো স্কুল ছেড়ে নতুন স্কুলে যেতে হয়েছিল সহপাঠী এবং শিক্ষকদের বর্ণ-বিদ্বেষের শিকার হয়ে। দিনের পর দিন মানসিক অত্যাচার সহ্য করতে পারেনি কিশোরী খেরিস। মানসিক দিক থেকে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল সে। অসুস্থ হয়ে পড়েছিল শারীরিক দিক থেকেও। কিন্তু মুখ খোলেনি বাড়িতেও। তবে খেরিসের ভিতরকার পরিবর্তনটা টের পেয়েছিল তার কয়েক বছরের বড় দিদি টেলর।  পরম মমতায় ছোট বোনের কাঁধে ভরসার  হাত রেখেছিল সে। তার হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছিল টুইটারে  করা একটা মাত্র টুইটে।

স্কুলে একমাত্র খেরিসেরই গায়ের রং কালো ছিল। তাই প্রায়ই বিদ্রুপের মুখে পড়তে হত তাকে। কখনও শিক্ষকদের থেকে আবার কখনও সহপাঠীদের থেকে। তাই তার মনে একটা ধারণা জন্মেছিল, সে সবার থেকে আলাদা একটা মানুষ, যাকে বাড়ির বাইরে সবাই ঘৃণা করে। কারণটা একমাত্র তার গায়ের রং।  বাড়িতেও লুকিয়ে চোখের জল ফেলত কিশোরী। শুধু একটা কথাই ঈশ্বরকে জানাত,  কেন তার গায়ের রং এমনটা হল।  একদিন শিক্ষক আঁকার জন্য সবাইকে রঙিন মোম পেন্সিল দিচ্ছিলেন। প্রত্যেককে দেওয়া হচ্ছিল বাদামি রঙের পেন্সিল। কিন্তু, খেরিসকে তিনি দিলেন কালো রঙের পেন্সিল। “সেদিন সত্যি আমি ভেঙে পড়েছিলাম”,  টিভি ক্যামেরার সামনে ভিতরের সমস্ত দুঃখ-যন্ত্রণা যেন চোখের জল হয়ে ঝড়ে পড়েছিল কিশোরীর।

খেরিসের অপমান এবং কষ্ট  সহ্য করতে না পেরে তার দিদি পোলার্ড টুইটারে খেরিসের কিছু  ছবি আপলোড করে দেয়। বিভিন্ন সাজে পরীর মতো ফুটফুটে খেরিস।টুইটে জুড়ে দেয় একটা হ্যাশট্যাগ, সেটি হলো #FlexinInHerComplexion। মূহুর্তের মধ্যে পোস্টটা ভাইরাল হয়ে যায়। ভাইরাল হয় হ্যাশট্যাগটিও।  এক ঘণ্টার মধ্যে টেলরের টুইটটি  ৩০,০০০ বার রিটুইট করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসতে থাকে প্রশংসা।

একজন লেখেন, ‘তোমার বোন খুবই সুন্দরী, তোমারই মতো। এটা একটা দারুণ কাজ করেছ। খেরিস সত্যিই খেলাটা শেষ করে দিয়েছে”। কেউ লিখেছেন,”তোমার মার গায়ের রঙে সত্যিই তুমি আলাদা। আমাদের মতো সাধারণ নও। তুমি অসাধারণ”।  একজনতো লিখেই দিয়েছেন, “আজ তোমার পুরোনো স্কুল বুঝতে পারছে তারা কাকে হারিয়ে ফেলল”। এরকম লক্ষ লক্ষ কমেন্ট পড়ছে প্রতি মিনিটে  খেরিসের দিদির টুইটার পোস্টে। খেরিস টুইট করেছে,” সব কমেন্ট পড়ার পর মনে হচ্ছে, আমি সত্যিই সুন্দরী। আমার আর দুঃখ নেই”। খেরিস এখন ফ্যাশন আইকন। নামী দামি ফ্যাশন হাউস তার সঙ্গে যোগাযোগ করছে। খেরিসের নিজের ডিজাইন করা টি-শার্ট বাজারে এসে গেছে। দাম পনেরো ডলার। তাতে লেখা “Flexin’ In My Complexion। দ্রুত স্টক শেষ হয়ে যাওয়ার পর, আবার বানানো হচ্ছে, আরও বেশি সংখ্যায়।  বিশ্ব বিখ্যাত জুতোর ব্র্যান্ড nike খেরিসকে তাদের বিজ্ঞাপনে মডেল করতে চলেছে।

গায়ের কালো রঙই খেরিসকে বিখ্যাত করে দিয়েছে। খেরিসের এখন নিজস্ব টুইটার আর ইনস্টাগ্রাম  অ্যাকাউন্ট আছে। যেগুলো  খেরিসের দিদি আর মা চালান। খেরিস আগে ভাবতো পৃথিবীতে সেই একমাত্র  বর্ণবিদ্বেষের শিকার। কিন্তু এখন বুঝতে পেরেছে এই অসুখে ভুগছে প্রায় অর্ধেক পৃথিবী। তাই আজ এগারো বছরের সেলিব্রেটি খেরিস চায়, তারই মতো বর্ণবিদ্বেষের শিকার, এমন শিশুদের পাশে দাঁড়াতে। মিডিয়ার ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ফ্যাশন আইকন খেরিস কেটে কেটে স্পষ্ট উচ্চারণে বলেছে, ” আমি বলব বাচ্চারা তোমরা তোমাদের  চামড়ার কালো  রঙকে ভালবাসো। একদম মন খারাপ করবে না। আমার চামড়ার রঙই  আমাকে বিশ্বে পরিচিত করেছে।  এখন আমার কালো চামড়াই আমার আত্মবিশ্বাস”।

সত্যিই খেরিস রজার্স আজ বর্ণ-বিদ্বেষ বিরোধী আন্দোলনের  প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। পল রবসনের মশাল আজ এগারো বছরের খেরিসেরই হাতে।

Comments are closed.