জল সরলেই অপেক্ষা করছে আন্ত্রিক, হতে পারে মহামারীও! সিঁটিয়ে আছে সুন্দরবন

পানীয় জলের সমস্যা প্রবল। তার উপর বহু প্রত্যন্ত এলাকায় এখনও ত্রাণ না পৌঁছনোয়, খিদের চোটে কিছু মানুষ মরা মাছ বা মুরগি খেয়ে ফেলতে পারেন, যা তাঁদের পক্ষে কার্যত বিষের সমান। তার উপর নাই ডাক্তার, নাই চিকিৎসা। ফলে আসন্ন আন্ত্রিক মহামারী নিয়ে প্রমাদ গুণছেন অনেকেই।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    তিয়াষ মুখোপাধ্যায়, রাঙ্গাবেলিয়া

    অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের তীব্র সংকট তো আছেই সেই সঙ্গে সুন্দরবনের আনাচকানাচে ঘনিয়ে আছে অন্য এক আশঙ্কা। চতুর্দিকের জলবন্দি অবস্থায় যেভাবে দ্রুত পচে যাচ্ছে জল, ভেসে উঠছে অসংখ্য মৃত মাছ, মুরগি, ছাগল– তাতে করে উমফানের ধাক্কা কোনও ভাবে সামলাতে পারলেও তার পরবর্তী মহামারী সামাল দেওয়া কার্যত অসম্ভব বলেই মনে করছেন সাধারণ মানুষ।

    গোসাবা ব্লকের রাঙ্গাবেলিয়ার বাসিন্দা সঞ্জিত মণ্ডল বলছিলেন, “প্রতিবারই এমন হয়। জল সরার পরেই পেটের অসুখ যেন দৈত্যের মতো আক্রমণ করে। এবার পরিস্থিতি আরও সঙ্গীন। অসংখ্য বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় যেভাবে জল ঢুকেছে, তাতে পান করার উপযুক্ত নেই একটি পুকুরের জলও। বহু দূরদূরান্তে মানুষ যাচ্ছেন একটু জলের জন্য। এবার সেই গুটিকয়েক পুকুরেও যদি জল ঢুকে যায়, মানুষ বাধ্য হয়ে এই জলই খাবে থিতিয়ে, ফুটিয়ে। আর তখনই আন্ত্রিক দেখা দেবে এলাকাজুড়ে।”

    সুন্দরবনের আঁখো দেখা হালও সে কথাই বলছে। পানীয় জলের সমস্যা প্রবল। তার উপর বহু প্রত্যন্ত এলাকায় এখনও ত্রাণ না পৌঁছনোয়, খিদের চোটে কিছু মানুষ মরা মাছ বা মুরগি খেয়ে ফেলতে পারেন, যা তাঁদের পক্ষে কার্যত বিষের সমান। তার উপর নাই ডাক্তার, নাই চিকিৎসা। ফলে আসন্ন আন্ত্রিক মহামারী নিয়ে প্রমাদ গুণছেন অনেকেই।

    পঞ্চায়েতের তরফে অবশ্য প্রচার ও সচেতনতা তৈরির চেষ্টায় কোনও ত্রুটি নেই। যতটা সম্ভব ব্লিচিং ও চুন বিলি করছেন তাঁরা। কিন্তু বলাই বাহুল্য, প্রয়োজনের তুলনায় তা একেবারেই পর্যাপ্ত নয়। বারবারই এলাকাবাসীকে বলা হচ্ছে, নষ্ট না হওয়া পুকুর থেকে জল এনে তা ভাল করে ফুটিয়ে তবে খেতে, গবাদি পশুকে খাওয়াতে। প্রচার করা হচ্ছে, কোনও অসুবিধা বুঝলেই গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে ওষুধ নিয়ে যেতে। আশাকর্মীরাও যতটা সম্ভব ঘুরছেন এলাকায় এলাকায়। জল পরিষ্কার করছেন অসংখ্য পঞ্চায়েতকর্মী। কিন্তু এই চেষ্টাগুলি সর্বোত্তম হলেও, বিপর্যয়ের তুলনায় তা নগণ্য।

    আরও পড়ুন

    নষ্ট জলে ভাসছে গেরস্থালি, ভাঙা বাঁধের বাঁকে বাঁকে ঘুরে দাঁড়ানোর জরুরি অভ্যেস

    এই পরিস্থিতিতে এক পঞ্চায়েত কর্মী শ্যামল বাগ বলছেন, “এর আগেও এই কাজ করেছি। এমন দিশাহারা লাগেনি কখনও। লাখে লাখে মাছ, পাখি, মুরগি গুঁড়িয়ে (মাটি চাপা দিয়ে) শেষ করতে পারছি না। আগে এক বিঘা জমির জল যতদিন লাগত, এখন তার চেয়ে অনেক বেশি লাগছে। কারণ, এত প্রাণী আগে কখনও মারা যায়নি।”

    জলের এই অবস্থা হওয়ায় যে মাছচাষ হয়েছিল, তা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেল। এক একটা পুকুর সাফ করতে গিয়ে ১০-১২ কিলোর মাছের দেহ মিলছে। এ ক্ষতি যেন চোখে দেখা যায় না!

    কোনও কোনও এলাকায় দেখা গেল, জমা জল ইতিমধ্যেই পচে গিয়ে কালো ও তৈলাক্ত হয়ে গিয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, ওই জল এক ফোঁটাও যদি কোনও ভাবে খাবার জলে মিশে যায়, বিপদের শেষ থাকবে না। সে বিপদ যেন আর দূরেও নেই খুব বেশি, আশঙ্কা প্লাবিত মানুষগুলির।

    সুন্দরবন এলাকায় কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘সেফ’-এর কর্মী দিগন্ত মুখোপাধ্যায় বলছেন, “খাবার-ত্রিপলের যতটা দরকার, ঠিক ততটাই দরকার ব্লিচিং, জিওলিন– এইসব। তবে এইসব দিয়েও যে বিপদ এড়ানো যাবে, তা নিশ্চিত বলা যায় না। তাই জল সরতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই প্রচুর মেডিক্যাল সহায়তা দিতে হবে মানুষকে। যত সম্ভব শিবির করতে হবে। যে কোনও ঝড় তথা বন্যায় বেঁচে যাওয়া মানুষদের সাহায্য করার এটাই সবচেয়ে জরুরি পর্যায়।”

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More