শুক্রবার, নভেম্বর ১৫

সাজে সাজো: শাড়ির ই-বুটিকই শুধু নয়, এক বাঙালি গৃহবধূর স্বপ্নের উড়ান

মধুরিমা রায়

উলুবেড়িয়ায় দু বোনে বেড়ে উঠেছেন।  বাবা ডাক্তার।  দিদি আইটি সেক্টরে আছেন।  নিজের ছোট থেকেই নাচ, গান, আঁকায় আগ্রহ।  মাল্টিমিডিয়া কোর্স, ওয়েব ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সও করেছেন।  তাই বাড়ির খুড়তুতো ভাই বোনরা ডাক্তার হয়ে উঠলেও, তিনি ভেবেছেন অন্যভাবে।  আর এই অন্যভাবে ভাবনাতেই এবার নিজের স্বপ্নকে, নিজের ব্রেন চাইল্ডকে ভূমিষ্ঠ করলেন বাঙালি গৃহবধূ।  স্বাতী বসাক।

স্বাতী ভক্ত বসাক

ছোটবেলাটা উলুবেড়িয়ার স্কুলে কাটিয়ে দক্ষিণ কলকাতার মুরলীধর গার্লস কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন স্বাতী ভক্ত।  তারপর মাল্টিমিডিয়া কোর্স।  বিয়ে করেন বাঙালি ব্যবসায়ী পরিবারে।  স্বাতী বসাক হয়ে ওঠেন ২০০৬ সালে বর্ধমানের ধাত্রীগ্রামে বিয়ের পরে।  তারপর আর পাঁচটা মধ্যবিত্ত জীবনের মতোই ছকে বাধা জীবন চলছিল তাঁর।  কিন্তু ২০০৬ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত সময় লাগল নিজের এই সন্তান ‘সাজে সাজো’ কে ভূমিষ্ঠ করতে।  ‘সাজে সাজো’ শব্দ দুটো যখন পাশাপাশি রেখেছেন স্বাতী, তাতে ‘Sajaএ Sajoও’– এভাবেই লিখেছেন শব্দ দুটো।  ইচ্ছে করে বাঙলা বর্ণ দুটো রেখেছেন তিনি।  কারণ তিনি জানেন, তাঁর শাড়ি যখন বিশ্বের দরবারে পৌঁছবে, তখন তাতে বাংলার গন্ধ তো থাকতেই হবে।

বলাই হয়নি যে স্বাতীর এই ‘সাজে সাজো’ আসলে অনলাইন (www.sajasajo.com)  শাড়ি কেনা বেচার জায়গা।  শাড়ি কোথাকার তা তো অনেকে নাও বুঝতে পারেন।  সারা পৃথিবীর অনেক জায়গা থেকেই শিল্পীরা শাড়ি বানান।  কিন্তু বাংলার শাড়ি যে বাকিদের থেকে রূপে, রঙে, বৈশিষ্ট্যে আলাদা, সে ছাপ তো মানুষের মনে রাখতে হবে।  তাই এই উদ্যোগ স্বাতীর।

যখন বিয়ে করেন, তখন থেকেই শ্বশুর, বরকে পারিবারিক শাড়ির ব্যবসায়ে সাহায্য করতে শুরু করেন।  ১৯৬৫ নাগাদ এই পরিবারের ব্যবসা শুরু হয়।  পরিবারের ব্যবসায় শাড়িগুলোতে ডিজ়াইন দেওয়া থেকে শাড়ির রঙের কম্বিনেশন কী হবে, সেগুলোতে স্বাতী নিজেকে মেলে ধরতে শুরু করেন ২০০৬-এর পর থেকে।  এরপর নিজের ভাবনা এতদিনে একদম নিজের মতো করে বাস্তবায়িত করলেন এই গৃহবধূ।  এতদিন সময় লাগল ঠিকই অনলাইনে আসতে, তবে আত্মপ্রত্যয়ী স্বাতী বলছেন, “আমাদের পারিবারিক ব্যবসায় যে অভিজ্ঞতা আছে, যে শ্রমিক, যে সুতো আমরা কাজে লাগাই, তার তো একটা গুডউইল আছেই।  আর আজকাল সকলেই বাড়িতে বসে শপিং করতে চাই, কেউই চাই না ঘামে ভিজে ঘুরে ঘুরে কেনাকাটা করতে, তাই অনলাইন শপিং-এ আমরা আজকাল ঝুঁকছি।  সেই জায়গা থেকেই এই ভাবনা। ”

এই শাড়ির বৈশিষ্ট্য কী কী? স্বাতী বলছেন, “বুটিকে মানুষ কেন যান? যাতে তাঁর শাড়ি বা জামাটা এক্সক্লুসিভ হয়।  এখানেও তাই।  শাড়িগুলো একটাই বানানো হবে।  এরপর কারও পছন্দ হলে সেই ডিজ়াইন এবং রঙে একটু হেরফের করে পরেরটা বানানো হতে পারে।  তবে প্রথমে যে কোনও একটা করেই পিস থাকবে।  এতে জামদানি থেকে সিল্ক, মটকা থেকে বালুচরি, স্বর্ণচরি, খাদি, মটকা, তসর, লিনেন, কাঁথাস্টিচ, তাঁত থাকছে সবই। ” স্বাতী জানেন এক রাতে সকলে একটা জিনিসের ফ্যান হয়ে যাবেন না।  তবে স্লো বাট স্টেডি, উইনস দ্য রেস- এই সারবাক্যে বিশ্বাস রাখেন তিনি।  এখানে বর্ধমান আর নদিয়ার তাঁতীদের দিয়ে এই কাজ চলছে।  প্রায় দেড় হাজার তাঁতী দিন রাত এক করে এই ‘সাজে সাজো’র কাজ করছেন।

এই ‘সাজে সাজো’ই প্রথম ফাইন লিনেনের সাথে ফাইন সিল্কের মিশ্রণে শাড়ি বানাচ্ছে, যাতে ডিজিটাল প্রিন্ট থাকছে।  আর এই এক্সক্লুসিভ শাড়ি কিনতে আপনার খরচ হবে ৫ হাজার টাকা।  তবে অনেকেই অনেক সময়ে ভেবে থাকেন, নেট থেকে কেনা শাড়িতে সঠিক ব্যয় করবেন কি না।  তাই ‘সাজে সাজো’ রিটার্ন পলিসিও রাখছে।  শাড়ি কেনার পর থেকে সাতদিনের মধ্যে আপনি যদি শাড়ি ফিরিয়ে দেন,পুরো টাকা ফিরিয়ে দিতে পারে ‘সাজে সাজো’।  তাঁরা কাস্টমারের পছন্দ এবং রুচিকে এতটাই সম্মান করছেন।  স্বাতী বলছেন, তাঁর ভাবনাকে তাঁর বরই বাস্তবায়িত করতে সাহায্য করেছেন।  এখন দেখার স্বাতীর এই স্বপ্নের উড়ান বাঙালির ঘরে ঘরে কতটা পৌঁছতে পারে।  সামনেই পুজো, তাই শাড়ি আর বাঙালির যে আত্মিক সম্পর্ক, সেটাই আপাতত মূলধন এই ব্যবসায়ী গৃহবধূর।

Comments are closed.