ফেক বিপন্নতার আগুনে পুড়ছে দেশ

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রোহন ইসলাম

৭০ লক্ষ ভারতীয় সেনাও কাশ্মীরের ‘আজাদি স্লোগান’কে স্তব্ধ করতে পারবে না।

লেখিকা অরুন্ধতী রায়ের বয়ানে প্রথম খবরটি ছাপে পাক অধিকৃত কাশ্মীরের কট্টরপন্থী ডিজিটাল মিডিয়া ‘কাশ্মীর মিডিয়া সার্ভিস’। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ‘জিও টিভি’, ‘রেডিও পাকিস্তান’, ‘এআরওয়াই’-এর মতো পাকিস্তানের মূলধারার সংবাদমাধ্যমেও সেই খবর আপলোড হয়ে যায়। কট্টর পাকিস্তানপন্থী সাইট ‘টাইমস অফ ইসলামাবাদ’-এও চলে এল সেই খবর। পরের দিনই ভারতীয় ওয়েবসাইট ‘পোস্টকার্ডডটনিউজ’ পাকিস্তানের সাইটের সেই খবর হুবহু তুলে ধরল। এর পরে একে একে ‘সত্যবিজয়’, ‘দ্য ইন্ডিয়ান ভয়েস’, ‘দ্য রিসার্জেন্ট ইন্ডিয়া’, ‘রিভোল্ট প্রেস’, ‘বিরাট হিন্দুরাষ্ট্র’, ‘ইন্টারনেট হিন্দু’র মতো ডিজিটাল সাইটগুলিও একই খবরে ছেয়ে গেল।

ঝড় উঠল দেশে। এই খবরকে ‘হাতিয়ার’ করে রিপাবলিক টিভির মতো খবরের চ্যানেল অ্যান্টি-অরুন্ধতী ক্যাম্পেন চালিয়ে গেল। এমনকী, পাক মিডিয়াকে উদ্ধৃত করে অরুন্ধতীকে তুলোধোনা করল মার্কিন খবরের সাইট ‘ফেয়ার অবসার্ভার’। লেখক ময়ঙ্ক সিংহের সেই প্রবন্ধ আপলোড করল ভারতের জনপ্রিয় ডিজিটাল মিডিয়া ‘নিউজলন্ড্রি’ও। প্রায় সকলেই এক সুরে অরুন্ধতীর মুণ্ডপাত শুরু ককরলেন। ভস্মে ঘি ঢাললেন বিজেপি সাংসদ তথা বলিউড অভিনেতা পরেশ রাওয়াল। সোশ্যাল মিডিয়া ট্যুইটারে লিখে বসলেন—‘পাথর নিক্ষেপকারীর বদলে অরুন্ধতী রায়কে সেনা জিপে বাঁধো!’ মুহূর্তে ভাইরাল সেই পোস্ট। আরও একধাপ এগিয়ে গায়ক অভিজিৎ ট্যুইট করলেন, জিপে বেঁধে ঘোরানোই শুধু নয়, অরুন্ধতীকে গুলি করে মারা হোক।

কয়েক দিন ধরে এই সবই চলল। এরই মাঝে ভারতীয় ডিজিটাল মিডিয়া ‘দ্য ওয়্যার’-এর তদন্তে উঠে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য। সাম্প্রতিক অতীতে কাশ্মীর নিয়ে মিডিয়ায় এমন কোনও কথাই বলেননি অরুন্ধতী। কাশ্মীর নিয়ে তাঁর শেষ বক্তব্য বেরিয়েছে ‘আউটলুক’ পত্রিকায়। তা-ও এই বিতর্কের এক বছর আগে। তা হলে মিডিয়া কথিত অরুন্ধতীর সেই বয়ানটি এল কোথা থেকে? অরুন্ধতীর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে লেখায় কোনও সোর্স দেয়নি ‘কাশ্মীর মিডিয়া সার্ভিস’। এমনকী, এই বিতর্কের কিছু দিনের মধ্যেই লেখাটি ওই সাইট থেকে অদৃশ্যও হয়ে গেল! ‘ওয়্যার’-এর এই খোলসার পরেই ছবিটা পরিষ্কার হয়ে গেল। গোটা বিতর্কের নেপথ্যে রয়েছে ‘ফেক নিউজ’! শেষমেশ ভুল বুঝতে পেরে আগের প্রবন্ধ প্রত্যাখ্যান করে অরুন্ধতীরর কাছে ক্ষমা চেয়ে সংশোধনী প্রকাশ করে ‘ফেয়ার অবসার্ভার’ এবং ‘নিউজলন্ড্রি’।

গোটা ঘটনায় একটা জিনিস স্পষ্ট, একই ‘খবর’ পাকিস্তানে জেহাদিদের কাজে আসছে। এ দেশে মেকি দেশপ্রেমের কারবারিদের। এ ভাবে দু’পক্ষ একে অপরকে বাঁচিয়ে রাখছে, পুষ্ট করছে। নেপথ্যে— ‘ফেক নিউজ’।

এই ধরনের ভুয়ো খবরের রমরমা এখন দুনিয়া জুড়েই। গত কয়েক দশক থেকেই মানুষ কেবল ‘ডেটা’ই পরিণত হয়েছে। সেই তথ্যকে কী করে প্রভাবিত করা যায়, তার ন্যক্কারজনক এক খেলার উপকরণ হয়ে উঠেছি আমরা। এত দিন এই সত্য সীমাবদ্ধ ছিল কিছু নির্দিষ্ট চৌহদ্দির মধ্যে। কিন্তু ফেসবুক-কেমব্রিজ অ্যানালেটিকা কাণ্ডের পরে একটা বৃহত্তর জনগণের মধ্যে এই সত্য আর গোপন নেই। ‘তথ্য’-এর আঁটঘাট জেনে তাকে নিজস্ব, ‘ম্যানুফ্যাকচার্ড কনটেন্ট’ দিয়ে প্রভাবিত করার এই খেলার অন্যতম হাতিয়ারই হল ‘ফেক নিউজ’।

আসলে বিশ্ব জুড়ে ভুয়ো খবর, গুজব বা রটনার এই হিড়িক বৃদ্ধির নেপথ্যে রয়েছে বিশেষ ‘প্রোপাগান্ডা’। ‘রিয়েল ইস্যু’ থেকে সাধারণ মানুষকে দূরে রাখার এই ‘প্রোপাগান্ডা’র চক্করেই ইন্টারনেটের নানা সাইট, সোশ্যাল মিডিয়া এবং হোয়্যাটস্‌অ্যাপে দেদার ভুয়ো খবর, গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হছে। যে ডোনাল্ড ট্রাম্প নানা সংবাদসংস্থাকে আঙুল উঁচিয়ে ‘ফেক নিউজ’ বলে দেগে থাকেন, সেই তাঁরই বিরুদ্ধে এমন অনেক ভুয়ো তথ্যকে ‘সত্য’ বলে প্রচার চালানোর অভিযোগ রয়েছে। ট্রাম্পের জয়ের পিছনে কট্টর দক্ষিণপন্থী ভুয়ো অনলাইন পোর্টালগুলির কত বড় ভূমিকা ছিল, তা দেখিয়েছে স্ট্যান্ডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা। শুধু ফেসবুকেই ট্রাম্পের পক্ষে ১০০টিরও বেশি ভুয়ো খবর ৩০ মিলিয়ন শেয়ার হয়েছিল! ব্যতিক্রম নয় ভারতো। বিগত কয়েক বছর ধরেই আমাদের দেশের রাজনীতিতে অন্যতম বড় ‘ফ্যাক্টর’ হয়ে উঠেছে এই ‘ফেক নিউজ’।

আসলে পোস্ট-ট্রুথের যুগে আমাদের দেশ এক পরিকল্পিত বিপদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে। ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে না পশ্চিমবঙ্গেও। পোস্টকার্ড, হিন্দুত্ব ডট ইন, স্বরাজ্য, অপ-ইন্ডিয়া-র মতো কিছু সাইট এবং ফেসবুক পেজ থেকে ভুরি ভুরি ভুয়ো খবর ছড়িয়ে এ রাজ্যের মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিষ ঢোকানো শুরু হয়েছে। আগামী লোকসভা ভোটে পশ্চিমবঙ্গকে পাখির চোখ করেছে নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ জুটি। সেই পরিকল্পনার অঙ্গ হিসেবেই হয়তো এই ধরনের ‘জাতীয় ফেক নিউজ’ কারবারিদের কিছু বাংলা সংস্করণও খুলে গিয়েছে। বাংলাদেশের আওয়ামি লিগ নেতা খুনে অভিযুক্তকে পিটিয়ে মারার ফুটেজকে পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের হাতে হিন্দু যুবককে হত্যা বলে মিথ্যাচারই হোক বা কয়েক বছর আগের উত্তর ভারতে নেশার ঠেকে পুলিশের মারকে বীরভূমে হনুমানজয়ন্তীর শোভাযাত্রায় দুই মুসলিম আইপিএস অফিসারের হিন্দু যুবককে মার বলে ভুয়ো প্রচার— ‘জেহাদি দিদির পশ্চিমবঙ্গে’ (পোস্টকার্ড নিউজের ভাষায়) ‘অত্যাচারিত হিন্দু সমাজে’র এখন এগুলোই নাকি রোজকার ‘ট্রু পিকচার’।

সাম্প্রতিক অতীতে উত্তরপ্রদেশের মুজফ্‌ফরপুরই (পাকিস্তানের দুই যুবককে খুনের পুরনো ভিডিও-কে হিন্দুদের হত্যার ভিডিও বলে হোয়াটসঅ্যাপে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল) হোক বা আমাদের এই রাজ্য— মানুষের মনে পরিকল্পিত ভাবে বিষ ঢুকিয়ে দেওয়ার এই রাজনীতির ফলাফল কী, তা আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যক্ষ করছি। সাম্প্রতিক দাঙ্গাগুলি যার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ। অথচ ঝাড়ুদার মোদির ফোটোশপ ছবি থেকে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের জড়িয়ে বিকৃত ভিডিও— ভুয়ো খবর ছড়িয়ে দেওয়ার একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে দেশ জুড়ে। এ দিকে সোশ্যাল মিডিয়া, হোয়াটস্‌অ্যাপের মতো সহজলভ্য ও সুপারফাস্ট মাধ্যম আসার পরে বিপাকে পড়েছে মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলিও। কারণ, ‘সত্য’, ‘সোর্স’ এবং ‘এডিটোরিয়াল এথিক্স’-এর মতো যে প্রাথমিক শর্তগুলি মেনে মূলধারা কাজ করে, তার কোনওটিরই ধার ধারে না এই ডিজিটাল সাইটগুলি। ‘প্রোপাগান্ডা’র পরিবেশনই এদের মূল উদ্দেশ্য, খবর নয়। আশঙ্কার বিষয় হল, এ সবের পরেও বিদ্বেষ আর হিংসায় প্রশ্রয় দেওয়া এই সব সাইট, সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলই হয়ে উঠছে সংবাদমাধ্যমের ‘বিকল্প মূলধারা’। হার্ভার্ডের একটি সমীক্ষার মতে, জনপ্রিয়তা এবং পাঠকসংখ্যার দিক থেকে ক্রমে ভুয়ো খবরের প্ল্যাটফর্ম মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলিকে পিছনে ফেলছে। আবার ৬৫ শতাংশ মার্কিন মনে করেন, মূলধারার সংবাদমাধ্যমের একটা বড় অংশের খবরই আদতে ‘ভুয়ো’!

নিজস্ব সাইটের পাশাপাশি ফেসবুক, ট্যুইটারে এই সব ভুয়ো খবর ছড়ানোয় যুক্ত ডিজিটাল মিডিয়াগুলির হাজারো হ্যান্ডেল আছে। সেখান থেকে প্রতি মুহূর্তে বিভিন্ন লেখা হাজারে হাজারে শেয়ার হচ্ছে, কমেন্ট পড়ছে। হোয়াটস্‌অ্যাপের হাজার হাজার গ্রুপের মাধ্যমে নিমেষে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে তা ছড়িয়ে পড়ছে। পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু খুনের ভুয়ো ভিডিওটি শুধু ফেসবুকেই ৩৭ হাজার বার শেয়ার হয়েছে। আবার ডিমনিটাইজেশনের ঘোষণার পরে নিমেষে ভারতের ২০০ মিলিয়ন হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারীর এক বিরাট সংখ্যকের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল একটি ভুয়ো বার্তা— নতুন নোটে নাকি জিপিএস ন্যানো চিপ থাকবে। এতটাই শক্তিশালী এই মাধ্যম। দেশের দুর্বল সাইবার আইনের ফাঁক গলে ক্রমে সব দিক থেকেই পোক্ত হয়ে উঠছে ‘ফেক নিউজে’র কারবারিরা। আবার ‘স্পর্শকাতর’ বলে না ছাপার প্রাচীন নীতি এখনও চালিয়ে যাচ্ছে মূলধারার সংবাদমাধ্যম। তার পুরো ফায়দা লুটে আজকের এই নিয়ন্ত্রণহীন হোয়াটস্‌অ্যাপ আর সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে বিভ্রান্তি ছড়াতে বেগ পেতে হচ্ছে না ভুয়ো খবরের কারবারিদের।

কিন্তু মানুষ ভুয়ো খবর বা গুজবে কেন বিশ্বাস করে?

রটনা এমন এক অসুখ, যা কোনও ব্যক্তি, গোষ্ঠী, ঘটনা বা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে এমন কিছু ধারণা তৈরি করে, যা আদতে সত্য নয়। তবু তা এক জনের থেকে আর এক জনের কাছে দ্রুত ছড়িয়ে যায়। কোনও প্রমাণ না থাকলেও কিছু মানুষের স্রেফ ‘বিশ্বাস’-এর বশে ক্রমেই তা বদ্ধমূল ধারণায় পরিণত হয়। আসলে আমরা কম জানি। সেই না জানা দিয়েই ভাবি, যা রটে, তার কিছু তো বটে। আমাদের এ ভাবে ভাবার পথটা আরও সমস্যা বাড়িয়ে দেয়, যখন আমরা ইন্টারনেটের তথ্যে ভরসা করতে শুরু করি। যে মাধ্যমে গুজব ছড়ায় হু হু করে।

কোনও মানুষই কোনও নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে কোনও তথ্যকে গ্রহণ করে না। তথ্য গ্রহণের এই প্রবণতাই আমাদের প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। তথ্যের এই পক্ষপাতমূলক গ্রহণ আমাদের এতটাই প্রভাবিত করে, আমরা এতটাই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি যে, গুজব ভুল প্রমাণিত হলেও আমরা সহজে সেই ভুল ধারণা থেকে সরতে চাই না। উল্টে বহু ক্ষেত্রেই সঠিক তথ্য সামনে এনে ভ্রান্ত প্রমাণের চেষ্টা করা হলে, আমরা নিজস্ব ধারণাটিকেই আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরি। কারণ, আমরা তা-ই সত্য বলে মনে করি, যা আমরা বিশ্বাস করি। যা বিশ্বাস করে আমরা সন্তুষ্ট থাকি। একই ভাবে সেই তথ্যকে ভ্রান্ত বলে উড়িয়ে দিই, যার দ্বারা আমাদের নিজস্ব বিশ্বাস, মতাদর্শ ধাক্কা খায়। আমাদের এই প্রবণতার ফাঁক গলেই অনলাইন, সোশ্যাল মিডিয়া, হোয়াটস্‌অ্যাপ ঘুরে গুজব, ভুয়ো খবর ক্রমে বহুর ক্ষেত্রে ‘সত্য’-এ রূপান্তরিত হয়।

এখন ঘটনা হচ্ছে, ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠের মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরে খুব পরিকল্পিত ভাবে একটা সংখ্যালঘু-আতঙ্ক তৈরি করা হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠের সামনে যে ‘থ্রেট’গুলো আদতে নেই, সেগুলোর অলীক-অস্তিত্ব তৈরি করা হয়েছে। আমাদের অস্তিত্ব-সঙ্কটের এই বোধ গুজব ছড়াতে ইন্ধন জোগাচ্ছে। তাই ‘বোরখা পরায় আপত্তি তোলায় মুসলিমদের হাতে এক হিন্দু যুবতীর হত্যা’র ভিডিও দেখে (যা আদতে বছর কয়েক আগে সুদূর গুয়াতেমালায় চোর সন্দেহে এক যুবতীকে প্রকাশ্যে পুড়িয়ে মারার ঘটনা)  ‘বিপন্ন’ আপনিও তখন সেই খবরের বিন্দুমাত্র যাচাই না করে নানা মাধ্যমে ‘শেয়ার’ করতে থাকেন।

একদা ‘জীবনস্মৃতি’তে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “ছাপা অক্ষরের খাড়া লাইনের মধ্যে কোনোরূপ মিথ্যা চালানো যায়, ইহা আমি মনেই করিতে পারিতাম না।” সেখান থেকে আমরা বহু দূর এগিয়ে এসেছি। এখন অন্তর্জালেও অবলীলায় একই কাণ্ড ঘটে চলেছে। বহু উচ্চশিক্ষিত, সংবেদনশীল মানুষকেও দেখেছি, অন্তর্জালের ভুয়ো খবরে সহজেই বিশ্বাস করে ফেলছেন। তার সুযোগে গত কয়েক বছরেই আনাচে কানাচে, বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলা একটা হাওয়া ক্রমশ পোক্ত হচ্ছে। এক, পশ্চিমবঙ্গে ‘মুসলিম তোষণ’ চলছে। দুই, এখানে ‘হিন্দু’রা কোণঠাসা, বিপন্ন।

নানা প্ল্যাটফর্মে এই ধারণাকে মানুষের মস্তিষ্কে ঢোকানোর একটা প্রক্রিয়া চলছে। এই ধারণার বাস্তব ছবিটা ঠিক কেমন? এর উৎস কি একান্তই দলীয়-রাজনৈতিক নয়? তথ্য কী বলছে? এ দেশে মুসলিম এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ছবিটা ঠিক কেমন? সাচার কমিটির রিপোর্ট দেখুন। সাম্প্রতিক প্রতীচী ট্রাস্টের রিপোর্ট দেখুন। সামাজিক-অর্থনৈতিক দিক থেকে কেমন দুর্দশার মধ্যে বাস করছেন আপনারই পড়শি, সংখ্যালঘুরা, তার উত্তর পেয়ে যাবেন। ৮০ শতাংশ ‘হিন্দু’ বসবাসকারী দেশ কি সত্যিই বিপন্ন? ৩৪ বছর ‘সেকুলার’ বাম সরকার থাকা রাজ্যের হাল যদি এমন হয়, তা হলে দেশের বাকি অংশের ছবিটা কল্পনা করতে নিশ্চয় কষ্ট হবে না। পিছিয়ে পড়া অংশের কথা ভাবাটা আমাদের দেশে কবে থেকে ‘তোষণ’ বলে চিহ্নিত হল? ঘটনা হল, ভোট-বাক্সের স্বার্থে মুসলিম সমাজের কেবল মৌলবাদী অংশকে তুষ্ট করার চেষ্টা করেছে নানা রাজনৈতিক দল। সাঈদির মুক্তির দাবি-ই হোক কিংবা, তিন তালাক— এ রাজ্যেও এই মৌলবাদীরা আরও সক্রিয় হয়েছে। বিনা বাধায়। উল্টো দিকে, একই অঙ্কের হিসেবে দাপট বাড়িয়েছে মুদ্রার অপর পিঠে থাকা সঙ্ঘ পরিবার এবং তার শাখাপ্রশাখা।

ঘটনা হল, সংখ্যাগরিষ্ঠতার সূত্রে হিন্দুরা এ দেশে অগ্রাধিকার প্রাপ্ত সমাজ। এই আর্থ-সামাজিক অবস্থানটা তাঁদের একটা স্বাভাবিক অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। এটিই স্বাভাবিক বলে এই সমাজ মনে করে। তাই অন্য সমাজের দিকে কেউ তাকালে, তাদের কথা ভাবলেই সেই সংখ্যাগুরু সমাজের একাংশের মনে এক ধরনের বিপন্নতার বীজ বুনে দেওয়া যায়। পিছিয়ে পড়া সমাজের হয়ে কথা বললে তাকে সহজেই ‘তোষণ’ বলে দেগে দেওয়া যায়। এবং এই তথাকথিত ‘তোষণ’ যে একটা নিকৃষ্ট ‘অপরাধ’— এই বোধটাও জনমানসে সঞ্চারিত করে দেওয়া যায়!

আসলে ‘বিপন্নতা’র ধারণা পাবলিকে খায়। ইতিহাস তার সাক্ষী। হিটলারের জার্মানিই হোক বা সাম্প্রতিক কালে ট্রাম্পের উত্থান এবং ‘ব্রেক্সিট’— সবের নেপথ্যে বড় ভূমিকা এই ‘বিপন্নতা’র বোধের। এ দেশে যেমন, ঐতিহাসিক ভাবে তাঁদের সঙ্গে বঞ্চনা হয়ে এসেছে— এমন ধারণা সংখ্যাগরিষ্ঠের মধ্যে পুষে রাখা হয়েছে। (ভক্তদের কাছে নরেন্দ্র মোদী এমন একটি ছবি— যিনি এই বঞ্চনার প্রতিকারক এবং অত্যাচারিতের সংহারক)। বিপন্নতা, বঞ্চনার এই বোধকে কাজে লাগিয়েই রাজনীতির কারবারিদের একাংশ এ দেশেও ভুয়ো খবরের ব্যবসা ফেঁদেছেন। ‘ইকোনমি অফ হেট’ কিন্তু এখন বিশ্ব বাজারে খুবই ‘হিট’।

উল্টো দিকে, আমাদের গোটা ‘স্টান্স’টাই হয়ে যাচ্ছে, প্রতিক্রিয়াধর্মী। ওরা মহরম করলে আমরা কেন রামনবমী করব না? তুমি আমাদের ধর্মের সমালোচনা করছো, কই মুসলমানদের ধর্ম নিয়ে তো কিছু বলো না। ‘এক্স’ নিয়ে কোনও কথা তুললে ‘ওয়াই’ নিয়ে কী বক্তব্য, সবার আগে তার জবাবদিহি করতে হবে! একটা অংশ ঘোর সক্রিয় এ ভাবেই আমাদের এই ‘হোওয়াটঅ্যাবাউটেরি’র বাইনারিতে ফাঁসিয়ে রাখতে। গত উত্তর প্রদেশের ভোট তার সাক্ষী। এ রাজ্যে ভোট যত এগিয়ে আসবে, তত বাড়বে এই খেলা।

সত্যি হোক বা মিথ্যা, সংবেদনশীল মানুষও গুজবে বিশ্বাস করেন। এ ভাবেই ভুয়ো জিনিস সত্য বলে মেনে নেওয়া মানুষের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ে। ক্রমে শক্তিশালী হয়ে ওঠা সেই রটনাকে ঠেকানো তখন প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। ইন্টারনেট যে গতি এবং পরিধিতে কাউকে ক্ষতিকারক তথ্য ছড়াতে দেয়, একই সঙ্গে আমাদের প্রত্যেককে সেই তথ্য যাচাইয়েরও সুযোগ দেয়। সত্যিটা ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগটাকে আমাদের কাজে লাগাতে হবে। দরকার ‘ফ্রি স্পিচ’কে আঘাত না করা, কড়া আইটি আইনও। আরও বেশি করে দরকার মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে। ইন্টারনেট, হোয়াটস্‌অ্যাপের যুগে তথ্যকে আড়াল করা সম্ভব নয়। এই সত্যটা তাদের মেনে নিতেই হবে। সে ক্ষেত্রে হিংসের কারবারিদের ভুয়ো তথ্য ছড়ানোর পরিবর্তে সঠিক তথ্য পরিবেশন করে ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ করার দায়িত্ব নিক মূলধারার সংবাদমাধ্যমই।

পেটের খিদে নিবৃত্তির চেয়ে মন্দির-মসজিদের ভাঙা-গড়া নিয়ে মানুষের মেতে ওঠায় ঠিক কাদের লাভ, সেই হিসেবটি কষার সময় এসেছে। এ লড়াইয়ে আমাদের প্রধান ভরসা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুই। কারণ, এ দেশের বহুত্ববাদী স্বর টিকে থাকার নেপথ্যে তাঁদের অবদান অনেক বেশি। ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন খাদ্যাভ্যাসে বিশ্বাসী বিপুল এই জনগোষ্ঠীই এত যুগ ‘সংখ্যালঘু’ স্বরগুলিকে আগলেছে। হিন্দুত্ববাদের নামে যাঁরা রাজনৈতিক কারবারে নেমেছেন, তাঁরা-ই যে আদতে এ দেশের মহান হিন্দুধর্মের প্রধান শত্রু— এই সত্যটি ভারতবর্ষের সেই প্রকৃত হিন্দুদের ‘সংখ্যাগুরু’ স্বর-ই যে ক্রমে বুঝতে পারছেন, এই বিশ্বাস আমার রয়েছে। তাই এই মহান দেশ ‘ফেক নিউজ’ আর ‘পোস্ট-ট্রুথে’র সময়ে বিভেদকামীদের ভুল প্রমাণ করবে, এই ভরসাও আছে।

দেশের এই নানা স্বরকে আজকের প্রজন্ম কি এত সহজেই ভুলে যাবে? আমরা নবীনরা কি কেবলই এই বিপন্নতার খেলায় অন্ধ হয়ে থাকব?

(লেখক ফলতা সাধনচন্দ্র মহাবিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও প্রাক্তন সাংবাদিক) 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More