ফেসবুকে ঝড় তুলছ, সামনে কেন চুপ!

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    তিয়াষ মুখোপাধ্যায়
    শমীক ঘোষ

    ফের শহরের কুশ্রী মুখ। দিনের আলোয়, ভরা বাসে, চূড়ান্ত অসভ্যতার শিকার কলেজপড়ুয়া তরুণী। প্রিয়াঙ্কা দাস নামের ওই তরুণী ফেসবুকে বিষয়টি জানালে, তুমুল প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। ফেসবুকেই।

    মাত্র চার ঘণ্টায় হাজার কুড়ি শেয়ার এবং হাজার দশেক কমেন্ট প্রমাণ করেছে, এ ধরনের সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে বেশ সচেতন মানুষ। নেটিজেনদের দেওয়ালে দেওয়ালে ঘুরছে প্রিয়াঙ্কার আপলোড করা ভিডিওটি। সঙ্গে জ্বলন্ত ক্যাপশনে উপচে পড়ছে ঘৃণা, রাগ, প্রতিবাদ। ভিডিওটিতে দেখা যাচ্ছে, চলন্ত বাসে বসে প্রকাশ্যে হস্তমৈথুন করছেন এক মাঝবয়সি লোক। প্রিয়াঙ্কার ক্যামেরায় ধরা পড়েছে সেই দৃশ্য।

    প্রিয়াঙ্কা জানিয়েছে, ভিডিওর মাধ্যমে যথাযোগ্য প্রমাণ হাতে নিয়ে, উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করেন তিনি। জানান, লোকটি কী চূড়ান্ত অসভ্যতা করছিল। কনডাকটরকে ডেকেও বলেন, লোকটিকে ধরতে। কিন্তু প্রিয়াঙ্কার দাবি, গোটা বাস নীরব ছিল। এক জন সহযাত্রীও প্রতিবাদ জানানো দূরের কথা, প্রিয়াঙ্কাকে সমর্থন করাও দূরের কথা, ন্যূনতম প্রতিক্রিয়াও কেউ প্রকাশ করেননি।

    এর পরেই প্রশ্ন উঠেছে, সব প্রতিবাদ কি তা হলে কেবল ফেসবুকেই পুঞ্জীভূত হচ্ছে? এই প্রতিবাদীদের কেউই কি বাস্তব পরিস্থিতিতে গলা তুলবেন না? বাস্তবে প্রতিবাদ করার যে ঝুঁকি, আর ফেসবুকে প্রতিবাদ করার যে গ্ল্যামার– এই দুইয়ের মধ্যে ব্যালেন্স করেই কি এগোবেন সবাই?

    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়

    কবি বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যাখ্যা, “ফেসবুকের প্রতিবাদটা প্রতিবাদীকে নিরাপদ রাখে। আমরা বোধ হয় নিজেরা নিরাপদে থেকে প্রতিবাদ করতে ভালোবাসি। ওইজন্য দেখা যায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিবাদে ফেসবুকে ঝড় উঠছে। কিন্তু অনুব্রতর ক্ষেত্রে প্রতিবাদটা লোকে একটু বুঝেশুনে করছে। যেখানে জড়িয়ে পড়ার সমস্যা হবে না, সেখানেই মানুষ প্রতিবাদ করছে। এ দিন বাসের ভিতরে প্রতিবাদ করতে গেলে, লোকটা যদি পাল্টা আক্রমণ করে! তাই চুপচাপ নেমে যাওয়াই আমাদের জন্য সেফ।“

    যদিও প্রিয়াঙ্কার ফেসবুক পোস্টের কমেন্টে এই প্রশ্নের উত্তরে অনেকেই বলছেন, ঘটনাস্থলে থাকলে তাঁরা প্রতিবাদ করতেন। কিন্তু বাস্তবে এমন দেখা গেল না কেন? প্রিয়াঙ্কা চিৎকার করে সবটা বলার পরেও কেন লোকটি নেমে যেতে পারল?

    সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়

    মানুষ হয়তো নিত্যনতুন ঘটনায় ‘প্রতিবাদ’ করতে করতে ক্লান্তও হয়ে পড়েছে। এমনটাই মত লেখক সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। বলছেন, “কত কিছুতে আর প্রতিবাদ করবে মানুষ? প্রতিবাদ করতে গেলে কে-ই বা তার পাশে দাঁড়াবে? ফেসবুকে প্রতিবাদ করার কোনও ঝুঁকি নেই। এক লহমায়  রিঅ্যাক্ট করে একটা স্ট্যান্ড নিয়ে ফেলা যায়। কিন্তু আসল ক্ষেত্রে প্রতিবাদ করতে দম লাগে। সাহস লাগে। আজ প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে যেটা ঘটেছে, সেটা এই সাহসেরই অভাব।“

    মনে পড়ে, কয়েক দিন আগেই মেট্রো রেলের কামরায় এক তরুণ-তরুণীর অশালীন আচরণের ‘প্রতিবাদে’ গায়ে হাত তুলেছিলেন কয়েক জন প্রৌঢ়। সেই প্রৌঢ়দের আচরণের প্রতিবাদে আবার সামিল হয়েছিলেন ইন্টারনেট জগতের তরুণ তুর্কিরা। সেই প্রতিবাদে অন্যায্য ভাবে কিছু প্রৌঢ়ের ছবি দোষী হিসেবে ভাইরাল হয়ে যাওয়ার ঘটনায় ফের পাল্টা প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। প্রথম ঘটনাটা ছাড়া, বাকি সবটাই অবশ্য ফেসবুকে। এ দিনের ঘটনা আবারও সেই একই শূন্যতার মুখে দাঁড় করাচ্ছে শহরবাসীকে।

    প্রশ্ন তুলছে, ঠিক জায়গায় ঠিক প্রতিবাদ কি কোনও দিনও করা হবে না?

    চৈতালি চট্টোপাধ্যায়

    সমস্যা আজকের নয়। সে কথাই মনে করিয়ে দিয়ে নারীবাদী লেখিকা চৈতালি চট্টোপাধ্যায় বলছেন, “বহু আগে থেকেই মহিলারা ট্রামে-বাসে এ রকম হেনস্থার শিকার হচ্ছেন। প্রতিবাদ করতে গেলে প্রায়ই শুনতে হয়, ‘এতই যখন অসুবিধা হচ্ছে, তখন ট্যাক্সি করে যান না কেন।‘ বাস্তবে প্রতিবাদ করতে গিয়ে এমন কটাক্ষ সইতে হলে তো ফেসবুকেই আশ্রয় খুঁজবে প্রতিবাদ।“

    বস্তুত, মানসিকতা যেমনই হোক, সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেকে অনেক বেশি প্রগতিশীল দেখানোর সুযোগ মেলে। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা বারবার প্রমাণ করে, সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের যথেষ্ট উদার ও প্রতিবাদী দেখালেও, আসলে অনেকের মনের মধ্যেই মধ্যযুগীয় অন্ধকার জমে আছে। তার পরেও ফেসবুকে সরব হতে বা উচ্চকিত হতে বাধা নেই। বাস্তবজীবনে চুপ করে থেকে নিজেদের নিরাপদ রাখলেই তো হল! বিস্মিত হলেও এটাই সত্যি।

    শর্মিষ্ঠা দত্তগুপ্ত

    লেখক-গবেষক ও সমাজকর্মী, দীর্ঘদিন নারী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত কর্মী শর্মিষ্ঠা দত্তগুপ্তের কথায় সেই বিস্ময়েরই প্রতিফলন। “মেয়েটি চেঁচানোর পরেও যে উপস্থিত লোকজন কোনও রিঅ্যাকশন দিচ্ছে না, এটা অকল্পনীয়। তা হলে কী আমাদের কিছুতেই কিছু যায় আসছে না? তবে এ-ও ঠিক বহু সময়েই ফেসবুক থেকেই বহু প্রতিবাদ-আন্দোলনের শুরু হয়েছে।“

    দোলন গঙ্গোপাধ্যায়

    নারীবাদী সমাজকর্মী দোলন গঙ্গোপাধ্যায় আবার বলছেন, “এটা ভাবলে হবে না, যে যিনি ফেসবুকে প্রতিবাদ করছেন তিনি বাস্তবে চুপ করে থাকতেন। তবে শেয়ার হলেই যে সেটা প্রতিবাদ এমনও ভাবার কারণ নেই। তবে আরও আশ্চর্য ঘটনা হল, মেট্রোয় দু’টো ছেলেমেয়ে ঘনিষ্ঠ ভাবে দাঁড়ালে তাঁদের গণপ্রহার দেওয়া যায়। কিন্তু সেই একই শহরে এমন একটা ন্যাক্কারজনক ঘটনায় কেউ কোনও প্রতিবাদ করে না। বোধ হয় প্রথম ক্ষেত্রে সমাজের অভিভাবকত্বটা একটু সহজ।“

    প্রচেত গুপ্ত

    লেখক প্রচেত গুপ্তর কথায়, “এটা সাজাযোগ্য অপরাধ। ওই বাসে কারও না কারও কিন্তু প্রতিবাদ করা উচিত ছিল। সে সাহসটুকু যে কারও হল না, এটা আমার খুব অবাকই লাগছে। তবে ফেসবুকেও এই যে ঘটনাটির প্রতিবাদ হচ্ছে, শেয়ার হচ্ছে সেটা ভালোই। কিন্তু তবু বলব এই যে এত ফেসবুক ফ্রেন্ডরা পাশে দাঁড়াচ্ছেন এঁদের মতো কেউ কিন্তু অকুস্থলে প্রকৃত বন্ধু হতে পারলেন না। হয়তো সোশ্যাল মিডিয়ার এটাই প্রভাব। সবাই দূর থেকে ফ্রেন্ড হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তব জীবনে কেউ আর বন্ধু হয়ে উঠতে পারছে না।“

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More