বৃহস্পতিবার, জুন ২৭

Exclusive মুখ খোলেন বলেই খুন হন কালবুর্গি, দাভোলকর, পানসরে: গুলজ়ার

মুম্বাইয়ের বাংলো ‘বসকিয়ানা’তে বসে গুলজ়ারের সঙ্গে তুমুল আড্ডা মেরে এলেন অর্ঘ্য দত্ত। কথায় কথায় উঠে এল, রবীন্দ্রনাথ থেকে হেমন্ত, মাছ-খাওয়া, বাঙালি সংস্কৃতি, এমনকী কালবুর্গি, দাভোলকর, পানসরের খুন হওয়ার মতো প্রসঙ্গও। আজ প্রথম কিস্তি।  

অর্ঘ্য দত্ত

“নাও। খেয়ে নাও আরাম পাবে।” ধবধবে ফর্সা হাতটা আমার দিকে বাড়াতে বাড়াতে বললেন গুলজ়ার।

স্পষ্ট বাংলায়। হাতের তালুতে গোলমরিচের মতো ছোট্ট ছোট্ট কয়েকটা গুলি।

একটু আগেই ওঁর নির্দেশে এসেছে আদা দেওয়া চা। তারপরও আমার থ্রোট ইনফেকশন নিয়ে উদ্বেগ কমেনি ওঁর। নিচু হয়ে বিরাট সেক্রেটারিয়াল টেবিলটার ড্রয়ারগুলো ঘেঁটে ঘেঁটে বার করে আনলেন হোমিওপাথির শিশির মতো ছোট্ট প্লাস্টিকের কৌটো। আঙুলের ডগা দিয়ে কৌটোয় টোকা মেরে মেরে বার করে আনলেন ছোট্ট গুলিগুলো।

“এইগুলো যষ্টিমধুর গুলি। কাশছো তো এখনও।” গলায় স্নেহের সুর। পাটভাঙা সাদা পাঞ্জাবির ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে প্রায় দুধসাদা হাতটা। নীল শিরাগুলো দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। এই হাত দিয়েই লেখা হয়েছে “থোড়া হ্যায়, থোড়ে কি জ়রুরৎ হ্যায়”-এর মতো হিন্দি সিনেমার একের পর এক কিংবদন্তী হয়ে যাওয়া লিরিক্স। যে গান শুনে এখনও একইরকম মোহিত হয়ে যাই আমি আর আমার সদ্য কলেজ পাশ করা ছেলে।

এই লোকটাই বানিয়েছেন, মৌসম, আঁধি, ইজাজ়ত, মাচিসের মতো সিনেমা।

মুম্বাইয়ের দুপুরের রোদ, পালি হিলসে ‘বসকিয়ানা’ বাংলোর এই স্টাডির পুরু কাচের জানলা ভেদ করে ঢুকেছে সামান্যই। টেবিল ল্যাম্পের আলোয় ঘরের মধ্যে আলোআঁধারি। চোখটা একটু যেন ভিজে ভিজে লাগছিল। আমার মতো একজন সাধারণ মানুষকে নিয়ে এতটা উদ্বেগ ওঁর!

“শোনো! আমার নাম লিখবে গুলজ়ার। শুধু গুলজ়ার। আগে পরে কিচ্ছু বসাবে না কিন্তু।” এবার চেয়ারে ঠেসান দিয়েছেন ঋজু পিঠটা। গলায় স্পষ্ট নির্দেশের সুর। “আর হ্যাঁ, আমার জন্ম সাল ১৯৩৪। নানা লোকে নানারকম লিখে যাচ্ছে। যা খুশি। তুমি কিন্তু এটাই লিখবে।” নামটাও সই করে দিলেন পাতায়। বাংলা হরফে। গুলজ়ার।

বসার টেবিলের একটু পেছনে, নিচু বুককেসটার ওপরে ফ্রেমে বাঁধানো তিনটে চারকোল ড্রয়িং।

“ওগুলো কার?”

হাসলেন সামান্য। “কয়েকটা আমারই আঁকা।” গুলজ়ার আঁকতেও পারেন!

“রবীন্দ্রনাথ পড়া শুরু স্কুল জীবনেই? তাই না?”

“রবীন্দ্রনাথ পড়ব বলেই আমি বাংলা শিখতে শুরু করেছিলাম।  আমার খুব ছোটবেলা থেকেই বই পড়ার নেশা। বই আমাকে টানত। তবে ওই বয়সে সবাই যা পড়ে তেমনই। রূপকথা, রহস্য রোমাঞ্চ। এইসবই। ক্লাস সেভেনে পড়ি, একদিন স্কুলের লাইব্রেরি থেকে নিয়ে এলাম রবীন্দ্রনাথের ‘গার্ডেনার’-এর উর্দু অনুবাদ। পড়েই চমকে উঠলাম। আরে এমন তো পড়িনি আগে কখনও। বলতে পারো রবীন্দ্রনাথের লেখাই আমাকে বাংলা সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট করল। তখন ওইরকম একই প্রচ্ছদে ওরকম বেশ কিছু বইয়ের উর্দু অনুবাদ বেরিয়েছিল। মানে ‘গার্ডেনার’-এর যেমন প্রচ্ছদ, সেই একই প্রচ্ছদে, শরৎচন্দ্রের ‘রামের সুমতি’ বা ‘মেজদিদি’, বঙ্কিমচন্দ্রের ‘রজনী’ বা ‘ইন্দিরা’-র অনুবাদ। কখনও বা মুন্সী প্রেমচাঁদ। সেইসবও পড়তে শুরু করলাম।”

ছোটবেলার কথা বলতে বলতে ওঁর মুখে একটা স্মিত হাসি।

“শরৎচন্দ্র,” হাসিটা হঠাৎ যেন মিলিয়ে গেল। মুখের কোণে একটু যেন যন্ত্রণার ছাপ। “শরৎচন্দ্র, আসলে কী জানো, ওর লেখায় সৎ-মা, সৎ-ভাইদের অত্যাচারের যেসব কথা থাকত, আমার ওই বয়সেই সেইরকম তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে কিছুটা। শরৎচন্দ্রের লেখা পড়ে তাই সহজেই যেন রিলেট করতে পারতাম। ওঁর লেখা পড়তে পড়তেই বাংলার সমাজ, সংস্কৃতিকে কেমন যেন চিনে ফেললাম আমি।”

“আর বাংলা লিখতে?” আমার প্রশ্নটা শুনে গাম্ভীর্য ভেদ করে ঠোঁটের কোণে ভেসে উঠল একটা রসিকতার হাসি।

আরও পড়ুন দ্বিতীয় ও শেষ কিস্তি  সুচিত্রা সেনকে আমি স্যার বলতাম: গুলজ়ার

“বাঙালি প্রেমিকাকে বাংলায় চিঠি লিখব বলে। প্রেমের জন্য ওইটুকু করব না?” এবার হা হা করে হেসে ফেললেন গুলজ়ার। কে বলবে উনি এখন শুভ্রকেশ, অশীতিপর? এতো নতুন প্রেমে পড়া তরুণের হাসি।

“ওহ! তাহলে তো তখন আপনার বাঙালিদের সব কিছুই পছন্দ হচ্ছে?”

“মাছ। তোমাদের বাঙালিদের মাছ খাওয়া আমার সব থেকে পছন্দ। ‘সঙ্ঘর্ষ’-ছবিটার ডায়ালগ লেখার আগে অবধি আমার সব কাজই বাঙালিদের সঙ্গে। ওই ছবিটাও মহাশ্বেতা দেবীর গল্প থেকেই হয়েছিল। তো যা বলছি, সবই তো বাঙালি পরিচালক, বাঙালি কলাকুশলী তাঁর আগে অবধি। শুধু বাংলা সাহিত্যই নয়, তাঁদের দেখে বাঙালিদের মতো করে ধুতি পরাও শিখতে চাইলাম। খুব ইচ্ছে হেমন্ত কুমারের (মুখোপাধ্যায়) মতো ধুতির কোঁচা পকেটে নিয়ে হাঁটব। কিন্তু সে আর হল কই! অগত্যা মালকোঁচা মেরেই ধুতি পরতাম। আর মাছ! তোমরা বাঙালিরা যে আগে থেকে কাঁটা না বেছে, কাঁটাশুদ্ধু মাছ মুখে তুলে নাও। মুখের ভেতরেই কাঁটাটা আলাদা করে ফেল, সেটা আমার দেখে মনে হত ম্যাজিক। একজনকে তো জিজ্ঞাসাই করে ফেললাম। কী ভাবে অমন করে মাছ খাওয়া যায়? সে বলল অভ্যেস। আমিও অভ্যেস করে ফেললাম।”

“শিখে নিলেন?”

“আরে মাছ আমার খুব পছন্দ। একসময় রোজ মাছ খেতাম। বাসু আমাকে একবার মাছ খাওয়াবে বলে সিনেমায় অভিনয় করিয়ে নিয়েছিল।”

“এত মাছ খেতে ভালোবাসেন?”

“বাসু চ্যাটার্জি নয় কিন্তু। বাসু ভট্টাচার্য্য। রাজ কাপুর-ওয়াহিদা রহমানের ‘তিসরি কসম’-এর ডিরেক্টর। আমাকে একদিন ফোন করে বলল, কাল চলে এস বাড়িতে, ভালো মাছ খাওয়াব। আমি গিয়ে দেখি ওমা, মাছ কোথায়, শ্যুটিং চলছে। ‘গৃহপ্রবেশ’ ছবির শ্যুটিং। সঞ্জীবকুমার, শর্মিলা ঠাকুর, দীনেশ ঠাকুর সব বসে। আমি বাসুকে বললাম, মাছ কোথায়? বলল, আগে একটা ছোট্ট রোলে অভিনয় করে দাও। তারপর মাছ খাওয়াব। আমার মুখ দেখে সবাই হাসতে লাগল। শর্মিলা তো হেসে কুটোপাটি। মাছ খাওয়ার লোভে শেষ অবধি আমাকে অভিনয়ও করতে হল!”

“সেই সময় বাংলা সিনেমার গান, আর হিন্দি সিনেমার গান, গুণগত কোনও তফাৎ লক্ষ করেছেন?”

রেগে গেলেন খুব। “এই প্রশ্নটার কোনও মানে আছে? কোনও মানেই নেই। সিনেমার গান লেখা হয় সিনেমার প্রয়োজনে। সিনেমা যখন সাহিত্যধর্মী, সেনসিবল, তার গানও সেইরকম হবে। তার মধ্যে সাহিত্য, কবিতার ছোঁয়া থাকবে। সে যে ভাষাতেই হোক না কেন। আর যখন সিনেমা মাথামুণ্ডুহীন, তার গানও মাথামুণ্ডুহীন!”

“একসময় তো অনেক সাহিত্যধর্মী ছবি হত। আপনিও করেছেন। একসময় অনেকে লেখকও সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখেছেন। ধরুন মান্টো বা আমাদের বাংলার শরদিন্দু। এখন সেটা আর হয় না।”

“দ্যাখো সেই সময় পরিচালকদের সাহিত্যধর্মী ছবির ওপর ভরসা ছিল। লেখকরাও মনে করতেন সিনেমা ইজ আ নিউ মিডিয়াম অব এক্সপ্রেশন। লাখ লাখ লোকের কাছে পৌঁছনো যাবে সিনেমার মাধ্যমে। তারা আমার গল্পটা জানবে। এখন সেই চিন্তাটাই বদলে গিয়েছে। লোকের রুচিও বদলে গিয়েছে। পাল্টে গিয়েছে বিনোদনের ধারণাও। সেই সময় অধিকাংশ দর্শক সাহিত্যগুণ সম্পন্ন সিনেমা দেখতে চাইত। আর এখন সাহিত্যগুণ সম্পন্ন সিনেমা করতে চাওয়া পরিচালকও কমে গিয়েছে।”

“তরুণ বয়সে আপনি ‘প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন’ ‘আইপিটিএ’ এর মতো সংগঠনের সান্নিধ্যে এসেছিলেন। ঋত্বিক ঘটক, সলিল চৌধুরীর মতো বাম আদর্শে বিশ্বাসী মানুষেরা এইসব সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আপনার ভাবনার জগত, রাজনৈতিক মতামত প্রভাবিত হয়নি?”

“আমি পার্টিশন দেখেছি। তারপরে দেখেছি দেশজুড়ে তীব্র বেকারত্ব। ট্রেড ইউনিয়ন মুভমেন্টও তুঙ্গে। প্রভাবিত হয়েছিলাম। সেই সময় সলিল চৌধুরী, শৈলেন্দ্র, বলরাজ সাহানী, সৈয়দ জাফরির মতো মানুষের সঙ্গে মিশছি। আমার লেখক হিসেবে পরিণত হওয়াকে প্রভাবিত করছেন তাঁরা। আমিও লেফটিস্ট কালচারাল উইং-এ জড়িয়ে পড়লাম। তবে কমিউনিস্ট পার্টির মেম্বার হইনি কোনওদিন। বামপন্থী সাহিত্য পড়তাম। নেরুদা পড়েছি। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা অনুবাদ করেছি।”

“আচ্ছা এই যে এত কমিউনিস্ট সান্নিধ্য, রবীন্দ্রনাথের প্রতি ভালোলাগায় বা মূল্যায়ণে এটা প্রভাব ফেলেনি?”

“কেন ফেলবে? যে মানসিকতা নিয়ে কালীদাস পড়েছি, শেক্সপিয়র পড়েছি, তলস্তয় পড়েছি, সেই মানসিকতা নিয়েই পড়েছি রবীন্দ্রনাথ। আমার কাছে রবীন্দ্ররচনা বিশুদ্ধ সাহিত্য মাত্র।”

“একটা অন্য প্রশ্ন করব?”

“কী?” আমার দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন গুলজ়ার।

“আমার মনে হয় মুম্বাইয়ের ইন্টেলেকচুয়ালরা কিন্তু অনেক বদলে গিয়েছেন। এখনও পশ্চিমবঙ্গে দেখি, কোনও সামাজিক বা রাজনৈতিক ইস্যুতে, বুদ্ধিজীবীরা রিঅ্যাক্ট করেন। কিন্তু মুম্বাইয়ে, অন্তত খবরের কাগজ পড়ে সেইরকম কিছু দেখতে পাই না। মনে হয় এখানে বুদ্ধিজীবীরা হয় অরাজনৈতিক, নয়তো সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাঁদের মতামত গুরুত্বহীন।”

এইবার প্রচণ্ড রেগে গেলেন গুলজ়ার। ফর্সা মুখটায় যেন দেখতে পেলাম, ক্ষোভের লাল আভা।

“তুমি কোন কাগজ পড়?” গর্জে উঠলেন। “তুমি পড় ইংরাজি কাগজ। মুম্বাই একটা ট্রেড ওরিয়েন্টেড বিজনেস ওরিয়েন্টেড সিটি। বাণিজ্যনগরী। দেখো না, আজকাল নামী ইংরাজী সংবাদপত্রগুলোতে পাতার পর পাতা জুড়ে শুধু বিজ্ঞাপন!  যে কোনও কালচারাল ম্যাটারের থেকে এখানে গুরুত্ব পায় বিজনেস সংক্রান্ত খবরাখবর। কিন্তু এই জনপ্রিয় কাগজের বাইরে তুমি কী মারাঠি কাগজ পড়েছ কখনও? হিন্দি? কলকাতায় যে খবরের কাগজ দেখো তুমি সেইগুলো বাংলায় প্রকাশিত হয়। মধ্যবিত্তরা পড়ে। কলকাতার ইংরেজি দৈনিকে কি বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের সব মতামত দেখতে পাও তুমি?” গলাটা উঠে গেছে আরও।

“আঞ্চলিক দৈনিক খুললে তুমি দেখতে পেতে সেখানে বুদ্ধিজীবীরা রোজ মতামত ব্যক্ত করছেন। প্রতিবাদ করছেন। শোনো, বুদ্ধিজীবীরা মোটেই সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব হারাননি। বুদ্ধিজীবীরা যথেষ্ট প্রতিবাদ করেন, মুখ খোলেন। আর খোলেন বলেই, কালবুর্গি, দাভোলকর, পানসরেকে খুন হতে হয়।”

গম্ভীর হয়ে গেলেন গুলজ়ার। চুপ একদম। কথাটা ঘোরানোর জন্য আমি বলে উঠলাম, “সুচিত্রা সেনকে নিয়ে একটা প্রশ্ন করব?”

(আগামী কিস্তিতে শেষ)

(অর্ঘ্য দত্ত মুম্বাই থেকে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা ‘বম্বেDuck’-এর সম্পাদক।বর্হিবঙ্গের কবিদের কবিতা সংকলন, ‘কবিতা পরবাসে’-র প্রথম দুটি সংখ্যা সম্পাদনা করেছেন । তাঁর লেখা কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। প্রকাশিত বই ‘বিখণ্ড দর্পণে আমি।)

Leave A Reply