‘সাঁঝবাতি’র শ্যুটিংয়ে উত্তমকুমারের গল্প শুনিয়েছেন সৌমিত্র! এক্সক্লুসিভ আড্ডায় মন খুললেন দেব

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

    বড়দিনে আসছে নতুন বাংলা ছবি, ‘সাঁঝবাতি’। পরিচালক লীনা গঙ্গোপাধ্যায় ও শৈবাল বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিনয় করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, লিলি চক্রবর্তী, পাওলি দাম, সোহিনী সেনগুপ্ত, সপ্তর্ষি মৌলিক ও দেব। মুক্তি পাওয়ার  দিন দশেক আগে, ‘দ্য ওয়াল’-এর সামনে এক অকপট আড্ডায় ধরা দিলেন এই সাঁঝবাতি টিমের তিন সদস্য, লীনা, সোহিনী ও দেব।

    সাঁঝবাতি যখন প্রাণবাতি

    দ্য ওয়াল: ছবির নামকরণ সাঁঝবাতি কেন করা হল?
    উত্তর এল তিনটে। তিন জন মানুষ তিন ভাবে বললেন, তাঁদের কাছে এই সাঁঝবাতি নামটির অর্থ কীভাবে ধরা দিয়েছে জীবনে ও যাপনে।

    সোহিনী: এটা লীনাদি সবচেয়ে ভাল বলতে পারবেন, উনিই বেস্ট পার্সেন। তবু বলছি, জীবনের সায়াহ্নে এসে সন্ধ্যাপ্রদীপ দিচ্ছেন দু’জন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা।

    দেব: সাঁঝবাতি মানে প্রাণবাতি বলতে পারো এখানে। সত্যি বলতে কী, গল্পটা যখন তৈরি হয় তখন তো নাম ঠিক হয় না। গল্পটা এগোনোর পরে প্লট ভেবে নামটা ঠিক হয়। এই ছবিটার গল্প যখন এগোতে শুরু করল, তখন নাম ভাবার সময়ে অনেকগুলো নাম ঠিক হয় প্রথমে। যেমন চাঁদু। অর্থাৎ আমার চরিত্রটার যে নাম, সেই চাঁদুর নামেই ছবির নাম রাখা হবে বলে ভাবা হয়। এর পরে অতনুদা (রায়চৌধুরী), আমাদের ছবির প্রোডিউসার, তিনি ভাবেন সাঁঝবাতি নামটা। বিধাননগর পুলিশের যে সংস্থা আমাদের ছবিতে যুক্ত ছিলেন, সেই সংস্থার নাম সাঁঝবাতি। যে বয়স্ক মানুষেরা বাড়িতে একা থাকেন, তাঁদের সব রকম দরকারে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় ‘সাঁঝবাতি’ সংস্থা। দু’হাজার সদস্য আছেন ওদের। কোনও একলা বয়স্ক মানুষ অসুস্থ হলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা থেকে সবরকম কাজই করে এই সংস্থা। বয়স্কদের নিয়ে ঘুরতে যাওয়া, আনন্দ উদযাপন– এসবও করে ‘সাঁঝবাতি’। এই ছবিটার প্রাণকেন্দ্রও তাই। ফেল সাঁঝবাতি নামটা খুব জাস্টিফায়েড।

    সব শেষে জানালেন ছবির পরিচালিকা লীনা গঙ্গোপাধ্যায়।

    লীনা: ছবিতে যে দু’জন বৃদ্ধ-বৃদ্ধার চরিত্র, তাঁদের জীবনের যেমন একটা সন্ধ্যেবেলা আছে, আমাদের সকলের জীবনেই সেই সন্ধ্যেবেলা আসবে এক দিন। আমরা সকলেই সেই সাঁঝবেলায় বাতি খুঁজব। সেটার প্রেক্ষাপটেই এই সাঁঝবাতি নামটা। এছাড়াও, সাঁঝবাতি সংস্থার সদস্যদের জীবন থেকে নেওয়া সত্যি গল্প অবলম্বনেই এই ছবিটা তৈরি। তাই সাঁঝবাতির বিকল্প কোনও নাম হতোই না।

    চাঁদুর রোলে দেব! আমি আঁতকে উঠেছিলাম

    দ্য ওয়াল: লীনাদি, দেবকে চাঁদুর চরিত্রে নেবেন, একথা কী ভাবে মাথায় এল? আমরা ছবির ট্রেলারে দেখছি লিলি চক্রবর্তীর বাড়িতে এক জন সাহায্যকারী লোক হিসেবে আসছে চাঁদু। এই চরিত্রটা তো আসলে নিম্নমধ্যবিত্ত একটি ছেলের, যার জন্য খুব সাধারণ পাশের বাড়ির ছেলের মতো একটা লুক দরকার ছিল। সেই রকম একটা চরিত্রে সুপারস্টার দেব! এরকম রোলে তো দেবকে ভাবাই যায় না। দেবই কি প্রথম চয়েস ছিল চাঁদুর রোলে?

    লীনা: (হেসে উঠে) এই রে! এটা নিয়ে এক বার বলেছি, আর সেটা নিয়েই এত বিতর্ক হচ্ছে তো!

    দেব: বলো বলো লীনাদি। মজা হচ্ছে। একটু কন্ট্রোভার্সিয়াল করো ইন্টারভিউটা।

    লীনা: না অন্য কাউকে ভাবিনি।

    দেব: (দুষ্টুর মতো হেসে) দেবকেও ভাবেনি কিন্তু!

    লীনা: (মৃদু হেসে কিছুক্ষণ চুপ) না, সত্যি কথা বলছি। দেবকে প্রথমে ভাবিনি। দেবকে প্রথম ভেবেছিলেন অতনু। ছবির প্রযোজক। ছবির আর এক পরিচালক শৈবাল বন্দ্যোপাধ্যায় আর আমি যখন অতনুর সঙ্গে আলোচনা করছিলাম, অতনু তখনই দেবের কথা বলেন। সত্যি বলতে, আমি আঁতকে উঠেছিলাম। দেবের সামনেই বলছি। এটা একটা ঘরোয়া আড্ডাচ্ছলে কথা হচ্ছে আমাদের মধ্যে, তাই। আমার মনে হয়েছিল, প্রথমত: আমি যে ধরনের গল্প বলায় বিশ্বাসী, তাতে দেব করতে চাইবে কিনা এমন চরিত্র। আর দ্বিতীয়ত: চাঁদুর চরিত্রে দেব আদৌ খাপ খাবে কিনা! — এই প্রশ্নগুলো এসেছিল আমার মাথায়। কিন্তু দেবের আগে যে অন্য কোনও অভিনেতাকে ভেবেছিলাম, এমন নয়। কিন্তু দেবের নামটা যখন প্রথম শুনলাম তখন একবাক্যে রাজি হতে পারিনি। তবে এটাই দেবের কাছে একটা অলিখিত, অদৃশ্য চ্যালেঞ্জ ছিল। দেব কিন্তু নিজেকে প্রমাণ করে দিল। আমি মন থেকে বলছি, এই ছবিতে দেবকে কাস্ট না করলে সেটা আমার ক্ষতি হতো। দেবের হয়তো অতটাও ক্ষতি হতো না।

    “একটু লাল চা খাওয়াও না। সোহিনী লাল চা? লীনাদি চা খাবে তো ?” — পরিবেশ হাল্কা করতে এক মুহূর্তও সময় নিলেন না দেব নিজে।

    লীনা: (দেবের দিকে তাকিয়ে) চা তো আমি খাই না বাবু।

    সুপারস্টারকে এমন বাৎসল্যভরা সম্বোধন করতে শুনে ভাল লাগে।

    দ্য ওয়াল: চন্দন, ডাক নাম চাঁদু। এই চাঁদুর রোলটা করার অফার কীভাবে এল তোমার কাছে?

    দেব: তিন বছর আগেও অতনুদা আমার কাছে একটা অফার নিয়ে এসেছিলেন। তখন কাজটা হয়নি কোনও কারণে। আমায় পরে নেওয়া হয়নি। আমারও করা হয়নি তখন। এর পরে আবার অতনুদা ‘বেঙ্গল টকিজ’ শুরু করার পরে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কাজ করব কিনা। দেখো, আমি স্পষ্টবক্তা তাই আমার আগের রাগটা, বলা ভালো অভিমানটা জমে ছিল। তাই ভাবলাম, আমি আবার হ্যাঁ বলব তার পরে আবার অফার পালিয়ে যাবে। কিন্তু পরে কোথাও গিয়ে মনে হল, অতনুদা বাংলা ছবিকে ভালোবাসেন, দায়িত্বশীল মানুষ। ওঁকে ভরসা করা যেতে পারে। আর ‘বেঙ্গল টকিজ’ অতনুদারই হাউস। ওঁর টেস্ট অফ সাবজেক্ট খুব ভালো। ভালো ভালো সাবজেক্ট আমাদের দেবেন। হ্যাঁ বললাম অতনুদাকে বিশ্বাস করে। তারপর লীনাদি আর শৈবালদার সঙ্গে আলাপ হল। সাঁঝবাতির গল্পটা এল, আমিও একাত্ম হলাম ছবিটার সঙ্গে, চাঁদুর সঙ্গে।

    আমি তোমারই মাটির কন্যা

    দ্য ওয়াল: সোহিনীদি, তুমি নিজেও এক জন সফল নাট্যকার। জাতীয় পুরস্কার পাওয়া অভিনেত্রী। তোমার সেরা কাজগুলো বাংলার বিখ্যাত পরিচালিকাদের সঙ্গে। অপর্ণা সেন, নন্দিতা রায়, লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাজ করেছো তুমি। তোমার কী মনে হয়, মহিলারাই এখন ভাল বাংলা ছবি বেশি করছেন?

    সোহিনী: আমার মনে হয় মহিলারা সব বিষয়েই সব সময়েই এগিয়ে। কালকেই এক জন সাংবাদিক আমায় জিজ্ঞেস করছিল, “মহিলা অভিনেত্রী এখানে কেন লিড রোল পায় না?” আমি বলেছিলাম “তোমাদের সঙ্গে বাজি লাগিয়ে বলতে পারি, দশটা মহিলাকেন্দ্রিক ছবি বানাও আর দশটা নায়কসর্বস্ব ছবি বানাও। দেখো কোনটা বেশী সমাদৃত হয়! আমাদের বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে ভাল মহিলা অভিনেত্রী যত জন আছেন, অত কিন্তু ভাল পুরুষ অভিনেতা নেই। আর তিন পরিচালিকার কথা যদি বলো, প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদা আলাদা অভিজ্ঞতা। লীনাদির সঙ্গে আমার কিছু বছর আগেই কাজ করার কথা হয়েছিল টেলিভিশনে। আমি যেহেতু সরকারি চাকরি করি, তাই রোজ সময় দিতে পারিনি বলে করা হয়নি। কিন্তু লীনাদির লেখা ডায়ালগ দুরন্ত। নন্দিতা রায়েরও তাই। তবে নন্দিতাদির সঙ্গী শিবুর নামটাও বলতে হবে। ওঁর অভিনয়, লেখা– দুইই অসাধারন। আর রিনা মাসির কথা তো আমায় আলাদা করে বলতে হবে না। দেখো, যে কোনও অভিনেতা-অভিনেত্রীই ভাল ডায়ালগ বলতে চান। আমি নিজেও স্টেজে হোক বা পর্দায়, এমন চরিত্রে অভিনয় করতে ভালবাসি, যেখানে ডায়ালগ ভাল থাকবে।

    বয়স্ক একা মানুষদের কথা ভাবেন নেতা, এমপি দেব

    দ্য ওয়াল: ‘সাঁঝবাতি’ তো সত্যি ঘটনা অবলম্বনে তৈরি, তাই না?

    দেব: হ্যাঁ একদম তাই। বিধাননগরের বয়স্ক লোকদের গল্প। যারা বিধাননগর পুলিশের ‘সাঁঝবাতি’ সংস্থার সদস্য। এ ছবি সল্টলেকের অনেকগুলো মানুষের গল্প। তবে এই ছবিতে যে চরিত্রগুলো রয়েছে, যেমন: ছানা দাদু, দিদা, চাঁদু, ফুলি — এই সব চরিত্র কিন্তু সল্টলেকে শুধু নয়, এখন আমাদের শহরের ঘরেঘরে দেখতে পাবে। এটা এখনকার আর্থসামাজিক অবস্থার গল্প। প্রত্যেকটা বাবা-মায়ের গল্প, প্রত্যেকটা ছেলে-মেয়ের গল্প। ছেলেমেয়েকে পড়াশুনো শেখানোর পরে তারা বাইরে চলে যাচ্ছে কাজের সূত্রে। বাবা-মা এখানে একা হয়ে পড়ছেন। এই কারণের জন্য দু’তরফের কাউকেই দোষ দিতে পারবে না তুমি।

    সোহিনী: এটা আসলে আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে বাসা বাঁধা আরবান লোনলিনেসের গল্প। এ শহুরে একাকীত্ব আমাদের সকলকেই গ্রাস করেছে। বয়স্কদের আরও বেশি। সেই বয়স্ক মানুষগুলোর নিঃসঙ্গ জীবন, মৃত্যুভয়, একটু ভরসার আকুতি– সে সব কথাই বলতে চেয়েছে এই ছবি।

    দ্য ওয়াল: নচিকেতার একটা গান আছে ‘বৃদ্ধাশ্রম’। সেটা আপাত অর্থে শুনলে আমরা ভাবি সবই যেন ছেলেমেয়েদের দোষ। কিন্তু এই একা হওয়া মানুষগুলো তো বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে বন্ধুও খুঁজে পান। একদম একা বাড়িতে থাকার চেয়ে সেটা বেটার অপশন নয় কী?

    সোহিনী: (একটু কড়া গলায়) বাবা-মাকে দেখার জন্য ছেলেমেয়েদেরই দরকার। বন্ধুর নয়। তাই ছেলেমেয়েরা যাতে বয়স্ক বাবা-মাকে দেখে, সে জন্য আইন করা দরকার।

    দেব: দেখো শুভদীপ, এখন সময় অনেক এগিয়ে আছে। কিন্তু বৃদ্ধাশ্রম নিয়ে যে ধারণা, সেটা যেন এখনও মিথ হয়ে আছে। অথচ এখন বৃদ্ধাশ্রম কালচারটা কিন্তু আর একমুখী নয়, এটা একটা জটিল বিষয়।

    সোহিনী: হ্যাঁ হ্যাঁ এটাও ঠিক।

    দেব: আমি সাউথ সিটিতে থাকি। সেখানে কেউ যদি কোনও ফ্ল্যাটে একা থাকেন, তাঁর নম্বর নীচে সিকিউরিটিকে দেওয়াই থাকে। আমাদের কমপ্লেক্সে একটা সংস্থা আছে, কারও কোনও প্রয়োজনে সিকিউরিটি ফোন করে জানায়। এমনকি বয়স্ক লোক যাঁরা থাকেন, তাঁদের ছেলে হয়তো বিদেশ থেকে টাকাটা পাঠিয়ে দেন, কিন্তু রোজকার জিনিসপত্র কেনা থেকে আরও যা যা দরকার, সেসব ওই সংস্থা ব্যবস্থা করে দেয়। এমনটা যদি হয়, তাহলে নিজের বাড়ি ছেড়ে কেন বৃদ্ধাশ্রমে যাবে? রাজারহাটেও একটা কমপ্লেক্স আছে এরকম। ওখানে আবাসনের ভিতরে সব আছে। টুকটাক দরকারে চিকিৎসা পরিষেবাও। বয়স্কদের সন্ধ্যেবেলায় ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার জন্য সাহায্যকারী দেওয়া হয় সঙ্গে। যাঁরা, শয্যাশায়ী তাঁদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকে দেখভাল করার। কোথাও যেন মনে হয়, ছেলেমেয়েরা বাইরে চলে গেলে এই মানুষগুলোই তো আছে। যাঁদের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক নেই, তাঁরাই ভরসা হয়ে উঠছেন। সেখান থেকেই এই গল্পটা শুরু।

    সোহিনী: যাই বলো, তবু এটা ভীষন দুঃখের। যেদিকে সমাজ এগোচ্ছে, আমি ভাল বলতে পারি না।

    দেব: দেখো সোহিনীদি, এখন আমরা ছুটছি। এখনকার সবচেয়ে বড় একটা ইস্যু হল, ব্যস্ততা। বাবা-মায়েরা কি তাহলে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করাবেন না? বেশি পড়াশোনা করালেই বিদেশে চলে যাবে ছেলে, এই ভয়ে বাঁচবেন? সেটাও তো হয় না, তাই না? সেই জায়গা থেকে ছেলেমেয়েদের দোষ আমি দেব না। কিন্তু এটা আমি সোহিনীদির সঙ্গে একমত। যে ছেলেমেয়েরা পড়তে বা কাজের জন্য বাইরে গিয়ে বাবা-মায়েদের ভুলে যায়, যোগাযোগ পর্যন্ত রাখে না, সেটা আমি সমর্থন করি না। মেনে নিতে পারি না সেটা। একটা ফোন করে জিজ্ঞেস করাই যায়, মা তুমি খেয়েছো? উৎসবে-পার্বণে শুভেচ্ছা বিনিময় করা যায়। যারা বাবা মায়ের সঙ্গেই থাকেন, তাঁরাও সঙ্গীর সঙ্গে সিনেমা দেখতে যাওয়ার সময়ে বাবা-মাকে এক বার জিজ্ঞেস করতেই পারেন, ওঁরা যাবেন কিনা। যদি না-ও যান, তবু এই জিজ্ঞাসাটুকুই ছোট্ট একটা সুন্দর জেশ্চার। বাবা-মায়ের ভাল লাগবে। আর এটুকুতে সামান্য একটু ভালবাসা বা যত্ন ছাড়া আর কিছু খরচ করতে হয় না।
    সাঁঝবাতি এই কথাটাও বলছে। বলছে, বুড়ো হওযার পরে সকলেরই একটু ভালবাসা দরকার। এখন জিপিএস, ওয়াইফাই– সব আছে ঘরে-ঘরে। কিন্তু আমাদের মনের দূরত্ব অনেক বেড়ে গেছে।

    মুন্নির গল্প

    দ্য ওয়াল: সোহিনীদির চরিত্রটা ছবিতে কী ভাবে আসছে?

    সোহিনী: ছবির গল্পে বাড়িতে দু’জন বহিরাগত আছেন, যাঁরা এই বাড়িতে যাতায়াত করেন। এক জন ছানা দাদু অর্থাৎ সৌমিত্রকাকু, আর এক জন মুন্নি অর্থাৎ আমি। মুন্নির প্রথম যৌবনে এই বাড়ির এক ছেলের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার কথা পাকা ছিল। কিন্তু এখন ছেলেটি বেঁচে নেই। তবু মুন্নি আজও সম্পর্কটা রেখে গেছে বাড়ির সঙ্গে। লিলিমাসি যে চরিত্রটা করছে, তাঁর সঙ্গেই মুন্নির যোগাযোগ। মুন্নিও একা। সে আর বিয়ে করেনি। সে ভাবে, এই বাড়ির বৌ হওয়ার কথা ছিল তার। সেই ভাবনা থেকেই একটা কর্তব্যবোধ থেকে গেছে, ভালবাসা তো বটেই। ইন্টারেস্টিং চরিত্র।

    ‘দেবের কোনও রোয়াব নেই’

    দ্য ওয়াল: দেব, তুমি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে এই প্রথম কাজ করলে। একসঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করলে। তুমি সোশ্যাল সাইটে লিখেছিলে, তোমার অভিনয় জীবনের এই তেরো বছরে এটা একটা স্বপ্নপূরণ। কেমন অভিজ্ঞতা হল, লিভিং লেজেন্ডের সঙ্গে কাজ করে?

    দেব: ব্রিলিয়ান্ট এক্সপিরিয়েন্স। একজন ৮৫ বছরের ভদ্রলোকের যা এনার্জি, কাজের প্রতি ভালবাসা, ভাবা যায় না। ওঁর তো আর কারও কাছে কিছু প্রমাণ করার দরকার নেই। কিন্তু ওঁর কাজের তাগিদ, ডেডিকেশান, সময়ানুবর্তিতা– সেটা শেখার মতো এখনও। উনি এই বয়সে যে কাজ করছেন সেটাই তো ডেডিকেশান। উনি এখনও থিয়েটার করেন শুধু প্যাশনের জোরে। আমি প্রতি মুহূর্তে শিখেছি। সবচেয়ে বড় কথা, শ্যুটিং করতে গিয়ে যখন রিটেক হয় বারবার, তখনও কোনও রাগ বা বিরক্তি নেই।

    সোহিনী: দম্ভ বলে কিছু নেই ওঁর।

    দেব:  মানুষ যে ওঁকে এখনও ভালবাসছে এত, তার কিছু তো কারণ আছে। এই গুণগুলোই সেই কারণ। আমরা ওঁর অভিনয় তো দেখে বড় হয়েছি। কিন্তু শুধু অভিনয় নয়, ওঁর জীবনদর্শন থেকে একটু শিখতে পারলেও বেশ সমৃদ্ধ হওয়া যায়।

    সোহিনী: এবং দেব আর সৌমিত্র কাকাকে একসঙ্গে এই ছবিতে কাজ করতে দেখে আমার মনে হয়েছে, উনি আদতেই অতুলনীয়। কারণ দেখো, দেব তো সৌমিত্র কাকার কাছে অনেক অনেক জুনিয়র? কিন্তু দেব যতই ছোট হোক, উনি এত ভালবেসে দেবের সঙ্গে কথা বলছিলেন, যেন মনে হচ্ছিল দেবের তারুণ্যটাই ওঁকে অনুপ্রাণিত করছে! দেব এমনিতেই যখন সেটে থাকে সবাই খুব ফুর্তিতে থাকে। দেব খুব খুনসুটি করে, মজা করে। সৌমিত্র কাকাও সেটা উপভোগ করেছেন। সৌমিত্র কাকা এক দিন আমায় বলছিলেন, “দেব কি ভাল ছেলে না? কোনও রোয়াব নেই ওর।”

    উত্তমকুমারের গল্প বলেন দেব!

    দ্য ওয়াল: সৌমিত্র চ্যাটার্জ্জীর সঙ্গে শ্যুটিংয়ের কোনও গল্প আছে, শট দেওয়ার ফাঁকে?

    দেব: হুম, প্রচুর। ওঁর ক্রিকেট নিয়ে ভালোবাসা, নবাব পতৌদি নিয়ে তখন কী হয়েছিল, উত্তমকুমার তখন ওঁর সময়ে– সেই গল্পগুলো করতাম। উত্তম-সৌমিত্রর মধ্যে রাগারাগি, মান-অভিমান ছিল কিনা, দাদা-ভাই সম্পর্ক কতটা… সব। আর আমি খুব মজা করেই কথা বলি। ওঁকে বলেছি “কটা গার্লফ্রেন্ড ছিল তোমার সত্যি করে বলো তো!” সৌমিত্রদা বলেন “তখন তো দাদা মহানায়ক, তাই বেশি ছবি করত পেত।” আমি বললাম “তোমার অভিমান হতো না? তোমার মনে হতো না, ‘নায়ক’টা তুমি যদি করতে?” সৌমিত্রদা এই বয়সেও খুব ডিপ্লোম্যাটিক। খুব সুন্দর গুছিয়ে উত্তর দেন। সৌমিত্রদা বললেন “না রে, তা নয়। ঝগড়া হতো, রাগ হতো আমাদের মধ্যে। কিন্তু সে সবই শুধু ওই দিনের জন্য। পরের দিনই আবার ফোনে কথা হতো। স্টুডিওতে দেখা হলেই যে কে সেই। আমাকে (সৌমিত্র চ্যাটার্জ্জী) বাড়ি থেকেও দাদা (উত্তম কুমার) গাড়িতে তুলে নিত। আবার আমার গাড়ি নিয়েও গেছি। তখন তো আমাদের দুটো ঠেক ছিল। একটা হতো গ্র্যান্ডে, আর একটা হতো এয়ারপোর্টের কাছে।

    দ্য ওয়াল: অনেক গল্প তো!

    দেব: তবে এই গল্পটা শোনো। সৌমিত্রদা বলছেন, “তখন আমি নিজে গাড়ি চালাতাম। আর উত্তমদার কাছে তখন ড্রাইভার আছে। ফেরার সময়ে উত্তমদা বলছে, ‘আমার গাড়িতে ওঠ। তোকে ড্রাইভ করতে হবে না। ড্রিঙ্ক করে গাড়ি চালাস না।’ এবার আমার ইগোতে লেগেছে, ‘উত্তমদা তুমি আমায় মাতাল বলছো! আমি ঠিক যেতে পারব।’ তার পরে সৌমিত্রদা গাড়ি ড্রাইভ করে বাড়ি এলেন। নেমে দেখছেন, পেছনে উত্তমকুমারের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে ওঁর বাড়ির সামনে। মানে উত্তমকুমার ফলো করতে করতে এসছেন পুরো রাস্তা। তখন আমি দাদাকে বললাম “তুমি এত দূর এলে! এবার বুঝলে তো আমি মাতাল নই গাড়ি ঠিকঠাক চালাতে পারি।”

    এই সব তখন সত্যি ছিল, সৌমিত্রদাই বলেছেন। মান-অভিমান হয়েছে আবার এভাবে কেয়ারিং করা দাদা যেন আমার অভিভাবক। সৌমিত্রদার শ্যুটিং শেষ হয়ে গেছে তাড়াতাড়ি উত্তম কুমার বললেন “এই চলে যাচ্ছিস কেন? আমার রাত আটটায় প্যাক আপ আছে। তার পরে একসঙ্গে আড্ডায় বসব। সকালে উত্তমকুমার শরীর চর্চা করতেন, সৌমিত্রদাকেও বলতেন করতে। এই ব্যাপারগুলো তো এখন আমাদের মধ্যে নেই।

    সোহিনী: সেটাই যে কোনো শিক্ষিত মার্জিত ভদ্রলোকদের মধ্যে মতবিরোধ বা মতান্তর হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু মনান্তর নয়। আফটার অল আমরা তো এক কাজ করছি। এখন যেন ঝগড়া হলে ঝগড়াই হয়ে গেল। এটা তো ঠিক না। আর আমি তো আগেও সৌমিত্র কাকার সঙ্গে কাজ করেছি। সৌমিত্র কাকার সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা থিয়েটারতুতো। ‘পারমিতার একদিন’, ‘পোস্ত’তেও ওঁর সঙ্গে কাজ করেছি। যতই শ্যুটিংয়ে থাকি ঠিক তিনটে বাজলে আমাদের বেরোতেই হয়। শো থাকে থিয়েটারের। তো আমি শ্যুটিংয়ে পরিচালককে বলতে পারতাম না ভয়ে। আর আমার প্রচণ্ড টেনশন হতো, গিয়ে শো-টা ধরতে পারব কিনা। সৌমিত্র কাকুর থেকে শিখেছিলাম ঠিক তিনটে বাজল, মুখের মেক-আপ তুলতে চলে গেল। এইটা খুব সাহস দিয়েছে আমাকে। আমি বলেছিলাম ‘তুমি এটা কী করে করো?’ তখন বলেছিলেন, ‘তুই যদি চাস বেরোতে, ঠিক পারবি।’

    লিলিদি মায়ের মতোই ভাল

    দ্য ওয়াল: লিলি চক্রবর্তীর সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ারের অভিজ্ঞতাও একটু বলো।

    দেব: লিলিদি! লিলিদির কথা আমায় জিজ্ঞেস করো। ভদ্রমহিলা নিজের জীবনটাতে কী আনন্দ করে যে বাঁচেন, তা বলে বোঝানো যাবেনা। উনিও আশির কাছাকাছি। একাই থাকেন। তবু কী প্রাণবন্ত! এই বয়সেও কী মজা করতে পারেন! আমিও একদম গম্ভীর থাকতে পারি না। গম্ভীর থাকলে আমার দমবন্ধ লাগে। লিলিদিকে সে জন্যই আরও বেশি করে ভাল লেগেছে আমার।

    সোহিনী: ভাগ্যিস! আমি তো প্রথম দিন কথাই বলতে পারছিলাম না সেটে। এই রে, এ তো দেব! সুপারস্টার! কী কথা বলব ওর সঙ্গে? দেখলাম ও একদম অন্য রকম ছেলে। খুব আরাম লাগে তখন। যাক বাবা!

    দেব: আর সেটা অভিনয় করতেও সুবিধা করে। এটা আমার প্রথম ছবি, যেখানে বয়স্ক বয়স্ক এত সিনিয়র অ্যাক্টররা আছেন। আমি দেব সেটাই দেখাতে ভয় করেছে আমার। ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়াটা তো সবচেয়ে সোজা। মাঠভর্তি লোক থাকলে তুমিও শিখবে, গোল দিতে মজাও পাবে। এত তাবড় অভিনেতাদের গোল দেব বলতে চাইছি না তাই বলে। বলছি, নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করা যায়। লিলিদি খাওয়াতে খুব ভালোবাসে। আজকাল আমরা প্রমিস করি, কিন্তু তার পরে আর সেটা রাখি না। শ্যুটিংয়ে এক দিন আমরা মিষ্টি খাচ্ছিলাম। লিলিদি বলল “মিষ্টি খেতে এত ভালবাসিস দেব? আমার পাড়ায় একটা ভাল মিষ্টির দোকান আছে, তোকে খাওয়াব।” তার পরের দিন আমার জন্য চার-পাঁচ রকমের মিষ্টি প্যাক করে নিয়ে এসছিলেন লিলিদি। এই বয়সেও। সেদিন আবার আমার কলটাইমটা একটু দেরিতে ছিল। তাই বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন সেট থেকে! আমার তো এতগুলো ছবি হয়ে গেছে। কিন্তু কেউ যদি আউট অফ দ্য বক্স কিছু করে, সেটা আমার মনেও থাকে। আর লিলিদির মতো এক জন লেজেন্ডারি শিল্পীর ভালবাসা পাওয়ার কথা কী করে ভুলব! লিলিদি মায়ের মতোই ভালো। লিলিদি ভেরি লাভলি। তারপর লিলিদিকে গিয়ে ধন্যবাদ দিলাম। এটাই হল সম্পর্ক। এই যে সম্পর্ক, ভাল রাখা, ভালবাসা– সেটা এই ছবিটাতে তুমি দেখতে পাবে। প্রত্যেকের কেমিস্ট্রি খুব ভালো। ফ্রি না হলে তুমি এসব অভিনয় করতে পারবে না, শুধু ডায়লগই বলবে। আর আমাদের গাইড করেছেন পরিচালকরা। লীনাদি এবং শৈবালদা।

    দ্য ওয়াল: তোমাদের ওয়ার্কশপ হয়েছিল ছবির আগে?

    দেব: আমার আর পাওলির হয়েছিল।

    সোহিনী: ও, তাই নাকি।

    দেব: তোমাদের ওয়ার্কশপ করালে তো ইনসাল্ট হয়ে যাবে! তোমরা বলবে “তুমি আমার শপে এসো, ওয়ার্ক দেখাব।” (হো হো করে হাসি)

    সোহিনী: (খুব হেসে) না রে, আমি স্টেজে অনেক ফ্রি। স্ক্রিনে নই। ক্যামেরা দেখলে ভয় পাই।

    দেব: সোহিনীদি ক্যামেরা তোমাকে দেখে ভয় পায়। তোমাকে কিছু শিখতে হবে না। আমাদের এই অফস্ক্রিন কেমিস্ট্রি অনস্ক্রিন ছবিতেও দেখতে পাবে। আমার তো এই ‘সাঁঝবাতি’ ছবিটা ছেড়ে দেওয়া উচিত মনে হয়েছিল একটা সময়ে। কারণ আমার নিজেকে অযোগ্য মনে হয়েছিল। আমার আশপাশের সকলে অতিরিক্ত ভাল।

    সোহিনী: আমি দেবের হয়ে একটা খুব অনেস্ট কথা বলছি। ওর দিদি হয়েই বলছি। দেবের অভিনয়ে একশো ভাগ সততা আছে। অভিনয় মানে তুমি কতটা ইমোশানালি ইন্টেলিজেন্ট। ওঁর সেই চোখ বা মনটা খুব ঝকঝকে। মানুষটাকে বোঝা যায়। আমি ওঁর বাণিজ্যিক ছবি বেশি দেখেছি, কিন্তু এখানে দেব একদম আলাদা।

    একদিন দল বেঁধে ক’জনে মিলে…

    দ্য ওয়াল: আউটডোরে তোমাদের কোনও মজার অভিজ্ঞতা?

    দেব: হ্যাঁ, ব্যাপক মজা। আউটডোরে গিয়ে তো একটা হোটেল পড়তে পড়তে বেঁচে গেল। সোহিনী সেনগুপ্ত খেতে গেছিল ওখানে। হা হা হা…

    সোহিনী: হা হা হা। আর ওখানে একটা উঁচু পাহাড়ে ওঠার সিন ছিল। সে তো আমার অবস্থা বুঝতেই পারছো। দেব আর শৈবালদা খুব মজা নিচ্ছিল। ওরা লম্বা লম্বা পা ফেলে নামছে আর উঠছে।

    দেব: আমাদের ছবির গানের পিকনিক মুডটা খুব ভাল ধরা হয়েছে ওখানে। আর যেহেতু আমরা প্রায় পুরো ছবিটার শেষের দিকে আউটডোরে গেছি, লিলিদিও সঙ্গে ছিল, তো আমাদের বন্ডিং খুব ভাল হয়। পিকনিক মুড পুরো। লোকেশনগুলো খুব সুন্দর।

    লীনা: ছবিটা যে খুব ইন্টেলেকচুয়াল স্টোরি, তা নয়। শট টেকিংয়ের যে সাংঘাতিক কৌশল আছে, তা নয়। খুব সিম্পল শট টেকিং। যাতে মানুষ দেখলে রিলেট করতে পারে। প্রতিদিনের জীবনের ঘটনা তুলে ধরেছি আমরা। এত সহজ অভিনয় করা খুব কঠিন। এটা আমাদের পাওনা। শুধু দেব বা পাওলি বা সোহিনী, এরকম করে বলব না। প্রত্যেকটা লোকই তাঁদের বেস্টটা দিতে চেয়েছে।

    দ্য ওয়াল: আপনার চিত্রনাট্যেরও তো কৃতিত্ব রয়েছে।

    লীনা: সেটা তো ওরা বলছে। আমি আমারটা বললাম। প্রত্যেকের অভিনয় এ ছবির সম্পদ। পাওলি একদম অন্য লুকে, দারুণ কাজ করেছে। আগে পাওলি দামকে কেউ এভাবে দেখেনি। দেবকে নিয়ে তো বারবার বলছি। আর সোহিনী চিরকালের ভাল অভিনেত্রী। ওকে নিয়ে আলাদা করে কিছু বলাটাই আমার স্পর্ধা। আর সৌমিত্রবাবু ও লিলিদিকে নিয়ে আমার কোনও কথা বলার অধিকারই নেই। আরও অনেকে আছেন ছবিতে, ছবিটা দেখলে তাঁদের দেখতে পাবে।

    চাঁদুর বিসর্জন নাচ, দেবের নয়

    দ্য ওয়াল: ঢাকের তালে কোমর দোলের পরে এবার ফের বিসর্জন গানে দেবের নাচ আসছে, তাই না?

    দেব: গানটায় খুব সাধারণ ছেলেপিলে পাড়ার বিসর্জনে নাচছে। তারা কেউ হিরোর মতো নয়। আমি অন্য আরও কিছু সিনেমায় কয়েকটা পুজোর নাচ নেচেছি। কিন্তু এটা নতুন রকম। এই পুজোর গানের টিউনটা খুব হিট। লীনাদি শৈবালদা এফেক্ট এখানে। শানের গাওয়া। আমিও চাইনি আগের ছবি গুলোর মতো এখানে আলাদা করে দেব হিসেবে আমার কোনও অংশ দেখা যাক। যেন চাঁদুই নাচছে। পুরোটাই চাঁদু-ফুলি। খুব সাধারন ছেলে ভাসান ড্যান্স নাচে যেমন। খুব নাচের স্কিল জানা দেব নাচছে না। দেবটাকে ঢাকতে চেষ্টা করেছি।

    দেখুন ভিডিও।

    সোহিনী-সপ্তর্ষি: আমরা দুজন চলতি হাওয়ার পন্থী

    সোহিনী: এখানে একটা মজার গল্প আছে। এখানে অভিনয় করেছে সপ্তর্ষি (মৌলিক)। যে আবার রিয়্যাল লাইফে আমার হাজবেন্ড। সপ্তর্ষি একদম নাচতে পারে না। ও যখন ‘নান্দীকার’-এ আসে, আমরা বলতাম তুই ভূতের নাচ কর। মিউজিক চালিয়ে ফাটিয়ে নাচে এমনিতে, কিন্তু নাচের আলাদা কোনও স্কিল নেই ওর। কিন্তু ওর এমনই ভাগ্য, যে প্রথম ছবিতে ও নেচেছে জিতের সঙ্গে। আর এই ছবিতে আবার দেবের সঙ্গে। প্রথম যেদিন এই ডান্সশ্যুট ছিল, ও ভগবানকে ডেকে বলছে: “আমি যেন না ধ্যাড়াই। দেবদা নাচবে পাশে।” তার পর শ্যুটিং শেষ হলে ওর সে কী আনন্দ!

    দ্য ওয়াল: সোহিনীদি, তুমি আর সপ্তর্ষি তো স্বামী স্ত্রী। ‘সাঁঝবাতি’ ছবিতে এই প্রথম দু’জনে একসঙ্গে অভিনয় করেছো। কেমন অভিজ্ঞতা?

    সোহিনী: বিয়ের পর থেকেই আমাদের রিলেশনশিপটা বাড়িতে স্বামী-স্ত্রীর। কিন্তু বাইরে একদমই সেরকম নয়, বরং বন্ধু। স্টেজে উঠলে আমরা মোটেই স্বাম-স্ত্রী নয়।

    দেব: মনেই হয় না ওঁরা স্বামী-স্ত্রী। আমি প্রথম যে দিন জানলাম ওঁরা বর-বৌ, আমি তো হাঁ। কথাই নেই দু’জনের, দু’জনে দু’দিকে! আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, ডির্ভোস-ফির্ভোস হচ্ছে নাকি দু’জনের। ভাবো!

    সোহিনী: না, ওসব বর-ফর জানি না। সপ্তর্ষি আমার বেস্টফ্রেন্ড।

    দেবের নিজের অভিনয় নিয়ে আত্মবিশ্লেষণ

    দ্য ওয়াল: দেব আগে ছিল পুরোপুরি বাণিজ্যিক ছবির অভিনেতা। কিন্তু দেব মানে এখন নতুন চমক। দেবের ছবি আসছে মানে বাংলা ছবিতে নতুন এক্সপেরিমেন্ট। কেমন লাগে তোমার?

    দেব: আগে কেউ বিশ্বাস করত না যে আমিও পারি অফবিট ছবি করতে। এখন সেই বিশ্বাসটা আমি নিজে পাচ্ছি।

    দ্য ওয়াল: তুমি বুনো হাঁস করেছো। ওটাও অন্য রকম।

    দেব: হ্যাঁ, করেছি তো। তার আগে রাজ চক্রবর্তীর ‘লে ছক্কা’ করেছি। সেটাও মানুষ নিয়েছে। তার পরে ‘দুই পৃথিবী’র মতো একটা ছবি করেছি। আমায় জিতের রোলটা দেওয়া হয়েছিল আগে। কিন্তু আমি দেখলাম, সব ছবিতেই সেই হিরো হচ্ছি। একটু অন্যটা করেই দেখি না! সেটাই করলাম। অন্য রকম। আমার মনে হতো, পরের ছবিটায় তো আবার সুইৎজারল্যান্ডে নাচ-গান করব। আমি তো কারও রোল কেড়ে নিইনি কিংবা আমি রাস্তায় চিৎকার করলেও কেউ আমায় নেবে না। এখন যেমন প্রযোজক বা পরিচালকরা নতুন কিছুতে আমায় ভরসা করছেন। আমার প্রোডাকশন হাউস এই কারণেই করা। অন্য ধারার ছবিতে নিজে কাজ করব বলে। ‘চ্যাম্প’ বলো বা ‘কবীর’ বলো– এগুলো তারই ফসল। আমার হবুচন্দ্র রাজাও রিলিজ হবে খুব তাড়াতাড়ি। বাচ্চাদের ভালো লাগবে। ‘টনিক’ যেটা করছি সেটাও বয়স্ক লোকদের নিয়ে গল্প। নতুনধারার ছবি। ‘গোলোন্দাজ’ বাচ্চা-বড় সকলের ভাল লাগবে। পুজোতেও আর একটা ছবি আসছে বাচ্চা-বড় সকলকে নিয়ে।

    প্রথম দিনও যে চেষ্টাটা আমার ছিল, সেটা এখনও আছে। মরে যায়নি বা হেরে যায়নি। কিন্তু আমার কি ভয় লাগেনি ঝুঁকি নিতে? এই যে এত বড় বড় অভিনেতাদের সঙ্গে ‘সাঁঝবাতি’ করলাম, আমি জানি এটা আমার কমফোর্ট জোন নয়। ভুল করলে আমি অনেকটাই পিছিয়ে যাব। কিন্তু তবু করলাম। কারণ আমার ইচ্ছে ছিল, চেষ্টা ছিল। তা না থাকলে আমি ‘জুলফিকার’ করতাম না। জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল জুলফিকার। আমার রোলটায় কোনও ডায়ালগ নেই, আমি বোবা। এক জন অভিনেতার অস্ত্র তাঁর ডায়লগ, তাঁর পজ়, তাঁর ভয়েস টোন। জুলফিকারে আমার আশপাশে বুম্বাদা, কৌশিক সেন, যীশু, রুদ্র– এঁরা সব ছিলেন। তবু করেছি, নতুন কিছু করব বলেই।

    রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত ‘পাগলু’ ডান্সের ভক্ত

    দ্য ওয়াল: দেব তো এখন সক্কলের কত প্রিয়। মেয়েদের হার্টথ্রব। ছোটদের মুখে মুখে দেবের ডায়ালগ ঘোরে। কিন্তু একটু প্রাচীনপন্থী বয়স্ক বহু মানুষই দেবের নাম শুনে খুশি হন না। ‘সাঁঝবাতি’ ছবি দিয়ে দেব কি তাঁধের আপন করে নেবে?

    দেব: অভিনেতা মানে কী? আমি বিশ্বাস করি, যখন তোমায় আট থেকে আশি সবাই ভালোবাসবে, তখনই তুমি ভাল অভিনেতা। প্রত্যেকটা বয়সের মানুষ যেন তোমায় ভালোবাসে। আগে তো কেউ বিশ্বাসই করত না যে চাঁদুর মতো চরিত্র আমি করতে পারি। কিন্তু আমি কি পারতাম না তখন? এখন হয়তো একটু ভালো পারছি, তখন হয়তো একটু কম পারতাম। কিন্তু বিশ্বাসটাই আসল। এ বিশ্বাস আমার আছে। ভালবাসাও আমি অর্জন করে নেব।

    সোহিনী: তুমি বয়স্কদের কথা বলছো, কিন্তু আমার বাবা (রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত) পাগলু ডান্স দেখে প্রচণ্ড আনন্দ পায়। দেব যখন নাচে, আমার বাবা মন দিয়ে চোখ বড় বড় করে দেখে টিভিতে। আমাদের বলে “দেখেছিস, ছেলেটা কী দারুন নাচছে।” বাবা তো প্রায়ই দেখে পাগলু। আসলে আজকাল একটা মেকি ইন্টেলেকচুয়াল শো অফ করাটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    দেব মানেই কি তাহলে এবার নতুন কিছু

    দেব: একই ধরনের ছবি করে গেলে কি সেগুলো পরে মানুষের মনে থাকবে? আমি তো বলতে পারব, অন্তত চেষ্টা করেছি। তাই বলে মেনস্ট্রিম ছবিকে ছোট করছি না। আমার এই বছরই ‘কিডন্যাপ’ আছে, ‘পাসওয়ার্ড’ আছে, ‘সাঁঝবাতি’ আছে। পরের বছর আমি দেখতে পাচ্ছি দুটো ছবি, ‘টনিক’ আর ‘গোলোন্দাজ’।
    দেবের কথা শুনতে শুনতে মাঝে লীনা গঙ্গোপাধ্যায় বলে ফেললেন, “বাবাহ্! এত সুইট করে সেজেছো কেন তুমি চুলটা সামনে ফেলে?”

    দেব: আমি কিছু করিনি গো। যেই জানলাম ভিডিও নেই, শুধু আড্ডার ছলে সাক্ষাৎকার, তাই এমনিই চলে এলাম।

    লীনা: অপূর্ব লাগছে। এই লুকটা পছন্দ হয়ে গেল আমার।

    দেব: নিচ্ছো তাহলে পরের ছবিতে?

    লীনা: একদম।

    সত্যিই আড্ডা। এত খোলামনে পরিচালক আর নায়ক যখন ধরা দেন, তখন কথার পরিধিও বাড়তেই থাকে।

    দ্য ওয়াল: নতুন পরিচালকদেরও তো সামনে আনছো তুমি, তাই না?

    দেব: নতুনদের না আনলে আমরা নতুন নতুন জিনিস জানব কী করে? আমি আগেও নতুনদের সঙ্গে কাজ করেছি। রাজের প্রথম দিকের ছবি করেছি, সুজিত মণ্ডল, রাজা চন্দ, রাজীব। এমনকি সুজিত গুহ একসময়কার সুপারহিট পরিচালক, পরে তাঁকে নিচ্ছিল না দর্শক। তখন সুজিতদা আমার সঙ্গে ‘মন মানে না’ করল। স্বপন সাহা কিন্তু তখন আরেকটা বিগ নেম। তখন তিনি আমার সঙ্গে কাজ করতে চাননি। বলেছিলেন “নতুন ছেলের সঙ্গে কাজ করব না।” তখন উনি জিতের সঙ্গে কাজ করছেন। তখন আমি নতুন, কী বলব। আর আজ দেখো, ভাগ্যে যা আছে তাই হল। সঙ্গে অবশ্যই পরিশ্রম।

    বড়দিনের কেক, দেবের জন্মদিন, উপহার

    দ্য ওয়াল: সব শেষে তিন জনকে একই প্রশ্ন। তোমাদের বড়দিনের গিফট ‘সাঁঝবাতি’ নিয়ে দর্শকদের কী বলতে চাও?

    দেব: শুধু সাঁঝবাতি নয়, ২৫ ডিসেম্বর আমার জন্মদিন। আমায় প্রচুর গিফট পাঠাও। হা হা হা।

    লীনা: দেব সকলেরই খুব আদরের ছেলে। একটা মজার কথা বলি, সাউথসিটিতে আমি আর দেব পাশাপাশি ব্লকে থাকি। তবে আগে আমি দেবকে ব্যক্তিগত ভাবে চিনতাম না। পরিচয় ছিল না আমাদের। তো কয়েক বার যখন ২৫ ডিসেম্বর রাতে বাড়ি ঢুকেছি, রাস্তার ওপরে দেখেছি অ্যাপার্টমেন্টের সামনে বিশাল করে সাজানো গেটে লেখা রয়েছে দেবের নাম। বিশাল বড় স্টার সে, তাই তাঁর ফ্যানেরাই করেছে। বেশ মজা লাগত। এই বছর সেই দেবের জন্মদিনে আমরাও যুক্ত হতে পেরেছি। এটাই বড় প্রাপ্তি। আর যে গিফ্টটা দেব চাইছে, সেটা ওকে দিতে চাইলে সকলে সাঁঝবাতি ছবিটা দেখুন। দেবের জন্মদিন এবং বড়দিন কেন্দ্র করে আমাদের তরফ থেকেও সকলের জন্য উপহার এই ছবি।

    সোহিনী: লীনাদি শৈবালদার সঙ্গে প্রথম কাজ। ভাল ছবি, ভালো ডায়ালগ, ভাল অভিনয়। সবাই কষ্ট করে কাজ করেছে, তাই সবাই যেন ছবিটা দেখে।

    দেব: খুব যত্ন করে ছবিটা বানানো। এ যত্ন প্রতিটা ফ্রেমে দেখতে পাবে তোমরা। আমার জন্য এই ছবিটা নতুন একটা অধ্যায়। নিজেকে নতুন করে ভাঙা। খুব সুন্দর একটা ছবি তখনই সার্থক হবে যখন দর্শক প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে সিনেমাটা দেখবে। সকলে প্রচুর আলোচনা করল অথচ দেখল না, তা করলে হবে না। ছবিটা দেখুন প্লিজ, দেখে কেমন লাগল ফেসবুকে লিখবেন। এখন তো সবাই রিভিউ লেখে ফেসবুকে। রাতে এসে ফেসবুক খুলেই বুঝতে পারি, ছবি ভাল না খারাপ। আপনারা দেখবেন ছবিটা। সৌমিত্রদা আর লিলিদির জন্যই না হয় দেখুন। ছবিটা দেখে হল থেকে বেরোনোর পরেও একটা ভাল লাগা কাজ করবে। এটুকু বলতে পারি।

    ‘সাঁঝবাতি’ টিমের তরফ থেকে সবাইকে বড়দিনের উপহার এই ছবি। দেখুন ট্রেলার।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More