বৃহস্পতিবার, জুন ২০

কৃষ্ট-সুরের খ্রিস্ট-কথায় সম্প্রীতির গান বাঁধছে শহরতলি

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

হাট বসেছে রবিবারে, নেপালগঞ্জে পথের ধারে।

চলছে কীর্তনের আসর। গ্রামের হাটের কীর্তনের পালা যেমন হয় আর কী। খোল, করতাল, ঢোল, ঝুমঝমি, হারমোনিয়াম। চার পাশে বসে দর্শক। গ্রাম্য সারল্যের ছাপ চোখেমুখে। মনকাড়া কীর্তনিয়া সুরে দুলছে মাথা। কিন্তু একটু কান পেতে সে গানের শব্দগুলো শুনলে চমকে উঠতে হয়। সে শব্দ বলছে খ্রিস্ট ধর্মের নানা বাণী, প্রভু যিশুর নামগান। বাংলার কীর্তনের মেঠো সুরে কী অবলীলায় বয়ে চলেছে ওল্ড টেস্টামেন্টসের বিভিন্ন অনূদিত শব্দেরা! নিমেষে ঘুচে যাচ্ছে প্যালেস্তাইন আর পশ্চিমবঙ্গের দূরত্ব। ধর্মের শিরায় শিরায় চারিয়ে যাচ্ছে সম্প্রীতির অমৃত।

গ্রামের পথে

প্রদীপ পতি, এই কীর্তন দলের উদ্যোক্তা। গুলে খেয়েছেন বৈষ্ণব পদাবলি। আত্মস্থ করেছেন ওল্ড টেস্টামেন্টস। উপলব্ধি করেছেন, সব ধর্মই শান্তির কথা বলে। বিবিধের মাঝে ঘটা মিলনই সব চেয়ে সুন্দর। আর এই উপলব্ধি সকলের মাঝে ছড়িয়ে দিতেই খ্রিস্ট-কীর্তনের আসরে মেতেছেন এবং মাতিয়েছেন প্রদীপ। বলছিলেন, “আমরা কাঁথির ডাকসাইটে বৈষ্ণব পরিবার ছিলাম। আমার বাবা কলকাতায় এসে ধর্মান্তরিত হন। তাই জন্ম সূত্রে আমিও খ্রিস্টান। কিন্তু নিজের আগ্রহেই ছোটবেলায় পড়েছিলাম বাড়িতে থাকা বৈষ্ণব পদাবলি। পরে যখন বাইবেল পড়লাম, দেখলাম একই শান্তির কথা লেখা। একই মানবপ্রেমের কথা লেখা। ভাষা হয়তো আলাদা, উপস্থাপনা আলাদা। কিন্তু বক্তব্য সেই একই। প্রেম, শান্তি, সহিষ্ণুতা।”

তাই প্রদীপ নতুন করে উপলব্ধি করলেন, কৃষ্টে আর খ্রিস্টে কোনও তফাত নাই রে ভাই….

দেখে নিন কয়েক ঝলক।

কবিয়াল অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির গলায় সেই কবেই রুপোলি পর্দায় এই গানকে শুনিয়ে দিয়েছেন পরিচালক সুনীল মুখার্জি। তার পরে পেরিয়ে গিয়েছে অর্ধ শতকেরও বেশি সময়। কিন্তু এখনও যে কোথাও, এ শহরেরই কোলঘেঁষা কোনও এক এলাকায় অভ্যাস হয়ে উঠেছে এই কবিগান, তা না শুনলে বিশ্বাস করা যায় না। গান তো গাওয়ার জন্য, কিন্তু কোনও গানের সারমর্ম যখন যাপনের অঙ্গ হয়ে ওঠে, তখন তা আর শুধু গান নয়, অভ্যাসই হয়ে ওঠে।

উঠোন পাশেই মাতা মেরির ছোট্ট মন্দির

মাটির বাড়ি, দরমার বেড়া, নিকোনো দাওয়া, লাগোয়া পুকুর, গুটিকয় হাঁস… যেমন হয় মফঃস্বল ঘেঁষা গ্রামের চেহারা। অথচ দূরত্ব, টালিগঞ্জ মেট্রো স্টেশন থেকে মোটে পনেরো-ষোলো কিলোমিটার। হরিদেবপুর পেরিয়ে, কবরডাঙা থেকে বাঁ দিকে ঘুরে, মিনিট দশেক এগোলেই নেপালগঞ্জ হাট। ফের ডান দিকে এগিয়ে পায়ে পায়ে ঢুকে পড়তে হবে মূল রাস্তা থেকে আড়াআড়ি বয়ে যাওয়া কোনও একটা মেঠো পথ ধরে। পৌঁছতে পারেন রামকান্তপুরে বা রাঘবনগরে। গ্রামের পথে পথে ঘুরতে পারেন আমবাগানে, পুকুরধারে, আলপথে, খোলা উঠোনে। দেখতে পাবেন, আর-পাঁচটা গ্রামের মতোই সে উঠোনে তুলসীবেদি রয়েছে। সেই সঙ্গেই আর-পাঁচটা গ্রামের থেকে আলাদা হয়ে, সে বেদির পাশে রয়েছে ছোট্ট মতো আরও একটা বাঁধানো বেদি। যাতে গাছ নেই, আছেন মাতা মেরী। যিশুকে কোলে নিয়ে। বেদির মাথায় গোঁজা ক্রস-চিহ্ন। দুই বেদিতেই পাশাপাশি জ্বলছে মোমবাতি, পুড়ছে ধূপকাঠি। সন্ধের মুখে প্রার্থনারা ঘন হয়ে উঠছে দুই বেদিতেই। বাংলা শব্দে-সুরে জড়ামড়ি করা প্রার্থনাদের এই সহাবস্থানে বুঝি অবাক হয় এখনকার এই ভীষণ অস্থির সময়টাও।

আছে কালী মন্দিরও

শুধু তা-ই নয়। স্থানীয় বাসিন্দা, গৃহবধূ মিনতি মাখাল বলছিলেন, বড় দিন এলেই ‘মাতা মেরির থানে’ জমতে থাকে শাড়ির রাশি। মিনতি পরিবার সূত্রে খ্রিস্ট ধর্ম পালন করেন, রোজ বিকেলে মোমবাতি জ্বালানোই হোক, আর সকালে আশপাশের গৃহবধূ সিক্তা, আল্পনাদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে যিশুর প্রার্থনাই হোক। তবে সকলেরই পরনে আটপৌরে শাড়ি, শাঁখা, সিঁদুর। মিনতিদের কথায়, “যিশু তো পোশাকে নেই, মনেই আছেন। সধবা মেয়েমানুষের হাতে তো শাঁখা থাকবেই। এ তো বাঙালিদের কালচার, অভ্যেস। অভ্যেসের জন্য ধর্ম বদলাতে না হলে, ধর্মের জন্য অভ্যেস বদলাব কেন?”

সহাবস্থান

ধ্রুব মাখাল থাকেন পাশেই। ধর্মে যদিও হিন্দু, তবু বুকে হাত ঠেকিয়ে বললেন, “ছেলের জ্বর হলে আমিও এসে মোমবাতি জ্বেলে দিয়ে যাই মাতা মেরির কাছে। মাকে বলি, ছেলেকে ভাল করে দাও।“ ঠিক যেমন বিপদে পড়লে পাশের গ্রাম রাঘবপুরের প্রাচীন কালীমন্দিরে গিয়ে মানত করার আগে কোনও রকম অসুবিধা বোধ করেন না খ্রিস্টান ধর্ম পালনকারী মহুয়া, বীরেশ্বররা। দুর্গাপুজোয় হৈ হৈ করে এলাকার মণ্ডপদর্শনেও ভাটা পড়ে না।

খ্রিস্ট-কীর্তন

প্রায় দেড় শতকের পুরনো কালীমন্দিরের নিত্য পূজারী কানাইলাল চক্রবর্তী। খোলা দাওয়ায় বসে স্মিত হেসে বলছিলেন, “মায়ের চোখে সকলে সমান—এ কথা তো শুধু বইয়ের বা মুখের নয়। এ কথা তো জীবনেরও। তাই মায়ের মন্দিরে পুজো দিতে গেলে ধর্মের পরিচয়টা একেবারেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। সে পরিচয় জানারও আলাদা করে চেষ্টা করি না।“ তাই তো গত বছর কালীপুজোর সময় দেখেছিলেন, মায়ের জন্য উৎসর্গ করা প্রসাদে ফলমূল, মিষ্টির পাশাপাশিই রয়েছে কেক, চকোলেট। “আমি জানি, মা সে দিন বড্ড খুশি হয়েছিলেন।“ – বললেন কানাইলালবাবু।

খুশি-মুখ

সমাজকর্মী মীরাতুন নাহার মনে করালেন, এই সম্প্রীতি বড় সুন্দর হলেও, তা কিন্তু বিচ্ছিন্ন উদাহরণ নয়। বললেন, “ছোট্টবেলা থেকে সব ধর্মের মানুষের পাশাপাশি বেঁচে থাকতে আর বাঁচিয়ে রাখতে দেখেই তো বড় হয়েছি। কোথা থেকে যেন ঢুকে পড়ল বিভাজনের ভূত!”

 শুনে নিন মীরাতুন নাহারের বক্তব্য।

Leave A Reply