বুধবার, জুন ১৯

বহু আরোহী, সময় কম! এভারেস্ট ছোঁয়ার পথে বাংলার পিয়ালি, রাত পোহালেই আসবে খবর

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

একসঙ্গে অনেক মানুষ খুব কম সময়ের মধ্যে সঙ্কীর্ণ কোনও পথ দিয়ে পৌঁছতে চাইছেন একটাই ছোট জায়গায়। না, সকলের পক্ষে একসঙ্গে পৌঁছনো সম্ভব নয়। স্বাভাবিক ভাবেই সঙ্কীর্ণ পথটা একে একে পেরোবেন। কেউ আগে, কেউ পরে, কেউ অনেকটা পরে।

ঠিক এমনটাই ঘটছে এ বছর, বিশ্বের উচ্চতম শৃঙ্গ এভারেস্টের চুড়োয় ওঠার সময়ে। পরিসংখ্যান বলছে, এ বছর আরোহণের ব্যস্ততম মরসুম প্রত্যক্ষ করছে এভারেস্ট। ৫০০-রও বেশি মানুষ এভারেস্ট অভিযানে পা বাড়িয়েছেন। একই সঙ্গে, এ বছরের উইন্ডো মাত্র চার দিনের।

পর্বতারোহণের পরিভাষায়, উইন্ডো মানে লাগাতার খারাপ আবহাওয়ার মাঝে যে সময়টুকু আকাশ পরিষ্কার থাকে। আবহাওয়া ভাল থাকে। সে সময়টুকুকেই আগে থেকে হিসেব করে আরোহীরা বেছে নেন শৃঙ্গে আরোহণের জন্য অর্থাৎ সামিটের তারিখ হিসেবে। সেই মতোই শুরু হয় অভিযান, এগোয় প্রতি দিনের আরোহণ।

২০ তারিখ, সোমবার এমনই উইন্ডোর প্রথম দিনে চুড়োয় পা রাখে মরসুমের প্রথম এভারেস্ট অভিযাত্রী দল। ওই দিনই তাঁদের পিছু পিছু ক্যাম্প থ্রি পৌঁছেছে দ্বিতীয় অভিযাত্রী দলটি। সব ঠিক থাকলে আজ, বুধবার ভোরেই এভারেস্ট সামিট করবেন তাঁরা। ওই দলেই রয়েছেন এ বছর বাংলার একমাত্র এভারেস্ট অভিযাত্রী, চন্দননগরের পিয়ালি বসাক।

পিয়ালি বসাক

মঙ্গলবার সন্ধেতেই সামিটের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন তিনি। তাঁর পরিকল্পনা, এভারেস্ট আরোহণ সফল হওয়ার পরে, সাউথ কলে নেমে, ফের লোৎসে শৃঙ্গে আরোহণ। পাশাপাশি দু’টি শৃঙ্গে একই সঙ্গে আরোহণের বিষয়টা শুনতে খুব ভাল লাগলেও, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া মানে এক রকম মৃত্যুর পরোয়ানা হাতে নেওয়া– এমনটাই মনে করছেন অভিজ্ঞ আরোহীরা।

মনে করা হচ্ছে, এভারেস্ট সামিট মার্চে যদি মঙ্গলবার বিকেল থেকে শুরু হয়, তা হলে বুধবার ভোরে শৃঙ্গ ছুঁয়ে খুব তাড়াতাড়ি নামার চেষ্টা করলেও অন্তত বেলা ১০টা-১১টা বাজবেই বলে জানাচ্ছেন তাঁরা। সেখান থেকে লোৎসে সামিট ক্যাম্প পৌঁছে যদি বুধবার রাতেই ফের লোৎসের উদ্দেশে সামিট মার্চ শুরু করেন, তা হলে সামিট করে ক্যাম্পে নেমে আসতে বৃহস্পতিবার দুপুর হয়ে যাবে। সে ক্ষেত্রে টানা দু’দিন ওই উচ্চতায় এতটা আরোহণ করার ধকল নেওয়া সমতলের মানুষদের পক্ষে এক রকম অসম্ভব।

অনেক বিদেশি অভিযাত্রী বা শেরপারা এমন ভাবে আরোহণ করেন। তবে তাঁদের শারীরিক সক্ষমতা, দক্ষতা, অনুশীলন, খাওয়াদাওয়া– সবই অনেক উন্নত। গড়পড়তা বাঙালি অভিযাত্রীদের ক্ষেত্রে সেটা মেনটেন করা খুব মুশকিল। তাই একটা আট হাজারি শৃঙ্গ আরোহণের পরে সাধারণ পর্বতারোহীরা ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তখন আরও একটা শৃঙ্গ আরোহণের ধকল না-ও নিতে পারে শরীর। স্বাভাবিক ভাবেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে এমন অবস্থায়।

শুধু তা-ই নয়, পিয়ালি জানিয়েছিলেন, তিনি গোটা অভিযানটাই করবেন সাপ্লিমেন্টারি অক্সিজেন ছাড়া। তবে এমন সিদ্ধান্তের পিছনে রয়েছে একটি নির্দিষ্ট কারণ।

গত বছর আট হাজার মিটারের শৃঙ্গ মানসলু অভিযানে গিয়েছিলেন পিয়ালি। সেই সময় পিয়ালির অক্সিজেন মাস্কে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় কোনও কারণে। সেটা পিয়ালি নিজে বুঝতে পারেনি। বুঝতে পারার কথাও নয়। আলাদা করে অক্সিজেন নেওয়ার অনুভূতি হয় না। তবে অক্সিজেন সাপ্লাই কমে গেলে শরীরে অবসন্নতা আসে।

তাই পিয়ালি স্বাভাবিক ভাবেই নিজে বুঝতে পারেনি অসুবিধা। এমনকী প্রথমে শেরপারাও বুঝতে পারেননি। কারণ পিয়ালির আচরণে বা চলাফেরায় কোনও ক্লান্তির ছাপ ছিল না। পরে যখন বোঝা গেল, তখন অক্সিজেন ছাড়াই তিনি বহু ক্ষণ কাটিয়ে দিয়েছে ওই উচ্চতায়। সেখান থেকেই অক্সিজেনের অতিরিক্ত সাপোর্ট ছাড়া এভারেস্ট অভিযানের কথা মাথায় আসে তাঁর। সফল হলে পিয়ালিই হবে অক্সিজেন ছাড়া এভারেস্ট আরোহণকারী প্রথম বাঙালি।

তবে অক্সিজেন ছাড়া আরোহণের পরিকল্পনা থাকলেও, অতিরিক্ত অক্সিজেন সঙ্গে রাখছেন পিয়ালি, দরকার পড়লেই তা ব্যবহার করবেন বলে জানিয়েছিলেন তিনি।

পিয়ালির সঙ্গে অন্য অভিযানে অংশ নেওয়া পর্বতারোহীরা বলছেন, পিয়ালির শারীরিক সক্ষমতা বেশ ভাল। চট করে হাঁপায় না। হাঁটার গতিও বেশ ভাল পাহাড়ে। শেরপারাও পিয়ালির আরোহণ দেখে বেশ সন্তুষ্ট বলেই জানিয়েছেন তাঁরা। তবে আট হাজার মিটার ওপরে কখন, কার সঙ্গে, কী ভাবে, কী সমস্যা ঘটে, তা অনেক সময়েই আন্দাজ করা যায় না। সেই ঝুঁকি নিয়েই অভিযানে বেরোন আরোহীরা।

তবে এই বছরে এভারেস্টের আবহাওয়া সাম্প্রতিক কয়েক বছরের মধ্যে বেশ কঠিন এবং খারাপ বলে জানা গিয়েছে কাঠমাণ্ডুর আবহাওয়া অফিস থেকে। বেশ জোরে হাওয়া চলছে। তুষারঝড়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এই সপ্তাহটাই মন্দের ভাল। তাই সোমবার, ২০ তারিখ থেকে শুরু হয়েছে আরোহণ। মঙ্গলবার, ২১ তারিখ এভারেস্ট ছুঁয়েছেন মোট ১২২ জন মানুষ। ২২ তারিখেই সব চেয়ে ভাল আবহাওয়ার পূর্বাভাস থাকায় ওই দিন সামিট ছোঁয়ার কথা ২৯৭ জনের। তাঁদেরই এক জন আমাদের পিয়ালি। ২৩ তারিখে ওঠার কথা ১৭২ জনের। ২৪ তারিখ রাখা আছে অল্টারনেট ডেট হিসেবে। এই তিন দিনে কারও পক্ষে সম্ভব না হলে তাঁরা চেষ্টা করবেন। ২৪-এর পরেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে উইন্ডো।

এভারেস্ট আরোহণ করা অভিযাত্রীরা বলছেন, এত জন একসঙ্গে আরোহণ করা সত্যিই খুব মুশকিল। কারণ চুড়োয় জায়গা খুবই কম। চুড়োয় ওঠার আগে যে হিলারি স্টেপ পেরোতে হয়, সেখানটাও বড্ড বেশি সরু। একসঙ্গে অনেক জন পার হওয়া যায় না। এক জন এক জন করে নামেন বা ওঠেন। রীতিমতো ‘ট্র্যাফিক জ্যাম’ হয়ে যায় সেখানে। আর সেই জ্যামই বড় সমস্যার কারণ হয়ে ওঠে।

এমনই হয় এভারেস্টে ট্র্যাফিক জ্যাম।

অভিজ্ঞরা বলছেন, অনেকটা সময় নিয়ে ওই উচ্চতায় দাঁড়িয়ে থাকা মানে, অনেকটা অক্সিজেন শেষ হয়ে যাওয়া। শরীরও ঠান্ডা হয়ে যায়, অত কম তাপমাত্রায় মুভমেন্ট না করলে। হাইপোথার্মিয়া (শরীরের ভিতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ শীতল হয়ে যাওয়া) শুরু হতে পারে। অবসন্নতা, ক্লান্তি ভর করে। পেশি শিথিল হয়ে যায়। এই ট্র্যাফিক জ্যামের কারণেই বহু পর্বতারোহীর মৃত্যু পর্যন্ত হয় বলে জানা গিয়েছে।

ইতিমধ্যেই জানা গিয়েছে, ২০ ও ২১ তারিখের অনেক সামিটের পরিকল্পনাই খারাপ আবহাওয়ার কারণে পিছোনো হয়েছে বাইশে। অর্থাৎ ওই দিন যত জন অভিযাত্রীর ওঠার কথা, আসলে উঠবেন তাঁর চেয়েও বেশি মানুষ। এই ভিড়ের মধ্যে পিয়ালি কোনও অসুবিধায় পড়বেন না তো! আশঙ্কা অনেকের মনেই। সেই সঙ্গে চিন্তা, সামিটে দেরি হলে নেমে এসে ফের লোৎসের উদ্দেশে বেরোনো মুশকিল হবে তাঁর পক্ষে।

তবে ভরসা দক্ষ শেরপারা, ভরসা পিয়ালির বিবেচনা। পরিস্থিতি বুঝে নিশ্চয় অভিযানের অভিমুখ পরিবর্তন করবেন তাঁরা প্রয়োজনে। আর যদি তেমন সমস্যা না হয়, যদি সব ঠিক থাকে, তা হলে হয়তো সকালেই খবর আসবে বিনা অক্সিজেনে এভারেস্ট ছোঁয়ার বিরল কৃতিত্বের মুকুট চড়েছে পিয়ালির মাথায়। হয়তো সেই মুকুটে লোৎসে আরোহণের পালকও গুঁজবে পিয়ালি। শুভ ইচ্ছেদের সঙ্গে করে অপেক্ষা ছাড়া আর কিছুই করার নেই।

আরও পড়ুন…

দীর্ঘতম ট্র্যাফিক জ্যাম! এভারেস্টের ৫০০ মিটার নীচে ব্যালকনি থেকে ফিরতে হল পিয়ালিকে, ফের চেষ্টা আজ

Comments are closed.