সোমবার, আগস্ট ২০

এভারেস্ট না হোক, এভারেস্ট বেসক্যাম্প তো থাকতেই পারে উইশলিস্টে!

রূপাঞ্জন গোস্বামী

ট্রেকারদের  স্বর্গ হিমালয়, আর হিমালয়ের সেরা ট্রেক হলো এভারেস্ট বেসক্যাম্প ট্রেক। সারা বিশ্বের ট্রেকাররা সংক্ষেপে বলেন ইবিসি। আকাশজুড়ে সুবিশাল তুষারমৌলি হিমালয়ের পটভূমিকায় অবিশ্বাস্য সৌন্দর্য ঠাসা অথচ গা ছমছমে ট্রেকরুট সারা পৃথিবীতে দুটি পাবেন না। সে আপনি যতই আল্পস, আন্দিজ, সাহারা,তাকলামাকান কিম্বা অ্যান্টার্কটিকায় ট্রেক করে আসুন না কেন।এই ট্রেকরুটটি তাই পৃথিবীর জনপ্রিয়তম ট্রেকরুট। হিমালয়ে অনেক কঠিন ট্রেকরুট আছে, যেমন কালিন্দী খাল ট্রেক, চাদর ট্রেক, অডেনস কল ট্রেক, ট্রান্স-জাঁস্কর ট্রেক। এগুলি তুলনা মূলকভাবে এভারেস্ট বেসক্যাম্প ট্রেকের চেয়ে অনেক কঠিন, কিন্তু এভারেস্ট হলো এভারেস্ট। পথের শেষে তার দেখামেলার অনুভূতি আর কোনো ট্রেকে নেই।চলুন ঘুরে আসি তাহলে।

প্রথম দিন – কাঠমাণ্ডু–(বিমান)–লুকলা –(ট্রেক)– ফাকদিং ( ২৬৫২ মিটার)

লুকলা তেনজিং-হিলারি এয়ারস্ট্রিপ

একটি ছোট্টো অথচ অনবদ্য বিমান সফর । অনেক নীচে ছবির মতো লাল-নীল গ্রাম। হলদে-সবুজ চৌখুপি কার্পেটের মতো কৃষিজমি। ঘনসবুজ অরণ্য আর রোদ ঠিকরোনো দুধসাদা হিমালয়ের ভুবনমোহন রূপ দেখতে দেখতে পৌঁছে যান লুকলার তেনজ়িং-হিলারী এয়ারস্ট্রিপ (২৮০০ মিটার)। আজকেই লুকলা থেকে তিন চার ঘণ্টার ট্রেক করে পৌঁছান ফাকদিং (২৬০০ মিটার)। বিশ্ববিখ্যাত ট্রেকরুটটি এগিয়ে চলবে মিষ্টি মিষ্টি শেরপা গ্রামগুলির মধ্যে দিয়ে। অবিস্মরণীয় সৌন্দর্য নিয়ে পথে দেখা দেবে দুধকোশি নদী আর উপত্যকার ল্যান্ডস্কেপ। ব্যাকড্রপে পাহাড়ের গায়ে সদ্য জমা বরফের আলপনা। রাতে থাকুন ফাকদিঙেই।

লুকলা থেকে ফাকদিঙের পথে

দ্বিতীয় দিন – ফাকদিং থেকে নামচেবাজার (ট্রেক)।
ছবির মতো বেশ কিছু গ্রামের মধ্যে দিয়ে তিন ঘন্টা ট্রেক করে জোরসালে গ্রামে এসে লাঞ্চ সারুন। পাঁচটি সাসপেনসন ব্রিজ পথে আপনাকে পেরোতে হবে।কাঁপন ধরানো গভীর গিরিখাত ও শৈলশিরা আপনার যাত্রাপথের সঙ্গী হবে। অবাক চোখে আপনাকে স্বাগত জানাবে কুসুম কাংগ্রু, থামসারকু এবং কুম্বিয়েলা শৃঙ্গের দল।

সাত ঘন্টা ট্রেক করে ফাকদিং থেকে পৌঁছন নামচেবাজার (৩৪৫০ মিটার)। উচ্চতা ও আবহাওয়ার সঙ্গে নিজের শরীরকে টিউন (অ্যাক্লাইম্যাটাইজ়েশন) করাতে আপনাকে এখানে দেড় দিন থাকতে হবে। কারণ আপনি পৃথিবীর সব চেয়ে বিখ্যাত ট্রেলে ট্রেক করছেন। শরীর খারাপ হলে জীবনের শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞতা হাতছাড়া হবে। যে পথে হাঁটছেন, কল্পনা করুন এই পথে হেঁটে গেছেন পৃথিবীর সেরা পর্বতারোহী ম্যালোরি, আরভিন, হিলারী, তেনজিং, মেসনাররা । আপনার মতো রুকস্যাক পিঠে নিয়েই। শিহরন লাগবে এমন মনে করলেই। ট্রেকের আনন্দ নিতে নিতে হাঁটতে হবে। যতই আপনার শরীর শক্তপোক্ত মনে করুন, মনে রাখবেন হিমালয় আপনার চেয়ে সহস্র কোটি গুণ শক্তি ধরে। তাই নিজের ক্ষমতা অতিক্রম না করাই ভাল।

নামচে বাজার

● তৃতীয় দিন-  নামচেবাজারে আজও ‘আপনি থাকছেন স্যার।’ আজ আপনার অ্যাক্লাইম্যাটাইজ়েশন ডে। অ্যাক্লাম্যাটাইজেশন ওয়াক করুন ঘন্টা দুয়েক। কাছ থেকে তুষারকিরিট শৃঙ্গরাজির শোভা উপভোগ করুন। আশপাশের সবুজ পাহাড়ে হেঁটে একটু ঘাম ঝরিয়ে নিন। ইয়াকদের ছবি তুলুন প্রাণ ভরে। নামচেবাজারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তিব্বতীয় বৌদ্ধ সংস্কৃতির স্বাদ নিন। এ পথের শেষ বড় বাজার এখানে। বাকি কেনাকাটা করে নিতে পারেন। ট্রেকিং গিয়ার থেকে বিয়ার সবই পাবেন। এখান থেকেই প্রথম দেখা মিলবে তাঁর। মাউন্ট এভারেস্ট, যাঁর জন্য আপনার আসা। তবে মন ভরবে না।

চতুর্থ দিন – নামচেবাজার থেকে খুমজুং (ট্রেক)।
নামচেবাজার থেকে ছোট ও অনায়াস ট্রেক দু’-তিন ঘন্টায় করে, আসুন খুমজুঙে (৩৭৮০ মিটার)।

খুমজুং গ্রাম ও আমাদাব্লাম শৃঙ্গ

মেঘছোঁয়া উপত্যকার ভেতর দিয়ে নৈসর্গিক হাঁটাপথ। পবিত্র পর্বত খুম্বিয়েলার পদতলে অবস্থিত খুমজুং। তাড়াতাড়ি এসে গেছেন, আলসেমি না করে দেখে নিন ইয়াক ফার্ম, খুমজুং মনাস্ট্রি ও অতি অবশ্যই কিংবদন্তী স্যার এডমন্ড হিলারি স্থাপিত স্কুলটি। খুমজুং মনাস্ট্রিতে ইয়েতি নামক অলৌকিক প্রাণীর মাথার খুলি আছে। বিশ্বাস করা বা না করাটা আপনার ব্যাপার।

পঞ্চম দিন – খুমজুং থেকে ফরৎসে (ট্রেক)।
ছ’ঘন্টা ট্রেক করে আসুন ফরৎসে গ্রামে (৩৮১০ মিটার)।

কারণ আমরা ভিড়ে ঠাসা চিরাচরিত পথে এভারেস্ট বেসক্যাম্পে যাব না।বরং গোকিও ভ্যালির অনাস্বাদিত সৌন্দর্যঠাসা পথদিয়ে আপনাকে নিয়ে যাবো। অসামান্য হাঁটা পথটি মং-লার শিরা ধরে এগিয়ে চলবে। সারা পথে শ্বেতশুভ্র শিখরগুলির মাথায় মেঘ ও রোদের আলিঙ্গন দেখতে দেখতে এগিয়ে চলুন। গোকিও গর্জের নির্মম শীতল অন্ধকার গায়ের রোম খাড়া করে দেবে। বরাত ভালো থাকলে দেখা মিলবে কস্তুরী মৃগর। যাত্রা পথের সৌন্দর্যে মোহিত হতে হতে এসে পৌঁছন ধাপে ধাপে গড়েওঠা ছবির মতো সুন্দর গ্রাম ফরৎসেতে।

ফরৎসে থেকে গোকিও রি

● ষষ্ঠদিন – ফরৎসে থেকে ডিংবোচে (৪৩৬০ মিটার) ট্রেক।

ডিংবোচেতে দেড় দিন থাকতে হবে আপনাকে। পা দু’টোকে একটু রেস্ট দিতে হবে তো, না কি! কারণ ফরৎসে ছাড়ার পর কঠিন চড়াই ভাঙতে হবে।ট্রেক রুটে পড়বে আর এক বিখ্যাত গ্রাম প্যাংবোচে। একটু চা, কফি, টিবেটান ব্রেড ও জংলি মধু খেয়ে এগিয়ে যাবেন সোমারে ভিলেজের পথে। ওখানেই সারুন লাঞ্চ। ফরৎসে থেকে ডিংবোচে এই ট্রেক রুটটি অফবিট ট্রেকাররা তাঁদের স্বর্গ বলে মনে করেন। এভারেস্ট বেস ক্যাম্প ট্রেক রুটের সব চেয়ে সুন্দর দিনটাই আজ বলে আমার অন্তত মনে হয়েছে। সুবিশাল হিমালয়ের মুক্ত সৌন্দর্যের খনিতে যেন এসে পৌঁছেছেন। ছ’-সাত ঘণ্টার কঠিন ট্রেক। কিন্তু চোখের শান্তিতে পেশির ক্লান্তি অমুভব করতেই পারবেন না। চোখ কান খোলা থাকলে দেখা মিলতে পারে কস্তুরী মৃগ, পাহাড়ি ছাগল ও পাহাড়ি ফেজেন্টের। আজকের যাত্রাপথের ঘোর কাটতে না কাটতে পৌঁছে যাবেন রহস্যময় মাউন্ট আমাদাব্লামের আদরের নাগালে থাকা ডিংবোচে। নামচে বাজার থেকে হিমালয়ের যে সৌন্দর্যর দেখা মেলে না তার দরজা কেউ যেন চিচিং ফাঁক বলে খুলে দিয়েছে। আর আপনি যেন আলিবাবা। হাঁ করে দেবাদিদেবের রত্নরাজি ঠিকরে আসা সৌন্দর্য নিজের অজান্তেই গিলতে শুরু করেছেন আপনি ও আপনার হাতের ক্যামেরা।

● সপ্তম দিন – আজও আপনি থাকবেন ডিংবোচেতে। সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে নামচেবাজারের দ্বিতীয় দিনের মতো অ্যাক্লাইম্যাটাইজ়েশন ওয়াক করুন নাগার্জুন হিলে। ডিংবোচে থেকে ৩৬০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে গণ্যমান্য পর্বতশৃঙ্গগুলির ভিউ পাবেন। এঁদের মধ্যে আছেন পৃথিবীর পঞ্চম উচ্চতম শৃঙ্গ মাকালু ও পর্বতারোহীদের মনপসন্দ আইল্যান্ড পিক। বার্ডস আই ভিউতে ইমজা ভ্যালির নৈসর্গিক দৃশ্য শিল্পীর ক্যানভাস।

ডিংবোচে গ্রাম

● অষ্টম দিন – ডিংবোচে থেকে লোবুচে (ট্রেক)
: আজ আপনাকে ট্রেক করতে হবে চার থেকে পাঁচ ঘন্টা। ডিংবোচে থেকে আজ আপনি যাবেন লোবুচে (৪৯১০ মিটার)। আপনি ধীরে ধীরে ট্রি-লাইন ছেড়ে ওপরে উঠে চলবেন।

ডিংবোচে থেকে লোবুচে

নিজেকে ‘স্লো বাট স্টেডি’ মোডে রাখুন। আজকের ট্রেক রুটও মনোরম দৃশ্যপটের বুক চিরে লোবুচে পৌঁছেছে। হিমালয়ান মিডোর বুকের ওপর দিয়ে দিলখুশ মেজাজে চলুন। কিন্তু অচিরেই কিছু স্মৃতিসৌধ আপনার মনকে ভারাক্রান্ত করবে। আপনি এসে পৌঁছাবেন মেমোরিয়াল প্লেটোতে।
এভারেস্ট ও আশপাশের শৃঙ্গগুলি জয় করতে আশা দেশবিদেশের কয়েকশো দামাল আরোহী এভারেস্টের অঙ্গনে শেষ ঘুমে ঘুমিয়ে পড়েছেন। তাঁদের স্মৃতির উদ্দেশেই এই সৌধগুলি নির্মিত। মনে মনে সম্মান জানান প্রকৃতি মায়ের দুঃসাহসি সন্তানদের। এর মধ্যে সব চেয়ে বিখ্যাত সৌধটি হলো বিখ্যাত আমেরিকান ক্লাইম্বার স্কট ফিশারের। যিনি প্রথম আমেরিকান হিসাবে এভারেস্ট ও কে-২ শৃঙ্গ সাপ্লিমেন্টারি অক্সিজেন ছাড়াই ক্লাইম্ব করেন।

বিখ্যাত পর্বতারোহী স্কট ফিশারের সমাধি

এই জায়গাটি নিঃশব্দে পার হয়ে যাওয়াই অলিখিত নিয়ম। অনেকেই মানেন না, আপনি মানুন। আজকেই আপনি প্রথম দেখবেন চোলাৎসে, লোবুচে ও পুমোরি পিক। লোবুচে পিকের নিচে ছো্ট্ট একটি হ্যামলেট, লোবুচে ভিলেজ। আপনার আজকের নৈশাবাস লোবুচের লজ বা হোম-স্টে।

লোবুচে গ্রাম

নবম দিন – লোবুচে থেকে গোরক্শেপ (৫২৮৮ মিটার) তিন ঘন্টায় বা এভারেস্ট বেস ক্যাম্প (৫৩৬০ মিটার) ছ’ঘন্টায়।

লোবুচের পরে দিগন্তবিস্তৃত প্রস্তরখন্ডের সমুদ্রে হোঁচট খেতে খেতে এগিয়ে চলুন। ক্লান্তিকর অথচ প্রাণের আরাম দেওয়া পথে তিন ঘন্টা কসরৎ করার পরে আসবে সাবেক এভারেস্ট বেসক্যাম্প গোরক্শেপ। এক অবিস্মরণীয় লোকেশনে এই গ্রামটির অবস্থান। গ্রামটিকে ঘিরে আছে পুমোরি (৭১৪৫ মিটার), লিংট্রেন (৬৬৯৭ মিটার), নুপৎসে (৭৭৪৫ মিটার) এবং সাগরমাথা ওরফে চোমোলাংমা ওরফে মাউন্ট এভারেস্ট (৮৮৪৮ মিটার)। খুম্বু আইসফলের দেখা মিলবে। এই খুম্বু আইসফলের পথ ধরেই বেশির ভাগ পর্বতারোহী এভারেস্টের শৃঙ্গ আরোহণের প্রয়াস করে থাকেন।

গোরক্শেপ

গোরক্শেপে লাঞ্চ করে তিন ঘন্টা হেঁটে পৌঁছে যান বর্তমান এভারেস্ট বেসক্যাম্প।

যদি আরোহণ মরসুমে যান, দেখবেন পুরো পৃথিবীটাই যেন উঠে এসেছে এখানে। শয়ে শয়ে রঙবেরঙের টেন্ট আর মানুষ। একেবারে মেলার পরিবেশ। নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধান, নানান আকৃতি নানান গাত্রবর্ণ। বিবিধের মাঝে মিলন ঘটিয়ে ছেড়েছে একমেবোদ্বিতীয়ম এভারেস্ট। বেসক্যাম্প থেকে এভারেস্ট দর্শন হয় না, তাই ফুটিফাটা খুম্বু আইসফলের খতরনাক ব্লু আইস পিনাকল ও খুম্বু আইসফলের ভয়ংকর সৌন্দর্য দেখুন । আজ এই পর্যন্তই থাক। ফিরে আসুন গোরক্শেপে। আর যদি এভারেস্ট বেসক্যাম্পে নৈশাবাসের ব্যবস্থা করতে পারেন, তো এক অবিস্মরণীয় রাতের সাক্ষী হবেন।

রাতে টেন্টের জ়িপ টেনে বাইরে আসুন। বড় বড় রাতজাগা তারার আলোয় ভেসে যাচ্ছে এভারেস্ট বেসক্যাম্প। অসংখ্য টেন্টের ভিতরে সোলার ও ব্যাটারি লাইট জ্বলছে। টেন্টগুলিকে মনে হবে দেওয়ালির রাতের রঙবেরঙের ফানুস।একেবারে মহাজাগতিক অ্যামবিয়েন্স। আপনি এক বার ভাবুন, যে এই সেই ঐতিহাসিক রণক্ষেত্র। কত রথী মহারথী এই রণাঙ্গনে এসেছেন। কেউ বিজয়রথে ফিরেছেন, কেউ ভগ্ন মনোরথে। কেউ বা ফেরেননি। ভীষ্ম, কর্ণের মতো যুদ্ধক্ষেত্রেই চিরতরে রয়ে গেছেন। এখানে লড়াই এভারেস্টের সঙ্গে নয়। লড়াই নিজের সঙ্গে। অস্ত্র হল ধৈর্য, সহনশীলতা, অদম্য ইচ্ছে, হারার আগে না হারার মানসিকতা।

এভারেস্ট  বেসক্যাম্প

দশম দিন : আজ সেই দিন। যে দিনটি আপনার জীবন ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ভোর রাতে উঠে পড়ুন। গোরক্শেপ থেকে ঘন্টা দুয়েক ট্রেক করে ক্লোজ-আপে এভারেস্ট দেখার আদর্শ স্থান কালাপাত্থরে যান। পৌঁছে উঠেপড়ুন দশ মিটারের মতো উঁচু প্রস্তরখণ্ড কালাপাত্থরে (সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা ৫৫৪৫ মিটার)।

গোরক্শেপ থেকে কালাপাত্থর ও পুমোরি

এভারেস্টের পিছন দিক থেকে হঠাৎ উঠে আসা সূর্য ও এভারেস্টের চুম্বন ভালো লাগলেও মন ভরবে না। কারণ কালাপাত্থরে এভারেস্টে সূর্যোদয়ের থেকে সূর্যাস্ত অনেক অনেক বেশি সুন্দর ও নয়নাভিরাম। গোধূলি লগ্নে অস্তরবির রক্তিমাভ আবির মাখে এভারেস্ট। এটা দেখতে আপনাকে এক দিন বেশি থাকতে হবে গোরক্শেপে। দিন শেষের মাহেন্দ্রক্ষণে হয় সূর্য ও এভারেস্টের শুভদৃষ্টি। এর সাক্ষী হতে দশ-বারো হাজার কিলোমিটার দূর থেকে ছুটে আসেন পাহাড়প্রেমীর দল। এভারেস্টকে এত কাছ থেকে দেখে কালাপাত্থরে জড়ো হওয়া ট্রেকারদের হর্ষোল্লাস, সল্টলেক স্টেডিয়ামে ইস্ট-মোহনের ডার্বির মাহল মনে করাবে। টেকনিক্যাল ক্লাইম্ব না করে এভারেস্টের সেরা ভিউ ও এভারেস্ট আঙিনার সেরা প্যানোরামিক ভিউ একমাত্র এখান থেকেই পাবেন।

কালাপাত্থর থেকে লোৎসে, এভারেস্ট, নুপৎসে

শেষ বিকেলের আলোয় কালাপাত্থর থেকে লোৎসে, এভারেস্ট, নুপৎসে

যাক আপনার স্বপ্নের অভিযান সফল হল। কালাপাত্থর থেকেই ফেরার পথ ধরুন। চার ঘন্টা ট্রেক করে নেমে আসুন ফেরিচে (৪২৪০ মিটার)। রাত্রিবাস সেখানেই।

ফেরিচে

একাদশ দিন – ফেরিচে থেকে তেংবোচে (ট্রেক)
ফেরিচে থেকে পাঁচ-ছ’ঘন্টায় নেমে আসুন তেংবোচে ওরফে থিয়াংবোচে (৩৮৭০ মিটার)। এখন আপনি নামছেন। তাই চাপ কম। ধীরে সুস্থে নামুন। খুম্বু রিজিয়নের সব চেয়ে বড়ো গুম্ফা আছে টেংবোচেতে। তাই তেংবোচে মনাস্ট্রf অবশ্যই দেখে নেবেন।

তেংবোচে

জানলে অবাক হবেন যে তেনজিং নোরগে স্থানীয় থানি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ছোটো বেলায় তাঁকে এই তেংবোচে মনাস্ট্রিতে লামা হতে পাঠানো হয়েছিল। ভাগ্যিস হননি। তেংবোচে থেকে তাওয়াচে, এভারেস্ট, লোৎসে, আমাদাব্লাম, থামসারকু ও তেনজিং নোরগে শৃঙ্গগুলির অপূর্ব প্যানোরামিক ভিউ পাবেন।

দ্বাদশ দিন -তেংবোচে থেকে জোরসালে (২৭৩০ মিটার)।
ধীরে সুস্থে ছ’সাত ঘণ্টায় নেমে আসুন তেংবোচে থেকে আপনার চেনা জোরসালে গ্রামে। যাবার সময় নামচেবাজারের পথে এখানে আপনি লাঞ্চ করেছিলেন।

ত্রয়োদশ দিন-জোরসালে থেকে লুকলা (২৮৬০ মিটার)
গজেন্দ্রগমনে চার-পাঁচ ঘণ্টায় নেমে আসুন লুকলা। আজ থেকে আর হাঁটা নেই। লুকলার হোটেলে বিশ্রাম নিন। প্রচুর জল বা ফলের রস খেয়ে শরীরকে রিহাইড্রেট করুন। স্যুভেনির কিনুন লুকলার স্যুভেনির শপ থেকে।

লুকলার স্যুভেনির শপ

চতুর্দশ দিন- ‘বাই বাই এভারেস্ট’ বলে লুকলা থেকে প্লেনে কাঠমাণ্ডু ফিরে আসুন।

জেনে রাখুন , এভারেস্ট বেসক্যাম্প ট্রেকের কিছু তথ্য 

আদর্শ সময়– মার্চ থেকে মে (প্রি-মনসুন) এবং সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর (পোস্ট-মনসুন)
ট্রেক লেভেল– ডিফিকাল্ট
ট্রেকের খরচ– জনপ্রতি কমপক্ষে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার  টাকা (স্থলপথে কাঠমাণ্ডু ও কাঠমাণ্ডু-লুকলা-কাঠমাণ্ডু প্লেনে)। পৃথিবীর সব চেয়ে নামী ট্রেক তাই দামীও।

যাবেন কী ভাবে
* কলকাতা থেকে ট্রেনে রক্সৌল পৌঁছে সেখান থেকে পাঁচ কিমি গাড়িতে, অটোতে পৌঁছান নেপালের বীরগঞ্জে। সেখান থেকে গাড়িতে বা বাসে দশ-এগারো ঘন্টায় কাঠমাণ্ডু।
* কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি গিয়ে গাড়িতে নেপালের কাঁকরভিটা পৌঁছান। সেখান থেকে বাসে বা গাড়িতে বারো ঘন্টায়। তবে রাস্তা বেশ খারাপ।
*কলকাতা থেকে সরাসরি বিমানে বা স্থলপথে কাঠমাণ্ডু এবং কাঠমাণ্ডু থেকে লুকলা পৌঁছন বিমানে। কলকাতা থেকে কাঠমাণ্ডু এয়ার ইন্ডিয়ার ভাড়া কম এবং কাঠমাণ্ডু থেকে লুকলা তারা এয়ারওয়েজ়, গোমা এয়ারওয়েজ় ও ইয়েতি এয়ারওয়েজ়ের মধ্যে শেষেরটাই সস্তা ও আমার পছন্দ।
তবে বাজেটে কুলালে কলকাতা থেকে কাঠমাণ্ডু হয়ে লুকলা বিমানে সরাসরি যেতে আসতে পারেন কুড়ি থেকে পঁচিশ হাজার টাকায়। আর শুধু কাঠমাণ্ডু থেকে লুকলা প্লেন ভাড়া, যাতায়াত দশ হাজার মতো।

থাকবেন কোথায়– এভারেস্ট বেসক্যাম্প রুটটি এতই বিখ্যাত ও জনবহুল ট্রেক রুট যে, রুটের সর্বত্র থাকার জায়গা আছে। তবে যেহেতু বিদেশি ট্রেকার ও মাউন্টেনিয়ারদের অহরহ যাতায়াত, তাই হোটেল, লজ, হোম-স্টে, টি-হাউসগুলির বেশির ভাগের মান আর ভাড়া মধ্যম শ্রেণীর । তবে উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্বাছন্দ্য কমতে শুরু করবে ও দাম বাড়তে শুরু করবে। গিয়ে দরদাম করে নেওয়া ভালো। লুকলা পৌঁছে যে হোটেলটি ঠিক করবেন, ফেরার সময় ওই হোটেলেই উঠবেন। মাঝের হল্টগুলোতে ওই হোটেলের লোকরাই থাকার জায়গা ঠিক করে দেবেন। যদি একান্তই না পারেন তা হলে এগিয়ে যাবেন অঢেল হোটেল, লজ, হোম-স্টে, টি হাউস পাবেন ৮০০-১২০০ টাকার মধ্যে। তবে এই ভাড়ায় উচ্চ মানের পরিষেবা আশা করবেন না। আমার ব্যক্তিগত পছন্দ রাস্তার ধারের ছোট্ট দোকান। সস্তায় থাকা ও খাওয়া। লজ্জা পাবেন না, পাশের বেডেই দেখবেন হয়তো বিদেশি ট্রেকার শুয়ে আছেন।
নীচের হোটেলগুলির যে কোনও একটা থেকেই বাকি পথের নৈশাবাসের লিঙ্ক, গাইড, পোর্টার (যদি লাগে) পেয়ে যাবেন।
*লুকলা-প্যারাডাইস লজ অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট (+97738550029),
খুম্বু রিসোর্ট (+97738550055),
লুকলা লজ (+977-984-9047423)
*ফাকদিং -গ্রিন ভিলেজ গেস্ট হাউস (+977-981-8310488)
*নামচেবাজার
নামচে লজ (+977-38-540004)
হিমালয়ান লজ (+977 38-540060)
জামলিং গেস্ট হাউস (+977-38-540366)
*খুমজুং
হোটেল ব্রাইট স্টার (+977-984-1314576)
এভারেস্ট শেরপা রিসর্ট (+9771-4468937)
গোকিও রিসর্ট (+977-981-3740678)
*ফেরিচে
এডেলওয়েস ফেরিচে (+977-38-540031)

ব্লগ রোডহেড/৬ পড়ন্ত বিকেলে গান ধরলো পেম্বা শেরপা

Shares

Leave A Reply