Latest News

৫০ হাজারি টিকিটের চাপে হতাশ অরিজিতের বহু ভক্ত, মুর্শিদাবাদের ‘মাটির ছেলে’ কি শুনতে পাচ্ছেন?

প্রসূন চন্দ

‘৫০ হাজার! সত্যিই ৫০ হাজার!’

শুক্রবার বিকেলের পর থেকে এই শব্দবন্ধনীটিই ঘুরে বেড়াচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়াজুড়ে (social media)। চারদিকে রীতিমতো উত্তাল অবস্থা। মনে হচ্ছে শিগগিরই যুদ্ধ লাগবে। অনেকেই বলছেন, ‘এবার কি কিডনি বেচে দিতে হবে?’ কেউ কিডনি বেচবেন কিনা, সেটা তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়। তবে এমন দাম শুনলে কিডনিতে ব্যথা হওয়া খুব একটা অস্বাভাবিক নয়।

কথা হচ্ছে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে কলকাতার (Kolkata) ইকো পার্কে অরিজিৎ সিংয়ের (Arijit Singh) পরবর্তী শো নিয়ে। শুক্রবার থেকেই শুরু হয়েছে সেই শো-এর টিকিট বুকিং। এত মাস পর আবার অরিজিতের শো কলকাতায়, স্বভাবতই তাঁর গানপাগল অনুরাগীদের উন্মাদনা ছিল তুঙ্গে। তাই টিকিট বিক্রি শুরু হতেই একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সকলে।

Arijit Singh

কিন্তু সেই টিকিট কাটতে গিয়েই মাথায় হাত! টিকিটের দাম দেখে ভিরমি খাচ্ছেন অনেকেই। একটি বহুল ব্যবহৃত অনলাইন সংস্থার মাধ্যমে বিক্রি হচ্ছে সেই শো-এর টিকিট। দেখা যাচ্ছে, সেখানে শ্রোতা-দর্শকদের জন্য আসন সংখ্যা পাঁচভাগে ভাগ করা হয়েছে। সবথেকে পিছনে ব্রোঞ্জ। এরপর একে একে সিলভার, গোল্ড, প্ল্যাটিনাম ও ডায়মন্ড।

আয়োজকদের তরফে জানানো হয়েছে, বসে এবং দাঁড়িয়ে দু’রকমভাবেই অরিজিতের প্রোগ্রাম উপভোগ করা যাবে। দু’টি ব্যবস্থাই করা হয়েছে সকলের কথা ভেবে। এছাড়াও বিভিন্ন জোনে বিভিন্ন রকমের সুযোগ-সুবিধাও থাকছে। কোথাও থাকছে নরম পানীয়, মকটেল এবং খাবারের ব্যবস্থা, কোথাও আবার শুধুই থাকবে খাবারের বন্দোবস্ত। এমনকি একটি নির্দিষ্ট জোনের টিকিট কাটলে বিনাপয়সায় গাড়ি পার্কিংয়ের সুবিধাও পাবেন দর্শকরা। এই যে সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, তার বিনিময়ে কত করে নির্ধারিত হয়েছে টিকিটের দাম?

এবার সেই প্রসঙ্গেই আসা যাক। প্রথমেই বলা হয়েছে যে দর্শকদের জন্য মোট পাঁচটি জোনের ব্যবস্থা হয়েছে। যার যেমন খুশি জোনের টিকিট কাটতে পারেন। দেখা যাচ্ছে, একদম পিছনে ব্রোঞ্জ জোনের টিকিটের দাম ২,৫০০ টাকা। সেখানে বসার সুবিধা নেই। দাঁড়িয়েই শুনতে হবে অরিজিৎ সিংয়ের গান। সঙ্গে থাকছে ভালমন্দ খাবারের ব্যবস্থাও। এর সামনে সিলভার জোন। যার টিকিট মূল্য ৪,০০০ টাকা। এখান থেকেই বসার বন্দোবস্ত করেছেন আয়োজকরা। সঙ্গে থাকবে খাবারের সুবিধাও। এরপর রয়েছে গোল্ড। ৪,৫০০ টাকার টিকিট কেটে এই জোনে ঢুকতে পারলে আপনি বসে বসেই উপভোগ করবেন অরিজিতের গান। এখানে খাবারের সঙ্গে মিলবে পানীয়ও।

এতদূর অবধি কমবেশি দামের ফারাক ঠিকই আছে। বসার ব্যবস্থা, খাবার ও পানীয়ের আয়োজন, সঙ্গে আবার অরিজিৎ সিংয়ের গান- এতকিছু একসঙ্গে মিলছে। তার জন্য এটুকু খরচ করাই যায়। কিন্তু মূল্য মাত্রাছাড়া হতে শুরু করল এরপরেই।

প্ল্যাটিনাম ও গোল্ড জোনের তফাৎ শুধু সামনে এবং পিছনে। এছাড়া আর কোনওই তফাৎ নেই। এতেই টিকিটের দাম প্রায় দ্বিগুণ। এখান থেকেই শুরু হল ‘কিডনিতে ব্যথা’। ‘সিটিং-ইটিং-ড্রিঙ্কিং’ এবং সর্বোপরি ‘লিসনিং’ মিলিয়ে প্ল্যাটিনাম জোনের জন্য টিকিট মূল্য ৮,৫০০ টাকা! আর এর সামনে ডায়মন্ড জোন। যার দাম সত্যিই এক ক্যারাট ডায়মন্ড বা হিরের কাছাকাছি। ৫০ হাজার টাকা!

না ভুল পড়ার বা শোনার কোনও জায়গা নেই। আসলে এমনটাই দাম এই ডায়মন্ড জোনের টিকিটের। টিকিট কাটতে গিয়ে প্রথমে ঘাবড়ে গেলেও পরে সকলেরই পরখ করে দেখার সাধ হয় যে এত দাম যখন নিশ্চয় তেমনই সুযোগ-সুবিধা থাকবে। হয়তো অরিজিতের সঙ্গে সেলফি তোলা যাবে, কিংবা গ্রিনরুমে গিয়ে পাওয়া যাবে প্রিয় গায়কের অটোগ্রাফ!

কিন্তু না, তেমন কিছুই নেই। গান শোনার পাশাপাশি সেখানে থাকছে অন্যান্য বেশ কিছু সুবিধা। একটি ৫০ হাজার টিকিট কেটে ঢুকতে পারবেন দু’জন। বসার জন্য থাকছে নরম গদির সোফা। সঙ্গে হার্ড ড্রিঙ্কস এবং স্ন্যাক্সের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে দর্শকদের মনোরঞ্জনের কথা ভেবে। এছাড়াও পাওয়া যাবে টিকিট পিছু একটি গাড়ি বিনাপয়সায় পার্ক করার সুবিধা। আর একদম সামনে থেকে অরিজিৎকে দেখা তো হাতে চাঁদ পাওয়ার সামিল।

কিন্তু এতেই বেজায় চটেছেন অনুরাগীরা। তাঁদের কথায়, টিকিটের দাম এমন রাখা হলে বহু সাধারণ ঘরের ছেলেমেয়েরাই সামনে দাঁড়িয়ে অরিজিতের গান শোনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন। এমন কিছুই সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না যে কারণে টিকিটের দাম এমন দুর্মূল্য হতে পারে। আর এরপর থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হয়েছেন বহু মানুষ। ঘুরতে শুরু করেছে নানারকম মিমও। অনেকেই যেমন টিকিটের এত দাম নিয়ে হাস্যরসে মেতেছেন, আবার অনেককেই বিলাপ করতেও দেখা গেছে।

Arijit Singh

সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ রাখলে তেমনই বেশ কিছু স্টেটাস দেখা যাবে নিজের চোখেই। একজন যেমন বলেছেন, ‘৫০ হাজারের বদলে ৬০ হাজার হলে বোধহয় অরিজিৎ সিংকে কোলে বসিয়ে গান শোনা যেত’। একজন তো আবার সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার উদাহরণ তুলে টিকিটের জন্য ক্রাউড ফান্ডিংয়ের আবেদনও জানিয়েছেন। বাড়ির দলিল বন্ধক দিলে অনুষ্ঠান দেখতে পাওয়া যাবে কিনা সেই প্রশ্নও তুলেছেন এক নেটিজেন।

Arijit Singh

তেমনই অনেকের গলায় ঝরে পড়েছে হতাশাও। একজন লিখেছেন, ‘কলেজে পড়ি। টুকটাক হাতখরচের টাকা বাঁচিয়ে জমিয়ে রাখতাম। যেদিন শুনেছিলাম অরিজিৎ সিং কলকাতায় আবার শো করতে আসছে সেদিন থেকেই অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু টিকিটের দাম দেখার পর সেই আশা ছেড়ে দিয়েছি। আমাদের মতো ছেলেমেয়েদের কপালে মনে হয় অরিজিৎ সিংকে সামনে থেকে দেখার সুযোগ মিলবে না।’

এই যে এত বিলাপ, এত হতাশা সবই তো অরিজিৎ অনুরাগীদের। যারা প্রিয় গায়ককে সামনে থেকে দেখার জন্য টিফিন খরচ বাঁচিয়ে রেখেছেন কিংবা পুজোয় একটা জামা কম কিনে সেই টাকা জমিয়ে রেখেছেন ওই টিকিট কাটার জন্য, তাঁরাই কিন্তু জিয়াগঞ্জের অরিজিৎ সিংকে আজ গোটা ভারতবর্ষের অরিজিৎ সিং বানিয়েছেন। গায়ক কি তাঁদের কথা শুনতে পাচ্ছেন! অরিজিৎ যেভাবে আজও সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে থাকেন, গ্রামের রাস্তায় স্কুটি নিয়ে ঘুরে বেড়ান তাতে এটুকু বুঝতে অসুবিধা হয় না যে এখনও মাটির কাছাকাছিই আছেন এই শিল্পী। কিন্তু তাঁর একটি শো-এর টিকিট মূল্য যে এভাবে মাটির থেকে দূরে সরে আকাশ ছোঁয়া হয়ে যাবে, তা বোধহয় শিল্পী নিজেও কোনওদিন ভাবেন নি!

(শুক্রবার টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার পর যা মূল্য নির্ধারিত ছিল, শনিবার বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই টিকিটের দামও বাড়তে শুরু করেছে। এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত ধার্য টিকিটমূল্য তুলে ধরা হয়েছে। পরে তা আরও পরিবর্তন হতে পারে।)

You might also like