Latest News

তরুণ মজুমদার (১৯৩১-২০২২): কানন দেবীর শিক্ষানবীশ থেকে বাঙালির ‘ভালবাসার অনেক নাম’

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

Subhadeep Bandyopadhyay

‘আমি দেখতে ভালবাসি
আমি নয়ন ভরে দেখতে ভালবাসি
নয়ন যদি ভরে তবু ভরে না তো মন কভু
আমি পাগল হইলাম শুনে শুনে
তোমার মোহন বাঁশি
আমি দেখতে ভালবাসি …’

তিনি সারা জীবন নয়ন ভরে বাংলাদেশের প্রকৃতির রূপ দেখেছেন ভালবেসে আর সেই প্রকৃতি শোভা তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন পর্দায়, যুগের পর যুগ ধরে, তাঁর চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। তিনি কিংবদন্তি পরিচালক তরুণ মজুমদার (Tarun Majumdar)। এই নবতিপর তরুণ নামেও তরুণ, কাজেও তরুণ।

তিনি দেবকী কুমার বসু, প্রমথেশ বড়ুয়া, কানন দেবী যুগ থেকে এযুগের শিল্পীদের সঙ্গেও কাজ করেছেন। উত্তমকুমার যেমন তাঁর পরিচালনায় কাজ করেছেন, তেমন উত্তমকুমারের নাতিও তাঁর ছবিতে প্রথম হিরোর রোল পেয়েছে। এই এতগুলো প্রজন্মের মধ্যে সেতুবন্ধন যেন করে গেছেন ইন্ডাস্ট্রির তনুদা।

অথচ প্রচারসর্বস্ব যুগে নিজেকে চিরকাল রেখেছেন আড়ালে। সাংবাদিকরা তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে চাইলে ফোন নামিয়ে রেখেছেন। তবু আড়ালে থেকেও বাংলার সকল দর্শকের মনে রয়ে গেছেন তিনি। কারণ তরুণ মজুমদারের লক্ষ্যেই ছিল, গল্পটা যদি চলচ্চিত্রে ভাল করে বলা যায়, তাহলে সে ছবি সব শ্রেণির দর্শকের মন জয় করতে বাধ্য। তাঁর একের পর এক ছবিতে তিনি তা প্রমাণ করেছেন। তরুণ মজুমদারের ছবিতে কোন শ্রেণিবৈষম্য ছিল না, আর্ট ফিল্ম বা কর্মাশিয়াল ছবির ঘেরাটোপে তাঁর ছবিকে ফেলা যেত না। দশকের পর দশক তিনি বাঙালি আবেগের নাম। তিনি বাংলা ছবির আনন্দ বৈরাগী তরুণ মজুমদার।

বাংলাদেশের মুসলমান জসীমউদ্দিন মাস্টারমশাইকে দেখেই সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরলেন তরুণ (Tarun Majumdar)

বাংলাদেশের বগুড়াতে থাকতেন তরুণ মজুমদার। জন্ম ১৯৩১ সালে। কিন্তু তাঁর জন্ম তারিখ কবে সেটা তিনি নিজেও কোনওদিন খোলসা করে বলেননি। বলতেন, ‘আগেকার দিনে কে আর এত ছেলেমেয়ের জন্মদিন মনে রাখত!’ তাঁর ডাক নাম তনু। তনু নামেই যে তিনি টালিগঞ্জ পাড়ার বিখ্যাত মানুষ হয়ে যাবেন, কে জানত!

বগুড়া ছিল মুসলিমপ্রধান অঞ্চল। কিন্তু জাতিগত ভেদাভেদ তাঁর মনে কোনওদিন জায়গা করেনি। পাড়ার মুসলিম অভিভাবকদের কোলেপিঠে চড়েই ছোট্ট তনু মানুষ হয়। কারণ বাবা বীরেন্দ্র মজুমদার ও পরিবারের বাকি পুরুষ অভিভাবকরা ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। তনু ছেলেবেলার বেশিরভাগ সময়টাই দেখেছেন, বাবা কাকাদের জেলে বন্দি থাকতে। তাঁর জ্যাঠামশাইকে তো জেলেই হত্যা করা হয়। মা, এক ভাই আর কজন দূরসম্পর্কের কাকারা বিশাল বাড়িতে থাকতেন। আবার স্কুলের বেশিরভাগ শিক্ষকই ছিলেন মুসলমান।

অঙ্ক করাতেন জসীমউদ্দিন সাহেব। তিনি সবসময় শ্বেতশুভ্র ধুতি-পাঞ্জাবি পরতেন। এই পোশাকই আজীবন তরুণ মজুমদারের নিজের পোশাকে প্রভাব ফেলেছে। তাঁর সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরার অভ্যাস জসীমউদ্দিন স্যারকে দেখেই। বগুড়ার এই গ্রাম ছিল যেন হিন্দু-মুসলিম মিলনতীর্থ। একই সঙ্গে দুই ধর্মের লোক ইদ-দুর্গোৎসবে মেতে উঠত। ঠিক যেমন তরুণ মজুমদারের প্রতিটি ছবিতে বাঙালির উৎসব চিত্র ভীষণ ভাবে প্রভাব ফেলেছে।

তরুণ মজুমদারের চরিত্র গঠন করতে ওই অঞ্চলের আরও দুটি স্থানের প্রভাব ছিল। ‘ভারতী লাইব্রেরি” আর ‘উত্তরা’ ও ‘মেরিনা’ সিনেমাহল। ‘ভারতী লাইব্রেরি’তেই রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, তারাশংকর গুলে খান তিনি। তাঁর পড়ার অভ্যাস তৈরি হওয়াতে তরুণ বাবুর মায়ের বড় ভূমিকা ছিল। তাঁর সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র তৈরির সুপ্ত ইচ্ছে এখানেই লুকিয়েছিল। আর ‘উত্তরা’ ও ‘মেরিনা’ সিনেমাহল দুটিতে ছবি দেখেই তাঁর ছবি বানানোর শখ তৈরি হয়। ‘মেরিনা’তে প্রথম দেখেছিলেন দেবকী বসুর ‘বিদ্যাপতি’। চার্লি চ্যাপলিন থেকে প্রমথেশ বড়ুয়ার নানা ছবি এখানেই দেখা। এখানেই মঞ্চস্থ হত নানা গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্য। যার বিশাল প্রভাব পাওয়া যায় তাঁর ‘দাদার কীর্তি’, ‘ভালবাসা ভালবাসা’ ছবি গুলিতে।

‘পরীক্ষায় স্ট্যান্ড করাটা কোনওদিন আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না’

দেশ স্বাধীন হল। বাবা-কাকারা জেল থেকে ছাড়া পেলেন। কিন্তু মজুমদার পরিবারের ভাগ্য বদলে গেল। দেশভাগের ফলে ভারতে চলে আসতে হল মজুমদারদের। শুরু হল অভাব। ঠাঁই হল উত্তর কলকাতার একটা ভাড়াবাড়িতে। পড়াশোনা চালানোর মতো টাকাকড়ি ছিল না। শুধুমাত্র ম্যাট্রিকুলেশনে স্ট্যান্ড করায় ইন্টারমিডিয়েটে সেন্ট পলসে পড়াশোনা ও থাকা বিনামূল্যে হয়ে যায়। ম্যাট্রিকুলেশনে সপ্তম স্থান অধিকার করা তরুণ মজুমদার এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, ‘পরীক্ষায় স্ট্যান্ড করাটা কোনও দিন আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। বিজ্ঞান পড়ার চেয়েও বাংলা সাহিত্য আমাকে অনেক বেশি ঋদ্ধ করেছে। নেশার মতো সাহিত্য পড়তাম।’

ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে স্কটিশ চার্চ কলেজে কেমিস্ট্রি অনার্স নিয়ে ভর্তি হন। কলেজে দীক্ষিত হন বামপন্থী আদর্শে। ধর্মতলা স্ট্রিটে গণনাট্য সঙ্ঘের মহলাকক্ষে সলিল চৌধুরী, দেবব্রত বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্র, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়দের গান আবৃত্তি শুনেই বামপন্থার প্রতি আকৃষ্ট হন যুবক তরুণ। যে আদর্শ থেকে সারাজীবনে কেউ তাঁকে টলাতে পারেনি।

Image - তরুণ মজুমদার (১৯৩১-২০২২): কানন দেবীর শিক্ষানবীশ থেকে বাঙালির 'ভালবাসার অনেক নাম'

‘শ্রীমতী পিকচার্স’-এর আনপেইড অ্যাপ্রেন্টিস

কলেজ শেষ করে তরুণ ঠিক করলেন, আর প্রথাগত শিক্ষার দরকার নেই। এবার চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করবেন। কিন্তু তখন ফিল্মে আসা মানে যেন অচ্ছ্যুৎ জগতে পর্দাপণ। কিন্তু তাঁর মামা তাঁকে নিয়ে যান পার্কসার্কাসের রূপশ্রী স্টুডিওতে। যদিও সেখানে বেশিদিন কাজ করা হল না। চলে এলেন মামার ফিল্ম পাবলিসিটি কোম্পানিতে।

সেখানে একদিন এলেন কানন দেবী। কানন যেন সত্যিই দেবী হয়ে এলেন তনুর জীবনে। কানন দেবীর প্রোডাকশনের একটি ছবির পাবলিসিটির কাজ পেয়েছিল তাঁর মামার কোম্পানি। সেখানেই নব্য তরুণের হাতেনাতে কাজ দেখে পছন্দ হওয়ায় কানন দেবী তরুণকে নিজের ‘শ্রীমতী পিকচার্স’-এ ডেকে নেন। কাজ শেখার তাগিদে ‘শ্রীমতী পিকচার্স’-এ পাঁচ বছর আনপেইড অ্যাপ্রেন্টিস হিসেবে কাজ করেন তরুণ মজুমদার। যা কেউ ভাবতেও পারে না এযুগে।

‘যাত্রিক’ ও তিন বন্ধু

‘শ্রীমতী পিকচার্স’-এর ব্যানারে ছবি হচ্ছে ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’। নামভূমিকায় সুচিত্রা সেন ও উত্তমকুমার। আউটডোর পড়েছিল রাজগীরে। একদিন দিনের শেষে শ্যুট সেরে গোটা ইউনিট গোরুর গাড়ি করে ফিরে যাচ্ছে। সূর্য হেলে পড়েছে পশ্চিমে। তরুণ মজুমদার নিজের মনে বলে উঠলেন, ‘স্যিল্যুটে গোরুর গাড়ির এই দৃশ্যটার শট নিলে কী যে ভাল হত!’ তরুণ বাবু বোঝেননি, পেছনেই বসেছিলেন উত্তমকুমারের। উত্তমকুমার তরুণ বাবুকে বললেন, ‘আপনি নিজে ছবি পরিচালনা করছেন না কেন? ছবি করুন আমি আর রমা (সুচিত্রা সেন) নায়ক-নায়িকা হবো।’

‘শ্রীমতী পিকচার্স’-এই সহকারী রূপে কাজ করতেন দিলীপ মুখোপাধ্যায় ও শচীন মুখোপাধ্যায়। তরুণ,দিলীপ ও শচীন, তিন বন্ধু মিলে তৈরি করলেন ‘যাত্রিক’ গোষ্ঠী। রাজি হলেন সুচিত্রা সেনও। দরকারে টাকা দেবেন, সেই আশ্বাসও দিলেন। তৈরি হল যাত্রিকের প্রথম ছবি ‘চাওয়া-পাওয়া’। ছবি সুপারডুপার হিট। উত্তম-সুচিত্রা জুটির শেষ পরিপূর্ণ রোম্যান্টিক ছবি ‘চাওয়া-পাওয়া’। যাত্রিকের দ্বিতীয় ছবি ‘স্মৃতিটুকু থাক’-এ দ্বৈত চরিত্রে সুচিত্রা সেন। তৃতীয় ছবি ‘কাচের স্বর্গ’র সময়ও উত্তমকুমারকে হিরো ভাবা হল। কিন্তু এক ব্যর্থ নায়কের চরিত্রে উত্তমকুমার কাজ করতে চাননি। নতুন হিরো খোঁজা শুরু হল।

শেষ অবধি তরুণ বাবু সহকর্মী পরিচালক দিলীপ মুখোপাধ্যায়কেই ‘কাচের স্বর্গ’র হিরো করে দিলেন। ছবি হিট। রাতারাতি দিলীপ বাবু নায়ক রূপে দর্শকের মনে জায়গা করে নিলেন। ‘যাত্রিক’র ছবি বক্সঅফিসে বিশাল সাফল্য পেলেও তিন পরিচালকের মতের অমিল হচ্ছিল।

মনোজ বসুর ‘আংটি চাটুজ্জ্যের ভাই’ গল্প নিয়ে পরের ছবির চিত্রনাট্য লিখে ফেললেন তরুণ মজুমদার। নাম দিলেন ‘পলাতক’। তখনই ছবির হিরো অনুপ কুমার হবে বলে তরুণ বাবু ভেবে ফেলেন। কানন দেবী প্রযোজিত ‘দেবত্র’ ছবি করার সময়ে অনুপ কুমারের সঙ্গে আলাপ হয় তরুণ মজুমদারের। কিন্তু বাকিদের পছন্দ ছিল, উত্তমকুমারই করুক ‘পলাতক’-এর হিরোর চরিত্র। অনুপ কুমার হিরো বলতেই কলকাতার সব প্রযোজকরা চলে গেলেন। শেষ অবধি বম্বের বিখ্যাত প্রযোজক ভি শান্তারামের পলাতকের চিত্রনাট্য এত পছন্দ হল, তিনি অনুপ কুমারকে হিরো করেই ‘পলাতক’ করতে রাজি হলেন। তার পর তো ইতিহাস। স্টার সিস্টেমকে ভেঙে তরুণ মজুমদার প্রমাণ করলেন, দর্শকের কাছে গল্পটা যদি ভাল করে বলা যায়, স্টার লাগে না।

তরুণের তিন তুরুপের তাস

‘পলাতক’-এর পর তরুণ মজুমদার ‘যাত্রিক’ থেকে বেরিয়ে এসে ‘আলোর পিপাসা’ দিয়ে স্বাধীন ভাবে একক নামে ছবি পরিচালনা শুরু করেন। ১৯৬৫ সালে দুটি ছবি করেন, বসন্ত চৌধুরী, সন্ধ্যা রায়, অনুপ কুমারকে নিয়ে ‘আলোর পিপাসা’ আর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও সন্ধ্যা রায়কে নিয়ে ‘একটুকু বাসা’। তরুণ মজুমদারের নামেই ছবি দেখতে হল হাউসফুল হতো। কিন্তু তরুণ বাবুর সব ছবি হিট হবার পেছনে থাকত আরও তিন ফ্যাক্টর। তিন জন ছাড়া তরুণ মজুমদার যেন অসম্পূর্ণ ছিলেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা রায় আর অনুপ কুমার। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তরুণ মজুমদারের আত্মিক সম্পর্ক ছিল। তরুণের ছবিতে সংগীত পরিচালক রূপে ও কণ্ঠদানে হেমন্তর যাত্রা শুরু ‘পলাতক’ দিয়ে আর শেষ ‘আগমন’ ছবিতে। এ যেন এক বিশ্বরেকর্ড।

Image - তরুণ মজুমদার (১৯৩১-২০২২): কানন দেবীর শিক্ষানবীশ থেকে বাঙালির 'ভালবাসার অনেক নাম'

তরুণের ছবির পোস্টারে সন্ধ্যা রায়ের অপাপবিদ্ধ দেবীমুখ দেখেই দর্শকরা হলে ছুটতেন। সন্ধ্যা রায়কে জীবনের সেরা চরিত্র গুলি দিয়েছেন তরুণ মজুমদার। আর অনুপ কুমারকে কমেডিয়ান থেকে নায়ক বা সিরিয়াস অভিনেতার রোলে নিয়ে আসেন তনুবাবু। তরুণ বাবুর ছবির অনেক দুর্বল অভিনেতার অভিনয়ের খামতি
ঢাকা পড়ে যেত, যদি সেই দৃশ্যে অনুপ কুমার থাকতেন।

বাংলার মুখ তরুণ-সন্ধ্যা

ঋতুপর্ণ ঘোষ বলেছিলেন, ‘তরুণ মজুমদারের ছবিতে সন্ধ্যা রায় যেন গ্রাম বাংলার মুখ।’ ঠিক তাই। নিসর্গ গ্রামের চিত্র তরুণ মজুমদার বাংলা ছবির ইউএসপি করে তোলেন। বাতিকর, চহট্টা, পদুমা, নগরী, কীর্ণাহার, কুরুলা– এই সব নানা অনামী, অচেনা গ্রাম তাঁর ছবির মাধ্যমে লেজেন্ডারি হয়ে গেছে। তেমনই বাংলার সাহিত্যিকদের লেখা থেকে তিনি ছবি করেছেন বারবার। বিভূতিভূষণ, তারাশংকর, মনোজ বসু, বিমল করদের লেখার চলচ্চিত্রায়ণ করেছেন তিনি। হিন্দি ছবিও করেছেন। ‘পলাতক’-এর হিন্দি ‘রাহগীর’ ও ‘বালিকা বধূ’র হিন্দি ভার্সন।

রবীন্দ্রনাথের গান মূলধারার ছবিতে আনলেন তরুণ মজুমদার

রবীন্দ্রসঙ্গীতের সার্থক চলচ্চিত্রায়ণ যদি কেউ করে থাকেন, তিনি তরুণ মজুমদার। তাঁর ছবিতে বারবার রবীন্দ্রসঙ্গীত ব্যবহার করে হিট করানোর ফর্মুলাকে অনেক বোদ্ধা বিদ্রুপও করেছেন। তাঁরা বলেছেন, নতুন গানে যদি ছবি হিট না করে তাই তরুণ বাবু ছবিতে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে এত প্রাধান্য দেন। তরুণ বাবু প্রত্যুত্তরে বলেছেন, ‘রবীন্দ্রসঙ্গীত হল সেই স্পর্শমণি যার স্পর্শে সবকিছু সোনা হয়ে যায়। আরেকজনের নাম না বললেই নয়, তিনি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। তরুণ-হেমন্ত জুটি রক্ষণশীলতার বেড়াজাল ভেঙে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে এনে ফেললেন মূলধারার স্রোতে।

‘কাঁচের স্বর্গ’ ছবির নায়ক স্বপ্ন দেখেছিল মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাশ করে সে বড় ডাক্তার হবে। কিন্তু দারিদ্র্য বাধ সাধল! পরীক্ষার ফি দিতে না পারায় ডাক্তারির ফাইনাল পরীক্ষায় বসা হল না। ডাক্তার হওয়া দূরের কথা, সামান্য চাকরিও তাঁর জুটল না। পরবর্তীকালে একদিন রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে চোখে পড়ল সেই ফেলে আসা ‘কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ’। চলছে পূর্ণমিলন উৎসব। সব ঝকঝকে ডাক্তার। আর দূর থেকে ভেসে আসছে, ‘দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না, সেই-যে আমার নানা রঙের দিনগুলি।’ গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠা দৃশ্যায়ন।

বিদেশে আছি, তাই ছুটে যেতে পারলাম না, আমার মন ছুটে গিয়েছে তাঁর কাছে

বীরভূমের ইলামবাজারে ‘নিমন্ত্রণ’ ছবির শ্যুট হচ্ছে। পাশে অজয় নদ বয়ে চলেছে। হঠাৎ তরুণ মজুমদারকে ইউনিটের একজন এসে খবর দিল, কে এসেছেন দেখবেন চলুন। তরুণ বাবু গিয়ে দেখলেন হাজির শান্তিনিকেতনের মোহরদি, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেদিন কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় শোনালেন গান ‘দূরে কোথাও দূরে দূরে’। সেই গানই ব্যবহার হল ‘নিমন্ত্রণ’ ছবিতে।

‘দাদার কীর্তি’তে মহুয়া রায়চৌধুরীকে চিত্রাঙ্গদা রূপ দেওয়া বা অনুপ কুমারকে রোম্যান্টিক হিরো করে ‘ঠগিনী’র সেই রবি গান ‘যৌবনসরসীনীরে মিলনশতদল’। ‘সখী ভাবনা কাহারে বলে’ বা ‘চরণ ধরিতে দিও গো আমারে’-র মতো অপ্রচলিত রবীন্দ্রসঙ্গীতকে বাঙালি মনে প্রচলিত করে দিলেন তরুণ মজুমদার। তবে লোকগান, অতুলপ্রসাদ, ডিএল রায়, মুকুল দত্তের লেখা গানও ছবিতে ব্যবহার করেছেন তিনি।

তরুণ আলোয় জন্ম নিল ভবিষ্যতের তারা

টালিগঞ্জ স্টুডিওর কাছেই থাকত কিশোরীটি ও তার পরিবার। তাদের পাড়ার গলিতে একদিন এসে দাঁড়াল এক মস্ত গাড়ি। তার থেকে নামলেন তখনকার টপ নায়িকা। মাথায় ঘোমটা দেওয়া, চোখে সানগ্লাস। পাড়ার সব বাড়ির ছাদ, বারান্দা, জানলায় ভিড় সেই নায়িকাকে দেখতে। কৌতূহল সবার মনে। সবার মুখে একটাই নাম, ‘ওই দেখ সন্ধ্যা রায়।’

তরুণ মজুমদারের ‘বালিকা বধূ’ ছবির নায়িকা খুঁজতে সন্ধ্যা রায় এসছেন। কিশোরীটির বাবাকে রাজি করানোর দায়িত্ব পড়েছিল স্বয়ং সন্ধ্যা রায়ের কাঁধে। কিশোরীর নাম ইন্দু। যিনি হলেন হলেন কলকাতা থেকে বম্বে কাঁপানো নায়িকা মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়। ঠিক এমন ভাবেই রেল স্টেশন থেকে তাপস পালকে ‘দাদার কীর্তি’র নায়ক করেন তরুণ মজুমদার। একের পর এক স্টার তৈরি করেছেন তনুবাবু। অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়, মহুয়া রায়চৌধুরী, দেবশ্রী রায়, অভিষেক চট্টোপাধ্যায়– সবাই তরুণ মজুমদারের আবিষ্কার ও তাঁর হাতে তৈরি শিল্পী। এমনকী গানেও তিনি আর হেমন্ত মুখোপাধ্যায় নিয়ে আসেন দুই তারা অরুন্ধতী হোমচৌধুরী ও শিবাজি চট্টোপাধ্যায়কে।

Image - তরুণ মজুমদার (১৯৩১-২০২২): কানন দেবীর শিক্ষানবীশ থেকে বাঙালির 'ভালবাসার অনেক নাম'

পেনসিল, ব্লাউজ, মিষ্টি— তরুণ মজুমদারকে নিয়ে কত গল্প! স্মৃতির ঝুলি খুললেন তারকারা

যখন ভাঙল মিলন-মেলা

১৯৬৭ সালের ২১ জুলাই তরুণ মজুমদার-সন্ধ্যা রায়ের রেজিস্ট্রি হয়। তার এক বছর পর আনুষ্ঠানিক বিয়ে। রিল টু রিয়েল লাইফে সংসার জমে উঠেছিল। নিঃসন্তান দম্পতির কাছে তাঁদের প্রতিটি ছবি ছিল সন্তানের মতো। নিজেদের রোম্যান্সের দেখনদারি কখনও করেননি এই স্টার দম্পতি। কিন্তু আশির দশকের শেষ দিকে তরুণ মজুমদারের সোনার সংসারেও এল ভাঙন। আইনি বিচ্ছেদ না হলেও তরুণ ও সন্ধ্যার ছাদ আলাদা হল। সন্ধ্যা চিরদিনের মতো ত্যাগ করলেন তরুণ ইউনিট। বরং অঞ্জন চৌধুরীর ছবিতেই সন্ধ্যা রায় জনপ্রিয় মুখ হয়ে উঠতে লাগলেন। তবে নিজেদের বিচ্ছেদকে কখনও ওঁরা বেআব্রু করেননি হাটে।

তরুণ-সন্ধ্যার বিয়েতে উত্তম-সুপ্রিয়া।

শুধু তাই নয় মজুমদার ইউনিটের আরও দুই শক্তি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু ও অনুপ কুমারের সরে আসা শেষ পেরেকটাও পুঁতে দিল। তরুণ মজুমদারের ছবির লেজেন্ডারি সব দৃশ্য যে চিত্রগ্রাহকের ক্যামেরায় প্রাণ পেত সেই শক্তি বন্দ্যোপাধ্যায়ও ছাড়লেন বহুদিনের ইউনিট। ‘সজনী গো সজনী, ‘আগমন’, ‘পথ ও প্রাসাদ’ আশাতীত সাফল্য পেল না। ছবি করা ক্রমশ থামিয়ে দিয়ে বর্ধমান চলে গেলেন তরুণ মজুমদার। বাংলা ছবি হারাল সুস্থ সংস্কৃতির ছবি।

Image - তরুণ মজুমদার (১৯৩১-২০২২): কানন দেবীর শিক্ষানবীশ থেকে বাঙালির 'ভালবাসার অনেক নাম'

ঋতুপর্ণার হাত ধরে ‘আলো’ দেখলেন সত্তর পেরনো তরুণ

দর্শক আর কোনও দিন ভাবতে পারেননি, তরুণ মজুমদারের কামব্যাক ঘটবে! কিন্তু বদলে যাওয়া ইন্ডাস্ট্রিতে স্বমহিমায় ফিরলেন তরুণ মজুমদার। মন্দার বাজারে তুমুল হিট করল ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত অভিনীত ‘আলো’। গণ্ডগ্রামের গল্প বলেও যে এ যুগে হল হাউসফুল করা যায়, দেখালেন তিনি। তনুবাবুকে প্রত্যাবর্তনের সাহস দিয়েছিলেন প্রযোজিকা ঋতুপর্ণাই। পরের ছবি ‘ভালবাসার অনেক নাম’-এ মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়ের কন্যা মেঘা ও উত্তমকুমার পৌত্র গৌরবকে জুটি করলেন তরুণ।

কিন্তু তরুণ মজুমদারের শেষ নিখুঁত ছবি ‘আলো’। পরবর্তী ছবিগুলিতে তরুণ মজুমদার ঘরানার নন্দনবোধ ক্রমেই হারাচ্ছিল। তবু তরুণ মজুমদার পূর্ণ বয়স বাঁচলেন এবং কাজের মধ্যে, স্বমহিমায় রাজত্ব করলেন। তাঁর চলে যাওয়া সত্যিই নক্ষত্র পতন। তিনি যেন ইন্ডাস্ট্রির জীবনপুরে ছ’দশকেরও বেশি সময় কাটিয়ে ফেলা এক নবতিপর পথিক। প্রণাম তরুণ মজুমদারকে। বাংলার সকল দর্শকের ‘ভালবাসার বাড়ি’র নাম আজও তরুণ মজুমদার।

‘টিনের তলোয়ার’ করতে চেয়েছিলেন তরুণ মজুমদার, উত্তমকুমারকে ভেবেছিলেন প্রধান চরিত্রে

You might also like