Latest News

Swatilekha Sengupta: সোনালি, সুচিত্রা, মাধবী, অপর্ণা… শেষে স্বাতীলেখাতেই রূপ পেল ‘বিমলা’

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

ইংরেজদের কঠিন শাসনের নিগড় থেকে দেশমাতৃকাকে উদ্ধার করতে হবে এই পণ নিয়ে সতেরো বছরের ছেলে ক্ষুদিরাম হাসিমুখে ফাঁসির মঞ্চে চড়ে গেল। গান্ধীজির অহিংসবাদ তখনও অজ্ঞাত। ‘বন্দেমাতরম্‌’— এই মন্ত্র যখন দেশের লোকের মনবীণায় ঝঙ্কৃত হচ্ছে, দেশের জন্য প্রাণ দেওয়া যখন একটা তুচ্ছ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে, বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন চলছে, সেই সময় রবীন্দ্রনাথ লিখলেন ‘ঘরে-বাইরে’।

তৎকালীন স্বদেশী আন্দোলনের আবেগমথিত পথ এই উপন্যাসে বহন করছেন সন্দীপ। আর পথের ঠিকভুল বিশ্লেষণ করে অহিংস সত্যের রাস্তা দেখাচ্ছেন নিখিলেশ। তাঁদের মধ্যে একটি মক্ষীরানি নারী চরিত্র। যার নাম বিমলা। যে বিমলা খুঁজছেন সত্যজিৎ রায় পঞ্চাশ দশকের শুরু থেকে আর বিমলা শেষ অবধি বাস্তবায়িত করতে পারলেন আশির দশকে এসে। এই তিন দশকের বিশাল বিমলা-সফর বাংলা ছবির ইতিহাসে এক জ্বলন্ত অধ্যায়। যা নিয়ে জল্পনা-কল্পনার কম নেই। সমস্ত প্রথম সারির নায়িকারই স্বপ্নের চরিত্র ছিল বিমলা (Swatilekha Sengupta)।

‘ঘরে-বাইরে’ করার স্বপ্ন দেখলেন হরিসাধন ও সত্যজিৎ

সত্যজিৎ রায় ছবির জগতে আসার আগে যে কাহিনি ছবি করবেন বলে ভেবেছিলেন তা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ঘরে-বাইরে’। তখন সত্যজিৎ আনকোরা একজন। সেটা ১৯৪৭ সাল। সত্যজিৎ ও তাঁর বন্ধু চিদানন্দ দাশগুপ্ত মিলে তৈরি করলেন ‘ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটি’। সঙ্গে ছিলেন বংশী চন্দ্রগুপ্ত ও আর পি গুপ্ত। কলকাতায় আন্তর্জাতিক ছবি, বিশেষ করে ইউরোপীয় নিয়ো-রিয়ালিস্ট সিনেমা দেখার পীঠস্থান হয়ে ওঠে এই সংস্থা। ফিল্ম সোসাইটিরই একটি সভায় ১৯৪৮-এ সত্যজিতের আলাপ হয় হরিসাধন দাশগুপ্তর সঙ্গে। এই হরিসাধন দাশগুপ্তই পরে হন এক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন তথ্যচিত্র নির্মাতা। হরিসাধন ফিচার ফিল্মও বানিয়েছেন পরে, ‘একই অঙ্গে এত রূপ’ বা ‘কমললতা’র মতো ছবি। প্রথম আলাপেই সত্যজিৎ, হরিসাধনরা বুঝে যান তাঁদের পছন্দের মিল এবং চলচ্চিত্রে বাঁক বদলের একই স্বপ্ন তাঁরা দেখছেন।

ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটি

সবার প্রথমে হরিসাধন দাশগুপ্ত চেয়েছিলেন ‘ঘরে বাইরে’ নিয়ে ছবি করতে। চিত্রনাট্য লিখলেন সত্যজিৎ রায়, পরিচালক হরিসাধন। প্রোডাকশন ডিজ়াইনে বংশী চন্দ্রগুপ্ত, সঙ্গীত পরিচালনায় জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, ক্যামেরায় অজয় কর। যে অজয় কর পরবর্তীকালে ‘সাত পাকে বাঁধা’, ‘সপ্তপদী’, ‘হারানো সুর’-এর মতো ছবি বানিয়েছেন।

ছবি বানাব ভাবলেই হবে না, তার জন্য দরকার অর্থ। স্বপ্ন সার্থক করতে দুরূহ পদক্ষেপ নিলেন হরিসাধন। নিজের যতীন দাস রোডের বাড়ি বিক্রি করলেন হরিসাধন। এছাড়াও মায়ের কাছ থেকে ধার করলেন কুড়ি হাজার টাকা। সেসময় কুড়ি হাজার টাকার অঙ্কে অনেক। এরপর বিশ্বভারতী থেকে ‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসের ডবল ভার্সন কপিরাইট কিনলেন হরিসাধন দাশগুপ্ত। ঠিক হল নিখিলেশের চরিত্রে থাকবেন রাধামোহন ভট্টাচার্য, যিনি ‘কাবুলিওয়ালা’তে মিনির বাবার চরিত্রে বিখ্যাত, ‘ঝিন্দের বন্দী’ও করেছেন। সন্দীপের ভূমিকায় অভি ভট্টাচার্য, যার প্রথম অভিনয় নীতিন বোসের ‘নৌকাডুবি’। পরবর্তীকালে ঋত্বিক ঘটকের ‘সুবর্ণরেখা’ থেকে বলিউডের ‘জাগৃতি’ বিখ্যাত ছবিতে কাজ করেছেন অভি ভট্টাচার্য।

বিমলার (Swatilekha Sengupta) সন্ধানে সত্যজিৎ

‘ঘরে-বাইরে’র নায়িকা সেই তন্বী, শ্যামা, শিখর দশনা, পীনোন্নত পয়োধরা ও অঘটনপটীয়সী বিমলার খোঁজে বেরিয়ে পড়লেন স্বয়ং সত্যজিৎ। হাজির হলেন গিয়ে শান্তিনিকেতন। শান্তিনিকেতন থেকে সত্যজিৎ খুঁজে আনলেন তন্বী, শ্যামা, দীর্ঘাঙ্গী সোনালি সেনকে। ইনি আবার পরিচালক বিমল রায়ের আত্মীয়া। রাধামোহন ভট্টাচার্যও চিনতেন সোনালিকে। ছবির আউটডোরের জন্য শ্যুটিং-স্পট ঠিক হল উত্তরপাড়া রাজবাড়ি। ১৬ মিমি ক্যামেরায় তোলা হল বেশ কিছু প্রি-প্রোডাকশনের শট। প্রযোজক হিসেবে এগিয়ে এলেন মাখন ঘোষ। নতুন অফিস খুলে সত্যজিৎই প্রযোজনা সংস্থার নামকরণ করলেন কোনার্ক পিকচার্স। কিন্তু প্রযোজকের গড়িমসিতে ছবির কাজ ক্রমশ পিছতে লাগল। ইতিমধ্যে সত্যজিতের আবিষ্কার সোনালির প্রেমে পড়লেন হরিসাধন। সোনালি হরিসাধনকে বিয়ে করে হয়ে গেলেন সোনালি দাশগুপ্ত। সোনালি পরে অবশ্যি বিশ্ববিখ্যাত পরিচালক রবার্তো রসেলিনিকে বিয়ে করে আলাদা পরিমণ্ডলে পাড়ি দেন।

সোনালি দাশগুপ্তের প্রদর্শনীতে স্বয়ং ইন্দিরা গান্ধী

নরেশ মিত্র তাড়িয়ে দিলেন সত্যজিৎকে

মাধবী মুখোপাধ্যায় জানাচ্ছেন “ঘরে-বাইরে নিয়ে আমার বলার কথা নয়। কারণ এই ছবির সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক নেই। হ্যাঁ সত্যজিৎ রায় আমাকে বিমলা অফার করেছিলেন, কিন্তু আমি করব না জানিয়ে দিই ওঁকে। তবে ছবির ইতিহাসটা বলতে পারি। নরেশ মিত্রর ‘কঙ্কাল’ ছবির নায়িকা ছিলেন মলয়া সরকার। তরলার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। সেই মলয়া দেবীকে দেখেই ‘বিমলা’ করা যায় ভেবে ফেললেন হরিসাধন ও সত্যজিৎ। তখন ওঁরা দুজনেই আনকোরা। সত্যজিৎ বাবু তখন ‘পথের পাঁচালি’ও করেননি। নরেশ মিত্রর সঙ্গে ওঁরা যখন দেখা করলেন, সত্যজিৎ বাবু আর হরিসাধন বাবুকে ভাগিয়ে দিয়েছিলেন নরেশ মিত্র। কারণ অচেনা দুই তরুণকে সময় দেবার উপযুক্ত মনে করেননি তিনি। সে কারণেই মলয়া দেবীর সঙ্গে ওঁরা যোগাযোগ করতে পারলেন না।”

‘ঘরে-বাইরে’ থেকেই সত্যজিৎপুত্রের নামকরণ সন্দীপ

মাধবী আরও জানাচ্ছেন “আসলে ‘ঘরে-বাইরে’ পরিচালনা করবেন সত্যজিৎ রায়ের স্বপ্ন ছিল। কিন্তু কপিরাইট কিনেছিলেন হরিসাধন দাশগুপ্ত। পরে হরিসাধন দাশগুপ্ত এই ছবিটার থেকে সরে আসেন এবং কপিরাইটটা সত্যজিৎ বাবুকে দিয়ে দেন। কারণ হরিসাধন দাশগুপ্তর জীবনেও একটা মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। ওঁর ভাই ক্যামেরাম্যান ছিলেন ওঁর সব ছবির, সেই ভাই ক্যামেরা হাতে বাজ পড়ে মারা যান। ঐ শোকের থেকে ‘ঘরে বাইরে’ ছেড়ে দেন হরিসাধন দাশগুপ্ত। পরবর্তীকালে যদিও আমাকে আর সৌমিত্র বাবুকে নিয়ে ‘একই অঙ্গে এত রূপ’ বা অনেক পরে উত্তম-সুচিত্রাকে নিয়ে ‘কমললতা’ করেছেন।”

‘একই অঙ্গে এত রূপ’ ছবিতে সৌমিত্র-মাধবী

এরপর সত্যজিৎ বাবু হরিসাধন বাবুর থেকে কপিরাইট নিয়ে ছবিটা করবেন ভাবেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ‘ঘরে-বাইরে’র কাহিনীটা সত্যজিৎ বাবুর খুব ভালো লেগেছিল তাই ওঁনার ছেলের নাম রাখেন সন্দীপ। “

সুচিত্রা সেনকে বিমলা রূপে দেখলেন সত্যজিৎ

বিজয়া রায়ের লেখায় পাওয়া যাচ্ছে ‘দেবী চৌধুরাণী’র আগে সুচিত্রা সেনকে ‘ঘরে-বাইরে’র বিমলার জন্য ভেবেছিলেন সত্যজিৎ রায়। সেটা নানা কারণে বাস্তবায়িত হয়নি। সুচিত্রা করতে চাননি বিমলা এমন কোনও তথ্য নেই। ছবিটাই হয়নি। নিখিলেশ ভেবেছিলেন সৌমিত্রকে এবং সন্দীপ স্বয়ং উত্তম কুমারকে।সুচিত্রা সেনের রূপের ছটায় নিন্দুক তো কম ছিলনা। সত্যজিতের বিমলা সুচিত্রা এই সংবাদ সাহিত্য এবং সিনেমা-মহলে এক ঝড় তুলেছিল। তৎকালীন বিখ্যাত ব্যক্তি সিগনেট প্রেসের ডি.কে. গুপ্ত হাহাকার করে উঠেছিলেন এবং বলেছিলেন মানিক যদি সুচিত্রা সেনকে তাঁর ছবিতে নেয় বিমলার চরিত্রে তবে তিনি সুইসাইড করবেন। ভাবুন সুচিত্রা বিদ্বেষ! অথচ মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভালে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী সুচিত্রাই পরে হন।

সন্দীপের ভূমিকায় সৌমিত্র নয়, উত্তমই যথার্থ- বললেন মাধবী

‘অপরাজিত’ ছবির শ্যুটিংয়ের সময় সত্যজিৎ অসুস্থ হয়ে গৃহবন্দি ছিলেন বেশ কিছুদিন। সেই সময় নাকি উত্তমকুমার দেখা করতে এসেছিলেন তাঁর সঙ্গে এবং তখন সত্যজিৎ উত্তমকে সন্দীপের চরিত্রটি অফার করেন। উত্তম ভাববার জন্য কিছুটা সময় চেয়েছিলেন এবং পরে টেলিফোন করে সত্যজিৎকে ‘না’ বলে দেন। সবটাই লোকমুখে চর্চিত। শোনা যায় উত্তমের ঘনিষ্ঠমহল তাঁর কান ভারী করে বলে যে সন্দীপ এন্টি-হিরো। কোরোনা। নিজের ইমেজ ভেবে উত্তমও ‘না’ করে দেন। ভাবা যায় উত্তম-সুচিত্রা-সৌমিত্র-সত্যজিৎ এক ছবিতে হলে কী ঐতিহাসিক কাজ হত!

মাধবী আজ অকপটে বললেন “আমার মনে হয়েছিল সন্দীপ রূপে সৌমিত্র বাবুর থেকেও উত্তমকুমার অনেক বেশি পারফেক্ট। সন্দীপের আকর্ষণ ক্ষমতাটা উত্তমবাবু করলে অনেক বেশি হত।

বিমলা হবার অফার ফিরিয়ে দিলেন মাধবী

সত্যজিৎ-মাধবী জ্বলন্ত প্রসঙ্গ নিয়ে মাধবী মুখোপাধ্যায় জানালেন “বিমলা করার অফার সত্যজিৎ রায় আমাকেও দিয়েছিলেন। আমি তখন কোনও কারণেই হোক করিনি। আগেও অফার করেছিলেন ‘নায়ক’এর সময়। শর্মিলা যে চরিত্র করেন। তখনও না করে দিয়েছি। বলেছিলাম সত্যজিৎ বাবুকে “আপনার এখানে আমি আর ছবি করব না।” ‘ঘরে-বাইরে’র সময় তাই সরাসরি আর সত্যজিৎ বাবু আমাকে বলেননি। তৎকালীন সাংবাদিক সেবাব্রত গুপ্তকে দিয়ে আমায় বলে পাঠিয়েছিলেন। তখন আমি সেবাদাকে বললাম যে, না সেবাদা করব না। করিনি বলে আমার কোন আফশোস নেই। মাধবী সামনে চলে, পিছন ফিরে তাকায় না। আমি কিন্তু বিমলা করেছি। ‘হে মহাজীবন’ নামে একটা রেকর্ড বেরিয়েছিল এইচ এম ভি থেকে তাতে শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন ‘ঘরে বাইরে’র চিত্রনাট্য। এত সুন্দর হয়েছিল বলার কথা না। আমি সেই শ্রুতিনাটকে বিমলা করে খুব তৃপ্তি পেয়েছিলাম।”

‘অপর্ণা সেনকেও বিমলার জন্য ভেবেছিলেন বাবা’ – সন্দীপ রায়

সন্দীপ রায় জানালেন “বাবা ‘ঘরে-বাইরে’ নিয়ে কাজ করার কথা ভাবলেও প্রথমেই ছবি করে উঠতে পারেননি। কখনও সময় সহযোগিতা করেনি, কখনও বাবার চরিত্র অনুযায়ী কাস্টিং পছন্দ হয়নি। এক সময় তো অপর্ণা সেনকেও বিমলার জন্য ভেবেছিলেন বাবা। সেই ভাবনাও পূর্ণতা পায়নি। ‘সীমাবদ্ধ’ শ্যুটের পরেও বাবা ভেবেছিলেন ‘ঘরে-বাইরে’ করবেন। তখনও বাবা বিমলা খুঁজে পাননি। অপর্ণা সেন খুব আশা করেছিলেন তাঁর মানিক কাকার ছবিতে বিমলা হতে পারবেন। শুধু তাই নয় ‘ঘরে-বাইরে’র মতো রাজনৈতিক ছবি অপর্ণাকে খুব টানত। কিন্তু সেসব স্বপ্ন আজ আর মনে রাখতে চাননা অপর্ণা সেন। যে অপর্ণা তাঁর ‘পরমা’কে দিয়ে বলিয়েছিলেন ‘আমার তো কোনও অপরাধবোধ নেই’… নারীর স্বেচ্ছাচারিতা নয়, নারীর স্বাধীনতার নতুন রূপটান দেন যে অপর্ণা। অপর্ণা সেন পরিচালনা করলেন সেই স্বপ্নকে নিজেই নিজের মতো রূপ দিয়ে এ যুগের ‘ঘরে-বাইরে আজ’। অপর্ণার বিমলা হলেন তুহিনা দাস। নিজেকেও কি বিমলার জায়গায় বসালেন মনে মনে অপর্ণা? অপর্ণার মন পড়া শক্ত, কিন্তু একজন ডিরেক্টরকে তো চরিত্রে ডুব দিতেই হয়।

‘সানন্দা’ র জন্য মানিককাকার সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন অপর্ণা

শর্মিলা থেকে শোভা দে

সুপ্রিয়া দেবী আক্ষেপ করে বলেছিলেন “মানিকদা তো আমাকেও বিমলা ভাবতে পারতেন!” যদিও ‘চিড়িয়াখানা’র একটি রোলে একবার ভেবেছিলেন সুপ্রিয়াকে সত্যজিৎ। পরে নিজেই তা কেটে দেন সত্যজিৎ।
অন্যদিকে শর্মিলা ঠাকুরও একবার তাঁর মানিকদাকে অনুরোধ করেছিলেন বিমলা কি রিঙ্কু করতে পারেনা?
শোভা দে বলেছিলেন সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তাঁর প্রাথমিক কথা হয়েছিল বিমলা করা নিয়ে। পরে আর এগোয়নি।

শোভা দে

স্বাতীলেখাকেও অনেকদিন ফাইনাল ‘হ্যাঁ’ বলেননি সত্যজিৎ

‘গালিলেও’ নাটকে স্বাতীলেখার অভিনয় দেখে সত্যজিৎ রায় বহু বছর পর তাঁর আদর্শ বিমলা খুঁজে পান। প্রথমে বিশ্বাস করেননি স্বাতীলেখা। নাট্যকার বিভাস চক্রবর্তী সত্যজিৎ রায়কে সেই নাটক দেখতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। এরপর রবি ঘোষ স্বাতীলেখাকে ফোন করে বলেন যে সত্যজিৎ রায় আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছেন নির্দিষ্ট তারিখে। কিন্তু সেদিন বিগ্রেডে বিশাল রাজনৈতিক সমাবেশ। বাস ট্রাম সব বন্ধ। স্বাতীলেখা চিরকালই অন্য ধাতুতে গড়া। যে মেয়ে বাংলা থিয়েটারে অন্য হাওয়া এনেছিল সে তো কথার দাম রাখবেই। আশ্চর্য ঘটনা ঘটালেন স্বাতীলেখা। গাড়ি-শূন্য রাস্তায় উত্তর কলকাতা থেকে দক্ষিণ কলকাতায় সত্যজিতের বিশপ লেফ্রয় রোডের বাড়ি পায়ে হেঁটে পৌঁছে গেলেন স্বাতীলেখা। আইকনিক কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উঠে বেল টিপলেন জ্যোতিষ্কের দরজায়। সত্যজিৎ রায় নিজেই দরজা খুলে বললেন “তুমি কী করে এলে! আজ যাদের যাদের আসতে বলেছি, কেউ আসতে পারেনি। তুমি চলে এলে!” স্বাতীলেখা যে আলাদা তাঁর প্রমাণ প্রথমেই রাখলেন। সত্যজিৎ জানলেন স্বাতীলেখা পিয়ানো বাজাতে পারেন। সব সুর তাঁর হাতে খেলে। গান গাইতেও পারেন। বিমলা পেলেন সত্যজিৎ। তবে পাকা কথা দেননি তখন সত্যজিৎ।অন্তত স্বাতীলেখা তাই জানিয়েছিলেন মাধবী মুখোপাধ্যায়কে।

মাধবী জানাচ্ছেন ” তখন আমি পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘মহাচিত্র’ নামে একটা ছবি করছিলাম। সেখানে স্বাতীলেখা এসেছিলেন এবং আমায় বললেন যে সত্যজিৎ রায় এখনও আমিই বিমলা করছি কিনা সঠিক করে বলেননি। দোলাচলে ছিলেন স্বাতীলেখা। তারপর শেষ মুহূর্তে স্বাতীলেখাকে ‘বিমলা’ করলেন। খুব আনন্দ পেয়েছিলেন স্বাতীলেখা। আনন্দ পাবার মতোই কথা। আমার তো ভালই লেগেছিল স্বাতীলেখাকে। শুনেছিলাম এলাহাবাদে উনি শুধু ‘চারুলতা’ ছবিটাই হলে গিয়ে বহুবার দেখেছিলেন। তবে আমার ব্যক্তিগত মত ‘চারুলতা’ যেমন সত্যজিৎ রায়ের নিখুঁত ছবি। ‘ঘরে বাইরে’তে মূল কাহিনির থেকে অনেক বদল হয়। আবার একটা কথা বলছি, ছায়াছবিতে দেখলাম নিখিলেশ-বিমলার শোবার ঘরে সন্দীপের ছবি। এটা রবীন্দ্রনাথ লেখেননি। একজন তৃতীয় ব্যক্তির ছবি স্বামী-স্ত্রীর বেডরুমে থাকেনা। এ ব্যাপারটা সত্যজিৎ রায় পরিচালক বলেই কেউ আর মুখ খোলেননি। তবে সত্যজিৎ রায়ের সব ছবিই অসাধারণ। থিয়েটার তো সংরক্ষণ হয়না। আমি তো খুশি স্বাতীলেখার একটা ভালো কাজ ফিল্ম হয়ে থাকল। গতানুগতিক নায়িকাদের থেকে স্বাতীলেখার মধ্যে আলাদা কিছু নিশ্চয়ই সত্যজিৎ রায় পেয়েছিলেন তাই বিমলা করেন।”

মক্ষীরানি বিমলা স্বাতীলেখা  (Swatilekha Sengupta)! দর্শকের নিন্দার ঝড়!!

বিমলা চরিত্রটি ছিল দর্শকদের বহুকাঙ্ক্ষিত। বিমলা রূপে স্বাতীলেখাকে প্রচুর দর্শক মেনে নিলেও বহু দর্শক মানেননি। তাঁদের জড়সড় লেগেছিল স্বাতীলেখার অভিনয়। অপর্ণা সেন বা শর্মিলা ঠাকুরকেই বিমলা চেয়েছিল সেইসব দর্শক আশির দশকে দাঁড়িয়ে। আবার অনেকে বলেছিলেন বিমলার তো রূপের ছটা ছিলনা তাঁর দুই জা-এর মতো। অনেকটা কাদম্বরী দেবীর মতো মনোযোগ পিয়াসী বিমলা। অপর্ণা কিছু না বললেও শর্মিলা বেশ বুঝিয়েছিলেন সাক্ষাৎকারে তিনি বিমলা রূপে মানিকদার চয়েস দেখে খুশি নন। স্বাতীলেখাকে সত্যজিৎ রায় বিশাল বিশাল চিঠি লিখে পাঠাতেন যে কারুর কথায় কান দিওনা, তুমি তোমার শ্রেষ্ঠ কাজ করেছ। স্বাতীলেখা সেই পত্রাদি আশীর্বাদী রূপে সারাজীবন সযত্নে রেখে দিয়েছিলেন। এমনকি বিমলার শাড়ি যা সত্যজিৎ রায় স্বাতীলেখাকে দেন, সেটি স্বাতীলেখা তাঁর মেয়ে সোহিনীকে আশীর্বাদস্বরূপ দিয়েছেন। 

সবকিছুর ঊর্ধ্বে গিয়ে বিমলা আজ স্বাতীলেখাই। বিমলার ঘরের অন্দরমহল থেকে বাহিরমহলে বেরিয়ে আসার দৃশ্য চিরকাল বিশ্ব চলচ্চিত্রে ঐতিহাসিক হয়ে থাকবে।

কাগজের বিজ্ঞাপনে সম্বন্ধ, ২২ বছর পার শতাব্দী-মৃগাঙ্কর! এক্সক্লুসিভ আড্ডায় ফিরে দেখা বিয়ে, দাম্পত্য

You might also like