Latest News

Suchitra Sen: সুচিত্রা সেনের অন্তর্বাসও স্মারক হিসেবে রেখে দিয়েছিলেন ভক্তরা

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

চন্দ্রাবতী দেবী এই শান্তির নীড়ে এসে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে যেতেন। ছায়া দেবী এই বাড়িতেই এসে খুঁজে পেতেন আপনজনের সান্নিধ্য। আবার সত্যজিৎ রায় এই বাড়িতেই করতে চেয়েছিলেন তাঁর ‘পিকু’ ছবির শ্যুটিং। কিন্তু অনুমতি দেননি প্রাসাদবাড়ির রানি। একা মেয়ে, সে বাড়ির রাজরানি। সুচিত্রা সেন (Suchitra Sen)। আর তাঁর সেই প্রাসাদ বাড়ি ছিল ৫২/৪/১ বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে। যে বাড়ি ঘিরে দশকের পর দশক বাঙালির জল্পনা ও কল্পনা কম ছিল না।

সুচিত্রা সেনের কি দরকার পড়েছিল এমন প্রাসাদ বাড়ির মালকিন হওয়ার? পাবনার মেয়ে রমার তো বিয়ে হয়েছিল কলকাতার বিত্তশালী শিল্পপতি আদিনাথ সেনের ছেলে দিবানাথ সেনের সঙ্গে। বালিগঞ্জ প্লেসে ছিল রমার শ্বশুরবাড়ি। সে বাড়িও দেখার মতো। কলকাতা শহরে তখন নামী শিল্পপতিদের মধ্যে এই সেন পরিবার প্রথম সারিতে থাকতেন।দেশভাগের সময় ওপার বাংলা থেকে যখন হাজার হাজার মানুষ এ পারে চলে আসছেন, কত মেয়েই হারিয়ে গেছেন চোরা পথের বাঁকে, সেই সময়ই রমার ভাগ্যবদল হয়। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে রূপের জোরে হয়ে যান উচ্চবিত্ত পরিবারের বউ। তারপর সেই রমাই হল রপোলি পর্দার রহস্যময়ী সুচিত্রা সেন (Suchitra Sen)। যেখানে সাবিত্রী, সুপ্রিয়া, সন্ধ্যা রায়দের অভাবের তাড়নায় হাজির হতে হয়েছিল স্টুডিওপাড়ায়, সেখানে সুচিত্রা সেন কিন্তু এসেছিলেন শিল্পপতি পরিবারের বউ হওয়ার পরেই। কতকটা স্বামীর পাশে সংসারের হাল ধরতেই সুচিত্রার সিনেমায় আসা। সাবিত্রী-সুপ্রিয়াদের জীবন যুদ্ধে টিকে থাকার লড়াই ছিল, কিন্তু সুচিত্রার ছিল শিল্পপতি পরিবারের বউ হয়েও ঠাঁটবাট বজায় রাখার তাগিদ।

তবে সুচিত্রা সেন নিজে কোনওদিন রূপের জোরে সিনেমায় নামতে চাননি। গায়িকা হতে অডিশন দিয়েছিলেন, একবার তো ফিল্মের অফার পেয়েও ছেড়ে দেন। তবু একসময় সুচিত্রাকে স্টুডিওপাড়ায় আসতেই হল। দিবানাথের চাকরিবাকরি ছিল না সেসময়। সংসার ধরে রাখতে বউকেই সিনেমায় নামানো। স্বামীর পাশে দাঁড়াতেই রমার ফিল্মলাইনে আসা। কিন্তু সেটাই ওঁদের কাল হল। স্ত্রীর তুমুল খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা স্বামীর পুরুষত্বে লাগল। যখন সারা বাংলা সুচিত্রায় মুগ্ধ, তখনই ঘর ভাঙছে সুচিত্রার (Suchitra Sen)। যত নাম বাইরে, ততই ঘরে এসে বদনাম। সিনেমা সুচিত্রাকে ‘গ্ল্যামার’ দিলেও, ব্যক্তিগত জীবনটা শেষ করে দিয়েছিল।বেকার দিবানাথ হামেশাই বউয়ের কাছ থেকে টাকা চাইতেন। তারপর মদ খেয়ে উড়িয়ে দিতেন। চলত হাতাহাতি পর্যন্ত। সুচিত্রা আউটডোরে গেলে সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি করতেন দিবানাথ। সুন্দরী বউয়ের প্রতি অতিমাত্রায় পজেসিভ বর। এই সম্পর্ক আর কতদিন ঠিকভাবে মেনে নেওয়া সম্ভব? তাই সুচিত্রা বালিগঞ্জ প্লেসের শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে এই বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের ‘প্রাসাদ’সম বাড়িটি কেনেন।

তবে এই প্রাসাদ বাড়ি খুব সহজে পাননি সুচিত্রা (Suchitra Sen)। শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে, মেয়েকে নিয়ে, একা বধূর কলকাতা শহরে এভাবে থাকা সহজ ছিল না। কিন্তু সুচিত্রার হাতে তখন একের পর এক ছবির অফার। তাই মাঝে মাত্র কিছু দিন টালিগঞ্জ আর নিউ আলিপুরে বাড়ি ভাড়া নেন সুচিত্রা। এরপর মেয়ে মুনমুনকে নিয়ে একা সুচিত্রা কেনেন এই প্রাসাদসম বাগানবাড়ি।এ যেন স্বর্গের অমরাবতী। কলকাতা শহরে তখন দেখার মতো বাড়ি। দেশের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী শচীন্দ্র চৌধুরীর বাড়ি ছিল এটি। ১৯৬০ সালে তাঁর থেকেই ১৯ কাঠা জায়গার উপর গড়া এই বাড়ি কিনে নেন বাংলা ছবির হায়েস্ট পেইড নায়িকা সুচিত্রা। তাঁর সমসাময়িক নায়িকাদের যেখানে হাজার অঙ্কে পারিশ্রমিক ছিল। সেখানে সুচিত্রার ছিল লাখ অঙ্কে পারিশ্রমিক। তাই বলে টাকার অঙ্কে সুচিত্রা কোনওরকম আপস করেননি।

তাই পরে যখন সুচিত্রা সেন (Suchitra Sen) সিনেমা করা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তখন উত্তম কুমারের পারিশ্রমিক দেড় লাখ টাকা। সেখানে সুচিত্রাকে প্রোডিউসার অফার দেন সাত লাখ টাকা পর্যন্ত, তাতেও সুচিত্রা ছবি সাইন করেননি। যখন সুপ্রিয়া দেবীর শো করে রোজগার হতো সাড়ে সাত হাজার টাকা, সেসব শোয়ে ৮০ হাজার টাকা দিয়েও সুচিত্রা সেনকে নামানো যায়নি। এতটাই তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তা। তাঁর পক্ষেই কলকাতার সেরা ঠিকানার বাড়িটি কেনা সম্ভব, যে বাড়ি দেখে চোখ ধাঁধিয়ে যেত বম্বের ফিল্মস্টারদেরও।

সুচিত্রা সেনের বাড়ি যে খুব বড় রাস্তার ওপর তা কিন্তু নয়। বেশ কিছুটা সবুজ গাছগাছালির গলিপথ পেরিয়ে ঢুকেই বেশ ভেতর দিকে তাঁর এই পাঁচমহলা বাগানবাড়ি ছিল। সেই ষাটের দশক থেকে সুচিত্রা ভক্তরা হাজির হতেন এই বাড়ির সামনে। বাড়ি দেখার সঙ্গে যদি বাড়ির মালকিনকেও এক লহমায় দেখা হয়ে যায়! কিন্তু ফটকে সদাজাগ্রত প্রহরী। তিনি কাউকেই ঢুকতে দেন না। বরং ‘কৌন হ্যায়’ হাঁক দিয়ে সরিয়ে দেন গেট থেকে দূরে।তাই গেটের ফাঁক দিয়েই দেখতে হতো সে স্বপ্নের বাড়ি। ফুলের বাগান, বাগানে সবুজ ঘাসের গালিচা, তার ওপর খালি পায়ে হেঁটে বেড়াতেন সুচিত্রা সেন (Suchitra Sen)। এক পাশে লাল সুরকির রাস্তা গিয়ে পৌঁছেছে গাড়ি বারান্দার তলায়। কিছু মোটর গাড়ি অচল, কিছু সচল। খারাপগাড়ি গুলিও যেন নস্ট্যালজিয়া। প্রাসাদের নীচের তলায় লোকজন দেখা যায় না। উপরের তলাগুলিতে বিশাল বারান্দা-ঘেরা ঘর। কিন্তু বারান্দার ভিতর আর কিছু দেখার জো নেই, সব চিকের আড়ালে।

দোতলার কাঠের সিঁড়ি দিয়ে যে কজন সাংবাদিক বন্ধু, সুচিত্রার কাছের অভিনেতা-অভিনেত্রী বা তাঁদের ছেলেমেয়েরা উঠেছেন, তাঁদের বর্ণনায় সুচিত্রার অন্দরমহল দেখার মতো ছিল।সিঁড়ি দিয়ে উঠলে প্রথমে বাহিরমহল। সুচিত্রার সঙ্গে প্রথম কেউ আলাপ করতে এলে তাঁকে বসতে দেওয়ার নির্দেশ ছিল এই বাহিরমহলের বারান্দায়। যদিও এই অনুমতি পেয়েছেন বিরল কিছু মানুষ। বাহিরমহল পেরিয়ে দরজা ঠেলে ঢুকলে রসুইখানা। খাবার-দাবার, ডাইনিং টেবিল। রসুইখানার লাগোয়া অতিথিশালা। এসব ঘর এমনিতে ফাঁকাই পড়ে থাকত। অথচ এত বিশালাকার ঘর যে গোটা একটি বড় পরিবার থাকতে পারে।

সুচিত্রা সেন (Suchitra Sen) কী খেতেন, এ নিয়ে অনেকের কৌতূহল ছিল। কিন্তু আদতে তাঁর বলা চলে পাখির আহার ছিল। খিচুড়ি, ছোট মাছ আর জিলিপি ছিল তাঁর পছন্দের খাবার। জিলিপি প্রসাদ দিতেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকেও। ডাইনিং টেবিল থেকে শোওয়ার খাট, সব আসবাবপত্র মেহগনি কাঠের তৈরি ছিল।

বাঁদিকে একটা সুসজ্জিত বিরাট ঘর। সেটি সুচিত্রার মেয়ে মুনমুনের। কিন্তু সেই ঘরও আগে ফাঁকাই থাকত। কারণ কিশোরীবেলায় মুনমুনকে কনভেন্ট বোর্ডিংয়ে রেখে মানুষ করেছিলেন সুচিত্রা। পরে মেয়েকে নিজের কাছে এনে রাখেন এই ঘরেই। ততদিনে মুনমুন পূর্ণ যুবতী।মুনমুনের মহলের পাশে সেই কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু, সুচিত্রা সেনের অন্দরমহল। বড় পালঙ্কে শোভিত সে ঘর। কিন্তু গৈরিকা সুচিত্রা সেন এতে শুতেন না। পাশে রাখা ছোট্ট একটি তক্তপোশে সুচিত্রা সেনের শোয়ার ব্যবস্থা। তাতে না আছে নরম গদি না আছে নরম বালিশ। আসলে স্পনডিলাইটিসের ব্যথার জন্যই সুচিত্রা এ ব্যবস্থা মেনে চলতেন। তবে ওঁর ঘরের জানলাটি ছিল বড় সুন্দর। বড় জানলা দিয়ে ঘরের ভিতর ঢুকে আসত ফুলেভরা গাছের ডাল। কলকাতা শহরে থেকেও মনে হত এ যেন কলকাতার থেকে অনেক দূরের কোনও বাংলো বাড়ি।

সুচিত্রার শোয়ার ঘরের সঙ্গেই লাগোয়া একটি ঠাকুরঘর। রামকৃষ্ণদেবের বিরাট ছবি সেখানে। সঙ্গে সারদা মা ও স্বামী বিবেকানন্দ। সুচিত্রা ঘনিষ্ঠ সাংবাদিকরা লিখেছিলেন, সুচিত্রা সেন সকাল নটায় স্নান সেরে ঢুকতেন ঠাকুরঘরে। সকাল গড়িয়ে দুপুরে বেরোতেন তিনি। বেশিরভাগ সময়ই তাঁর কেটে যেত ঠাকুরঘরে।

তবে পরবর্তীকালে মুনমুন সেন নিজেই বলেছেন, “মা মোটেই সর্বক্ষণ ঠাকুরঘরে পড়ে থাকতেন না।”

আদতে সুচিত্রা (Suchitra Sen) ঈশ্বরকে তাঁর মননে ধারণ করেছিলেন। তাই একলা থেকেও তিনি একা ছিলেন না। রুপোলি পর্দার টান অগ্রাহ্য করেছিলেন অনায়াসেই। মেডিটেশন করতেন অনেকক্ষণ। প্রচুর ঈশ্বরবাদের উপর বাংলা ও ইংরেজি বই পড়তেন। গীতার বাণী ছিল সুচিত্রার মুখস্থ। নিজে কখনও সিনেমার কথা বলতেন না। কাগজে তাঁর নামে কে কী লিখল, সেসব রটনাও দেখতেন না, জানতে চাইতেন না। কিন্তু কাছের মানুষরা সিনেমাপাড়ার বর্তমান হালহকিকত বললে, তা মন দিয়ে শুনতেন। আবার কেউ খুব বেশি সিনেমার কথা বললে ধমকও দিতেন মহানায়িকা।

ওঁর বাড়ির সেই বিখ্যাত বাগানে দু’টি জাপানি স্প্যারাে ছিল। একটা টিয়া পাখিও পুষেছিলেন। কুকুর তাে ছিলই। ছিল একটা বাঁদরও। ১৯৭৯ সাল নাগাদ ওই বাঁদর বাঁদরামি করে, সুচিত্রাকেই মারধর করে পালিয়ে যায়। তবে সুচিত্রার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী ছিল একঝাঁক পায়রা আর কাকের দল। সুচিত্রা আঁচল ভরে চাল এনে তাদের ছড়িয়ে দিতেন আর তারা ভিড় করে সব খেত।

সুচিত্রা সেনের বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের বাড়িতেই ছবির অফার নিয়ে গেছিলেন সত্যজিৎ রায় থেকে রাজ কাপুর। সেসব অফার চুক্তিতে মতে না মেলায় সুচিত্রা ফিরিয়ে দিয়েছেন। আবার এই বাড়িতে বসেই গুলজারের ‘আঁধি’র চুক্তিপত্রে সই করেছেন। তবে গুলজারকেও অনেকবার ঘুরিয়েছিলেন মিসেস সেন। চিত্রনাট্য বদল করতেও নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরে গুলজারের কথাতেই মনস্থির করেন ম্যাডাম।

একবার তো সুচিত্রা সেনের (Suchitra Sen) বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের বাড়িতেই নিজের ছবির শ্যুট করতে চাইলেন সত্যজিৎ রায়। ছবির নাম ‘পিকু’। অপর্ণা সেন, ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায় কাস্টিং। প্রস্তাব গেল সুচিত্রার কাছে। পত্রপাঠ সুচিত্রা বিদায় জানালেন। বলে দিলেন “আমার বাড়িতে কোনও শ্যুট হবে না।” হয়তো সত্যজিতের ‘দেবী চৌধুরাণী’ ছবি করার চুক্তির খারাপ অভিজ্ঞতা ভুলতে পারেননি সুচিত্রা। বাড়িতে ছবির শ্যুট হলে প্রাইভেসিও নষ্ট। সত্যজিৎ সুচিত্রার বাড়ির লাগোয়া পাশের একটি বাড়িতে শ্যুট করলেন।

তবে সুচিত্রা সেনের এই বাড়িতে কিন্তু একটি ছবির শ্যুট হয়েছিল। বিজয় বসুর ‘নবরাগ’। ১৯৭১ সালের ছবি। পঞ্চাশ বছর আগের কথা। ছবিতে উত্তম-সুচিত্রার যে বাড়িটি দেখানো হয়েছিল সেটা আদতে সুচিত্রা সেনের বাড়ি। পরিচালক বিজয় বসুর সঙ্গে সুচিত্রার হৃদ্যতা ছিল। ‘নবরাগ’ ছবির নানা ক্লিপিং-এ সুচিত্রা সেনের বাড়ি আজও দেখা যায়, যা একটা বড় ডকুমেন্টেশন বৈকী। কিন্তু গুটিকয়েকজন বাদে কেউই জানেন না, ওই সিনেমার বাড়িটি সুচিত্রা সেনের। উত্তম কুমার, সুচিত্রা সেন, জহর রায়, বিকাশ রায় এ বাড়ির বাগানে, বারান্দায়, ঘরে শ্যুট করেছিলেন।

ছবির জগৎ থেকে অবসর নেওয়ার পরে সুচিত্রার দিনগুলো কাটত দুই নাতনির সঙ্গে, হিয়া আর নয়না। তাদের আমরা রিয়া-রাইমা বলেই জানি। সুচিত্রা সেন তাঁদের আম্মা।

সুচিত্রা সেন কেন ফিল্ম ছাড়লেন সে প্রশ্ন সবার মনে। রূপ যৌবন হারানোর ভয়ে? তবে বয়সোচিত সৌন্দর্য্য ওঁর বরাবরই ছিল। ফিগারও চিরকালই অসম্ভব সুন্দর। কিন্তু সেই বয়সোচিত রূপের সময়োচিত চিত্রনাট্য ভাল পরিচালক বা ভাল গল্প সুচিত্রা পাননি। গুজব বা জল্পনা বাদ দিয়ে ভাবলে এটাই মনে হয় শেষমেশ।

আশির দশকে যে ধরনের ছবি হত তাতে সুচিত্রা সেন মিসফিট ছিলেন। মা-মাসি হতে তিনি চাননি। সুচিত্রা সেন মস্কোর পুরস্কার বাদে ফিল্ম সমালোচক মহলেও কি খুব সম্মান পেয়েছেন? তিনি সত্যজিৎ-মৃণালের নায়িকা নন বলে তাঁকে ব্যঙ্গই করা হয়েছে। রূপ ভাঙিয়ে খান বলা হয়েছে। তাই কিছুটা রাগে বা অভিমানেই তিনি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন ছবির জগত থেকে। কারণ তাঁর মুখের সামনে কোনও নতুন পরিচালক সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়বে কিংবা কোনও নবাগতা অভিনেত্রী তাঁর মেক আপ রুম শেয়ার করতে চাইবেন– এসবের মুখে পড়তে চাননি মহানায়িকা, যা তাঁর সমসাময়িক লেজেন্ডরা ফেস করেছেন।

সুচিত্রা সেনের প্রাসাদ বাড়িই ছিল তাঁর লক্ষ্মী। তাই তিনি কাজ না করেও চার দশক সুন্দর জীবনযাপন করেছেন। একমাত্র মেয়ে মুনমুন রাজপরিবারে বিয়ে করে খুব সুখী হন। ফিল্মের নায়িকাও হন। তাই সব মিলিয়ে সুচিত্রা সেন ঝাড়া হাত-পাই ছিলেন, যে সন্তানসুখ পাননি তাঁর সমসাময়িক অনেকেই।

কিন্তু নব্বই দশক শুরু হতেই এই প্রাসাদ বাড়ির গায়ে লাগল ঝোড়ো হাওয়া। ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত হল সুচিত্রা সেনের রাজপ্রাসাদ।  আজকাল অনেক সুচিত্রা-ভক্তই বলেন, কেন সুচিত্রা সেনের বাড়ি সংরক্ষণ হল না। তার কারণ মালকিন যদি নিজেই বাড়ি বিক্রি করে দেন, সরকারের তরফ থেকেও কিছু করার থাকে না। আর কতই বা সরকারি উদ্যোগে এসব সংরক্ষিত  হয়েছে!

তবে সুচিত্রার বাড়ি ভেঙে ফেলার কারণ ছিল বেশ কিছু। কারণ, তখন আরবান ল্যান্ড সিলিং অ্যাক্ট অনুযায়ী কেউ ন’কাঠার বেশি জমি রাখতে পারত না। ফলে বাড়িটা ভাঙা হয়। অনেকে বলেছিলেন বাড়িটিকে ‘হেরিটেজ’ তকমা দিতে। কিন্তু পরে আর তা হয়নি। তাছাড়াও ওই বিশাল বাড়ি দেখভালে প্রচুর খরচ হত। সর্বোপরি সুচিত্রা সেন বাড়ি বিক্রি করে যা টাকা পেয়েছিলেন তাতেই তিনি শেষ জীবন কাটাবেন মনস্থির করেন। অন্তরালে নিশ্চিন্তে থাকতে পেরেছিলেন এ কারণেই।তবে বাড়ির বিক্রির সময় দরদাম নিয়ে ঠকেওছিলিন বিস্তর। কয়েক লক্ষ টাকা চোট হয় সুচিত্রা সেনের। শুধু তাই নয়, সেই সময় একটি মিউচুয়াল ফান্ডে টাকা রেখেও ঠকেছিলেন সুচিত্রা। তবে বাঁচার তাগিদে, প্রাসাদ থেকে আবাসন হওয়ার পরে রহস্যময়ী সুচিত্রা সেনকেও প্রাইভেসি ভাগ করতে হয়েছিল বাকি বাসিন্দাদের সঙ্গে। তবে সুচিত্রা ম্যাজিক ছি এটাই, তিনি রাতের দিকে বেরোলেও কখনও কোনও ফ্ল্যাটের আবাসিক তাঁকে দেখতে পাননি এত বছরেও। লিফটম্যান, দারোয়ানদের রিমোট থাকত সুচিত্রার হাতেই।

নব্বই দশকে বাড়ি ভাঙার সময়ে সুচিত্রা সেন চার বছর ভাড়া ছিলেন দেওদার স্ট্রিটের একটি ফ্ল্যাটে। বর্তমানে দেওদার স্ট্রিট, বালিগঞ্জের দুটো ইলেকট্রিক ট্রান্সফর্মার  সুচিত্রা সেনের ছবি এঁকে সাজানো হয়েছে। ৭বি, দেওদার স্ট্রিটে এই ট্রান্সফর্মারের কাছের বাড়িতেই থাকতেন রহস্যময়ী অধরা মাধুরী।

সুচিত্রার নিজের বাড়ি ভাঙার সময় বহু দুর্লভ জিনিস ছড়িয়েছিটিয়ে গেছিল। সুচিত্রা যত্ন করে যেসব জিনিস দিয়ে ঘর সাজিয়েছিলেন, সব এলোমেলো হয়ে গেছিল। এত জিনিস রক্ষা করবে কে? সঙ্গে হারিয়ে গেছিল মুনমুনের আঁকা কত ছবি, মুনমুনকে মাস্টারমশাই যামিনী রায়ের এঁকে দেওয়া ছবি। এদিক-ওদিক ছড়িয়ে গেছিল সুচিত্রার কত পুরস্কার, ব্যবহার্য জিনিস। এ খবরও চাপা ছিলনা। সংবাদপত্রে বড় বড় করে শিরোনাম হল, ‘সুচিত্রা সেনের বাড়ি ভাঙা হল, সুচিত্রা উঠে গেলেন দেওদার স্ট্রিটে’।এই খবর দেখেই বাঁধভাঙা জলের মতাে লােক ঢুকেছিল বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের সুচিত্রা-সাম্রাজ্যে। যাঁরা এতদিন ঢুকতে পারেননি, তাঁদের যেন সেদিন ছিল সুবর্ণ সুযোগ। বেশিরভাগই অবশ্য সুচিত্রা ভক্ত। আর ছিল পথচলতি লোকজন। তাঁরা যে সুচিত্রার ব্যবহার করা কত জিনিস স্মারক হিসেবে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন, তার ইয়ত্তা নেই।

এমনকি, কিছু ভক্ত তাে ওই স্তূপের মধ্যে থেকে পাওয়া সুচিত্রা সেনের একটা অন্তর্বাসও গলায় বেঁধে দৌড়চ্ছে, এমন চিত্রও দেখা গেল। লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা সুচিত্রা সেনকে তো দেখা যাবে না, তাই তাঁর ব্যবহার করা জিনিসেই যেন সুচিত্রাকে কাছে পাওয়া। তাই সেসব যত্ন করে সংগ্রহে রেখেছিলেন সুচিত্রা-ভক্তরা। কেউ আবার বাড়ি ভাঙা ইট তুলে এনে সংগ্রহে রেখেছিলেন।

এসব দেখে সুচিত্রার কাছের মানুষদের অবশ্য খারাপই লেগেছিল। কারণ সবারই জানা, সুচিত্রা বাড়িটাকে কী যত্নে ভরিয়ে তুলেছিলেন। সেই বাড়ি ভেঙে হল বর্তমানের অভিজাত আবাসন, ‘বেদান্ত’ অ্যাপার্টম্যান্ট। ঠিকানা একই রইল। একটা ফ্লোর সুচিত্রা আর মুনমুনের পাশাপাশি। বর্তমানে দীর্ঘদিন মুনমুন সেনের বাড়ি এটাই। রাইমা ও রিয়াও এখানে থাকেন বেশি সময়। সুচিত্রা আর মুনমুনের ফ্ল্যাটের মাঝে আছে যাতায়াতের দরজা। বাইরের লোকের প্রবেশ ছিল। সুচিত্রার বেডরুমের সামনে লিভিং রুম। বাঘছালের প্রিন্টে সোফা। সেখানেই বসতেন, বই পড়তেন সুচিত্রা। বাড়িতে পরতেন আলখাল্লার মতো হাউসকোট বা স্কার্ট।

সুচিত্রা সেনের মৃত্যুর পর তাঁর ফ্ল্যাটটি সুচিত্রার নানা ছবি দিয়ে মুনমুন সাজিয়েছেন।

বেদান্ত অ্যাপার্টমেন্টের সামনে লেখক।

‘বেদান্ত’ আবাসনে আজ আর সুচিত্রা সেন নেই। কিন্তু তাঁর বাড়ি দেখতে আজও দূরদরান্ত থেকে হাজির হন সুচিত্রা-ভক্তরা। বাংলাদেশ থেকেও পাবনার মেয়ের বাড়ি দেখতে ভক্তরা আসেন। প্রবেশাধিকার নেই। গেটের বাইরে থেকেই তীর্থদর্শন। প্রাসাদবাড়ির সেই বড় বারান্দা থেকে বর্তমানের এক কামরার চিকে ঢাকা বারান্দা দেখেই মানুষ শান্তি পায়। ‘ওখানেই থাকতেন সুচিত্রা সেন’ এটা ভেবেই যেন সুচিত্রা দর্শন হয়ে যায় আজও মানুষের। এটাই সুচিত্রা সেন, এটাই সুচিত্রা ম্যাজিক।

সুচিত্রা বলল ‘আমার হিরো কোথায়?’ সেদিন একদমই ‘কেউ না’ সুপ্রিয়া

You might also like