Latest News

বামাক্ষ্যাপা ও তাঁর সমসাময়িক মনীষীদের অপমান করছে ‘মহাপীঠ তারাপীঠ’, কুসংস্কার ছড়াচ্ছে, সিরিয়াল বন্ধের দাবি সাবর্ণ পরিবারের

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

রাজা রামমোহন রায়ের প্রচেষ্টায় পাশ হল সতীদাহ বিরোধী আইন, বিদ্যাসাগরের হাত ধরে এল বিধবা বিবাহ আইন, স্বামী বিবেকানন্দর শিকাগো বক্তৃতা, বঙ্কিমচন্দ্র রবীন্দ্রনাথ থেকে সুভাষচন্দ্রের সময়কাল, ঠিক সেই নবজাগরণের সময়েই আবির্ভাব বামাক্ষ্যাপার। তিনি শুধু একজন তান্ত্রিক বা সাধক নন, তিনিও এক নবজাগরণের পথিক। কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে এসে ভারতবাসী দেখতে শুরু করেছিল নতুন আশার আলো।
অথচ ‘মহাপীঠ- তারাপীঠ’ সিরিয়ালে কুসংস্কার, বুজরুকি, ভণ্ডামি দেখিয়ে বামদেব ও সমস্ত মনীষীদের যুগকে অপমান করা হচ্ছে। মিথ্যা সিরিয়াল বন্ধের আর্জি জানাল খোদ সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার।

সাবর্ণ রায়চৌধুরী বাংলার একটি ঐতিহাসিক জমিদার পরিবার। ব্রিটিশদের আগমনের পূর্বে এই পরিবার ছিল কলকাতার জমিদার। ১৬৯৮ সালের ১০ নভেম্বর সুতানুটি, কলিকাতা ও গোবিন্দপুর গ্রাম তিনটির সত্ব সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের কাছ থেকে ইজারা নেয় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।

২০০১ সালে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার পরিষদের পক্ষ থেকে কলকাতা হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করে দাবি করা হয় যে, জব চার্নক সত্যই কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা কিনা তা খতিয়ে দেখা হোক। হাইকোর্ট একটি বিশেষজ্ঞ কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে ২০০৩ সালের ১৬ মে রায় দেন যে, জব চার্নক কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা নন এবং ২৪ অগস্ট (যে তারিখটিতে জব চার্নক সুতানুটিতে উপনীত হয়েছিলেন) কলকাতার জন্মদিনও নয়।
সাবর্ণ রায়চৌধুরীর দুর্গাপূজা সে তো জগৎ বিখ্যাত আজও। সব কটি বাড়িতেই পুজো হয় এবং মূল সাবর্ণদের বসবাস বেহালা বড়িশার সখেরবাজার অঞ্চলে।

সাবর্ণদের দুর্গাপুজো বড়িশা আটচালা

আদি সতীপীঠগুলির সঙ্গেও জড়িয়ে আছে সাবর্ণ পরিবারের ইতিহাস। কলকাতার সাবর্ণ রায় চৌধুরীদের সঙ্গে কালীঘাটের সংযোগ সেই ১৫৬৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে। কালীক্ষেত্রের মা কালী মূর্তিটি সাবর্ণদের কূলমাতা মা ভুবনেশ্বরীর আদলে। সাবর্ণ বংশের শ্রী সন্তোষ রায়চৌধুরী কালীঘাটের বর্তমান মন্দির তৈরি করেন ও তার কাজ সমাপ্ত করেন শ্রী রাজীবলোচন রায়চৌধুরী ১৮০৯ খ্রিষ্টাব্দে।

প্রাচীন কালীঘাট মন্দির ফাইলচিত্র

সুতরাং সতীপীঠ কালীঘাট, তারাপীঠের আদি ইতিহাস সাবর্ণ পরিবারের নখদর্পনে। তাঁরা যখন স্টার জলসায় ‘মহাপীঠ- তারাপীঠ’ সিরিয়ালটি দেখছেন পদে পদে হোঁচট খাচ্ছেন বিকৃত ইতিহাস দেখে।

সতীপীঠ তারাপীঠ

সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার পরিষদের সম্পাদক শ্রী দেবর্ষি রায়চৌধুরী ‘দ্য ওয়াল’কে জানালেন,

“যে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বাংলার মনীষীরা লড়েছিলেন তাঁদের প্রত্যেককে অপমান করা হচ্ছে এই ‘মহাপীঠ তারাপীঠ’ সিরিয়ালে।
তখন ইংরেজ দেশ শাসন করছে। ১৮২৯ সালে রাজা রামমোহন রায়ের প্রচেষ্টায় পাস হল সতীদাহ বিরোধী আইন। ১৮৫৬ সালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মশাইয়ের হাত ধরে এল বিধবা বিবাহ আইন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্মগ্রহণ করলেন ১৮৬১ সালে। স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগোতে ভারতীয় সনাতন ধর্মের উপর দিলেন সেই বিশ্বখ্যাত ভাষণ ১৮৯৩তে। সুভাষচন্দ্র বসু জন্মগ্রহণ করলেন ১৮৯৭ সালে। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন হল ১৯০৫ সালে। উত্তাল হল বাংলা। রবীন্দ্রনাথ শুরু করলেন রাখিবন্ধন উৎসব। মোহনবাগানের এগারো জন যোদ্ধা ইংরেজদের হারিয়ে আই এফ এ শিল্ড জিতলেন ১৯১১সালে। আর এই একই সময়কালে ১৮৩৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন সাবর্ণ পরিবারের জামাই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, যার স্ত্রী সাবর্ণ পরিবারের মেয়ে হালিশহরের রাজলক্ষ্মী রায়চৌধুরী।

১৮৩৮ সালেই জন্মগ্রহন করেন বামাচরণ চট্টোপাধ্যায়। এই বামাচরণ হলেন আমাদের শ্রদ্ধেয় সাধক বামাক্ষ্যাপা। অর্থাৎ বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, স্বামী বিবেকানন্দ এবং সাধক বামাক্ষ্যাপার কর্মকাণ্ড একই সময়কালের। বামাক্ষ্যাপা মারা যান ১৯১১ সালে, আবার সেই বছরই জন্মগ্রহণ করছেন বাংলা গীতির জাদুকর, সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের কৃতি সন্তান প্রণব রায়। এই সময়কাল ছিল ভারতীয় সভ্যতা তথা রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থায় এক বিপ্লবের সময়। কুসংস্কার আর পুরোনো চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে এসে ভারতবাসী দেখতে শুরু করেছিল নতুন আশার আলো। শুরু হয়েছিল সময় বদলাবার পালা।

বামাক্ষ্যাপার প্রকৃত চিত্ররূপ

অথচ এই সাধক বামাক্ষ্যাপার জীবনী ( ১৮৩৮- ১৯১১) যা প্রতিদিন দেখানো হচ্ছে স্টার জলসার ‘মহাপীঠ তারাপীঠ’ সিরিয়ালে তা সম্পূর্ণ বিকৃত ইতিহাস। এই ধারাবাহিকে তন্ত্র, মন্ত্র, ভূত, প্রেত, দৈত্য, নাগরাজের ক্রোধ এইসব দেখিয়ে এই সময়কালকে শুধু নয় এই সমসাময়িক বাংলার মনীষীদের করা সকল কর্মকাণ্ডকে অপমান করা হচ্ছে।

ঊনবিংশ ও বিংশ শতকের ঘটনা বলে যা দেখানো হচ্ছে তা আজ থেকে চার হাজার বছর আগেকার হয়ত পটভূমি বা ধ্যান-ধারণা। এই ধারাবাহিকে দেখানো ঘটনাগুলি একদিকে যেমন এক ঐতিহাসিক চরিত্র সাধক বামাক্ষাপার চূড়ান্ত অপমান তেমনই অন্যদিকে আমাদের মগজের মধ্যে আবারও ভূত, প্রেত, কুসংস্কার ঢুকিয়ে দেওয়ার কৌশলে এক প্রচেষ্টা। বামাক্ষ্যাপা খুব কিন্তু প্রাচীন যুগের লোক ছিলেন না যে দৈবশক্তি দিয়ে সব কাজ করবেন।
আজ থেকে ১৫০ বছর আগে সেটা কুসংস্কার মুক্ত করার যুগ অথচ সিরিয়ালে দেখানো হচ্ছে ভূত প্রেত দৈত্য তারা এসে তারাপীঠকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, নাটোরের রাজাকে জলের তলায় নাগরাজের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছে। এইসব ঘটনাগুলো সিরিয়ালে দেখিয়ে আবার দর্শকের মগজে কুসংস্কারগুলো ঢুকিয়ে দেবার একটা প্রচেষ্টা চলছে এবং ইতিহাস থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা। যেসময় বাংলায় রেনেসাঁস আসছে, স্বাধীনতা আন্দোলন হচ্ছে সেইসময়ের পথিকৃৎ বামাক্ষ্যাপার নাম করে ভুলভাল ইতিহাস ও কুসংস্কারকে দেখানো হচ্ছে। বামাক্ষ্যাপা নিজের মধ্যে কালীসাধনা করতেন কিন্তু সেটা তো ভূত প্রেত আমদানি করে বুজরুকি ছিল না। বিকৃত সামাজিক ছিল না। যা দেখে আগামী প্রজন্ম ভুল শিখছে।

বামদেবের সমাধি

আমরা সাবর্ণ সংগ্রহশালার তরফ থেকে, মিথ্যাচার করা এই ধারাবাহিকটি অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানাচ্ছি। আপনারাও সরব হোন। ব্যবসার নামে ইতিহাস বিকৃতি করা চলবে না। নইলে আগামী প্রজন্মের শিক্ষা ও ইতিহাস সচেতনতা যেটুকু মানুষের মধ্যে তৈরী হয়েছে সেটা নষ্ট হয়ে যাবে।”

‘মহাপীঠ তারাপীঠ’ সিরিয়ালের শুরুতে সব চরিত্র কাল্পনিক ও বাস্তবের ঘটনার সঙ্গে মিল নেই লিখে দিয়ে বিকৃত ইতিহাস দেখানোর সুযোগ নেওয়া হচ্ছে। বামদেব এর সমসাময়িক কারা? বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, নেতাজী। তো সেইসময়কালে ভূত প্রেত দৈবশক্তি দেখিয়ে বাংলার মনীষীদের রীতিমতো অপমান করা কি বাংলার মানুষ সহ্য করবে? ভূতপ্রেত কবে তারাপীঠ ধ্বংস করেছে? কোথায় তার ইতিহাস আছে? নেতিবাচক চিন্তাধারা মানুষের মনে এই অতিমারীর সময়ে ইনজেক্ট করছে এই সিরিয়াল।
‘মহাপীঠ তারাপীঠ’ সিরিয়ালটি বন্ধ করার আর্জি জানালো সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার। তাঁদের অনুরোধ বাংলার মানুষও সরব হন এই বিকৃত সিরিয়ালের বিরুদ্ধে।

You might also like